কতটা কঠিন ও কষ্টের ছিল কবি নজরুল ইসলামের জীবন  

কতটা কঠিন ও কষ্টের ছিল কবি নজরুল ইসলামের জীবন   
13 Aug 2022, 10:15 AM

কতটা কঠিন ও কষ্টের ছিল কবি নজরুল ইসলামের জীবন

 

বাসবী ভাওয়াল

 

"হে মোর রাণী, তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে", এই কবিতা উপহার পেয়েছিলেন যিনি, তিনি সমগ্র হৃদয় তুলে দিয়েছিলেন তাঁর হাতে। চোদ্দ বছরের কিশোরীর হৃদয় জুড়ে তখন তাঁর নুরুদা। সেই কিশোরী বিদ্রোহী কবি নজরুলের সহধর্মিণী যার নাম কবি মহাকাব্যের বীর নারীর নামানুসারে রেখেছিলেন প্রমীলা। পোশাকি নাম আশালতা সেনগুপ্ত, গিরিবালা দেবীর একমাত্র সন্তান।

বিয়ের আগে প্রমীলাকে পার হতে হয়েছিল দুস্তর সমুদ্র। যে পরিবারের আশ্রয়ে তিনি বড় হচ্ছিলেন সেই পরিবার ছাড়তে হয়েছিল। প্রবল বাঁধা এসেছিল সমাজের তরফ থেকে। বিয়ে হয়েছিল ইসলামী রীতি অনুযায়ী। তবে প্রমীলা দেবীকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে হয়নি। বিয়ের পর অসম্ভব হয়ে পড়ে বাড়ি ভাড়া পাওয়া। গিরিবালা দেবী ও প্রমীলা পড়েন সঙ্কটে। সংসারের মধ্যে থেকেই তাঁরা একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন। না মেলামেশা করতে পারতেন হিন্দুদের সঙ্গে না মুসলমানদের সঙ্গে। আর অপরদিকে নজরুল থাকতেন বেশিরভাগ সময়ই ঘরের বাইরে।

গিরিবালা দেবী

নজরুল ছিলেন প্রেমের কবি। কিন্তু বিবাহিত জীবনে সুখী হয়েছিলেন কিনা তা বলা কঠিন। বিয়ের পর প্রমীলার হাসিখুশি চঞ্চল ভাব কেটে গিয়েছিল। হয়ে গিয়েছিলেন বয়সের তুলনায় অনেক বেশি ধীর, স্থির ও শান্ত। পুত্র শোকে নজরুল যে কষ্ট পেয়েছিলেন তা তিনি কোনো দিন কাটিয়ে উঠতে পারেননি। গানে গানে তিনি শোকের কথা বলেছেন। কিন্তু প্রমীলা? তাঁর শোকের কথা ব্যক্ত করে মনকে লঘু করতে পারেন নি। বুলবুলের অসাধারণ প্রতিভা ছিল। মাত্র তিন বছর বয়সে হারমোনিয়ামে সুর বাজালে বলে দিতে পারতেন কি সুর বাজছে।

প্রমীলা দেবী

প্রমীলার দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা তাঁর জীবনে দুর্ভোগ ডেকে আনে। স্বামী অনেক চেষ্টা করেও তাঁকে রোগ মুক্ত করতে পারেন নি। এই দুর্ভাগ্য আরো প্রলম্বিত হলো ১৯৪২ সালে নজরুল যখন রোগাক্রান্ত হলেন। আর সেই রোগ জুলাই মাসে কবিকে অপ্রকৃতস্থ এবং উন্মাদে পরিণত করে। তিনি বাকরুদ্ধ হন। সেসময় সর্বশক্তি দিয়ে সঙ্কটমোচন করতে সহায়তা করেছেন গিরিবালা দেবী।

অথচ এই গিরিবালা দেবীই পরবর্তী সময়ে একদিকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত শয্যাশায়ী একমাত্র কন্যা, অপরদিকে বাকরুদ্ধ ও মানসিক ভারসাম্যহীন জামাতা এবং তাদের দুই সন্তানকে রেখে চলে গেলেন নিরুদ্দেশে। কি কারণে গিরিবালা দেবী সমাজ সংসার পরিজন ছেড়ে চলে গেলেন গন্তব্যহীন গন্তব্যে। খোঁজাখুঁজি করেও তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। অথচ এই তিনিই একদিন সমাজ, সংস্কার, ধর্ম, বরণ, গোত্র, শাস্ত্র সবকিছু এড়িয়ে নিজের একমাত্র কন্যাকে ভিন্নধর্মী চালচুলোহীনের সঙ্গে নিজের হাতে দিয়েছেন বিয়ে। শুধু তাই নয়, উড়নচন্ডী কবি জামাতা এবং কিশোরী কন্যাকে নিয়ে ভিনদেশে সংসার পেতেছেন। সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন তাদের সংসার গড়ে তুলতে, ছেড়েছেন প্রয়াত স্বামীর একান্নবর্তী পরিবারের আশ্রয়। স্নেহ মায়া মমতা সবকিছু দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন কবির সংসার। ভিন্নধর্মী জামাতার সাথে এক পরিবারে অবস্থান করে নিজ নিজ ধর্ম পালন করেছেন। অনেক ভর্ৎসনা সহ্য করেও সংসার ত্যাগ করেন নি, এমনকি দৌহিত্রদেরও পালন করেছেন।

কী কঠোর দৃঢ়তা, মনোবল, শক্তি সাহস,স্পর্ধা, মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িক মনোভাব এবং আত্মশক্তির বোধন জাগ্রত রেখেছিলেন সর্বদা গিরিবালা দেবী। টানা বাইশ বছর তিনি কবির সংসার আগলে রেখেছিলেন। জামাতার চিন্তা চেতনা ও লেখায় গিরিবালা দেবীর প্রচ্ছন্ন প্রভাব অনুভূত হয়।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'অগ্নিবীণা' তেই পাওয়া গিয়েছিল একজন ধর্মনিরপেক্ষ সমন্বয়বাদী কবিকে। ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে 'মানুষ' পরিচয় -ই যে আমাদের কাছে প্রধান হওয়া উচিত নজরুল তা বলেছেন। তিনি মনে করেন, হিন্দু ও মুসলিম যদি পরস্পরকে ঈর্ষা ও ঘৃণা করতে থাকে তাহলে ভারতের স্বাধীনতা লাভ অসম্ভব। নজরুল কর্মসাগরে সব ধর্মের মানুষকে মেলাতে চেয়েছেন।

 

একটি অভিভাষণে নজরুল বলেছেন, "কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কোনোটাই নয়। আমি মাত্র হিন্দু মুসলমান কে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।"

 

নজরুল সারাজীবন সম্প্রীতিসাধনার মাধ্যমে মানবতার পবিত্র ভূমিতে স্থিত হতে চেয়েছেন। তাই আশালতা সেনগুপ্ত কে ধর্মান্তরিত করে বিয়ের পক্ষে নজরুল ছিলেন না। নজরুলের জীবনের শেষ অভিভাষণে তিনি বলেন, "যদি আপনাদের প্রেমের প্রবল টানে আমাকে আমার একাকীত্বের পরম শূন্য থেকে অসময়েই নামতে হয় তাহলে সেদিন আমায় মনে করবেন না আমি সেই নজরুল। সে নজরুল অনেক দিন আগে মৃত্যুর খিড়কি দুয়ার দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে। সেদিন আমাকে কেবল মুসলমানের বলে দেখবেন না- আমি যদি আসি, আসব হিন্দু মুসলমানের সকল জাতির ঊর্ধ্বে যিনি একম অকেমদ্বিতীয়ম তাঁরই দাস হয়ে।" নজরুল জীবন ও নজরুল সৃষ্টি-এ দুয়ের প্রাণ সম্প্রীতি ও সমন্বয়ের সুতোয় বাঁধা।

 

লেখক: প্রধান শিক্ষিকা, নিচুমঞ্জরী বালিকা বিদ্যালয়, শালবনি।

Mailing List