অন্তরিন / তিন (বড়গল্প)

অন্তরিন / তিন (বড়গল্প)
23 Jan 2022, 01:00 PM

অন্তরিন / তিন

 

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

সরবিট্রেট-এর শিশিটা লেখার টেবিলেই ছিল।

নবু পই পই করে বলে গিয়েছিল সুন্দরকে, ওই শিশিটা যেন সব সময় কাছে কাছে রাখে।

সুন্দরের এই সুদীর্ঘ জীবনের ইতিহাসে এই বস্তুটি এসেছে খুবই অল্প ক'দিন হল। ওষুধের পাঠ চুকিয়ে, জল পান করে যখন আবার ফোনের রিসিভারটা কানে নিল। তখন শুনতে পেল কোঁ-কোঁ শব্দ; অর্থাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। যাঃ, লাইনটা কেটে গেল!

 

আচ্ছা,  ঠিক কিভাবে জবার সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল তার..

ভাবতে বসল না, ভাব-সাগরে ডুবে গেল।

.... সেটা উনিশশো একষট্টি সাল। সবে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ব্যাচেলর অব মেডিসিন এন্ড সার্জারি অর্থাৎ M.B.B.S পাশ করে বেরিয়েছে।

তারও পর বেশ কতগুলো বছর গেল চোখের ওপর বিশেষ পারদর্শী হবার পরীক্ষায় পাশ করার জন্য।  ডক্টরেট অব মেডিসিন (MD) ও  পরে মাস্টার অব সার্জারি (MS) দুটোতেই ডিগ্রি অর্জন করা হয়ে গেছে ততদিনে। 

MBBS করার পর আর হায়ার স্টাডি করা সম্ভব হলো না ইন্দ্রাণীর। তখনও সে জবা হয়ে ওঠেনি। 

সেকেন্ড ইয়ারের সময় থেকেই আলাপ ওর সঙ্গে। 

 

প্যাথোলজি, ফার্মাকোলজি, মাইক্রোবায়োলজি আর ফরেনসিক মেডিসিন ছাড়াও মেডিসিন,  সার্জারি, গাইনোকলজিও পড়তে হত। ইন্দ্রাণীর খুবই আগ্রহের বিষয় ছিল সার্জারি।

পরে যত দিন এগোতে লাগল, ওর ধ্যান-জ্ঞান হয়ে উঠতে লাগল তা।

একদিন ক্লাসে অ্যনাটমি ও ফিজিওলজি বিষয় নিয়ে এমন এক তর্ক বাধল, তা নিয়ে সুন্দর আর ইন্দ্রাণী দুজনেই বিচ্ছিরি ভাবে জড়িয়ে পড়েছিল।

ব্যাপারটি নিয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের অফিস থেকে ডাক পরল ক্লাসের অনেকেই; তার মধ্যে যথারীতি ওরা দুজনেই ছিল।

আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান হবার কথা। কিন্তু প্রিন্সিপাল স্যার এমন এক বিশ্রী ইঙ্গিত করে কথা বলেছিলেন ইন্দ্রাণীর দিকে তাকিয়ে, যে তখন আর মাথা ঠিক রাখতে পারেনি সুন্দর।  চোস্ত্ ইংরেজিতে ওই ভুল আচরণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করে উঠেছিল।

তার পর আলোচনা সেখানেই শেষ হয়েছে বটে, তবে তার ঝড়-ঝাপটায় আঘাতের সামনে পড়তে হলো সুন্দর আর ইন্দ্রাণী দুজনকেই।

পরদিন ওদের দুজনের ওপরই সাসপেনশনের নোটিশ এলো। কারণ: মিসবিহেব উইথ ডিপার্টমেন্ট হেড।

সুন্দরের পক্ষে ওই সাসপেনশন অর্ডারের মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছিল তার বাবা ও বংশ-পরিচিতির কারণে,  কিন্তু ইন্দ্রাণী পক্ষে তা আর সম্ভব হলো না।

এখানে বলে নেওয়া দরকার সুন্দরের পরিচিতিটা। ও সাবর্ণ চৌধুরী বংশের। ওই সময়ে কলকাতার বড়িষায় যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল, আজও আছে। যদিও ইতিহাস, তবুও বলতে হয়,  সুন্দরদের-ই পূর্ব-পুরুষের কাছ থেকে ষোড়শ আটানব্বইয়ের দশই নভেম্বর তিনটি গ্রাম- সুতানুটি,  কলিকাতা ও গোবিন্দপুর, ব্রিটিশ ঈষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইজারা, অর্থাৎ লিজ নিয়েছিল।  ওই তিনটি গ্রামের পরিবর্তিত রূপ, আজকের এই কলকাতা শহর।

পরবর্তীতে সুন্দরদের পরিবার খালি বরিষায় নয়, উত্তরপাড়া, বিরাটী ও কলকাতার আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। 

 

যাক্ গে, এখন কথা হল গিয়ে, পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে সুন্দর নিয়মিত ভাবে মেডিকেল কলেজে ক্লাস করতে পারলেও ইন্দ্রাণীকে ওই সাসপেনশন অর্ডারের কারণে ক্লাস বন্ধ রাখতে হল।

প্রথম প্রথম খুব খারাপ লাগে সুন্দরের। পরে মনের দংশনে অফিসের থেকে ইন্দ্রাণীর বাড়ির ঠিকানা যোগাড় করে সরাসরি হাজির হল তার বাড়িতে।

(ক্রমশঃ)

ads

Mailing List