ভেষজে ভেজাল! শুনতে অবাক লাগলেও সত্য, ভেজাল বন্ধে চাই ডিএনএ বারকোড, কারণ, ৮০ শতাংশ মানুষ রোগ নিরাময়ে যে উদ্ভিদেই ভরসা রাখেন

ভেষজে ভেজাল! শুনতে অবাক লাগলেও সত্য, ভেজাল বন্ধে চাই ডিএনএ বারকোড, কারণ, ৮০ শতাংশ মানুষ রোগ নিরাময়ে যে উদ্ভিদেই ভরসা রাখেন
01 Oct 2022, 01:50 PM

ভেষজে ভেজাল! শুনতে অবাক লাগলেও সত্য, ভেজাল বন্ধে চাই ডিএনএ বারকোড, কারণ, ৮০ শতাংশ মানুষ রোগ নিরাময়ে যে উদ্ভিদেই ভরসা রাখেন

 

 ভেষজেও অবলীলায় মিশে যাচ্ছে ভেজাল। আর সেই অপমিশ্রণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মানুষ। কারণ, উদ্ভিদের মধ্যে যেমন ওষধি গুণ রয়েছে, তার ফলে রোগ নিরাময় হয় কোটি কোটি মানুষের। আবার ঠিক তেমনই অপমিশ্রণ মানুষকে পঙ্গুও করে তুলতে পারে। অপমিশ্রণ কিভাবে মানুষের ক্ষতি করে, কিভাবেই বা ভেজাল বন্ধ করা সম্ভব, তা নিয়ে লিখছেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ ও বনবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অমলকুমার মন্ডল ও রিসার্চ স্কলার অয়নকুমার নস্কর। 

ড. অমলকুমার মন্ডল

অয়নকুমার নস্কর

 

ভারতবর্ষ শস্যশ্যামলা। প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ। আর সেই কারণেই এই দেশটি আদিকাল থেকে বিশ্বের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এসেছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে এই প্রাকৃতিক সম্পদের টানেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এদেশে এসেছেন। কেউ সৎ উদ্দেশে আবার কেউ অসৎ উদ্দেশে। কেউ যেমন শোষণ করেছে আবার কেউ কেউ সমৃদ্ধও করেছে। তেমনই পাশ্চাত্যের একটি শিক্ষা বিষয়ক দান হল উদ্ভিদবিদ্যা।

এই দেশের উত্তরে বিশাল হিমালয় পর্বতমালা থেকে দক্ষিণে ভারত মহাসাগর। পশ্চিমে থর মরুভূমি। ভারতবর্ষকে বৈচিত্রময় করে তোলার পাশাপাশি অপরূপ রূপও দান করেছে। এই বৈচিত্র শুধুমাত্র ভূমিরূপ বা জলবায়ুতেই সীমাবদ্ধ নেই, এই বৈচিত্র এখানকার প্রাণীকূল ও উদ্ভিদের মধ্যেও বিরাজমান। আর এই বৈচিত্রের কারণেই ভারতবর্ষকে বিশ্বের ১৭টি মহাবৈচিত্রময় দেশের মধ্যে একটি রূপে গন্য করা হয়। এছাড়াও ভারতবর্ষে ইউনেস্কো দ্বারা ঘোষিত ৭টি প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানও রয়েছে। স্থানীক প্রজাতির আধিক্যের নিরিখে সমগ্র পৃথিবীতে ৩৬টি হটস্পট রয়েছে। তার মধ্যে সুজলা, সুফলা ভারতবর্ষেই রয়েছে ৪টি হটস্পট।

স্বতন্ত্র ভারতবর্ষ ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে এগিয়ে চলেছে। বাণিজ্য, গবেষণা, মহাকাশ ‌থেকে চিকিৎসা –সব ক্ষেত্রই স্বাবলম্বী। আর যদি আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের কথা বলা যায়, তাহলে তা তো বহু শতাব্দী প্রাচীন। বলা যেতে পারে, আয়ুর্বেদ চিকিৎসা শাস্ত্রের সূচনা এই ভারতবর্ষেই ঘটেছিল। যীশু খ্রীষ্টেরও জন্মের বহু আগে। মহর্ষি চরক প্রথম উদ্ভিদের মধ্যে ওষধি গুনাগুনের কথা বর্ণ‌নাও করেন। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে যা ‘চরক সংহিতা’ নামে বিখ্যাত। পরবর্তী সময়ে নানা মুনি ঋষিরা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। বর্তমানে‌ আয়ুর্বেদ শাস্ত্র বিশ্বজুড়েই প্রসার লাভ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) মত অনুসারে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ মানুষ এখনও উদ্ভিদকেই রোগ নিরাময়ের ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করেন।

হু এর পরিসংখ্যান থেকেই পরিষ্কার, বর্তমান সময়েও চিকিৎসা ক্ষেত্রে উদ্ভিদ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। আর সেই সূযোগ কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরাও নেমে পড়েছে মুনাফা লোটার জন্য। তা জ্ঞাতসারে হোক বা অজ্ঞাতসারে। বর্তমানে সকলেই একটি শব্দ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। তা হল ভেজাল বা অপমিশ্রণ। এক্ষেত্রেও তা ঘটে চলেছে। যে উদ্ভিদ আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করা হয়, তার পরিবর্তে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে অন্য উদ্ভিদের মিশ্রণ। তার পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে এটা অনেকেরই জানা নেই। ভেজাল সম্পর্কিত গবেষণায় ভারতীয় ও কানাডার বিজ্ঞানীরা তা তুলেও ধরেছেন। গবেষণা করতে গিয়ে তাঁরা লক্ষ্য করেন, ভারতবর্ষের ভেষজগুন সম্পন্ন ঐতিহ্যপূর্ণ একটি গাছ হল অশোক। যার বিজ্ঞান সম্মত নাম Saraca asoca। গোত্র লিগুমিনোসী। এটি সব থেকে বেশি অপমিশ্রণের শিকার। এই অপমিশ্রণ ২০-১০০ শতাংশ পর্যন্ত দেখা গিয়েছে। বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্ণাল অব লিগ্যাল মেডিসিন’ এ প্রকাশিতও হয়েছে। বিজ্ঞানীরা কিডনি ফেলিওর একশ জন মহিলার ওপর গবেষণা চালান। গবেষণায় তাঁরা দেখান, আক্রান্ত হওয়ার পিছনে রয়েছে শুধুমাত্র ভেজাল ওষুধ। তাঁদের উপশমের জ‌ন্য Stephania tetrandra এর মূলের পরিবর্তে অপমিশ্রণ হিসাবে Aristolochia fangchi জাতীয় গুল্ম উদ্ভিদের মূল দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে ওষধি গুনসম্পন্ন Cinnamomum verum এর পরিবর্তে C cassia এবং C malabatrum বাজারে ভেজাল হিসাবে বহুল প্রচলিত। যেখানে C cassia তে ১ শতাংশ Coumarin নামক কেমিক্যাল থাকে, যেটি Hepatotoxicity এর জন্য দায়ী। এছাড়াও এমন আরও ভেজালের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। এই ভেজালের ভয়াবহতা ২০১৩ সালে জার্ণাল অব প্ল্যান্ট স্টাডিজ এ প্রকাশিত ‘অ্যাডাল্টারেশন এণ্ড সাবস্টিটিউশন ইন ইণ্ডিয়ান মেডিসিনাল প্ল্যান্টস, অ্যান ওভার ভিউ’ – আর্টিকেল এ আরও স্পষ্ট হয়। ড. জি রবিকান্ত (অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, অশোকা ট্রাস্ট ফর রিসার্চ ইন ইকোলজি এণ্ড এনভায়রনমেন্ট, বেঙ্গালুরু) এই সমস্যাটার কথায় বলেছেন। তিনি বলেছেন, ভারতবর্ষে এমন কোনও সংস্থা নেই যারা এই ভেষজ উদ্ভিদ বাজারে আসার আগে তাদের সঠিক গুণমান যাচাই করবে বা শনাক্ত করবে সেটির মধ্যে অপমিশ্রণ ঘটেছে কিনা।

প্রশ্ন জাগতেই পারে যে ভেজাল কেন হয়? সব সময় কী অসাধু ব্যবসায়ীরা ইচ্ছে করেই এটা করে। নাকি অন্য কারণও রয়েছে। ভেজাল হওয়ার পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত বিভ্রান্তিকর স্থানীয় নাম। দ্বিতীয়ত বাজারে চাহিদা অনুযায়ী অপ্রতুলতা, তৃতীয়ত শনাক্তকরণ। সাধারণত উদ্ভিদবিদ্যার বিন্যাসবিধি (plant taxonomy) শাখাতে ছাত্রছাত্রীদের উদ্ভিদ শনাক্তকরণ শেখানো হয়। এই প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক জটিল ও তথ্যমূলক। কিন্তু ব্যবসায়ীদের এই ধরণের বিন্যাসবিধি সম্বন্ধে ধারণা কম। ফলে সব সময় যথাযথ শনাক্তকরণে সফল হন না। বেশিরভাগ মানুষ, সাধারণত ফল, ফুল, পাতার রঙ বা গঠন দেখে শনাক্ত করে থাকেন কোনটি কোন গাছ। কিন্তু তা শুকিয়ে গেলে বা তার কোনও একটি অংশ অর্থাৎ মূল বা ছাল হলে, তা শনাক্ত করা কঠিন। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি বিজ্ঞানে এটি অসম্ভব নয়। ডিএনএ বারকোড এমনই একটি মাধ্যম যার সাহায্যে ভেষজ উদ্ভিদের সঠিক শনাক্ত করণ সম্ভব। ডিএনও বারকোডের মাধ্যমে বিরল, বিপন্ন প্রজাতির জিনও সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

ডিএনএ বারকোড ব্যাপারটা কী? এই বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন কানাডার বিজ্ঞানী হেবার্ট। যেমন প্রতিটি দ্রব্যে এখন বারকোড থাকে, তেমনই উদ্ভিদের জিনেও তা করা যায়। দু’টি আলাদা প্রজাতির জিনের পুণঃসংযুক্তি হোক বা অসংখ্য প্রজাতির উপস্থিতি – জিনের মধ্যে পার্থক্য থাকবেই।

ডিএনও বারকোড কিভাবে করা হয়? প্রাণীদের কোষের মাইটোকন্ড্রিয়ার মধ্যে অবস্থিত একটি জিনকে গবেষণার মাধ্যমে শনাক্তকরণ করা হয়েছে। তা সমস্ত প্রাণীর ডিএনএ বারকোড হিসাবে ব্যবহার করা যায়। উদ্ভিদ মাইটোকন্ড্রিয়াতেও এই জিনটি উপস্থিত। কিন্তু উদ্ভিদের ক্ষেত্রে এই জিনের বিবর্তন এতটাই কম যে, এটিকে উদ্ভিদের বারকোড হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। উদ্ভিদের এই ধরণের শনাক্তকারী জিন এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি, যার মাধ্যমে উদ্ভিদকূলকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব। এখানে সাধারণ মানুষের একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, একটি নির্দিষ্ট জিনকে সংগ্রহ করে তার সিকোয়েন্সিং করলে যে তথ্য পাওয়া যায় সেই তথ্যটি ওই নির্দিষ্ট প্রজাতির বারকোড। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়। এটি ডিএনএ বারকোডের প্রাথমিক চরণ।

তাহলে কিভাবে সেটি সম্ভব? একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির উদ্ভিদের বারকোড করতে হলে ওই একই প্রজাতির নমুণা বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করতে হবে। প্রত্যেকটি নমুণা থেকে একের বেশি প্লাস্টিড জিন (rbcL, trnT-L, trnL-F, psbA-H, rps16, trnY-E, trnS-G etc), মাইয়োকন্ড্রিয়া জিন (matK) ও নিউক্লিয়ার জিন (ITS1, ITS2) সংগ্রহ করে সিকোয়েন্সিং করতে হবে। এরপর সমস্ত আন্তঃপ্রজাতির নির্দিষ্ট ওই জিনগুলির মধ্যে দুরত্ব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বারকোডিং গ্যাপ নির্ধারণ করতে হবে। তারপর গাণিতিক মাধ্যমে প্রত্যেকটি জিনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ করলেই বোঝা যাবে কোন জিন বা জিনগুলি ওই সংশ্লিষ্ট প্রজাতির। তখনই সংশ্লিষ্ট জিনকে সেই প্রজাতির বলে গণ্য করা হবে। এই পদ্ধতিতেই একমাত্র ভেজাল বা অপমিশ্রণ বন্ধ করা সম্ভব। আর তখনই উদ্ভিদের ওষধি গুন প্রকৃত মানুষের কাজে আসবে। নতুবা ভেজাল বা অপমিশ্রণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মানুষ।

Mailing List