অজ্ঞানতা, না কি গদি বাঁচানোর খেলা? তাই দূষণের অন্ধকারও নজরে আসে না

অজ্ঞানতা, না কি গদি বাঁচানোর খেলা? তাই দূষণের অন্ধকারও নজরে আসে না
14 Sep 2022, 03:00 PM

অজ্ঞানতা, না কি গদি বাঁচানোর খেলা? তাই দূষণের অন্ধকারও নজরে আসে না

 

 

. গৌতম সরকার

    

 

ইদানিং রীতিমতো একটা হাড়-হিম করা খবর খবরের কাগজ, টেলিভিশন বা সোশ্যাল মিডিয়া কোথাও ন্যুনতম কলকে পাচ্ছে না। সেটা হল, একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে কলকাতা বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিততম শহরের শিরোপা অর্জন করেছে। আমাদের কল্লোলিনীর স্থান রাজধানী শহর দিল্লির ঠিক পরেই।

এত গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপারে কতিপয় পরিবেশ কর্মী আর বিজ্ঞানী ছাড়া আর কারোর মাথাব্যথা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। আমজনতার কথা ছেড়েই দিলাম, সরকারেরও কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। তবে যেটা পরম আশ্বর্য্যের সেটা হল গোটা বিষয়টিতে বিরোধী পক্ষের চুপ করে থাকা। সেটা কী নিছক অজ্ঞানতা? নাকি এর পিছনেও জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ নিহিত আছে! ব্যাপারটা রীতিমতো ভাববার, কারণ ২০১১ সালে ক্ষমতায় পরিবর্তন ঘটলেও পরিবেশ নিয়ে এই রাজ্যের সচেতনতার বহর যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। স্রেফ উপেক্ষা, অবজ্ঞা আর আটপৌরে গা-ছাড়া হাবভাব ছাড়া তার কপালে আর কিছুই জোটেনি। তবে একটু খোঁজখবর নিলে আসল কারণটা বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। এই শহরে দূষণের ভয়ংকর প্রাবল্যের জন্য যে কারণগুলো দায়ী, তার বেশিরভাগটার সঙ্গেই যারা জড়িত আছে তারাই রাজনৈতিক জমায়েত এবং সর্বোপরি ভোট ব্যাংকে বড়সড় ভূমিকা পালন করে। তাই কোনও রাজনৈতিক দলই যে এটা নিয়ে খুব বেশি সোচ্চার হবে না, বলাই বাহুল্য।

 

বাতাসের দূষণ (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআই) মাপা হয় গ্রাউন্ড লেভেলের ওজোন গ্যাসের পরিমান, অন্যান্য পার্টিকিউলেট ম্যাটার, যেমন- কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড ইত্যাদির উপস্থিতির প্রেক্ষিতে। এই মাপকের ভিত্তিতে সর্বশেষ 'স্টেট অফ গ্লোবাল এয়ার'-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ ঘনবসতি পূর্ণ শহরগুলিতে বাতাস দূষণের নিরিখে দিল্লির স্থান প্রথম এবং কলকাতার দ্বিতীয়। এছাড়া বায়ুমণ্ডলে পি.এম ২.৫ অর্থাৎ আড়াই মাইক্রন বা তার থেকে ছোট ধূলিকণার উপস্থিতির নিরিখেও বাতাসের গুণমান হিসেব করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা 'হু'-এর মতে এই দূষকের উপস্থিতি প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হওয়া উচিত নয়। ভারতে এই দূষকের সীমা টেনে বাড়িয়ে করা হয়েছে ঘনমিটার পিছু ৪০ মাইক্রোগ্রাম। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা বলছে, কলকাতায় এই দূষকের মাত্রা ৮৪ মাইক্রোগ্রাম, দিল্লিতে ১১০ মাইক্রোগ্রাম এবং মুম্বাইয়ে ৪৫.১ মাইক্রোগ্রাম। আই কিউ এয়ার-এর হিসেবে দিল্লি, কলকাতার পর পাঁচ নম্বরে আছে ঢাকা (৭১.৪ মাইক্রোগ্রাম), আট নম্বরে করাচি (৬৩.৬ মাইক্রো গ্রাম), নয় নম্বরে বেজিং (৫৫ মাইক্রো গ্রাম)। পৃথিবীর প্রথম দশটি দূষিততম শহরের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সংখ্যাধিক্য এই ভৌগোলিক অঞ্চলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পরিবেশ নিয়ে উদাসীনতার চিত্রটি পরিষ্কার করে তোলে।

   

শহরের দূষণের জন্য কোন কোন বিষয়গুলি দায়ী সেটা নিয়ে সামান্য মতভেদ থাকলেও বিভিন্ন রিপোর্টে মোটামুটি ভাবে যে বিষয়গুলোর দিকে আঙুল তোলা হয়েছে সেগুলো হল, পি এম ২.৫, গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়া, যত্রতত্র জঞ্জাল পোড়ানো এবং নির্মাণকার্য। বিজ্ঞানীদের মতে বাতাসে উপস্থিত সূক্ষ ধূলিকণা ফুসফুসে পৌঁছে সাধারণ জ্বর-সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে ক্যানসার রোগ পর্যন্ত ঘটাতে পারে। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে আমাদের শহরে প্রায় এক লক্ষ পঁচাশি হাজার মানুষ এই কারণে মারা গেছেন, যেটা কোভিড সংক্রমনের চেয়ে কম কিছু নয়, কিন্তু মানুষ বা সরকার কেউই ব্যাপারটিকে পাত্তা দিতে রাজি নয়। কলকাতার বায়ু দূষণের আরেকটি কারণ হল নির্মাণ কাজ। কোনও কোনও পরিবেশবিদের মতে গাড়ির ধোঁয়ার থেকেও নির্মাণ কাজের ফলে সৃষ্ট দূষণ শহর ও শহরবাসীর পক্ষে বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এই শহর নির্মাণ কাজ আর তৎসহ পুরানো ও বেআইনি বাড়ি ভাঙার ধুলোয় দিন দিন বিষাক্ত হয়ে উঠছে। এর সাথে যোগ হয়েছে জঞ্জাল পোড়ানোর দূষণ। এখনও পর্যন্ত জনবহুল এলাকায় বহু চায়ের দোকান, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় কয়লার উনুন এবং কেরোসিন স্টোভ ব্যবহার করা হয়। এর সাথে শহরের অধিকাংশ বর্জ্য পদার্থ পুড়িয়ে ধ্বংস করার নামে বাতাসে দূষিত গ্যাসের পরিমান বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে।

 

সরকারকে এই ব্যাপারে সচেতন করে বিশেষজ্ঞরা দূষণ কমানোর বিভিন্ন পরামর্শও দিয়েছেন, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বড় রাস্তার পাশের দোকানগুলিকে গ্যাস ব্যবহার করতে বলা আর করপোরেশনের তরফে রাস্তার ধুলো কমাতে জল ছিটোনোর কর্মসূচির অতিরিক্ত কিছু করা সম্ভব হয় নি। দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা হাইকোর্ট এবং ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল শহর থেকে পনের বছরের পুরনো গাড়ি বাতিল করার কথা বলে আসছে, কার্যক্ষেত্রে কিছুই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি আবার একই নির্দেশ এসেছে, সরকার সেই নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করেছে। পরিবেশ বন্ধুরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনকে শহরে যথেষ্ট সংখ্যক গাছ লাগানোর কথা বলে আসছেন। ২০২১ সালে কলকাতা পৌরসভার তরফে ৫০০০ গাছ লাগানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া কয়েকটি ওয়ার্ডে পাইলট প্রজেক্টের মাধ্যমে ময়লার পৃথকীকরণের কর্মসূচি নেওয়া হয়। তবে এই কাজকে সর্বাঙ্গীন করা খুব জরুরী। সব বরোতে বৃহৎ আকারের কালেকশন সেন্টার তৈরি করতে হবে, বর্জ্য পরিবহনের গাড়িগুলিতে জিপিএস লাগানো বাধ্যতামূলক হওয়া দরকার। এই সমস্ত কাজ কিছু কিছু শুরু হয়েছে, ধারে এবং ভারে কাজের গতি সত্বর বাড়ানো অতি আবশ্যক৷

    

শহরের বায়ুদূষণ কমাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০১৯ সালে একটি উচ্চ পর্যায়ের পরামর্শদাতা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের প্রতিনিধিদের সাথে পুরসভার আধিকারিকরাও ছিলেন। প্রাথমিকভাবে কমিটির পক্ষ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে একটি স্বল্পমেয়াদী এবং ৪৫ দিনের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার জমা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেটা ঘটেনি। তারপর মহামারীর দীর্ঘ দুটো বছর পেরিয়ে ২০২১ সালে এপ্রিলে আবার একটি বৈঠক হয়, বৈঠক পরবর্তী কোনও রিপোর্ট বা পরিকল্পনার খসড়া জমা পড়েছে কিনা ঠিক জানা যায়নি।

বায়ুদূষণের কালো ছায়ায় ঢাকা পড়েছে কল্লোলিনী কলকাতা। সমস্যা এতটাই গভীরে চলে গেছে যাতে করে প্রশাসনকেও এখন নড়েচড়ে বসতে হয়েছে। বায়ুদূষণ কমাতে জঞ্জাল পোড়ানো, কাঠের উনানে রান্না করা ইত্যাদি বিবিধ বিধিনিষেধ জারি করেছে পুর প্রশাসন। কিন্তু ফাঁক থেকে গেছে অনেক জায়গায়। বৃক্ষছেদন, অবৈধ ট্যানারি, ভেড়ি দখল করে অবৈধ নির্মাণ ইত্যাদির কারণে বায়ুদূষণ দিন দিন যে ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে সে ব্যাপারে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বহু সংশয় থেকে যাচ্ছে। আমেরিকার হেল্থ এফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ সমীক্ষা জানিয়েছে শুধুমাত্র ২০১৫ সালে বায়ুদূষণের জেরে ভারতে ১১ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল। কলকাতা শহরে অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বাতাসে দূষণের পরিমান সর্বাধিক থাকে। এর ফলে হাঁফানি, শ্বাসরোগ, ফুসফুসের সংক্রমণ সংক্রান্ত জটিল রোগগুলি বেড়ে যায়, একথা চিকিৎসকগণ দীর্ঘকাল ধরে বলে আসছেন। কিন্তু যেটি এতদিন জানা ছিলোনা সেটি হল, বায়ুর বিষাক্ত উপাদান শুধু ফুসফুস নয়, ফুসফুস অতিক্রম করে শরীরের সমস্ত অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে ক্যানসারের মত দূরারোগ্য ব্যাধির সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

   

এত কিছুর পরও প্রশাসনের তরফ থেকে দূষণ প্রতিরোধের জন্য যেটুকু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেটি মোটেও যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে মানুষের অজ্ঞানতা বা সচেতনতার অভাব বা স্রেফ পাত্তা না দেওয়ার মানসিকতা অতি সত্বর আমাদের ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে। যাঁরা আক্রান্ত হচ্ছেন, যাঁরা মারা যাচ্ছেন তারা ছাড়া বাকি সমাজ ভ্রূক্ষেপহীন নির্লিপ্ত জীবনযাপন করে চলেছেন। আর কত মৃত্যুমিছিল সন্দর্শনের পর প্রশাসন থেকে শুরু হবে বৃহত্তর সমাজের চেতনার উন্মেষ ঘটবে আগামী পৃথিবীই তার সাক্ষী থাকুক।

 

লেখক: অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক

তথ্যঋণ: সংবাদপত্র ও ইন্টারনেট

Mailing List