দামোদরে আর আগের মতো মেলে না মাছ, মেলে না কালো হীরে, এ যেন এক নদী-হত্যার খেলা

দামোদরে আর আগের মতো মেলে না মাছ, মেলে না কালো হীরে, এ যেন এক নদী-হত্যার খেলা
10 Aug 2022, 12:30 PM

দামোদরে আর আগের মতো মেলে না মাছ, মেলে না কালো হীরে, এ যেন এক নদী-হত্যার খেলা

 

প্রভাতকুমার শীট

 

পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া জেলার প্রাণকেন্দ্র দামোদর নদ। কৃষি থেকে শুরু করে শিল্প সবেতেই এই জেলার বাসিন্দার জীবন-জীবিকার রসদ যোগাত। আর এখন দিন দিন কমছে জলের পরিমাণ, বাড়ছে বালি উত্তোলন ও নদী দূষণের মাত্রা। তারই জেরে জেলাবাসীর চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়েছে।

অভাবের সংসারে দামোদর নদীর বুকে শত শত মানুষের জীবন জীবিকা নির্ভর করে। অনেকে কয়লা কুড়িয়ে অথবা মাছ ধরে দিব্যি সংসার চালাত। এই ছবিটি ছিল কয়েক দশক আগে। আজ চোখে পড়ে না। হাতেগোনা কয়েকজন এ কাজ করে। পুরুলিয়া জেলার সাঁতুড়ি  ব্লকের মধুকুণ্ডার বাসিন্দা রেখা ও মহিনী নদীর জলে ভেসে আসা কয়লা খুঁজছে। সেই সকাল থেকে বেরিয়ে, দুপুর গড়িয়ে চলল তাতেও পর্যাপ্ত কয়লা পাচ্ছে না। কয়লা কুড়োতে  কুড়োতে তারা বলল, "নদীতে জল কমেছে, তাই কয়লা আসে না। মাছও কমেছে অনেক। আগে মাছ ধরে সংসার চলত। এখন কয়লা বিক্রি করে হাতে কিছু টাকা আসে। আগের মতো মাছ ধরে লাভ তো দূরের কথা সংসার চলে না। আগে মাছ ধরে চারশত থেকে ছয়শত টাকা দিনে রোজগার হত। এখন মেরেকেটে দেড় থেকে দুইশত টাকা রোজগার হয়। সেই সকাল থেকে বেরিয়েছি। মাত্র কেজি পাঁচ কয়লা কুড়িয়েছি। সংসারের জ্বালানির জন্য কিছু রেখে বাকিটা বিক্রি করব"। আসানবনির বাসিন্দা উত্তম বাউরি বলেন, "দশ বছর আগেও বোয়াল,  আড়, চেলা, ট্যাংরা, খয়রা, বান প্রভৃতি মাছ ধরা পড়তো জেলেদের জালে। কিন্তু সেই সবের আর দেখা মেলে না"।  দেউলির বাসিন্দা কার্তিক ধীবরের কথায়, "আগে প্রতিদিন আট থেকে দশ কেজি মাছ উঠত জালে। এখন মেরে কেটে দু’তিন কেজি মাছ ধরাও খুবই কষ্টের।" মাছের আকাল দেখা গিয়েছে দামোদরের গর্ভে। লকডাউন এর ফলে নদীর দূষণ কমায় কিছুটা স্বস্তি ছিল। এখন সেই আগের মতো নদীর দূষণ বেড়েছে। মাছের সংখ্যা ও পরিমাণ কমেছে অনেক। মাছ ধরে বেঁচে থাকা গ্রামবাসীদের রুজিতে টান পড়েছে বেশ। গবেষকরা দামোদরে মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে নদীদূষণকে দায়ী করেছে।

বিভিন্ন কলকারখানার রাসায়নিক পদার্থ, যেমন জিঙ্ক, ম্যাঙ্গানিজ, ফেরাস, পারদ,  সীসা প্রভৃতি নদীর জলে মিশে বিষাক্ত করে তুলছে। তাছাড়াও রাইস মিলের বর্জ্য, শহরের নিকাশি জল, চাষের জমির দূষিত জল পড়ছে। তাতেই বাড়ছে দূষণ। জলে দ্রবীভূত পদার্থ সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফেট প্রভৃতি বাড়ায় জলের সহনশীলতার মাত্রা ছাড়িয়েছে। জলের গুণগত মান কমে যাওয়ায় মাছের ডিমের বিরূপ প্রভাব ফেলে ও ডিম নষ্ট হয়। মাছের খাবার ফাইটোপ্লাংটন ও  জুপ্লাংকটন কমছে। জলে বাড়ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ও তাপমাত্রা। কমছে অক্সিজেনের পরিমাণও। এসবের ফলে মাছের বেঁচে থাকার আবাসস্থল ও প্রজন্মের আঁতুড়ঘর চিরতরে নষ্ট হচ্ছে। জলজ পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র বিঘ্ন ঘটছে। শুধু জল দূষনে তা নয়, নদীর বুকে মেশিনের সাহায্যে বালি উত্তোলনের ফলেও বিঘ্নিত হচ্ছে নদী জল প্রবাহ ও বাস্তুতন্ত্রিক ভারসাম্য হারাচ্ছে। এসব তথ্য উঠে এসেছে বিগত তিন বছরে ধরে দামোদর নিয়ে গবেষণা করার সুবাদে।

দামোদরের উপর নেতাজী সুভাষ সেতুর (দিশেরগড় পারবেলিয়া ব্রীজ) নিচ দিয়ে নদী বরাবর আঁকাবাঁকা পথে একটু এ গেলেই চোখে পড়বে এক ভয়ানক দৃশ্য। এ যেন কালো হীরের দেশে প্রবেশ। নদীগর্ভে অবৈধ ওপেন কোল মাইনিং চলছে। এক দুই জায়গায় নয়, দশ থেকে বারো জায়গায়। কাক পক্ষীও টের পাবে না। পরে জানতে পারলাম, জায়গাটা নিতুড়িয়া ব্লকের ভামুরিয়া পঞ্চায়েতের দেবীডাঙ্গা গ্রাম। চলছে দামোদর নদীর তীরে পাথর কেটে, ইঁদুরের গর্তের মত বেশ কয়েকটি খাদান খোঁড়া হয়েছে। সেখানে কয়লা মাফিয়ারা অবৈধভাবে কয়লা তুলছে। নদী পাড় কেটে দুই থেকে আড়াই ফুট সুড়ঙ্গ দিয়ে নদী গর্ভে প্রবেশ। সুড়ঙ্গের মাথায় টিনের দরজা। দরজার উপরে কালীমার ছবি টাঙ্গানো। দুই এক জায়গায় চোখে পড়ল কয়লা খনির জল বেরনোর ডেলিভারি পাইপ।

কয়লা মাফিয়ারা নদী পাড়ের অবতল ঢাল বরাবর ২০ থেকে ৪০ মিটার গভীর থেকে কয়লা তুলছে। বস্তা ভরে দিনের আলোতে নদী পারাপার করছে। তারপরে সাইকেল, স্কুটার, গরুর গাড়ি, ছোট ট্রাক বোঝাই হয়ে রাজ্য সড়কের পরিবর্তে গ্রামের ভিতর দিয়ে সেই কয়লা চলে যাচ্ছে স্থানীয় কয়লা ডিপোগুলিতে। একটা খনির কয়লা শেষ হলে অন্য খনির কয়লা তুলছে। এই ভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ অবাধে লুট করছে। আর কয়লার গর্ত গুলো ভরাট হচ্ছে না। ফলে নদীর পাড়ে ধ্বস নামে বারে বারে। নদীর ভূদৃশ্য বা চরিত্র বদলে যাচ্ছে। নদী ভরাট হচ্ছে অর্থাৎ নাব্যতা কমছে। আর কয়লার পিটের সাথে নদীর জল মিশে দূষণ বাড়ছে।

শুধু নদীর বুক থেকে কয়লা উত্তোলন নয়। যত্রতত্র চলছে মেশিনের সাহায্যে অবাধে, অনিয়ন্ত্রিত বালি উত্তোলন। নদীর বুকে গড়ে উঠেছে সিমেন্টের পাকা রাস্তা, ট্রাকে করে বালি পরিবহনের জন্য। গত কয়েক দশকে অবৈধ বালি উত্তোলনের দরুন নদীর গঠনগত কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে বদলে যেতে পারে নদীর গতিপথ। দামোদর তার নিজস্ব প্রবাহ ছেড়ে ঢুকে পড়তে পারে লোকালয়ে। নদীর বুকে যে অত্যাচার হচ্ছে তা সহনশীলতার মাত্রা ছাড়িয়েছে বহু আগে। যেখানে অবৈধ উন্মুক্ত কয়লা খনন ও মেশিনের সাহায্যে বালি উত্তোলন হচ্ছে, সেখানেই দূষণ ও বাস্তুতান্ত্রিক ঝুঁকি বেশি। শুধু নদীর জলের নয়, নদীর গর্ভের জলে ও মাটিতে দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে। আগামী দিনে ভৌম জলের দূষণ বাড়বে। এ যেন নদী হত্যার চক্রান্ত। এসব সত্ত্বেও কবে আমাদের হুঁশ ফিরবে? নদী কত আর নিজেকে মানিয়ে নেবে (রেজিলিয়েন্স)? সময় এসেছে নদীর বুকে আমাদের অত্যাচার বন্ধ করার ও দূষণ কমানোর।

..........

লেখক: অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয়, মেদিনীপুর

Mailing List