অন্তরিন / পঞ্চম পর্ব (গল্প)

অন্তরিন / পঞ্চম পর্ব (গল্প)
06 Feb 2022, 12:41 PM

অন্তরিন / পঞ্চম পর্ব (গল্প)

 

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

এক সঙ্গে পিসিমা নাম্নী ভদ্রমহিলার দুটি প্রশ্ন-বাণ ও জবা আর ইন্দ্রাণীর ধোঁয়াশার মধ্যে দিশেহারা হয়ে উঠছিল সুন্দর। বোধহয় বাড়ির কাজে ব্যস্ত ছিল ইন্দ্রাণী।  সদর দরজার নতুন অতিথি কে, বা কার সঙ্গে কথা বলতে হচ্ছে পিসিমাকে,  তা দেখার জন্য শশব্যস্ত হয়ে আসতে হয়েছে তাকে। 

এই প্রথম যেন তার দিকে ভালো করে লক্ষ্য সে।

কপালের ঘামে মাথার চুলগুলো অবিন্যস্ত ভাবে এদিক-ওদিক দিয়ে মুখে এসে পড়েছে, আর সেগুলো হাত দিয়ে সরাতে সরাতে সুন্দরকে বলল, আরে সুন্দর, কি ব্যাপার, এসো --- ভেতরে এসো।

এক বিশাল জগদ্দল পাথর যেন মাথা থেকে নামলো তার।

--- তুমি আমাদের বাড়ির ঠিকানা পেলে কোত্থেকে?

উত্তরের অপেক্ষা না করেই সরাসরি ঐ ভদ্রমহিলাকে সহাস্যে বলল ইন্দ্রাণী, পিসিমা, এ হলো আমার বন্ধু,  সুন্দর--- সুন্দরমোহন। আমরা এক সাথে ডাক্তারি পড়ি কলকাতায়। তা দাঁড়িয়ে কেন, এসো, ভেতরে এসো।

মেয়েদের এই একটি বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন ভগবান। যে কোনো পরিস্থিতিতে কেমন মানিয়ে নিয়ে পরিবেশ শান্ত করে তুলতে পারে! সত্যিই,  ঈশ্বর অসীম যত্ন নিয়ে ওদের বোধহয় বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে জগতে পাঠিয়েছেন।

ভেতরে ঢুকে দেখল বেশ পুরনো বাড়ি,  অনেক দিন মেরামতির কাজকর্ম যে হয় নি, সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়। 

সামনে বিরাট বড় উঠোন। সামনে তুলসী-মঞ্চ। ঐ উঠোন ঘিরে তিন দিকে বিস্তৃত দোতলা বাড়ি। 

--- এসো, মা-র সাথে আলাপ করিয়ে দি।

আবার চিন্তায় ছেদ পড়ল।

--- হ্যাঁ, কোথায় মাসীমা ---

বলতে বলতে মাঝারি চেহারার এক মহিলা বোধহয় রান্নাঘর থেকেই বেড়িয়ে এলেন। কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে মেয়ের দিকে জিজ্ঞাসু নয়নে তাকালেন তিনি। 

--- মা, এ হচ্ছে আমাদের কলেজের বন্ধু। আমরা এক ক্লাসেই পড়ি; এই যে ক'দিনের পড়া জমা হয়েছে, তারই কিছু পেপার দিতে এসেছে বোধহয়।

 

ততক্ষণে আমার হাত পৌঁছে গেছে ওঁর পায়ের কাছে,  প্রণাম করতে হবে যে। আমার শিক্ষা, আমার সংস্কৃতি, ভদ্রতা-সভ্যতা সব কিছুই আমার মা-কে ঘিরে।

--- থাক বাবা, থাক। বেঁচে থাকো, সুখে  থাকো।  তা হ্যাঁ বাবা, তোমার বাড়ি কোথায়?

--- আঁজ্ঞে বিরাটীতে আমাদের বাড়ি।

--- তবে তো কাছেই। 

--- আদি বাড়ি বেহালা, বরিষায়।

--- জানো মা, সুন্দরেরা বরিষার সাবর্ণ চৌধুরী বংশের। 

--- ওমা তাই, ও তো শুনেছি খুবই বর্ধিষ্ণু পরিবার!

--- তা হ্যাঁরে জবা, তুই দেকচি এই ছেলেটার সব খবর-ই রাকিস।

অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন ইন্দ্রাণীর পিসিমা, সুযোগ পেয়েই হুল ফুটিয়ে দিলেন।

--- বা রে, একসাথে পড়ি, একে অন্যের খবর রাখব না? সব সময়ই কি মড়া কাটবো নাকি, পিসিমা?

হালকা করে দিলো একটা কথায়। ওর মা পরিবেশ আরো হালকা করে বললেন, ঠাকুরঝি, ছেলেটা প্রথম বাড়ি এলো, দ্যাখো না ভাই,  বিশুদার দোকানে যদি কিছু পাও। তোমার দাদাও এখন বাড়ির বাইরে। জবামা, ওকে বাইরের ঘরে বসা, আমি চা নিয়ে আসছি।

 

কলিং বেলটা অনেকক্ষণ ধরে একনাগাড়ে কে বাজিয়ে চলেছে।  কেউ নেই এতবড় বাড়িটায় যে গিয়ে খুলে দেবে দরজাটা।

কি যে একটা ভাইরাস এসে জুটল করোনা,  না কি, তার ঠেলাতেই তো ঠিকের ঝি, রান্নার বৌ, ঘর মোছার লোক নেপুর মা -সব্বাই ছুটি নিয়েছে। 

নিজের মনেই গজগজ করতে করতে সদর দরজা খুলতে ছুটল সুন্দর। পুরনো দিনের চর্বিতচর্বণে এতটাই মশগুল ছিল, কতক্ষণ ধরে যে বাইরের লোক বেল বাজিয়ে চলেছে, তা বুঝতেই পারেনি।

আর বয়েস বাড়ার সাথে সাথে হাঁটুর ব্যথার সাথে পাল্লা দিয়ে পায়ের পাতায় ঝিনঝিনি ধরাটাও যেন বেড়েছে আজকাল। 

আবার বেল ---

--- আরে যাই যাই--- দাঁড়াও ভাই, যাচ্ছি।

বলতে বলতে দরজা খুলে দেখে পাশের বস্তির তিন-চারজন ছেলে দাঁড়িয়ে। মুখে সবার রঙবেরঙের মাস্ক।

--- কে ভাই, কাকে চাই?

--- দাদু আমরা --- নেপু--- ঐ যার মা আপনার বাড়ির ঘর-দোর ঝাড়পোঁছ করে, তারই বন্ধু। তা দাদু, মাস্ক পরেননি কেন? খবর শোনেন না?

--- না, ইয়ে--- তোমরা অনেকক্ষণ ধরে বেল দিয়ে যাচ্ছ, আমি শুনতে পাই নি, আর তাড়াতাড়িতে আর ওটা নেওয়া হয় নি। 

--- হ্যাঁ, ওটা সব সময়ই পরে থাকবেন।  কাউন্সিলার তো সব্বাইকে বাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে গেছে। এই আমরাই ক-ওত বাড়ি গে দিয়ে এসেছি  --- তা যাক, যা বলতে এসেছি--- নেপুর মার করুনা হয়েচে।

এইমাত্তর পুলিস এসে গাড়ি করে নিয়ে গেল হাসপাতালে।

---অ্যাঁ, বলো কি হে ! নেপুর মা ---- করোনা ভাইরাস!!

--- তব্বে আর বলচি কি, তিন/চার দিন সর্দি, গলায় ব্যথা --- মোড়ের মাথায় বোসের ওষুধের দোকানে যে ডাক্তার বসে,

--- হ্যাঁ, ঐ বোস ফার্মাসির ডাক্তার ব্যানার্জি  ---

--- ওই ডাক্তার আজ সকালে দেকে--- আমাদের থানায় খবর দিয়ে হাসপাতালে তুলে দিয়েছে।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইল সুন্দর।  খুব শান্ত নিরীহ মেয়েটা ছিল।

--- বাবা, কিছু টাকা দিয়ে দি, নিয়ে যাও। নেপুর তো এখন লাগবে টাকা।

--- নানা দাদু, টাকা-ফাকা এখন কিছুই লাগবে না। সব সরকারি খরচায়। একন জেলে আর ঐ করুণা নাকি --- হলে হেব্বি মস্তিষ্ক--- সব ফ্রি --- হে হে ---

ওদের মুখের ভাষায় স্তম্ভিত সুন্দর। তবুও মুখে ভদ্রতা এনে বলল:

--- তবুও হাতের কাছে কিছু রাখ। সংসারে কাজে লাগবে। 

--- না না বাবা, দরকার হলে নেপু নিজেই আসবে।  আমরা ও টাকা নিয়ে করব কি?

পাশের বেঁটে, কালো মত ছেলেটা গুটখা খাওয়া লালচে ছোপধরা দাঁতগুলি বার করে হেসে বলল,

--- তবুও যদি বাংলার ঠেক খোলা থাকত--- তাও না হয় একটা কথা হোতো। স-ওব বন্ধ, আর আমরাও সতী।

--- আরে চুপ বে। ভদ্দরলোকের সাতে ক্যামন কোরে কতা বলতে হয়, তুই মাইরি একোনো শিকলি না। দাদু, দরজা দিয়ে দাও। পরে নেপু এলে আসবে।

চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনে গেল সুন্দর।

ভাবতে লাগল,  এ কোন দিন আসতে চলছে  ----- ।

 

  (ক্রমশঃ)

Mailing List