অন্তরিন / বড়গল্প  (দুই)

অন্তরিন / বড়গল্প  (দুই)
16 Jan 2022, 10:15 AM

অন্তরিন

 

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

  (দুই)

 

সুদীর্ঘ সময়ের পর দুটি দূরে থাকা কপোত-কপোতী ঐ কালো, সেকেলে বিদঘুটে চেহারার যন্ত্রটিকে মাধ্যম করে চালিয়ে যায় তাদের পুরনো দিনের স্মৃতি-চারণা।

 --- দেখো, এক তরফা আমাকে বললে হবে না, তোমার গলাটা --- কেমন ছিল--- ভুলে গেছ, নাকি মনে করিয়ে দিতে হবে ম্যাডাম ....

--- মনে নেই,  দেখি --- তোমার কেমন মনে আছে :

--- কেন,  ইভা নাগের মত,  কেমন ব্যাক্তিত্ত্ব-সুলভ কন্ঠ,  আজো কানে বাজে। কেমন ঝকঝকে ভাবে বলত:  'All India Radio,  news read by Eva Nag '  ওঃ জবা, সেদিন ঐ গলার স্বর আমাকে তোমার অত কাছে নিয়ে গিয়েছিল। আমি ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে চিকেন স্ট্রু আর ব্রেড টোষ্টের অর্ডার দিয়ে কেমন করে তোমাকে বার বার বলতে বলতাম ইভা নাগের ঐ কটা লাইন---।

কথা বলতে বলতে  কেমন নস্টালজিক হয়ে যায় সুন্দর।  

--- সেজন্যই তো আজ আমার গলা চিনতে পারলে না ---

--- কতকাল তোমার ঐ গলা শুনতে পাই না,  কি করে বুঝব বলো, এতদিন পরে তোমার গলা আবার শুনতে পাবো।

--- এখনও মশাই-য়ের বৈকালিক কফি-সেবনের অভ্যাসটি আছে?

--- আছে মানে, বিলক্ষণ আছে। আরে যতক্ষণ কফি খাবার আনন্দ,  ততক্ষণ সুন্দরের সৌন্দর্য।  তারপরই তো সব কুৎসিত,  ছাই, --- পঞ্চভূতে লীন।

ঠান্ডা গলায় গড়গড় করে বলে সুন্দর।  কে বলবে, আজ ওর বয়স চুরাশির কোঠায়!!

চটুল কন্ঠে ঠোঁট কামড়ে জবা বলল,

--- তাহলে আমি সেটা মাটি করে দিলাম তো!

--- নানা, ও ঠান্ডা হয়ে গেল তো কি হয়েছে,  তোমার সাথে কথা তো বলা যাচ্ছে।  আমি আবার বানিয়ে নেব।

--- তুমি বানাবে মানে? তোমার বৌ, সরি --- বৌদি কোথায়?

--- আরে আর বলো না। বড় ছেলে সৌম্যজিৎ, মানে সৌম্য তো অনেকদিন  আমেরিকায়,  জানো তো --

--- কি করে আর জানব বল!

একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে জবার গলা থেকে; সেটাকে অনেক কষ্টে চেপে রেখে বলল:

--- ও হ্যাঁ,  তাও তো বটে। তা, বৌদি কি এখন ছেলের কাছে থাকে?

--- আরে না না। আর বলোনা। এত দিন ক্যালিফোর্নিয়ার একটা হসপিটালে সুপার হয়ে ছিল; এই মাসখানেক হলো ওয়াশিংটনে শিফ্ট করেছে।

--- ওমা তাই! তাহলে বৌদির ওয়াসিংটন-টাও ঘোরা হয়ে গেল এই সুযোগে।

--- আরে দূর দূর, শিফ্টের জন্য নবনীতা, I mean,  নবুকে পাঠানোর দরকারই ছিল না, আসলে --- হয়েছে কি ---  বৌমা রিম্পি প্রেগনেন্ট,  সৌম্যর বড় ছেলেটা তো সবে এই তিন বছরের--- একা সৌম্য অফিস করে --- বাড়ি শিফ্টিং,  বড় ছেলেকে সামলানো ---- একা পেরে উঠবে না বলেই তোমার বৌদিকে পাঠানো। 

--- তা তুমিও সাথে যেতে পারতে, এই বয়সে তাহলে একা থাকতে হত না।

 এবার হাসিতে উপচে পড়ল সুন্দরমোহন।

--- তুমি বোধহয় এখনকার খবর জানো না। আগে যা পোষ্য ছিল, এখন তার সংখ্যা আরো বেড়ে গেছে। অ্যাকোরিয়ামের মাছেদের সংখ্যাই প্রায় আড়াই হাজার, তার ওপর পাখি, গাছ, এই সব প্রাণীবাচক সত্ত্বা তো আছেই, তার ওপর অপ্রাণীবাচক বস্তুও কম কোথায়?

--- সত্যি, তুমি পারোও বটে।

একটু থেমে বলে উঠলো,

--- আচ্ছা সুন্দর,  এতো কাজের মধ্যে--- মানে ---  আমার কোনো কথা তোমার  মনে পড়ে না,  না ---

থমকে যায় আলাপচারিতার পরিবেশ; শান্ত জলে ওঠে ঢেউ।

চোখের সামনে ভেসে ওঠে রোগা ছিপছিপে দীর্ঘ চেহারার এক তরুণীর মুখ।

মনের পর্দা সরে যায়,  ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিন --- কফি হাউস--- কলেজ-স্ট্রিটের সেই স-ব দোকানের  ছবিগুলো সেলুলয়েডের ছবির মত ঝপ ঝপ করে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। 

 

সরবিট্রেট-এর শিশিটা আবার কোথায়--- বুকের বাঁদিকের ব্যথাটা যেন একটু একটু করে চাগাড় দিয়ে উঠছে  ---।

ওদিকে জবা আগ্রহী স্বরে জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছে:

--- কি হলো, তুমি কথা বলছ না  কেন,  তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? হ্যালো সুন্দর--- তুমি লাইনে আছো, আমার কথা শুনতে পাচ্ছ ?

ঔৎসুক্য, চাঞ্চল্য, দুশ্চিন্তা--- সব একসাথে তার গলার স্বরে ঝরে ঝরে পড়ছে।

ওদিকে সুন্দরমোহনের লক্ষ্য বস্তু তখন একটা  --- ।

 ---- সরবিট্রেটের শিশিটা। রিসিভারটা টেবিলে নামিয়ে রেখে, চোখে চশমা দিয়ে এদিক-ওদিকে খুঁজে বেড়ায়।

(ক্রমশ)

ads

Mailing List