এক কেজি ইলিশের সর্বাঙ্গে নাকি ৯ হাজার কাঁটা থাকে! বাঙালি কবে মাছ খাওয়া শুরু করেছিল, বিশ্বের আর কোন কোন জাতি কত মাছ খায়, মাছ খাওয়ার ইতিহাস জানেন / পঞ্চম কিস্তি

এক কেজি ইলিশের সর্বাঙ্গে নাকি ৯ হাজার কাঁটা থাকে! বাঙালি কবে মাছ খাওয়া শুরু করেছিল, বিশ্বের আর কোন কোন জাতি কত মাছ খায়, মাছ খাওয়ার ইতিহাস জানেন / পঞ্চম কিস্তি
31 Aug 2022, 01:30 PM

এক কেজি ইলিশের সর্বাঙ্গে নাকি ৯ হাজার কাঁটা থাকে! বাঙালি কবে মাছ খাওয়া শুরু করেছিল, বিশ্বের আর কোন কোন জাতি কত মাছ খায়, মাছ খাওয়ার ইতিহাস জানেন / পঞ্চম কিস্তি

ড. সুবীর মন্ডল

 

ইলিশ স্বভাবে রোমান্টিক, পরিশীলিত। লাজুক। এমনকি ট্রেনে চড়লেও তার জাত যায়। সে তুলনায় রুইয়ের অবয়বখানি সহজেই সম্ভ্রম আদায় করে। কাতলার বিশাল বপু। যে পুকুর-দীঘিতে তার লীলাভূমি, সেখানে সশব্দে তার উপস্থিতি জানান দিতে কসুর করে না। রুই-কাতলার ধ্রুপদ ঘাই মারা ও দ্রুততর অঙ্গ সঞ্চালন সত্যই ক্লাসিক। রুই-কাতলা দর্শনীয় জলজ প্রাণী, না চেখে একে দেখেও সুখ। ইলিশের আচরণ পরিমিত, নিঃশব্দ। এর চলাফেরা, জলে ঘাই মারা স্বভাবসুলভ আভিজাত্যবিরোধী। অথচ জালে ধরা পড়ার পর থেকেই মানুষের হাতে পরে শুরু হয় তার লোক দেখানো চাল। বাজার থেকে সুপুষ্ট, সুবৃহৎ লোহিত বর্ণের রুই মাছ কিনে কেউ হাতে ঝুলিয়ে পথচারীদের ঈর্ষা মিশ্রিত দৃষ্টি আকর্ষণ না করে ঘরে ফেরেন না। রুই বাড়ি যায় ঝাঁকা মুটের মাথায় চড়ে, মোটরে চেপে।

মানুষের হাতে পড়ে ইলিশের ভাগ্য ঠিক বিপরীত। জোড়া ইলিশ হাতে দুলিয়ে পথচারী ও পাড়াপ্রতিবেশীর দাম কত প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে তুষ্ট, অক্লান্ত ও গর্বিত ক্রেতা বুক ফুলিয়ে ঘরে ফেরেন। এর পর পাই ইলিশ ভাজার গন্ধে সারা পাড়া আমোদিত, উদ্বেলিত এবং ঈর্ষিত। নতুন পয়সার বড় মানুষের অস্তিত্বের মতো। পাড়ার দেয়ালে, বাড়িতে, দরজায় ইলিশে গন্ধ সেঁটে থাকে বহুক্ষণ। এই সোচ্চার, এই দেখানোপনার জন্য ইলিশ দায়ী নয়। দায়ী বাঙালির হেঁসেলের ইলিশ প্রেম। সবাই জানেন রবীন্দ্রনাথ প্রশান্তি আর পরিণীত আচরণের এক মূর্তপ্রতীক। সরব কোনো কিছুই - ইংরেজিতে যাকে বলে লাউড, তার পছন্দনীয় নয়। তবে কি রবীন্দ্রনাথ ইলিশের এই সরব সুগন্ধে, সুচ্চকিত লাউড পরিণতির দরুনেই মাছটিকে নিয়ে তেমন উৎসাহ দেখাননি? কাঁঠাল সম্পর্কেও রবীন্দ্রনাথের ধারণা বেশ কড়া। তার মতে, কাঁঠালের সব কিছুই বাহুল্য অর্থাৎ ফল হিসেবে কাঁঠাল, লাউড; যা রবীন্দ্র মানসিকতায় কিঞ্চিৎ ব্রাত্য। কাঁঠাল ও ইলিশ - উভয়ই রবীন্দ্র লেখনীতে উপেক্ষিত।

 

সব সুন্দর, সব ভালোতেই রয়েছে বিঘ্নের কিছু তীক্ষ কাঁটা - পরমা সুন্দরী নারী যদি একটু ঝামটা না দেন, ল্যাংড়া আমে যদি একটু অম্লরস না থাকে, তবে বিশ্বসংসারের সৌন্দর্য পূর্ণতা পাবে না।

গোলাপের মতো এমন সুগন্ধি ফুলেও তো রয়েছে অজস্র কাঁটা। ইলিশেই বা কাঁটা থাকবে না কেন। প্রকৃতির অফুরন্ত অনুগ্রহের যেমন সীমা নেই, তেমনি নেই তার বেশুমার খামখেয়ালির উদাহরণ। ইলিশের কাঁটাও প্রকৃতি দত্ত। এটা খামখেয়ালি হতে পারে। হতে পারে কোনো অজানা কারণে বিধি প্রদত্ত অনুগ্রহ। কেউ বলেন ইলিশে কাঁটার আধিক্য (এক কেজি ইলিশে সর্বাঙ্গে নাকি ৯ হাজার কাঁটা) প্রকৃতির দেয়া একটি রক্ষাকবচ, বিত্তহীন বাঙালিদের উন্নত বিশ্বের বাজারের গ্রাস থেকে বাঁচানোর জন্য। কাঁটাহীন বলেই তো বাংলাদেশের সব বাগদা-গলদা চিংড়ি ইউরোপ-আমেরিকা-জাপানের ধনী রান্নাঘর আমোদিত করে মোক্ষলাভ করছে। ইলিশের কাঁটার এই হিতকর দিকটি না থাকলে সাধারণ ছাপোষা বাঙালির ইলিশ অনুরাগ অভাবের তাড়নায় জানালা দিয়ে পালাত। বিদেশী বাজার সব উৎকৃষ্ট আকার ও মানের সব ইলিশ বাংলাদেশের মাছের আড়ত থেকে তুলে নিয়ে যেত ডলার-পাউন্ডের সোনার কাঠির আকশি দিয়ে। তাই সাহিত্যিক শংকর বলেছেন, ‘বেঁচে থাকুক ইলিশ কাঁটা চিরজীবী হয়ে।’

ইলিশকে কাঁটাহীন করে স্মোকড হিলশার উদ্ভাবন ছেলে-বুড়ো, দেশী-বিদেশী - সবার জন্য ইলিশ আস্বাদনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যেসব বঙ্গীয় রন্ধন কুশলীরা এই মহান হিতকর উপহারটি আমাদের দিয়ে গেছেন, তাদের নাম-গোত্র এবং নিবাস নিয়ে বেশ স্বাস্থ্যপ্রদ বিতর্ক রয়েছে। কারো কারো স্থিতধী বিশ্বাস এই নতুন অপূর্ব ভোজ্য পদটির স্বাভাবিক উৎপত্তি স্থান ইলিশ অধ্যুষিত পদ্ম-মেঘনা বিধৌত পূর্ববাংলা; আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে ঢাকা নগরী। আবার অনেকের মতে, ইংরেজের রাজধানী কলকাতায় সাহেব ভজনার উপকরণ হিসেবে এটির প্রথম আবির্ভাব ঘটে কলকাতা শহরে। পরে নাকি ঢাকার কুশলী মগ, খ্রিস্টান বাবুর্চিরা খইয়ের গুঁড়ো, তেঁতুল ইত্যাদি উপাদান মিশিয়ে স্মোকড হিলশাকে আরো উপাদেয় করে বহুজন ‘হিতায় বহুজন সুখায়’ নিবেদন করেছে। উল্লেখ্য, ইলিশ স্মোকড করার জন্য লাগে স্পেশাল আগুন, যাতে লাগে তুষ, খই, গুড়, আরো লাগে স্মোকড লিকার, টমেটো পিউরি এবং আরো কত কি।

 

রসনা রসিক প্রতাপ রায়ই নাকি প্রথম জানিয়ে ছিলেন বহু বছর আগে অধুনা বাংলাদেশের ঢাকায় গিয়ে তিনি শুনেছেন, ঢাকা ক্লাবের দাবি স্মোকড হিলশার জন্ম ওই ক্লাবেই। একালে ইলিশ অর্থই যখন পদ্মা, তখন ঢাকা ক্লাবকে এ সম্মান মুকুট দিতে আপত্তি কি?

 

জন্ম যে শহরেই হোক না কেন, স্মোকড হিলশার সার্থক বাংলা প্রতিশব্দ করেছেন রবীন্দ্রনাথের ভাইজি বিদুষী প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী। তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘ধোঁয়া মাছ’ অথবা ‘ধূমপক্ব মাছ’। ইলিশ নিয়ে দু-একটি হাস্যকর কিন্তু পিলে চমকানো তথ্য এখানে দেয়া যেতে পারে। যেমন, মৎস্য সমাজে ইলিশই নাকি একমাত্র ‘উপবীতধারী’, তার দুই পিঠে যে দুটি সুতা থাকে, তার নাম ‘পৈতা’ - অভিজ্ঞরা এই সুতো নিপুণভাবে টেনে বের করে নেন। ইলিশ লেজের পাখনার মধ্যে যে কালো বস্তুটি দেখা যায়, তার নাম নাকি ‘কয়লা’। এই কয়লাও নিপুণভাবে টেনে বের করা আবশ্যক। প্রাচীন সংস্কৃতে ইলিশকে ইল্লিশো বলা হতো, শাস্ত্রে তার শত প্রশংসা - মধুর, রেচক, স্নিগ্ধ, বহ্নিবর্ধক, পিত্তকৃত্, কফকৃত্, কিঞ্চিত্ লঘু ও বাতনাশক। যা কিছু ঘাপলা তা ওই ইলিশ কাঁটায়। দুষু্বজনেরা মৎস্যপ্রেমী বাঙালিকে মৎস্যলোভী ভোঁদড়ের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন, কিন্তু ‘উহারা অবোধ, জানে না’। আজকাল বহু ইয়ং শিক্ষিত বাঙালির ভীষণ কাঁটার ভয়, আর আদরিনী বঙ্গললনা হলে তো কথাই নেই।

(চলবে..)

লেখক: শিক্ষক

Mailing List