সরকারি ডাক্তার: ডাকাত, ভগবান না গোলকিপার

সরকারি ডাক্তার: ডাকাত, ভগবান না গোলকিপার
05 Apr 2022, 12:45 PM

সরকারি ডাক্তার: ডাকাত, ভগবান না গোলকিপার

 

ডাঃ শুভেন্দু বাগ

 

রাত তখন সাড়ে বারোটা। পরিমল বাবু শ্বাসকষ্ট নিয়ে একটি সরকারী হাসপাতালে ঘন্টাখানেক আগে ভর্তি হয়েছেন। সঙ্গে খান পনেরো শুভানুধ্যায়ী। সবাই উদ্বিগ্ন। ডাক্তারবাবু চিকিৎসা শুরু করেছেন। ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছে, নেবুলাইজেসন চলছে। কিন্তু রোগীর বাড়ির শত অনুরোধ সত্ত্বেও স্যালাইন দেওয়া হয়নি।

ডাক্তারবাবুর মতে, রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক।এটি হার্ট ফেলিওর। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ জনিত চিকিৎসার গাফিলতির ফলাফল বলে তাঁর মত। হাসপাতালের বাইরের পরিসর উৎকণ্ঠার আস্ফালনে কলরব মুখর। কেউ হাসপাতালের নোংরা পরিবেশ নিয়ে তর্কে ব্যস্ত, কেউ বা মুঠোফোনে কোনো এক পরিচিতের কাছে চিকিৎসা পরামর্শ নিচ্ছেন। কেউ বা পরিমলবাবুর ছেলের ফোন পাওয়া মাত্র কিভাবে তিনি শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এখানে এসেছেন তার গল্প পরিবেশন করে সকলের সম্ভ্রমপূর্ণ দৃষ্টি উপভোগ করছেন। আবার কেউ বা ফোনে হাত আড়াল করে আবডালে নিম্নস্বরে অপেক্ষারত কাউকে এসব ঝুটঝামেলা থেকে তাড়াতাড়ি মুক্ত হয়ে শীঘ্রই বাড়ি ফেরার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

আগে থেকে ভর্তি থাকা বাকি রোগীদের পরিজনেদের কেউ কেউ এসব কান্ড হাঁ করে গিলছেন। আর যাদের রোগী তিন চারদিন ধরে ভর্তি আছেন তাঁদের অভ্যস্ত চোখে এ শুধুই নিদ্রা ব্যাঘাতের ক্লিষ্ট অনুভূতি মতো। এরই মাঝে প্রায় প্রতি মিনিটে অ্যাম্বুলেন্সের বিপদ সঙ্কেত হাসপাতালে এসে আছড়ে পড়ছে। সঙ্গে আবার নতুন রোগী পরিবহনের ঘটাং ঘট শব্দ। তার উপর যুক্ত হচ্ছে গগনভেদী নতুনের আগমনী যন্ত্রমা আর পুরনোর খসে পড়ার আর্ত চিৎকার।

পরিমলবাবুর  ভাই সুবিমল বাবু শহরে থাকেন। খবর শুনে তড়িঘড়ি ছুটে এসেছেন। ডাক্তারবাবুর এহেন চিকিৎসা গাফিলতির ব্যাখ্যা শুনে বৌদিকে এব্যাপারে জানতে চাইলে বৌদি সম্পুর্ন অস্বীকার করে বলেন, “অসম্ভব উনি তো রোজ ওষুধ খেতেন। ডাক্তারবাবু উপসর্গ কমাতে পারছেন না বলে বাহানা বানাচ্ছেন। আর তাছাড়া বারংবার বলা সত্ত্বেও উনি ন্যূনতম স্যালাইনটুকুও দিচ্ছেন না। এখানে আবার কোনও কার্ডিওলজিষ্ট নেই। এর থেকে আমরা অন্য কোথাও নিয়ে যাব"। পরিমল বাবুর বড় পারিজাত তৎক্ষনাৎ ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়ে বলে- বাবা তো রোজদিন ওষুধ খেতেন। হাইপ্রেসার কমেও গিয়েছিল। পারবেন না তো বলে দিন। আমরা অন্য কোথাও নিয়ে যাব। তাছাড়া একটা স্যালাইন তো দিতে পারেন। ডাক্তারবাবু কিছু একটা লিখতে লিখতে মুখ না তুলেই ওর কথার উত্তরে বললেন, স্যালাইন দেওয়া যাবে না। আর এই মুহূর্তে রেফারও করব না। বরং আগে কি কি ওষুধ খেতেন প্রেসক্রিপশন দেখাও”। বলেই আবার নতুন আসা রোগী দেখায় মন দিলেন। তাড়াহুড়োয় আগের প্রেসক্রিপশন কিছুই হয়নি। তার উপর ডাক্তারবাবুর উত্তর মনঃপুত না হওয়ায় ক্ষুন্ন পারিজাত একটু সরে বন্ধুস্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতাকে ফোন করে সব ঘটনা বলল। কাজও হল তড়িৎগতিতে। ফোন গেল হাসপাতালে। ডাক্তারবাবু তুলতেই কড়া গলায় গলায় নির্দেশ "আমি অমুক দাদা বলছি। কি শুরু করেছেন কি আপনারা? স্যালাইনও দেবেন না রেফারও করবেন না। আগেরবারের ঘটনাটি ভুলে গেলেন নাকি?"। ডাক্তারবাবু উত্তরে কিছু বলার আগেই ফোন কেটে গেল।

এইখানেই গল্পটি শেষ হলে পাঠকরা দুই ভাগে বিভক্ত হবেন। প্রথম পক্ষটি নিজেদের জীবনে ঘটে যাওয়া হাসপাতালের তিক্ত স্মৃতি রোমন্থন করে উপরিউক্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালগুলিকে “নরক” ও ডাক্তারদের “ডাকাত” বলে সহযাত্রী বা সহবাসীদের সাথে আলোচনায় মত্ত হবেন।

ধরে নেওয়া যাক...ঐ ডাক্তারবাবু রাজনৈতিক নেতাটির হুমকি শুনে রোগীটিকে তৎক্ষণাৎ রেফার করে দিলেন এবং রাস্তাতেই রোগীর মৃত্যু হল। রোগীর পরিজন স্যালাইন দেওয়া হয়নি বলে রোগীর মৃত্যু হল বা আগেই রেফার করে দিলে মৃত্যু হত না এই অপরাধে রাজনৈতিক মদতে চিকিৎসক নিগ্রহ ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুরে বিরত হত না?

অথবা ঐ চিকিৎসক প্রোটোকল অনুযায়ী স্যালাইন না দিয়ে বাকি সব চিকিৎসা দিয়েও রোগীর অবস্থার কোনও দৃশ্যত উন্নতি সাধন করতে পারলেন না। বা এইরূপ অবস্থায় রোগীর আরও অবনতি হল। সেক্ষেত্রেও রেফার করা হয়নি কেন এই অভিযোগে হাসপাতাল কর্মী ও চিকিৎসকের উপর ক্ষোভ উগরে দেবার জন্য রোগীর পরিজন চিকিৎসা সংক্রান্তভাবে সম্পূর্ন অশিক্ষিত ও ভোটলোভী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ক্ষোভ ঐ রোগীর সঙ্কটাপন্ন অবস্থার জন্য চিকিৎসককে শারীরীক ও মানসিক নিগ্রহে কালক্ষেপ করেন না।

 

আবার ঐ রোগী যদি রেফার না হয়েই চিকিৎসায় আশানুরূপ সাড়া দিয়ে স্যালাইন নিয়েই ম্যাজিকের মতো সুস্থ হয়ে ওঠেন ওই চিকিৎসকের ‘ভগবান’ হতেও বেশি সময় লাগে না।

এবার আসি চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী বিশ্লেষণে....

১। হার্ট ফেলিওর এর ক্ষেত্রে ইন্ট্রাভেনাস স্যালাইন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এক্ষেত্রে ফেলিওরের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে মৃত্যু ত্বরান্বিত হতে পারে।

২। প্রাথমিকভাবে শ্বাসকষ্টজনিত উপসর্গটি স্থিতিশীল না হলে শুধুমাত্র শ্বাসকষ্টের কারণে রাস্তাতেই রোগী মারা যেতে পারেন। তাই রোগীকে স্থিতিশীল করে উচ্চতর হাসপাতালে পাঠানো উচিত।

 

অর্থাৎ চিকিৎসকটির কথায় কোনও ভুল ছিল না। যা সাধারণত: নিগ্রহ পরবর্তী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চিকিৎসার বিচারে প্রমানিত হয়ে থাকে ও যাকে প্রথম শ্রেণীর পাঠককূল ‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাই’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। সাংবাদিককূল ঐ নিগ্রহের খবর ফলাও করে ছাপলেও নিগ্রহ পরবর্তী বিচারে চিকিৎসকটির নৈতিক জয়ের কোনও সংবাদমূল্য না থাকায় তা প্রকাশ করেন না। ফলে পরথম শ্রেণীর পাঠককূল তাঁদের ধারনাতেই আবদ্ধ থাকেন ও স্মৃতি রোমন্থন কালে ডাক্তার কে “ডাকাত" ও হাসপাতাল গুলিকে "নরক" বলে তৃপ্তিলাভ করেন।

আসলে বাস্তব চিত্র অনুযায়ী এই গল্পের আরো অনেক নেপথ্য দিকও বর্তমান।

 

১। হতে পারে... পূর্ববর্তী চিকিৎসকের বারংবার নিষেধ সত্ত্বেও তার হাইপ্রেশার সংক্রান্ত ওষুধগুলি পাড়ার কোনো ভুঁইফোড় ডাক্তারের কথায় বন্ধ করে রেখেছেন ও ধুম্রপানে বিরত হননি। আর অন্যান্য নির্দেশ গুলিও পালন করেননি (যা এই ধরনের ক্ষেত্রে শতকরা ৮০ ভাগ ঘটনাতেই দেখা যায়)। এবং যে ওষুধটি তিনি খাচ্ছিলেন তা নেহাতই মামুলি অ্যান্টাসিড।

 

২. গোদের উপর বিষফোঁড়ার ন্যায় হতে পারে চিকিৎসা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি, ওষুধপত্র ও সহকারী চিকিৎসাকর্মী অপর্যাপ্ত বা অমিল হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসাটুকুও ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ডাক্তারবাবু দিতে পারলেন না। (যা কিনা সরকারী হাসপাতাল গুলিতে দৈনন্দিন সমস্যা)

 

৩। তার উপর এইরূপ হাসপাতালগুলিতে রোগীর চাপ প্রবল। একজন চিকিৎসক তার একাধিক রোগীর চিকিৎসা করার বিষয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল সব চিন্তাভাবনার সময় একই রোগীর ভিন্ন ভিন্ন বাড়ীর লোক ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জিজ্ঞাস্য নিয়ে একই ডাক্তারবাবুর কাছে হাজির হলে সমস্ত রোগীর নিরিখে বিচার করে দেখলে একসময় ডাক্তারবাবুর বিরক্ত বোধ করা খুবই সঙ্গত বলে মনে হবে, যা আবার প্রথম শ্রেনীর পাঠককূলের কাছে ডাক্তার বাবুর ব্যবহার "অসমীচিন" বলে গণ্য করার কারন হয়ে দাঁড়ায়।

 

৪. এছাড়াও আবার নব্য সংযোজন... তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত গুগলসেবি এক সমাজ যারা ইন্টারনেট আউড়ে ডাক্তারবাবুর জ্ঞান তাহির করতে এবং বাড়ির লোকেদের কাছে সম্ভ্রম লাভের আশায় শ্বাসকষ্টের রুগীকে কেন ফেলিওর বললেন, কেন সিওপিডি বলবেন না, এমফাইসেমাই বা নয় কেন, এই জাতীয় হাজারো জিজ্ঞাসা নিয়ে চিন্তামগ্ন চিকিৎসককে তার্কিক হামলা করেন। নিজেদের পেটে ব্যথা হলে প্রথমে এঁরা নিজেরা ওষুধ খান। না সারলে অবশেষে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পেট ব্যথার ন্যায় মামুলি রোগের উচ্চারণে ডাক্তারবাবুর চোখে সম্ভ্রম জাগাতে পারবেন না এই ভেবে প্রথমেই, ‘কিডনি ব্যথা হয়েছে স্যার” বলে ডাক্তারবাবুর রোগ নির্ণয়ের মস্তিষ্কটিকে কিঞ্চিৎ ধুম্রমগ্ন করে দেন।

অর্থাৎ কিনা সারা মাঠ জুড়ে ফুটবল খেলা হল। গোল হলে গোলকিপার অর্থাৎ ডাক্তারবাবুর দোষ। যে কোনো অস্বাভাবিক রোগী মৃত্যুর ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত পরিকাঠামো, অসহনীয় পরিবেশ, দমবন্ধ করা রাজনৈতিক পরিস্থিতি, স্বল্প বেতন, কার্যক্ষেত্রে অনুপযুক্ত নিরাপত্তা, অবাধ্য রোগী ও তার অসহযোগী পরিজন, লাগামছাড়া ওষুধের দাম সবই ধামাচাপা পড়ে গিয়ে চিকিৎসকের নৈতিকতা দিয়ে গোল কেন খেল তার বিচার হয়।

 

উপরের ঘটনাটি একটি নমুনা মাত্র। প্রাত্যহিক চিকিৎসক জীবনে প্রতিনিয়ত প্রতিটি সরকারী হাসপাতালে এ এখন রোজনামচা। মুস্কিল হল এই সমাজে সবাই কমবেশি ডাক্তারিটা জানেন, শুধুমাত্র পাশ করা ডাক্তাররাই জয়েন্ট এন্ট্রান্স উত্তীর্ণ হয়ে ৫ বছর ধরে এম বি বি এস পড়ে, ১ বছরের ইন্টার্নশিপ করে, ১ বছরের হাউস স্টাফশিপ করে ও পরিশেষে পোষ্টগ্র্যাজুয়েট এন্ট্রান্সে উত্তীর্ণ হয়ে ৩ বছরের পাঠ শেষ করে এম ডি/এম এস পাশ করেও (এর পর রয়েছে ডি এম.এম সি এইচ এমন উচ্চশিক্ষার ডিগ্রী সমূহ) তা জানতে পারেন না। প্রতিবছর বহু মেধাবী ছাত্র শুধুমাত্র সময়সাপেক্ষ এই বিপুল পড়াশুনার চাপের কাছে নতিস্বীকার করে অকালে আত্মহত্যা করে। অনেকে আবার চিকিৎসক ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো চাপে, রাষ্ট্রযন্ত্রের পিষ্টনে অকালে ঝরে যান। সাধারণ মানুষের নির্ভরতা বাড়ে দক্ষিণের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের উপর। নির্লোভ, অব্যবসাভিত্তিক, সুস্থ পরিকাঠামো নিয়ে যদি চিকিৎসকদের শুধুমাত্র সুচিকিৎসার নিরিখে মাপা যায় তাহলে কিংবদন্তী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় থেকে শুরু করে প্রবাদপ্রতীম ডাঃ শীতল ঘোষ শুধুমাত্র এই বাংলা থেকেই পাওয়া যাবে। অর্থাৎ আমরা দক্ষিণের থেকে পরিকাঠামো, অসুস্থ ব্যবসায়ী মানসিকতার দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও মেধাভিত্তিক পর্যালোচনায় কিছুটা হলেও এগিয়ে। আবার পিছিয়ে থাকা দিকগুলির কোনটিই একজন চিকিৎসা প্রদানকারী চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাহলে গোল খেলে শুধুমাত্র গোলকিপারের দোষ দেবেন কেন?

 

এবার প্রথমশ্রেণীর পাঠককূলের কাছে অনুরোধ, আমরা যারা দ্বিতীয় শ্রেনী অর্থাৎ কিনা গোলকিপার রূপী চিকিৎসক, চিকিৎসাকর্মী, যারা কিনা অন্যান্য সরকারি কর্মীদের ন্যায় অফিসে ঢুকে পেপার পড়তে পারি না, নিজেদের ক্ষোভও সরকারি নিয়মে আপনাদের অসুবিধা হবে বলে কর্মবিরতির মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারি না, আপনাদের সুস্থতার লক্ষ্যে নিজেদের সংসারে চিরকাল অশান্তির আবহ নিয়ে বেঁচে থাকি, শুধু বলতে চাই আমরা "ভগবান" হয়ে আপনাদের অযৌক্তিক উচ্চাশার শিকার হতে চাই না। আবার মনুষ্য সেবার ব্রত নিয়ে ডাক্তারি পড়তে এসে এ হেন জাঁতাকলে পড়ে “ডাকাত"ও হতে চাই না। আমাদের আর পাঁচটা বুদ্ধিজীবীর ন্যায় ষড়রিপু সম্পন্ন চাকুরীজীবী মানুষের পূর্ণ মর্যাদা দেওয়া হোক।

লেখক: চিকিৎসক, এসএসকেএম হাসপাতাল, কলকাতা

Mailing List