অন্তরিন /এগারো (গল্প)

অন্তরিন /এগারো (গল্প)
27 Mar 2022, 03:30 PM

অন্তরিন /এগারো (গল্প)

 

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

ভালোবেসে সখি, নিভৃতে যতনে---

আমার নামটি লিখো,

তোমার মনের মন্দিরে।

আমার পরাণে যে গান বাজিছে

তাহার তালটি শিখো

তোমার চরণ-মন্জিরে---

ভালোবেসে সখি  -----

 

গুনগুনিয়ে গানের এই কলিটা গাইতে গাইতে সিঁড়ির রেলিংয়ে হাত দিয়ে, ধীরে ধীরে দোতলা থেকে একতলায় নাবল সুন্দর।

আসলে সকালে নবুর ফোনটা আসার পর থেকেই মনটা বেশ হালকা লাগছে।

গানটা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই গলা দিয়ে বেরিয়ে এলো।

আসলে এমনটা হয় না, কোনো একটা গানের কলি কোনো না কোনো সময়ে মনে পড়ে যায় ---- হয়তো কারণ নেই, এমনিই -----  তেমনি আজ এই গানটাই স্মৃতি-পটে ভেসে উঠলো।

চা খেতে খেতে একবার অ্যাকোরিয়াম সেল্ফের কাছে গেল। মাছগুলোর অগাধ, স্বাধীন গতিবিধি।

এতগুলো পাম্প চলে সারাদিন, কিন্তু কোনো শব্দ ছাড়াই। আর এ বিষয়ে কৃতিত্ব অবশ্যই নবুর। সুন্দর অত টাকা দিয়ে বিলাতি সো ফাইন পাম্প কিনতে চায় নি, জোর করে কিনিয়েছে নবু।

ওর যুক্তি অকাট্য। ছেলে বাইরে থাকে, তোমার বয়স হয়েছে; আর আমি নিজে বাপু কোথায় কি পাওয়া যায়---- অতশত জানি না।  কখন কোন পাম্প খারাপ হবে, না ছোটো বাজারে ----

তার থেকে বাবা বিলেতি পাম্পই আনিয়ে নাও, নিশ্চিন্তি।

এই সব ভাবতে ভাবতেই ড্রাই ফুড দিয়ে দিল মাছগুলোকে। এবার অ্যাকোরিয়ামের থার্মোমিটারের টেম্পারেচার চেক করে নিল। ওর প্রিয় এঙ্গেলের ট্যাঙ্কের কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল, তারপর একে একে ব্লাকমলি, সোর্ডটেল, টাইগার, রেডক্যাপ গোল্ডফিস, ফাইটার,  কোকোডাইল ---- সবগুলোর সামনে একবার করে সতর্ক লক্ষ্য করল, এটা ওর রোজকার রুটিন।

 

এবার পাখির খাঁচার সামনে হাজির হল। বদ্রিকা, ফিঞ্চ, কিছু চুনিয়া-মুনিয়া, আর খান তিনেক ময়না আর টিয়া---- এই নিয়েই তার পক্ষীসমাজ।

এ তার বেশ লাগে।

নার্সিংহোম ছেড়ে দেবার পর এগুলোই তার অক্সিজেন। 

নার্সিংহোমে চেম্বার করে, আগে- পরে যেমন রুটিন-মাফিক পেশেন্ট ভিজিট করত, এখন বাড়ির মধ্যে ওরাই যেন ওর পেশেন্ট। নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গর মতোই ভাবে ওদের।

 

দুপুরে রান্নার ঝ্যমেলা রাখেনি সুন্দর।

হোম ডেলিভারি করা ছিল, কিন্তু এখন সব তো বন্ধ। করোণার জন্য সব হোটেল-ই বন্ধ হওয়ায় নিজেকেই যা হোক করে নিতে হচ্ছে।  আজ সিম্পল ঝোল-ভাত। এমনিতেই  বরাবর বেশি হাজিবাজি খাওয়ার পক্ষপাতী নয়। আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে খাওয়া নিয়ন্ত্রণ ও  করতে হয়।

তবে আজ ও একটা অন্যায় করে ফেলেছে। সামান্য ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছে। ব্যাপারটা ভেবেই, নিজের মনেই একটু হাসি পেল। সে যেন ছেলেমানুষ হয়ে যাচ্ছে।

মাঝে মাঝে এই অন্যায় করার একটা আলাদা আনন্দ আছে ; আগে ছোটবেলায় দেশের বাড়ি থেকে ঘি আসতো। পরে বিরাটির বাড়িতে মা মাঝে মাঝে দুধের সর তুলে ঘি তৈরী করতেন। 

তাই, পুরোনো দিনের অনুভূতিগুলো কখনো-সখনো নেড়েচেড়ে দেখতে ভালো লাগে।  এখন তো বনেদিয়ানা উঠেই গেছে।  আছে খালি ঠুনকো বড়লোকি চাল।

কাল সেই যে জবার ফোনটা কেটে গেছিল, তার পর থেকে ওর কোনো ফোন আর আসেনি। নানান কাজের মধ্যে তারও আর ওকে ফোনটা করা হয়ে ওঠেনি।

বিকেলবেলায় ছাতে পায়চারি করে নীচে নেমে খুবই ইচ্ছে করতে লাগল আবার ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

আই ডি কলার দেখে, নম্বরটা মিলিয়ে ফোন করল জবাকে।

মনে কেমন যেন একটা কিন্তু কিন্তু ভাব। কে জানে,  ফোনটা কে ধরবে!

ওদিকে রিং হয়ে যেতে লাগল  -----।

(ক্রমশঃ)

Mailing List