Lata-Mangeshkar তাঁর বীণা বাজাতেন স্বয়ং দেবী সরস্বতী, সুরসম্রাজ্ঞী অজানা-অচেনা লতা মঙ্গেশকর  

Lata-Mangeshkar তাঁর বীণা বাজাতেন স্বয়ং দেবী সরস্বতী, সুরসম্রাজ্ঞী অজানা-অচেনা লতা মঙ্গেশকর   
29 Oct 2022, 11:00 AM

Lata-Mangeshkar তাঁর বীণা বাজাতেন স্বয়ং দেবী সরস্বতী, সুরসম্রাজ্ঞী অজানা-অচেনা লতা মঙ্গেশকর

 

সত্যব্ৰত দোলই

 

“লতা মঙ্গেশকর গান গাইতেন না, গান নিজে গাইত লতা মঙ্গেশকরকে। বীণা নিজে থেকে বাজে না। তাকে একজন বাজায়। কে বাজাত লতার বীণা? তাঁর বীণা বাজাতেন স্বয়ং দেবী সরস্বতী। আর তানপুরা বাজাত হাওয়া। 'সা' আর 'পা' ধরে হাওয়া পৌঁছে যেত তাঁর গানের ঘরে। এ হাওয়া সেই হাওয়া যা পাতায় পাতায় লেগে ‘মর্মরিয়া বনকে কাঁদায়"। সেই হাওয়া বসন্তের। সেই হাওয়া না থাকলে প্রেমের হাহাকার ও লেলিহান আনন্দ একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে পারে না এক গলা থেকে। ভালবাসার আর এক নাম কষ্ট। সেই কষ্টকে তিনি বালি আর আগুন দিয়ে মুছে গলায় তুলতেন। নিজের ভিতরে কষ্ট ছিল, তাই তিনি কষ্টকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুরে বসিয়ে গাইতেন। ... তাঁর গলা হয়ে উঠেছিল ভারতবর্ষ। তাঁর সুর হয়ে উঠেছিল ভারতের ধানখেত। একটি ধুনি পাহাড় থেকে নেমে গঙ্গার ওপর দিয়ে যেতে যেতে অরণ্যের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে জনপদের বিষণ্ণতাকে সঙ্গে নিয়ে যেদিন উপকূলে আছড়ে পড়ে, সেদিন যেভাবে প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে, সেভাবেই একটা সুর কোমল গান্ধার হয়ে ওঠে তাঁর গলায়। এত প্রেমের গান তিনি গেয়েছেন, বাঙালিকে বুঁদ করে রেখেছেন, বাঙালিও তাকে হিরের নাকছবি পরিয়ে দিয়েছে।..." সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর সম্পর্কে কথাগুলি বলেছেন বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম বিশিষ্ট কবি সুবোধ সরকার।

 

শিল্পীর পরিচয় তাঁর শিল্পে। তাই শিল্পীর মৃত্যু হলেও তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর শিল্পের মধ্য দিয়ে। কিন্তু শিল্পই যার ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা, যার কণ্ঠে স্বয়ং সরস্বতীর বাস, তাকে শুধুই শিল্পী বললে কম বলা হয়। বরং বলা ডাল, শিল্পের পরিচয় তাঁর পরিচয়ে। তিনি 'কুইন অফ মেলডি' লতা মঙ্গেশকর। আসমুদ্রহিমাচল যাঁর কন্ঠস্বরে সম্মোহিত থেকেছে প্রায় এক শতাব্দী ধরে, যার শ্রেষ্ঠত্ব অদ্বিতীয়, আগামী কয়েক শতকেও যে প্রতিভার ব্যাখ্যা খুঁজে পাবে না এই উপমহাদেশ... লতা মঙ্গেশকর সেই বিস্ময়ের নাম। সত্যিই বিস্ময়, কারণ এত নিখুঁত স্বরক্ষেপণ, কন্ঠের এত মসৃণ ওঠানামা, শব্দের এত অনায়াসে জীবন্ত হয়ে ওঠা যে কোনও সংগীত শিল্পীর পক্ষে সম্ভব, লতা না থাকলে এই সত্যিটা বিশ্বের কাছে অজানাই থেকে যেত। প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা সুর, তাল, লয় লতার কণ্ঠস্বরে যে রূপ পেয়েছে, তাঁর অসামান্য গায়কীতে প্রতিটা গান যে মাত্রা পেয়েছে, তা তুলনাহীন।

লতা মঙ্গেশকর যতটা মরাঠি, ততটাই যেন বাঙালি। একজন অবাঙালি সংগীত শিল্পীকে আপামর বাঙালি যেভাবে আপন করে নিয়েছেন, তাতে এরকমটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। এমনিতেই শিল্প এবং শিল্পীকে কোনও ভাষা বা রাজ্যের ঘেরাটোপে বেঁধে রাখা যায় না। আর সেই শিল্পী যদি হন লতা মঙ্গেশকর-এর মাপের, তাহলে তো তিনি আঞ্চলিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠবেনই। গানের সূত্রে বাংলার সঙ্গে লতার যোগাযোগ হলেও সেই যোগ নাড়ির টানের চেয়ে কিছু কম ছিল না। লতা অনেকবার তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, অন্যান্য ভাষার চেয়ে বাংলা ভাষার তাঁর ঝোঁক বরাবর বেশি। কিন্তু কীভাবে এল সেই স্বভাবগত ঝোঁক? পরিচালক বিমল রায়ের স্ত্রীকে একবার লতা বলেছিলেন, বাংলা ভাষার প্রতি তার ঝোঁকটা হয়তো গর্ভাবস্থায় শুরু হয়েছিল। লতার বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন মরাঠি সংগীত ও নাট্য জগতের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। দীননাথ ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের ভক্ত। লতার জন্মের আগে থেকেই দীননাথ তাঁর ঘরে বিবেকানন্দের বিরাট প্রতিকৃতি টাঙিয়ে তার সামনে স্বামীজির রচনা জোরে জোরে পড়তেন, স্বামীজির গান গাইতেন। লতার পরবর্তীকালে মনে হয়েছে, বাংলার সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগটা হয়তো তাঁর তখন থেকেই। ভাষা বোঝেননি, কিন্তু ভাষার মাধুর্য তাঁর কানের ভিতর দিয়ে মরমে স্থান করে নিয়েছে। বাংলা ভাষার পাশাপাশি বাঙালির সংস্কৃতির প্রতিও সমানভাবে কৌতূহলী ছিলেন লতা। তাই অনুবাদে পড়ে ফেলেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্রের উপন্যাস। লতার গানে শ্রোতারা খুঁজে পান এক বিরল 'দিব্য সংযোগ'।

আর লতা নিজেও আধ্যাত্মিক ছিলেন। তাঁর ছিমছাম, সহজ-সরল জীবন যাপনে কোনও বাহুল্য ছিলনা। ছিল মা সরস্বতীর প্রতি ভক্তি আর স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা। সেই টানেই কলকাতা এলে লতা বেলুড় মঠে যেতেন। সেখানে সন্ধ্যারতি দেখতেন চুপ করে। বেলুড় মঠে গিয়ে একবার সেখানকার প্রেসিডেন্ট মহারাজকে গানও শুনিয়েছিলেন লতা। লতার প্রথমবার বেলুড় যাওয়া হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী বেলা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। লতার গলার হারের লকেটে একদিকে থাকত স্বামী বিবেকানন্দের আর অপরদিকে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ছবি। মুম্বইয়ে লতার বাড়ির ঠাকুরঘরেও স্বামীজী, শ্রীরামকৃষ্ণদেব ও শ্রীমা সারদাদেবীর ছবি পাশাপাশি থাকত। কলকাতার এক সাংবাদিককে তিনি বলেছিলেন, স্বামী বিবেকানন্দের সব বই তাঁর সংগ্রহে আছে। ভগিনী নিবেদিতার অনেক বইও ছিল তার সংগ্রহে। লতার ভাই হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর রামকৃষ্ণ মিশনে স্বামীজীর আদর্শে দীক্ষিত ছিলেন। তবে লতার একটাই দুঃখ ছিল, কলকাতার দুর্গাপুজো কখনও নিজের চোখে তাঁর দেখা হয়নি। ৩৮টি ভাষায় লতা সাত হাজারের মতো গান গেয়েছেন। হিন্দির পর বাংলা ভাষায় তিনি সবচেয়ে বেশি গান গেয়েছেন। লতা-গবেষক স্নেহাশিস চট্টোপাধ্যায়ের তথ্য অনুযায়ী লতার গাওয়া মোট বাংলা গানের সংখ্যা ২২৩। ৭৫টি বাংলা চলচ্চিত্রে ১৩৯টি গান তিনি নেপথ্য কণ্ঠে গেয়েছেন। বাংলা চলচ্চিত্র ছাড়া বাংলা ভাষায় তাঁর বেসিক গানের সংখ্যা ৮৪। লতা সম্পর্কে কেউ কেউ বলেন, 'লতা মঙ্গেশকর ইজ দি এপিটোম অফ পারফেকশন'। কথাটি একশো শতাংশ সত্যি। পাঁচের দশকের শেষে যখন তিনি বাংলা গান গাওয়া শুরু করলেন তখন তার মনে হল বাংলা ভাষায় সাবলীলভাবে গান গাইতে হলে বাংলা ভাষা শেখাটা অত্যন্ত জরুরি। না হলে উচ্চারণে থাকবে ত্রুটি, ভাষার অনায়াস চলনও হবে বাধাপ্রাপ্ত। তাই 'পারফেকশনিস্ট' লতা সেইসময় চরম ব্যস্ততার মধ্যেও বাঙালি পরিচালক বাসু ভট্টাচার্যের কাছে বাংলা শিখতে শুরু করলেন। আর কিছুদিনের মধ্যেই লতা বাংলা উচ্চারণ তো বটেই, এমনকি ভাষাটাকেও রপ্ত করে ফেললেন । ১৯৪২-এ মরাঠি গান 'খেলু সারি মানি হাউস ভারি' (ছবির নাম-কিটি হসাল) গেয়ে ফিল্মি দুনিয়ায় পা রাখা লতার কণ্ঠে প্রথমবার বাংলা গান শোনা গিয়েছিল এর ঠিক দশ বছর পরে। ১৯৫২ তে মুক্তি পাওয়া ভি. শান্তারামের মরাঠি ছবি 'অমর ভূপালি বাংলায় ভাষান্তরিত হয়েছিল। যেখানে মরাঠির মতোই সমসংখ্যক গান বাংলা ছবিতেও ছিল। গীতিকার ছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার আর সুরকার বসন্ত দেশাই। সেখানে লতা তিনটি গান একক কণ্ঠে ও দুটি গান মান্না দে'র সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে গেয়েছিলেন। লতাকণ্ঠে বেসিক বাংলা গানের সূচনা হয় ১৯৫৭ তে। পবিত্র মিত্রের কথায় ও সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুরে গানের আলপনা আঁকলেন লতা "আকাশ প্রদীপ জ্বলে/দূরের তারার পানে চেয়ে/আমার নয়ন দুটি /শুধুই তোমারে চাহে/ব্যথার বাদলে যায় ছেয়ে” আর “কত নিশি গেছে নিদহারা/ওগো কত ফুল গেছে ঝরে"।

প্রথম গানে ছন্দের পালক বুলানোর আমেজ আর দ্বিতীয় গানে জটিল সুরপথে একরাশ কান্নার প্রকাশ। শুরু থেকেই বাংলা গানে উচ্চারণ ও আবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে লতা এতটাই নিখুঁত আর অনুভূতিময় যে, তাঁর গান শুনলে বুঝতে অসুবিধে হয়, যিনি গাইছেন, তিনি একজন অবাঙালি। ঐ বছরই বেসিক রেকর্ডে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় ও ভূপেন হাজারিকার সুরে লতা গাইলেন, 'রঙ্গিলা বাঁশিতে কে ডাকে... এবং 'মনে রেখো মনে রেখো ওগো আঁধো চাঁদ'। প্রথম গানটিতে অসমীয়া লোকসংগীতের ছোঁয়া। এই গানের ও চাদ যা শুনে যা/ মায়াজাল যা বুনে যা...' অংশটি যেরকম সুরে মাখামাখি হয়ে লতার কোকিল কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়েছে, তা যেন চোখের সামনে বিহুর রূপকে মূর্ত করে তোলে। দ্বিতীয় গানটিতে আছে স্বপ্ন তরীতে চড়ে সুরপথে মনের কথা বলার অনুভূতিময় ব্যঞ্জনা। ১৯৫৮তে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায়, 'প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে...' আর 'ও পলাশ ও শিমুল কেন এ মন মোর রাঙালে...' গানে আবার আলোড়ন। সহজ মিষ্টি চলনের সুর নির্মাণে পারদর্শী হেমন্ত গান দুটির চলনে এমন কিছু মোচড় রেখেছেন যা আদর্শ লতাসুলভ হয়ে উঠেছে। লতার কণ্ঠে 'ও পলাশ ও শিমুল' গানের প্রথম ও দ্বিতীয় অন্তরার অংশগুলো যেন বসন্তের আকুলতা হয়ে ছুটে চলে হৃদয় থেকে হৃদয়ে। ১৯৫৯ এ প্রথম বাংলা বেসিক গানে ঘটলো লতা- সলিল চৌধুরী সংযোগ, যা একটা যুগের সূচনা করল বলা যায় ।

সলিল চৌধুরীর গান নির্মাণ নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। নিজস্বতার ঝলমলে আলোয় আলোকিত তাঁর সুর এবং অবশ্যই কথা। লতার প্রথম সলিল গীতি 'যা রে... যারে উড়ে যারে পাখি/ফুরালো প্রাণের মেলা/ শেষ হয়ে এল বেলা/ আর কেন মিছে তোরে বেঁধে রাখি...'। এই গানে যেন আকুলতা ছেয়ে গেল চরাচরে। দ্বিতীয় গান লাউনি সুরের প্রভাবে, 'না যেও না/ রজনী এখনও বাকি/আরও কিছু দিতে বাকি/বলে রাত জাগা পাখি...।' লক্ষ্য করার বিষয়, সলিল সংগীতের যে ক'টা গান লতার কণ্ঠে চির সবুজ হয়ে আছে, তার প্রায় বেশির ভাগ গানেই প্রকাশ পায় বিচ্ছেদ-বিরহের অনুভূতি। কিন্তু সুরের বৈচিত্র্যে, গান থেকে গানে তাল-লয়-ছন্দ মেতে উঠেছে নানারকম স্ক্যানিংয়ে। এ যেন ব্যর্থতা নিয়ে উল্লাস! যেমন- 'সাত ভাই চম্পা জাগো রে', 'কেন কিছু কথা বলো না' নিশিদিন নিশিদিন বাজে স্মরণের বীণ', 'আজ নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমের', 'ও মোর ময়না গো, কার কারণে তুমি একেলা' ইত্যাদি। এই গানগুলো মূলত বিষাদের কথা বলছে। কিন্তু সুর ছড়িয়ে পড়ছে মনের আনন্দে এধার থেকে ওধার।

 

হিন্দি জগতে রাহুল দেববর্মণের সুরে লতার গান একটি আলাদা অধ্যায়। কিন্তু বেসিক বাংলা গানে, একবারই সংযোগ ঘটেছিল এই দুই মহান সংগীতব্যক্তিত্বের। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় আর রাহুল দেববর্মনের সুরে লতা দু'টি গান গেয়েছিলেন- 'আমার মালতীলতা' আর 'আমি বলি তোমায় দূরে থাকে।' ১৯৭৪-এ কিশোরকুমারের সুরে ও মুকুল দত্তের কথায় লতা পুজোর গান গেয়েছিলেন- 'ভালোবাসার আগুন জ্বেলে' এবং 'প্রিয়তম, কী লিখি তোমায়। ঐ বছরই সংগীতপ্রেমীরা দেখলেন অন্য চমক। মুকুল দত্তের কথায় কিশোর কুমার গাইলেন, ‘তারে আমি চোখে দেখিনি' এবং 'আমি নেই, আমি নেই/ভাবতেই ব্যথায় ব্যথায় মন ভরে যায়"। গান দুটির সুরকার স্বয়ং লতা মঙ্গেশকর। প্রথমটিতে কিশোরকুমারের উচ্ছ্বাসে ভরা গান গাইবার দক্ষতাকে আর দ্বিতীয় গানে শিল্পীর অসাধারণ বেস ভয়েসকে বিষাদের আবহে অসামান্যভাবে ব্যবহার করেছেন সুরকার লতা যা শুনলে বোঝা যায়, সুর বিন্যাসেও তিনি কতখানি ক্ষমতা ধরেন।

মাত্র ছ'টি গান। লতা মঙ্গেশকরের রবীন্দ্রসংগীত-যোগ বলতে এটুকুই। তবু সেই গানে লতার সাংগীতিক নিপুণতা সৌকর্য লাবণ্য চিরকালের জন্য কী অমোঘ ছায়া ফেলে গেছে! রবীন্দ্রসঙ্গীতে লতার শুরুটা হয়েছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরেই। 'মধু-গন্ধে ভরা মৃদু-স্নিগ্ধছায়া নীপ-কুঞ্জতলে' গান রেকর্ড দিয়ে যাত্রা শুরু লতার। এরপর গেয়েছেন 'শাঙনগগনে ঘোর ঘনঘটা, নিশীথ যামিনী রে', 'হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে', 'তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম', 'তোমার হল শুরু, আমার হল সারা', 'সখী, ভাবনা কাহারে বলে। সখী, যাতনা কাহারে বলে'। অধিকাংশ গানই ১৯৫০-এর প্রথমার্ধে রেকর্ড করা। মাত্র দুটি ১৯৭০-এর দশকে। বাংলা ছবিতে এবং বাংলা ডিস্কে ছড়িয়ে থাকা লতার গাওয়া এই ছ'টি রবীন্দ্রসংগীত এক অনন্য উচ্চতার অবতারণা করেছে। 'কুহেলী' ছবির 'তুমি রবে নীরবে' এবং 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ' ছবির 'সখী, ভাবনা কাহারে বলে' গান দুটি আজও বাঙালি শ্রোতাকে আবেগমথিত করে তোলে।

 

সংগীত আর সুরে কাঁটাতারের কোন বেড়া নেই। নেই পাসপোর্ট কিংবা ভিসার ঝামেলা। সীমানা পেরিয়ে লতার গান ছড়িয়ে পড়েছে ভারতীয় উপমহাদেশের অসংখ্য জনমানুষের হৃদয়ে। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। মহান এই শিল্পীর কাছে বাংলাদেশ ঋণী। একাত্তরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে গান গেয়ে লতা তহবিল সংগ্রহ করেছেন বাংলাদেশ সরকারের জন্যে। ১৯৭২-এর ৩০ জানুয়ারি ভারতের একটি সাংস্কৃতিক দলের হয়ে ঢাকার পিলখানায় গান করেন লতা। সঙ্গে ছিলেন নার্গিস, সুনীল দত্ত, মালা সিনহা সহ আরও কয়েকজন ভারতীয় শিল্পী। সেবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকেও তাঁর বাসভবনে গান গেয়ে শোনান লতা। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গঠিত 'বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা'র অন্যতম সংগঠক সৈয়দ হাসান ইমাম বাংলাদেশে লতার অনুষ্ঠান সম্পর্কে লিখেছেন- 'বাংলাদেশের পক্ষে শিল্পীদের দেখভাল করার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। পিলখানায় মাটির ঢিবির ওপর শতরঞ্জি বিছিয়ে ওপরে শামিয়ানা খাটিয়ে মঞ্চ করা হয়েছিল। প্রচণ্ড শীতে লতাজি খালি পায়ে মঞ্চে এসে গান গাইলেন। শুনলাম, উনি জুতা পায়ে গান করেন না।' ১৯৭২-এর ডিসেম্বরে মুক্তিপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় নির্মিত বাংলাদেশের চলচ্চিত্র 'রক্তাক্ত বাংলা'য় 'ও দাদাভাই' গানটি গেয়েছিলেন লতা। সংগীত পরিচালক ছিলেন সলিল চৌধুরী। স্বাধীন বাংলাদেশে এই একটি মাত্র ছবিতেই গান গেয়েছিলেন তিনি।

 

“লতা মঙ্গেশকর'স ভয়েস নোস নো বাউণ্ডারিজ অ্যাণ্ড ফ্রোস লাইক দি উইণ্ড অ্যাণ্ড দি ওয়াটারস" সাতের দশকে রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে লতার সম্পর্কে এই কথাগুলি বলেছিলেন দিলীপ কুমার। লতার মাপের কালচারাল আইকনের জন্যে বোধ হয় এর থেকে ভাল বিশেষণ আর কিছু হতে পারে না। সীমান্ত নয়, ভাষার বিভেদ নয়, সাংস্কৃতিক পার্থক্য নয়, প্রজন্মের পার্থক্য নয়...এক বহমান আবেগে লতা ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন আমাদের। যুগের পর যুগ ধরে। গানের ভাষা দিয়ে আঞ্চলিকতার বিভেদ মুছেছেন তিনি। মরাঠি হোক বা বাঙালি, সকলেই আপন করে নিয়েছে তাঁকে। এখানেই বোধহয় একজন শিল্পীর সাফল্য। লতা মঙ্গেশকরের মধ্য দিয়েই ভারতের বদলে যাওয়া ইতিহাসকে খুঁজে পাই আমরা। তাঁর গান বারবার হয়ে ওঠে জাতীয়তাবাদী ঐক্যের প্রতীক ।

 

বাংলা ভাষা, বাংলা গান কিংবা বাংলার সংস্কৃতির প্রতি লতার যেমন গভীর সংযোগ ঘটেছিল, তেমনই বাঙালি সুরকার এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তাঁর গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে সলিল চৌধুরী, শচীন এবং রাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে লতার পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এঁদের মধ্যে লতার সঙ্গে সবচেয়ে নিবিড় সম্পর্ক ছিল হেমন্তের। লতার পরিবারে হেমন্তের ছিল অবারিত দ্বার। লতার মা যেমন হেমন্তকে খুব ভালবাসতেন, তেমনই লতার বোন আশা, মীনা, ঊষা ও ভাই হৃদয়নাথ হেমন্তের ভক্ত ছিলেন। আশা ভোঁসলে তো নিজের ছেলের নামও রেখেছিলেন হেমন্তের নামে। হেমন্তের বোম্বের (এখন মুম্বই) গীতাঞ্জলি বাংলোতে মাঝে মধ্যেই চলে যেতেন লতা। হেমন্তের স্ত্রী বেলাদেবীর সাথেও লতার খুব বন্ধুত্ব ছিল। বাংলা ভাষায় গান গাইবার জন্য এবং নিজের বাংলা উচ্চারণ সঠিক করতে লতা অনেক পরিশ্রম করতেন।

আর এ ব্যাপারে হেমন্ত লতাকে অনেক সাহায্য করেছেন। বাঙালি খাবারের প্রতিও লতার যথেষ্ট দুর্বলতা ছিল। হেমন্তের বাংলোতে লতা জমিয়ে মাছের পদ খেতেন। হেমন্ত লতার জন্য কলকাতা থেকে দই ও মিষ্টি বোম্বে নিয়ে যেতেন। হেমন্তর কন্যা রাণুর জন্মের আগে বেলাদেবীকে লতা সাধ খাইয়েছিলেন। লতা কলকাতা এলে হেমন্তের ভবানীপুরের বাড়িতে থাকতেন। পাঁচের দশকে কোনও এক অনুষ্ঠানের জন্য লতা ও গীতা দত্ত কলকাতায় আসেন। গ্র্যাণ্ড হোটেলে লতার থাকার ব্যবস্থা হলেও তিনি হোটেলে না উঠে 'দাদা' হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে উঠেছিলেন। প্রিয় লতা এসেছে, অতএব 'ফাংশন' তো করতেই হয়। এই তাগিদে ‘বসুশ্রী’তে পয়লা বৈশাখে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তবে এর জন্য লতা কোনও পারিশ্রমিক নেননি। কারণ, হেমন্ত দাদা বলেছেন, এটাই যে লতার কাছে শেষ কথা। লতার কলকাতা-সংযোগ সম্পর্কে আর একটা কথা শোনা যায়। লতার বিশেষ পছন্দের ছিল কলকাতার এক বিশেষ দোকানের তৈরি হারমোনিয়াম । তখন বাংলা গানের স্বর্ণযুগ। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে বাংলার তাবড় শিল্পীর হারমোনিয়াম বানানো হত এক নির্দিষ্ট বাদ্য-যন্ত্র প্রস্তুতকারকের কাছ থেকেই। তিনিই তৈরি করেছিলেন ভারতের প্রথম ফোল্ডিং হারমোনিয়াম। হেমন্ত নাকি ঐ দোকান থেকে তাঁর নিজের জন্য একটি হারমোনিয়াম কিনে তা লতাকে দেখান। তখন এরকম সহজে বহনযোগ্য ফোল্ডিং হারমোনিয়াম বম্বেতে পাওয়া যেতনা। সেটা দেখে লতার এত ভাল লাগে যে সেখান থেকে অর্ডার দিয়ে নিজের জন্য একটি হারমোনিয়াম বানিয়েছিলেন। হেমন্ত-কন্যা সংগীতশিল্পী রাণু মুখোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “কলকাতায় এলে লতাজি হোটেলে না উঠে থাকতেন আমাদের বাড়িতে। ঠাকুরমার সঙ্গে তাঁর ছিল ভারী বন্ধুত্ব। রাতে ঠাকুমার সঙ্গেই ঘুমোতেন। সকালে উঠে পুজো করতেন। এমনকী তাঁরা পরস্পরের শাড়িও এক্সচেঞ্জ করতেন। নিজের জামাকাপড় নিজেই কাচতেন তিনি। বাড়িতে রান্না হত, তিনি একতলার রান্নাঘরে ছোট পিঁড়িতে বসে গল্প করতেন সকলের সঙ্গে। তবে বেশিরভাগ সময় নিজের রান্না নিজে করতেন। একবার সকলের জন্য রান্না করেছিলেন!....

সুরকার সলিল চৌধুরীর সঙ্গেও লতার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সলিল- কন্যা সংগীতশিল্পী অন্তরা চৌধুরী স্মৃতিচারণ করেছেন, “বাবা সবসময় বলতেন, লতা মা সরস্বতীর কন্ঠ। জানতেন, লতার জন্য কঠিন গানগুলো রেখে দিলে ক্রিয়েশনের প্রতি জাস্টিস হবেই।...'আজ নয় গুন গুন' গানের রেকর্ডিংয়ের সময় স্টুডিয়োতে গিয়েছিলাম। বাবা যখন গান তোলাচ্ছেন লতাদিদি খুব সফ্‌টলি গাইছিলেন। পরে যখন ভাল করে গান তুলে নিয়ে মাইকের সামনে গেলেন, তখন দরাজ গলায় গাইলেন, একটা 'টেক'-এই 'ওকে'। আসলে উনি আর্টিস্ট হিসেবে গলাটাকে প্রিজার্ভ করছিলেন।... মায়ের মনে অভিমান ছিল যে, বাবা লতাদিদিকে সব রোমান্টিক গান দিয়ে দিতেন আর মাকে জ্ঞানের গান দিতেন। একবার বাবাকে পুজোর গান করতে হবে। কিছুতেই সুর আসছিল না। মাকে বললেন, চলো পওয়াই লেকে বেড়িয়ে আসি। একটু পরেই বাবার সুর এসে গেল। বাড়ি এসে বাবা তবলায় বসলেন, মা হারমোনিয়ামে সুর তুলে নিলেন। তৈরি হল না যেও না'। পরে গানটা লতাদিদি গাইলেন। গানের ব্যাপারে বাবা নিশ্চিত থাকতেন যে, কোন গান কার গলায় লাগবে। আমার মেয়ে বা স্ত্রী বলে পার্শিয়ালিটি করতেন না।"

 

শচীন দেব বর্মন এবং রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গে লতার খানিকটা মিঠেকড়া সম্পর্ক ছিল। হিন্দি ফিল্ম ইগুান্তি শচীনকর্তাকে খানিকটা 'মুক্তি' হিসেবে চিনত। পাঁচের দশক থেকে সাতের দশক পর্যন্ত লতা টানা শচীনকর্তার সুরে গান গেয়েছেন। শচীনের সঙ্গে লতার সম্পর্কটা ছিল একেবারে শুরু-শিষ্যার মতো। কোনও গান তোলানোর সময় শচীনকর্তা লতাকে বাড়িতে ডেকে নিতেন। বাড়িতে বানানো ক্ষীর খাইয়ে তোলাতেন গান। কিন্তু হঠাৎ তাঁদের সম্পর্কে ছেদ পড়ে যায়। শচীনকর্তা কোথাও একটা বলে ফেলেছিলেন, “লতার কেরিয়ার কে বানিয়েছে ? আমরা সুরকার-গীতিকাররা। আমরাই তো ওকে ভাল গান দিয়েছি।" লতা গোটা বিষয়টি শুনে এতটাই ব্যথিত হন যে, শচীনকর্তার সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখেননি। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৩, প্রায় পাঁচ বছর তারা একসঙ্গে কাজ করেননি। শচীন এই কটা বছর লতাকে ভীষণ মিস করেছেন। আর লতাও ওমরেছেন নিজের মতো করে। সময় রাহুল দেববর্মণ ইতান্তির উঠতি প্রতিষ্ঠা। তিনি একদিন লতাকে বলেন, “দিদি, আমি প্রথমবার সুর করছি, তোমাকে গাইতেই হবে। লতা পঞ্চমকে (রাহুল দেব বর্মন) কী করে না করবেন ? তাই পঞ্চমের বাড়ি গেলেন। লতা জানতেন না যে, রাহুল তাঁর এবং শচীনকর্তার মনোমালিন্য মিটাতে মধ্যস্থতার কাজ করছেন। পঞ্চমের বাড়িতে গিয়ে শচীনকর্তাকে দেখে লতার সব রাগ জল হয়ে যায়। শচীনকর্তা লতার মাথায় হাত রেখে বলেন, “লতা তোরে আসতে হইবো।” তারপর শচীন-লতার জুটিও আরও শক্তিশালী হয়ে ফেরে। লতা এইসব বাঙালি সুরকারদের সঙ্গে হৃদয়ের যোগ অনুভব করতেন, তা হয়তো খুব বেশি মানুষের সঙ্গে করতেন না। কারণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে, লতা তাঁদের জন্য হিন্দিতে বেশ কিছু কাজ ছাড়তেও দ্বিধা করেননি। আসলে ছোটবেলা থেকে একা লড়াই করতে করতে ভালবাসার প্রতি তাঁর একটা কাঙালপনা ছিল। এই বাঙালি সুরকাররা প্রফেশনাল সম্পর্কের বাইরে লতার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ককে ঘরোয়া করে ফেলেছিলেন এবং লতাকেও করে তুলেছিলেন অনেকাংশে 'বাঙালি'।

 

এক অখণ্ডধার রাগের আলাপ ধুন-এ সবের দেশ নেই, ভাষা নেই, তা বয়ে চলে কালের যাত্রায়। এই যাত্রার নাম 'লতা মঙ্গেশকর। যেন নীরব আত্মার বিপ্লব। বিশ্ব সংগীতের সব জাতি তাঁর কাছে ঋণী। তিনিই শিল্প, দর্শন, চিত্রকলা, সিনেমা, নাটক, কবিতাকে তাঁর সুরে জাগিয়ে দিতে। যে-সময়ে তিনি এসেছিলেন, সেই সময়ের সমগ্র মানব সভ্যতা তাঁর ঋণ নত হয়ে স্বীকার করেছে। লতা মঙ্গেশকর এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি সুরের বাঁধনে বাঙালিকে করে তুলেছেন তাঁর পরমাত্মীয়। স্বজন।

লেখক: অধ্যক্ষ, রয়্যান অ্যাকাডেমি, মেদিনীপুর

Mailing List