হারিয়ে যাওয়া ঠিকানা / গল্প

হারিয়ে যাওয়া ঠিকানা / গল্প
17 Jul 2022, 12:30 PM

হারিয়ে যাওয়া ঠিকানা / গল্প

মৌমিতা বিশ্বাস

 

সমুদ্রের ধারে ভেজা ভেজা বালি হাত দিয়ে চেপে চেপে বারবার একটা ঘর বানানোর চেষ্টা করছিলো একটা বাচ্চা ছেলে। কিছুটা বানানোর পরেই ঝুরঝুরে নরম বালির ঘর ধ্বসে পড়ছিলো আচমকা।

কিছুটা দূরে বসে বসে দেখছিলো প্রতীক। এলোমেলো হাওয়ায় উড়িয়ে দিচ্ছিলো তার চুল। শেষ বসন্তের বিকেলবেলার হাওয়া। এই সময় শহরে থাকলে একটা মন কেমন করা অনুভূতি হয় তার। মনে হয় কোথাও যেনো একটা যাওয়ার আছে তার। কিছু যেনো বলার আছে কাউকে। কোনো একটা অজানা ঠিকানা যেনো খুঁজে বের করার আছে বলে মনে হয় তার। তারপর এক সময় বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামলে আবার শান্ত হয়ে যায় তার ভিতরের সব আলোড়ন। নিজের গতানুগতিক জীবনের কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে।

একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলো প্রতীক। হঠাৎ কিছুটা দূরে বালির ওপর বসে থাকা নারী পুরুষের দলটার থেকে কোনো মহিলা কণ্ঠ কারো নাম ধরে ডাকলো বোধ হয়। চটকা ভেঙে তাকিয়ে দেখলো সে বাচ্চা ছেলেটা পিছন ফিরে তাকালো, তারপর উঠে চলে গেলো দলটার দিকে। বোধ হয় ওর মা ডেকেছে। বালির ওপর রয়ে গেলো ওর বানাতে চাওয়া বালির ঘরের ভগ্নাবশেষ। কিছুক্ষণ পরেই সমুদ্রের ঢেউ এসে যা ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে।

সন্ধ্যা নামছে। তরল অন্ধকার আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিচ্ছে চারপাশ। আজকের মতো সূর্য ডুব দিয়েছে জলের গভীরে। উঠে দাঁড়ালো প্রতীক। এবার হোটেলে ফিরবে। এক নামজাদা ওষুধ কোম্পানির মাঝারি মাপের কর্তা প্রতীক রায়। বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স। বিবাহিত। স্ত্রী আর কন্যা নিয়ে আপাত পরিপাটি সংসার। একটা সেমিনারে যোগ দিতে তার এই সমুদ্রের ধারের শহরটিতে আসা। আদতে এটা একটা পর্যটন কেন্দ্র। আর এই ধরনের বিভিন্ন বড় শহরেই তাদের সেমিনারগুলো হয়। এর আগে বেশ কয়েকবার তার স্ত্রী অনন্যাও তার সাথে গেছে। তাতে বেশ রথ দেখা কলা বেচা দুই কাজই হতো। মানে দুদিনের সেমিনার শেষে আরো দুদিন ছুটি যোগ করে ছোটখাটো একটা ট্রিপ হয়ে যেতো তাদের। কিন্তু এখন তাদের মেয়ে ঋষা বড় হয়েছে। পড়াশোনার চাপ বেড়েছে তার। প্রতীকের বাবা মাও মাস তিনেকের ব্যবধানে গত হয়েছেন চার বছর আগে। তাই বাধ্য হয়েই অনন্যার আর আসা হয়না। ফলে সেমিনার শেষ হলেই সেই দিনই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাড়ি ফিরে যায় সে। কিন্তু এবার একটু ব্যতিক্রম হচ্ছে। কারন এই শহরেই নতুন একটা প্রজেক্ট খুলতে চলেছে তার কোম্পানি। তাই তারও কিছু কাজকর্ম সেরে যাওয়ার অর্ডার আছে তার ওপর। আজ সেমিনারের শেষ দিন হলেও আরও সপ্তাহ দুয়েক থেকে যেতে হবে তাকে।

 হোটেলে ফিরে কফি অর্ডার করলো প্রতীক। তারপরে টয়লেটে ঢুকলো ফ্রেশ হতে। মুখে চোখে জল দেওয়ার সময় বেসিনের ওপরের আয়নায় নিজেকে দেখলো এক ঝলক। এই মধ্য চল্লিশেও বেশ ছিপছিপে আছে সে। তার সাথে বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বল মুখ চোখ। সেই সঙ্গে আছে একমাথা চুল যার অনেকটাই কাঁচা পাকা মেশানো।

 ফ্রেশ হয়ে কফির কাপ নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো সে। অগুনতি সাগরের ঢেউ সাদা ফেনার মুকুটে সেজে ছুটতে ছুটতে এসে ভেঙ্গেচুরে ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমাগত। লোনা হাওয়া এসে ঝাপটা মারছে মুখে চোখে। শেষ বসন্তের এলোমেলো হাওয়ায় যেনো তার স্মৃতির ওপর থেকে উড়িয়ে নিয়ে গেলো আলগোছে ফেলে রাখা পর্দা গুলো সব।

 

#

আজ অনেকদিন পরে তার মনে পড়লো মৌলির কথা। তার যৌবনের প্রথম প্রেম। কলেজ শেষ করে ইউনিভার্সিটি তে সদ্য ঢুকেছে তখন প্রতীক। লিটল ম্যাগাজিন বের করতো তখন সব বন্ধুরা মিলে একটা। ওই বয়সে এরকম অনেক পাগলামী থাকে মানুষের। সময়ের সাথে সাথে আস্তে আস্তে বন্ধও হয়ে যায় সেসব। সেই লিটল ম্যাগাজিন এর সূত্রেই আলাপ মৌলির সাথে। কলেজের ইংলিশ অনার্সের ফার্স্ট ইয়ারে পড়া মেয়েটা বইমেলায় তাদের লিটল ম্যাগাজিনের স্টলে এসেছিলো বন্ধুদের সাথে। যে বন্ধুদের দলে প্রতীকের পাড়ার দু একটি জুনিয়র ছেলে মেয়েও ছিলো। সেই প্রথম দিনই মৌলির ধারালো বুদ্ধিদীপ্ত মুখটা যেনো মনে গেঁথে গেছিলো তার।

এরপরে আরও দু এক জায়গায় দেখা হলো তাদের ওই পাড়াতুতো জুনিয়র গ্রুপটার সৌজন্যে। ফোন নম্বর আদান প্রদান হওয়ার পরে সম্পর্কটা আপনা থেকেই তৈরি হয়ে গেলো। এতটাই অনায়াস ছিলো সে সম্পর্কের শুরুটা প্রতীকের মনে হতো  অলক্ষ্যে যেনো অনেকদিন আগে থেকেই কেউ স্থির করে রেখেছিলো তাদের এই সবকিছু। আর পাঁচটা সম্পর্কের মতোই বিয়ে আর সংসারের মধ্যে দিয়েই পরিণতি পেতে পারতো সেই সম্পর্ক। কিন্তু ওই যে কোনো এক জায়গায় আগে থেকেই পুরোটা স্থির করা ছিলো যেনো। সম্পর্কটা এগোলো না আর।

ইউনিভার্সিটি পাশ করে চাকরি নিয়ে বাইরে চলে গেলো প্রতীক। মৌলিদের সহপাঠীদের দলটাও পড়াশোনা আর কর্মজীবনের সন্ধানে একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়লো এদিক সেদিক।  তাদের দুটো শহরের কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্ব যেনো আস্তে আস্তে ঢুকে পড়লো জড়িয়ে জাপটিয়ে থাকা তাদের দুটো মনের মধ্যেও। হয়তো তারা দুজনেই বেশ কিছুটা অবুঝ ছিলো তখন। ছিলো বেশ কিছুটা অধৈর্য্যও। নতুন চাকরি, নতুন শহরে মানিয়ে নেওয়া, সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ির চাকরি পাওয়া বড় ছেলে হওয়ার দায়িত্ত্ব পালন আর মৌলি সব কিছুর মধ্যে যেনো ঠিকঠাক তাল মেলাতে পারছিলো না সে। ছোটো খাটো মনোমালিন্য, অভিমান, জমতে জমতে কখন যেন পাহাড়প্রমাণ হয়ে গেলো। দুজনের কেউই আর একটা সময়ের পরে সে পাহাড় ভেঙে পৌঁছাতে পারলোনা আরেকজনের কাছে। বেশ কিছুদিন পরে একবার শুনেছিলো রাজ্যের বাইরের কোনো শহরে বিয়ে হয়ে গেছে মৌলির। তারপর সেও বিয়ে থা করে সংসারী হয় একসময়। কর্মব্যস্ত নাগরিক জীবনে স্মৃতি বিলাসিতার সময় বা আগ্রহ কোনোটাই থাকেনা আর। শুধু এই ভালোবাসার ঋতুর সময়টা তে যেনো এই পাগল হাওয়া মাঝে মাঝে স্মৃতির ওপর পড়ে থাকা পর্দাটা উড়িয়ে দেয় এক দমকায়।

 তখনই যেনো কোনো একটা হারিয়ে যাওয়া ঠিকানা টানতে থাকে তাকে। তার আর অনন্যার আপাত পরিপাটি গোছানো আর সুশৃঙ্খল সংসারের ফাঁকে হঠাৎ যেনো কড়া নাড়ে প্রথম যৌবনের সেই বেহিসাবি হারানো ভালোবাসা। তবে তা সাময়িক। কিছু পরেই আবার বাস্তবে ফিরে আসে সে ধীরে ধীরে। ঢুকে পড়ে নিজের অভ্যস্ত নিজস্ব ছন্দবদ্ধ জীবনে।

ঘরের ইন্টারকম টেলিফোনের আওয়াজে চটকা ভাঙ্গলো প্রতীকের। উঠে গিয়ে ফোনটা তুললো। ওপার থেকে মার্জিত পুরুষ কণ্ঠ জানালো ডিনার টাইম শুরু হয়ে গেছে, স্যার। রুম সার্ভিস নেবেন নাকি ডাইনিং রুমে আসবেন।

রুম সার্ভিসই বলে দিলো প্রতীক। খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পড়লো সে।

 পরদিন সকাল থেকে প্রজেক্টের বিভিন্ন কাজ। বিশেষত হিসেব নিকেশ নেওয়ার কাজে বেশ ব্যাস্ত হয়ে পড়লো সে। বারবার হেড অফিসে মেইল করে নানান রিপোর্ট পাঠাতে হচ্ছে দিনভর। এখানে প্রজেক্ট ম্যানেজার এর দায়িত্বে আছেন যিনি তিনি বয়সে প্রতীকের থেকে হয়তো অল্প কিছু সিনিয়র হবেন। কিন্তু এই বয়সেই সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে বেশ অনেকটাই উপরে উঠে গেছেন। প্রবাসী বাঙালি ভদ্রলোক। প্রথম প্রথম সিনিয়র অফিসার হিসেবে একটু দূরত্ব বজায় রেখে চললেও কয়েকদিনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেলো বেশ। দিনভর কাজের পরে দুজনে যখন  সারাদিনের কাজের খতিয়ান নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে বসতো তখন কাজের আলোচনার সাথে সাথে আড্ডাও হতো কিছুটা। বিপত্নীক বাঙালি ভদ্রলোক। বছর পাঁচেক আগে স্ত্রী একটা অ্যাকসিডেন্টে মারা যাওয়ার পরে আর বিয়ে করেননি তিনি। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে থাকেন। ওই মেয়েই তার বেঁচে থাকার আনন্দ। ঝকঝকে কেরিয়ার ভদ্রলোকের। স্মার্ট, মেধাবী, বনেদি বাড়ির সুপুরুষ সন্তান। জীবনে কোনো কিছুর অভাব নেই। তাও কোথায় যেনো একটা ফাঁকা জায়গা রয়ে গেছে তার। জীবন কাউকেই বোধ হয় পুরোপুরি সুখী হতে দেয়না। মনে মনে ভাবে প্রতীক। ভদ্রলোকের সাথে কথা বলে মনে হয় বয়সে বেশ খানিকটা ছোট স্ত্রীকে তিনি খুবই ভালোবাসতেন। তাই হয়তো আর বিয়ে করার কথা ভাবেননি। কাজ মিটিয়ে ফিরে আসার আগের দিন নিজের বাড়িতে ডিনারে নিমন্ত্রণ করলেন প্রতীককে। ভালোই লাগলো প্রতীকের। বিগত কয়েকদিন ধরে হোটেলের খাবার খেয়ে খেয়ে আর ভালো লাগছিলো না। অফিসের কাজের শেষে প্রতীককে নিজের গাড়িতে করেই বাড়ি নিয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু না গেলেই বোধ হয় ভালো হতো।

 

#

গত দুদিন হলো শহরে ফিরে এসেছে প্রতীক। সেই এক শহর। সেই অফিস, অফিসের কাজের চাপ। বাড়ি, বউ, মেয়ে। সব কিছুই সেই এক আর আগের মতই আছে। কিন্তু কি যেনো একটা নেই। সেইদিন সেই সমুদ্রে ঘেরা লোনা হাওয়ার শহরে তার অনেকখানি ভালো থাকা হারিয়ে এসেছে সে। ওই ভদ্রলোকের সাথে তার বাড়িতে পৌঁছানোর পরে ভালোই লেগেছিলো তার। সমুদ্রের ধারে ছিমছাম সুন্দর বাড়ি। মিষ্টি একটা মেয়ে তার। সারা বাড়ি জুড়ে দেওয়ালে অনেক ছবি। বেশিরভাগই পাহাড়ের। ওনার স্ত্রীর নাকি ফোটোগ্রাফির শখ ছিলো। এইসব ছবি তারই তোলা। দেখতে দেখতে একটা ছবিতে চোখ আটকে গেলো তার। একটা পাহাড়ি পথে দাঁড়িয়ে আছেন এক মহিলা।

ভদ্রলোক বললেন, ইনিই আমার স্ত্রী।

 পথের ঠিক মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছেন মহিলাটি। সামনে আরো বেশ খানিকটা অসম্ভব চড়াই পথ দেখা যাচ্ছে। দুচোখে একটা অনিশ্চয়তা নিয়ে সেই চড়াই পথটার দিকেই তাকিয়ে আছেন তিনি। কিসের অনিশ্চয়তা? ওই চড়াই পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে পারবেন কি পারবেন না সেই অনিশ্চয়তা? পাহাড় ডিঙ্গানো যে খুব কঠিন। তা প্রতীকের থেকে বেশী কে জানে। আর ওই  অনিশ্চয়তায় ভরা চোখদুটো প্রতীকের যে ভীষণ চেনা। মৌলি। একদিন ওই দুটো চোখ তার জীবন জুড়ে ছিলো। এই বসন্তের সন্ধ্যাবেলায় ওই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে তার যেনো মনে হলো এক অসম্ভব খাড়া পাহাড়ে উঠতে গিয়ে সে পা ফস্কে এক অতল খাদে পড়ে যাচ্ছে। যেখান থেকে উঠে আসা অসম্ভব। তার অনেকদিন ধরে না যেতে পারা ঠিকানাবিহীন গন্তব্যটা যেনো চিরকালের মতো সহস্র আলোকবর্ষ দূরে সরে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। ঝড়ের মতো পাগল লোনা হাওয়ার স্রোত যেনো প্রবল বেগে ঢুকে যাচ্ছে তার বুকের পাঁজর ভেঙে তছনছ করে দেবে বলে।

#

অফিস থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরছে প্রতীক। অভ্যস্ত জীবনে মানিয়ে নিতে হবে তাকে আবার। ঋষার স্কুলের জন্য ক্র্যাফটের জিনিষ কিনলো কটা। তারপর ধীরে ধীরে মেট্রো স্টেশনের দিকে এগোলো। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে শহরজুড়ে। শেষ বসন্তের এলোমেলো মন কেমন করা হাওয়া উড়িয়ে দিচ্ছিলো তার কাঁচা পাকা চুল। আজ এই প্রথম এই শহরের বুকে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো আর কোনো হারিয়ে যাওয়া ঠিকানায় ফেরার কোনো অবুঝ অপেক্ষা নেই। বুকের অতল গভীরে রয়ে যাওয়া কিছু কথা কোনোদিন কাউকে মন প্রাণ ভরে বলার আকুলতাও আর নেই তার। ভালবাসার এই পাগল ঋতু শেষ হতে আরও ঠিক কতদিন বাকি?

……..

লেখক: অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার (রেভিনিউ)

Mailing List