বীরসা মুণ্ডার দেশে

বীরসা মুণ্ডার দেশে
24 Nov 2022, 11:15 AM

বীরসা মুণ্ডার দেশে

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল

 

আজ ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী সমাজের ভগবান বীরসা মুণ্ডার দেশে। চাণ্ডিল ছুঁয়ে- ছৌনাচের আঁতুরঘর সেরাইকেল্লা-চাইবাসা--চক্রধরপুর, রোরো--কুজু নদী, হিরণি ফলসের পথে-এ-এক অন্যভুবন। চাণ্ডিল ড্যাম থেকে সামনে সোজা চাইবাসার যাওয়ার যাওয়ার স্বপ্নের পথ। ঢেউ খেলানো মসৃণ স্বপ্নের রাজপথ। ল্যাণ্ডস্কেপ অনেকটা মধুপুর-- শিমুলতলার যেন কালার ফটোকপি। স্বল্প বিরতির পর আবার পথ চলা শুরু করলাম। মনজুড়ে সুন্দরী অরণ্যকন্যা চাইবাসা। ভাবনায় একটা ছবি এঁকে চলেছি, কাউকে বলতে পারছি না। সীমান্ত বাংলার সবুজ রাজ্য ঝাড়খণ্ড, রূপে, রসে-বর্ণে অনন্যা। নগরজীবনের কোলাহল মুক্ত এক স্বপ্নরাজ্য। কষ্টকল্পনা বনাম কঠিন কঠোর বাস্তব ভাবনায় বুঁদ হয়ে যাচ্ছি। গাড়ির কাঁচ সরিয়ে দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। শাল -মহুয়ার জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে সদ্য ওঠা  সূর্যের আলোর মায়াবী আলো।

ছোট ছোট পাহাড়ে ঘেরা অরণ্য ভূমি। অরণ্যের কোলে ওঁরাও-মুন্ডা দের মতো প্রান্তভূমির আদিবাসী সহজ, সরল নিষ্পাপ মানুষজনের বাস। জীবন এখানে ধীর স্থির, বয়ে চলে তার নিজস্ব ছন্দে। ভোরের আলো এখানে উদ্ভাসিত হয় নিটোল খনিজ সম্মৃদ্ধ ঝর্ণার জল কে চুম্বন করে। সুবর্ণরেখার শাখা রোরো নদী আর অপরূপা কুজু  নদীএখানে তার রূপের বাহারে বারে বারে চলে আসে সাহিত্যিকের কলমে। এক সময় মাওবাদীদের আঁতুড়ঘর ছিল সাইবাসা। আজ সব অতীতের কথকতা। চাইবাসার পরম সম্পদ নির্মল অনাঘ্রাতা প্রকৃতি। একইভাবে উঠে আসে আরও নদীর নাম। গভীর অরণ্য নিবাসী এখানকার আদিবাসীরা গড়ে নিয়েছে তাঁদের নিজস্ব শিব মন্দির, যার গা ঘেষে অনবরত কলকল শব্দে হাকুইয়াম ঝর্ণা। চাইবাসার সঙ্গে বাঙালির গভীর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বাঙালিদের একটি ক্লাব আছে,বহু প্রতিষ্ঠিত বাঙালি ব্যবসায়ী সঙ্গে পরিচয় হল। দুই নদী বেশ ঘরোয়া।জনজীবনের প্রাণের সম্পদ। বর্তমানে কিছু নদীর তীরে বেশ কয়েকটি আধুনিক মানে ফ্যাক্টরি তৈরি হচ্ছে।এখানকার প্রান্তভূমির মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পালাবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আমার কৈশোর জীবনে চাইবাসার সঙ্গে পরিচয় ঘটে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখার মাধ্যমে। এক সময় বাঙালি বহু লেখক ও কবিদের প্রিয় আস্তানা ছিল চাইবাসা। বর্তমানে বহু বাঙালিরবসবাস। শুনলাম দুর্গাপুজো বেশ ভালোই হয়। চাইবাসার প্রতি একটা আকর্ষণ অনুভব করতাম। সুযোগ খুঁজছিলাম। বহুদিনের অধরা স্বপ্ন আজ পূর্ণ হল। সবুজ জঙ্গলাবৃত সেই চাইবাসা। তাছাড়া বঙ্গ সাহিত্যের কল্যানে স্কুল -কলেজ জীবন থেকেই যে "চাইবাসা" মনের গভীরে বাসা বেঁধে নিয়েছিল! অবশেষে সুযোগ পেলাম ... আদিবাসীদের ভগবান বিরসা মুন্ডার স্বপ্নের চাইবাসাকে, টাঙ্গি তীর ধনুকের চাইবাসাকে, লড়াই- -আত্মমর্যদার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর চাইবাসাকে, রূপসী চাইবাসাকে.... মনের বাসা থেকে বাস্তবে নিয়ে আসতে।

আগেকার দিনে বাঙালি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দেওঘর, দার্জিলিং আরো অনেক জায়গায় যেত, তেমনি একটা বড়ো সংখ্যার মানুষ যেত অবিভক্ত বিহারের চাইবাসাতে, বর্তমানে এটি ঝাড়খন্ড রাজ্যে....

বলা হয়, চাইবাসার জল ধন্বন্তরীর ওষুধ....যাই খাওয়া হোক, এখানকার জল খেলাই সব সহজেই হজম হয়ে যায় ......এখানকার জল আর জলবায়ুর সত্যিই দারুণ, তার প্রমাণ পেয়েছি ..কারণ কোথাও গেলে রাস্তার পাশের দোকানের স্থানীয় কোন খাবার চেকে দেখা আমার বাদ থাকে না ...এখানে সেই সব খাবার পরিমাণ সত্যিই বেড়ে গিয়েছিল ...

অরণ্য আর পাহাড়ে ঘেরা চাইবাসার অন্যতম আকর্ষণ ওঁরাও, মুণ্ডা, হো, সাঁওতাল ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর বাস এখানে...এখানে সহজেই মিশে যাওয়া যায় এইসব অধিবাসীদের সঙ্গে, সেই সাথে নিজেকে হারিয়ে ফেলা শাল, পায়াল, সেগুনের উঁচু-নীচু, আঁকা-বাঁকা পথে ..

শহর থেকে কিছু দূরে বয়ে চলছে খরস্রোতা বোরো নদী,দুই পুড়ে শুধুই সবুজের সমারোহ ...এর পাশেই লুপুঙঘুটু নামে একটা জায়গা, মাটি ফুঁড়ে জল উঠেছে, আর তার ছোট্ট একটা ধারা বোরো নদীতে গিয়ে মিশেছে....স্থানীয়রা এই জলকে পবিত্র মনে করে ...চাইবাসা শহরে বাঙালি ছোঁয়া পাওয়া যায় ...ছোট বড়ো নানা ধরনের হোটেল আছে ..

শাল, পিয়ালের ছায়ায় হো-মুণ্ডা-ওঁরাও দের ধামসা, মাদলের সুরে চাইবাসাতে দুদিন কাটিয়ে আসাই যায়...

একটি টোটো ভাড়া করে আধ বেলায় অনায়াসেই ঘুরে নেওয়া যায় চাইবাসা শহরের সাইটসিংয়ের জায়গা গুলো, যে গুলো সবই ওই ৪-৫ কিমি এর মধ্যে - জুবিলী পার্ক, লুপুংগুটু, রোরো নদী ও বাঁধ, রুঙ্গটা গার্ডেন ইত্যাদি।

 

পথনির্দেশ---হাওড়া থেকে সরাসরি  ট্রেনে চাইবাসা। এছাড়াও  কোলকাতা থেকে  সরাসরি জামশেদপুর  হয়ে চাইবাসা যাওয়া যায়। থাকার জন্য অনেক হোটেল আছে।

Mailing List