ছোটদের ভূগোল শিক্ষা, রাসায়নিক আবহবিকার

ছোটদের ভূগোল শিক্ষা, রাসায়নিক আবহবিকার
12 Nov 2022, 10:30 AM

ছোটদের ভূগোল শিক্ষা, রাসায়নিক আবহবিকার

দীপান্বিতা ঘোষ

 

আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান বিশেষত জল H2O,অক্সিজেন O2),কার্বন-ডাই-অক্সাইডCO2 শিলার খনিজের উপর নানাভাবে বিক্রিয়া করে শিলার কাঠিন্য নষ্ট করে দেয় ও শিলা বিয়োজিত হয়।এভাবে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ হলে তাকে রাসায়নিক আবহবিকার বলে।

       

রাসায়নিক আবহবিকার ছয় প্রকার—

 

1.কার্বনেশন বা অঙ্গার যোজন

2.অক্সিডেশন বা জারণ

3.হাইড্রেশন বা জলযোজন

4.হাইড্রোলাইসিস বা আর্দ্র বিশ্লেষণ

5.সলিউশন বা দ্রবণ

6.জৈব রাসায়নিকআবহবিকার।

 

1.কার্বনেশন বা অঙ্গার যোজন

সজ্ঞা-বায়ুমণ্ডলের কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সঙ্গে জলের রাসায়নিক সংযোগে কার্বনিক অ্যাসিড শিলা খনিজের সাথে বিক্রিয়া ঘটিয়ে শিলার পরিবর্তন ঘটালে তাকে কার্বোনেশন বলে।

উপাদান: কার্বন ডাই অক্সাইড, জল ও ক্যালসিয়াম কার্বনেট(CaCO3)

সমীকরণ- H2O + CO2 =H2CO3

CaCO3+ H2CO3 = Ca(HCO3)2

 

ব্যাখ্যা: বৃষ্টির জলের সঙ্গে বায়ুমন্ডলের কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশে কার্বণিক অ্যাসিড (H2CO3) তৈরি হয়। বিশুদ্ধ জলে চুনাপাথর CaCO3 দ্রবীভূত হয় না। কিন্তু কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশ্রিত জলে চুনাপাথর বা ক্যালসিয়াম কার্বনেট সহজেই দ্রবীভূত হয় এভাবে শিলার রাসায়নিক আবহবিকার ঘটে।

প্রাধান্য যুক্ত অঞ্চল: চুনাপাথর গঠিত কার্স্ট অঞ্চলে এই আবহবিকার বেশি ঘটে।

 

2.অক্সিডেশন বা জারণ

সজ্ঞা: জল বা জলীয় বাষ্পের উপস্থিতিতে শিলা খনিজের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অক্সিজেন যুক্ত হলে তাকে জারন বলে।

উপাদান: জল, অক্সিজেন ফেরাস অক্সাইড বা যেকোনো লৌহ গঠিত খনিজ।

সমীকরণ:

4 FeO + 3H2O + O2 = 2 Fe2O3,3H2O

(ফেরাস অক্সাইড)         (লিমোনাইট)

ব্যাখ্যা: লোহা যখন ফেরাস অক্সাইড রূপে থাকে তখন তা কঠিন থাকে ফলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না কিন্তু এর সঙ্গে লোহার বিক্রিয়ায় ফেরাস অক্সাইড ফেরিক অক্সাইডে পরিণত হয় ,এবং তা সহজেই ভেঙে যায়। এর ফলে শিলায় মরচে পড়ে।

প্রাধান্যযুক্ত অঞ্চল: ভূপৃষ্ঠে যে সকল শিলার মধ্যে লোহা আছে সেখানে এই প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল তাছাড়া এমফিবোলাইট,পাইরক্সিন ও বায়োটাইট খনিজের ওপর অক্সিজেন কার্যকর হয়।

 

3. হাইড্রেশন বা জলযোজন

 সজ্ঞা: রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শিলার মধ্যস্থিত খনিজের সাথে জল যুক্ত হলে তার গাঠনিক পরিবর্তন ঘটে এবং নতুন খনিজের সৃষ্টি হয়। এই প্রক্রিয়াকে জলযোজন বা হাইড্রেশন বলে।

উপাদান: জল, ক্যালসিয়াম সালফেট বা যেকোন জল শোষণকারী খনিজ।

পদ্ধতি: এই প্রক্রিয়ায় কোন কোন শিলার খনিজ অধিক জল শোষণ করার ফলে খনিজ কণা প্রসারিত হয় এবং তাদের বাঁধন আলগা ও নমনীয় হয়ে পড়ে ।

উদাহরণ: এই প্রক্রিয়াতে ক্যালসিয়াম সালফেট এর সাথে জল যুক্ত হয়ে জিপসাম সৃষ্টি হয়। তাছাড়া ফেরাস অক্সাইডের সাথে অক্সিজেন ও জল যুক্ত হয়ে ফেরিক অক্সাইড গঠন করে।

সমীকরণ:

i) CaSO4 +2 H2O = CaSO4, 2H2

ii) 4FeO + 3 H2O + O2 = 2Fe2O3, 3H2

 

4.হাইড্রোলিসিস বা আর্দ্র বিশ্লেষণ:

সজ্ঞা: শিলা মধ্যস্থ খনিজের সঙ্গে জল যুক্ত হয়ে খনিজ অণুকে একইসঙ্গে বিয়োজিত ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন যৌগে পরিণত করে।

উপাদান: জল ও বিভিন্ন খনিজ।

পদ্ধতি: এই প্রক্রিয়ায় জল হাইড্রোজেন ও হাইড্রোক্সিল আয়নে বিশ্লিষ্ট হয়ে খনিজের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়।ফেলসপার এই প্রক্রিয়ায় অ্যালুমিনোসিলিসিক এসিড ও পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইডে পরিণত হয়।

সমীকর:

2KAlSi308 + HOH = HAlSi3O 8 + KOH

 

5. দ্রবন বা সলিউশন

সজ্ঞা: খনিজ লবণ, জিপসাম প্রভৃতি সহজেই জলে দ্রবীভূত হয়।এর ফলে তার আগেকার অবস্থা বিলুপ্ত হয়। এই ধরনের আবহবিকার কে দ্রবণ বলে।

পদ্ধতি: জল দ্বারা খনিজ পদার্থ দ্রবীভূত হয় না কিন্তু শিলায় অবস্থিত কোন কোন খনিজ দ্রব্য রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে এমন এক অবস্থায় এসে উপস্থিত হয় তখন তা সহজেই জলে দ্রবীভূত হয়ে পড়ে।

যেমন ক্যালসিয়াম কার্বনেট সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না কিন্তু যখন তা ক্যালসিয়াম বাই কার্বনেটে পরিণত হয় তখন তা সহজেই জলে দ্রবীভূত হয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে থাকে।

সমীকরণ:

CaCO 3 + H2CO 3 = Ca(HCO3)2

 

6.জৈব রাসায়নিক আবহবিকার

 উদ্ভিদ, বিভিন্ন প্রাণী ও ক্ষুদ্র জীবাণুর প্রভাবে রাসায়নিক আবহবিকার ঘটে। শিলা মধ্যস্থ ধাতব খনিজ লিচেন, ব্যাকটেরিয়া প্রভৃতি ক্ষুদ্র জীব নিঃসৃত জৈব রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা দ্রবীভূত হয়। এই ধাতব ক্যাটায়ান যুক্ত জৈব রাসায়নিক পদার্থকে চিলেট বলে। বিভিন্ন ক্ষুদ্র উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহ পচে জৈব এসিডের সৃষ্টি করে। এই অ্যাসিডের প্রভাবে রাসায়নিক আবহবিকার ঘটে। বিভিন্ন জীবজন্তু রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে শিলার আবহবিকার ঘটায়।

 ________________

লেখক: ভূগোলের শিক্ষিকা, নান্দারিয়া হাইস্কুল, শালবনি, পশ্চিম মেদিনীপুর।

Mailing List