মাথা পিছু বছরে কতটা প্লাস্টিক মিশছে পরিবেশে, তার ক্ষতির দিকটি ক’জনের জা‌না? প্লাস্টিক ব্যবহার কমাতে সচেতনতাই ভরসা

মাথা পিছু বছরে কতটা প্লাস্টিক মিশছে পরিবেশে, তার ক্ষতির দিকটি ক’জনের জা‌না? প্লাস্টিক ব্যবহার কমাতে সচেতনতাই ভরসা
05 Aug 2022, 10:30 AM

মাথা পিছু বছরে কতটা প্লাস্টিক মিশছে পরিবেশে, তার ক্ষতির দিকটি ক’জনের জা‌না? প্লাস্টিক ব্যবহার কমাতে সচেতনতাই ভরসা

প্রভাতকুমার শীট

 

দেরিতে হলেও রাজ্য সরকারের সচেতনতা ফিরেছে। ৭৫ মাইক্রোনের কম ঘনত্ব যুক্ত প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণের পাশাপাশি প্লাস্টিক ম্যানেজমেন্টের উপর জোর দিচ্ছে। তার জেরে বড় শহরে মাছ বাজারে প্লাস্টিক ক্যারির পরিবর্তে কাগজের ঠোঙা বা শালপাতা ব্যবহার হচ্ছে। সরকারি আধিকারিকরা বিভিন্ন বাজারে হানা দিয়ে তদারকি ও নজরদারি করছে। মাঝেমধ্যে জরিমানাও হচ্ছে। এতে হয়তো কিছুটা সামাজিক সচেতনতা বাড়ছে। কিন্তু ছোট শহরেও প্লাস্টিক বর্জ্য পাহাড় সমান মজুদ হচ্ছে।  বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে হাটে-বাজারে, খালে-বিলে, নদী-নালায়, নর্দমায় জমা হচ্ছে প্লাস্টিক বর্জ্য। গ্রাম-গঞ্জে সচেতনতা বা নজরদারি কই? তাছাড়াও নদীর তীরে বিভিন্ন স্থানে পলিথিন জাতীয় বর্জ্য প্লাস্টিক দূষণ ঘটছে। 

 

সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর মিলিত প্রবাহের সাথে প্রতিদিন এক থেকে তিন মিলিয়ন প্লাস্টিক বঙ্গোপসাগরে জমা হয়। গঙ্গা নদীতে প্লাস্টিকের লোড সব থেকে বেশী। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ডায়মন্ডহারবার থেকে পাওয়া জলের নমুনায় অধিক পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া  গেছে। বিষাক্ত প্লাস্টিক নদীকে শ্বাসরোধ করছে। গঙ্গা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রনে কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। নদী দূষন কমানো পাশাপাশি নদীর স্বাস্থ্য পুনঃরুদ্ধারে কেন্দ্রীয় সরকারের "নমামী গঙ্গা" প্রকল্প  চালু করে ২০১৫ সালে। প্রকল্পটিকে চারটি সাব প্রকল্পে- নির্মল গঙ্গা, অবিরল গঙ্গা, জন গঙ্গা, জ্ঞান গঙ্গা নামে ভাগ করা হয়েছে। প্রকল্পটিতে পাঁচ বছরে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। তাতেও বাড়ছে গঙ্গা নদীর দূষণ! কেন্দ্রীয় সরকার তির্যক প্রশ্নের সামনে মুখে কুলুপ এঁটেছে।

ছোট শহরে নদীর তীরে নাইলন, পলিপ্রোপিলিন, পলিস্টারিন প্লাস্টিক বর্জ্য বেশি। পলিপ্রোপিন আসে আলুর চিপস প্যাকেট, কুরকুরে প্যাকেজ, খাদ্যদ্রব্য প্যাকেট, জলের বোতলের ক্যাপ এবং একবার ব্যবহারে মুখোশ থেকে। প্লাস্টিকে ন্যানো পার্টিকেলে মেটাল অক্সাইডকে আটকে রাখে। ফলে জলজ বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করে ও জীবনের ঝুঁকি বাড়ায়। পরিবেশে মাটি, বায়ু, নদীর জল দূষনে, ভৌমজল নিয়ন্ত্রনে, জলবায়ু পরিবর্তনেও প্লাস্টিকের বিশেষ অবদান। ২০৫০ সাল নাগাদ প্লাস্টিকের উৎপাদন হবে প্রায় ৩৩ মিলিয়ন টন এবং কয়েক দশক ধরেই প্লাস্টিক বর্জ্য উদ্বেগের কারণ হবে। ঝুঁকির সম্ভাবনা বাড়ছে জল, মাটি, প্রাণী ও পরিবেশের। মাথাপিছু বছরে ৬১০ গ্রাম মাটিতে ও ১৫ গ্রাম জলে প্লাস্টিক মিশেছে। 

আজকের দিনে প্লাস্টিক বর্জ্য একটি জ্বলন্ত সমস্যা। প্লাস্টিক ল্যান্ডফিল্ড, পরিবেশে প্লাস্টিক আবর্জনা  বায়ো-ডিগ্রেড হয়না। এগুলো ভেঙ্গে ক্ষুদ্র  ক্ষুদ্র অংশে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। মাইক্রোপ্লাস্টিক কণাগুলি আকার ৫ মিমি এর চেয়ে কম। এগুলো সহজে জলে ভেসে থাকে। প্লাঙ্কটন, মাছ, মোলাস্ক সহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী সহজে খেয়ে ফেলে। খাদ্য ওয়েবে প্রবেশ করার মানুষের দেহের মধ্যে চলে আসে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সিগারেট প্যাকেটের মোড়ক, জলের বোতল ক্যাপ, খাবারে বড় প্লাস্টিকের ব্যাগ প্রভৃতি শহরের জল নিকাশের ব্যবস্থাকে আটকে দেয়। নর্দমায় মশা কীটপতঙ্গের প্রজনন স্থল হয়ে পড়ে। প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগ বা পলিথেনে জল জমে সংক্রমণ বাড়তে পারে ম্যালেরিয়ার মত ভেক্টর বাহিত রোগ। এই রাজ্যের প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয় ম্যালেরিয়ায়। শুধু কলকাতায় প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয় ভেক্টর বাহিত ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ায় রোগে।

 

 বিশ্বের বেশিরভাগ প্লাস্টিক জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি হয়। তাই জীবাশ্ম জ্বালানি আহরণ, রাসায়নিক পরিশোধন, অপব্যবহারে পর পুড়িয়ে ফেললে বায়ুমন্ডলে কার্বন নিঃসরণ ও গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধি পায়। বিশ্বের অর্ধেক প্লাস্টিক প্যাকেজিং এর কাজে ব্যবহার হয় , এগুলো পোড়ানোর ফলে কালো কার্বন তৈরি হয়।  যা কার্বন-ডাই-অক্সাইডের থেকে পাঁচ হাজার গুণ বেশি উষ্ণতা বাড়াতে পারে। 

প্লাস্টিক বর্জ্য মাত্র ৭ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য। প্লাস্টিক বর্জ্য  মুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে কতগুলো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন:

এক: ৭৫ মাইক্রোনের কম ঘনত্ব যুক্ত প্লাস্টিক উৎপাদন ও প্রস্তুত বন্ধ করা।

দুই: একক ব্যবহারের প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ করতে অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো।

তিন: স্কুল কলেজে ছাত্র-ছাত্রীদের প্লাস্টিক না ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া।

চার: প্লাস্টিক পরিবেশের ক্ষতিকারক হিসেবে সামাজিক সচেতনতা মূলক প্রচার।

পাঁচ: স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গুলোকে কাজে লাগানো, অনুষ্ঠান বাড়িতে কলাপাতা, শালপাতা, বা পদ্মপাতার ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া। 

ছয়: টুরিস্ট স্থানে পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহারযোগ্য জুট ব্যাগ, কাপড়ের ব্যাগ বা সাবাই ঘাসের ব্যাগের ব্যবহারে জোর দেওয়া ও সচেতনতা করা।

সাত: নদীতে সাফাই অভিযান এর মাধ্যমে প্লাস্টিক মুক্ত করা। যাইহোক, সরকারি নজরদারির পাশাপাশি পরিবেশের সুস্বাস্থ্য ও মানুষের ভালো থাকা নির্ভর করে নিজেদের সচেতনতার ওপর।

.......

লেখক: অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয়।

Mailing List