ভূগোল শিক্ষা: ভারতের উপকূলীয় সমভূমি  

ভূগোল শিক্ষা: ভারতের উপকূলীয় সমভূমি   
21 Nov 2022, 09:55 AM

ভূগোল শিক্ষা: ভারতের উপকূলীয় সমভূমি

 

দীপান্বিতা ঘোষ

 

ভারতের উপকূলীয় সমভূমি অঞ্চলটি প্রায় 3100 কিমি দীর্ঘ, যা পশ্চিমে গুজরাট থেকে শুরু করে কুমারিকা অন্তরীপ স্পর্শ করে পূর্বে উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত।

ভারতের উপকূলীয় সমভূমির দুটি বিভাগ হল —-

A.পশ্চিম উপকূলের সমভূমি।

B.পূর্ব উপকূলের সমভূমি।

 

পশ্চিম উপকূলের সমভূমি

উত্তরের পাকিস্তানের সীমা থেকে শুরু করে দক্ষিণে প্রায় কুমারিকা অন্তরীপ পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলীয় সমভূমিটির দৈর্ঘ্য প্রায় 1600 কিমি, প্রস্থ প্রায় 15 থেকে 80 কিমি ।

এই উপকূলীয় সমভূমি অঞ্চলকে 4 ভাগে ভাগ করা যায়—----

  1. গুজরাট উপকূল
  2. কোঙ্কন উপকূল
  3. কর্ণাটক উপকূল
  4. মালাবার উপকূল

 

1.গুজরাট উপকূল—-

এই উপকূলকে চার ভাগে ভাগ করা যায়

কচ্ছের রণ

কচ্ছ উপদ্বীপ

কাথিয়াবাড় উপদ্বীপ

গুজরাট সমভূমি

a) কচ্ছের রণ:

গুজরাট উপকূলীয় সমভূমির উত্তর ভাগে জলাভূমি বা রণ দেখতে পাওয়া যায়। সেই জন্য এই অংশকে "কচ্ছের রণ" বা "জলাভূমির দেশ" বলা হয়।

b) কচ্ছ উপদ্বীপ:

কচ্ছের রণের দক্ষিণ পশ্চিমে কচ্ছ উপদ্বীপ অবস্থিত।

c) কাথিয়াবাড় উপদ্বীপ:

গুজরাট উপকূলের দক্ষিণভাগ লাভা দ্বারা গঠিত যা কাথিয়াবার উপদ্বীপ নামে পরিচিত। এখানে গির ও গিরনার পাহাড় অবস্থিত। গিরনার পাহাড়ের গোরক্ষনাথ শৃঙ্গটি কাথিয়াবাড়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।

d) গুজরাট সমভূমি:

কাথিয়াবাড় উপদ্বীপের পূর্বে সবরমতী, মাহী, নর্মদা তাপ্তি নদীবাহিত পলি সঞ্চিত হয়ে এই সমভূমি গড়ে উঠেছে।

  1. কোঙ্কন উপকূল:

দমন থেকে গোয়ার দক্ষিণ সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত এই উপকূল প্রায় 500 কিমি দীর্ঘ এবং 45 থেকে 47  কিমি প্রশস্ত।

  1. কর্ণাটক উপকূল:

কর্ণাটকের অন্তর্ভুক্ত সমভূমিটিকেই কর্ণাটক উপকূল বলে ।এর দৈর্ঘ্য প্রায় 225 কিমি।

  1. মালাবার উপকূল:

কেরলে বিস্তৃত উপকূল অঞ্চলটি মালাবার উপকূল নামে পরিচিত। এর দৈর্ঘ্য প্রায় 225 কিমি। এখানে অনেক উপহ্রদ আছে যাদের কয়াল বলে।

যেমন ভেম্বানাদ, অষ্টমুদি কয়াল।

থেরিস:

এখানকার বালিয়াড়িকে স্থানীয় ভাষায় থেরিস বলে।

 

পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি

 

বাংলাদেশের পশ্চিম সীমা থেকে কুমারিকা অন্তরীপ পর্যন্ত প্রায় 1500 কিমি বিস্তৃত সমভূমিটিকে পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি বলে।

দৈর্ঘ্য– প্রায় 1500 কিমি

প্রস্থ– প্রায় 80 থেকে 120 কিমি।

এর উপবিভাগগুলি হল

a) করমন্ডল বা তামিলনাড়ু উপকূল

b) উত্তর সরকার বা অন্ধ্র উপকূল

c) উৎকল উপকূল

 

a) করমন্ডল বা তামিলনাড়ু উপকূল

কৃষ্ণা নদীর বদ্বীপ থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলীয় অংশটি করমন্ডল বা তামিলনাড়ু উপকূল নামে পরিচিত। এই সমভূমিতে পুলিকট হ্রদ অবস্থিত। এখানে বছরে দুবার বৃষ্টিপাত হয়। এই অঞ্চলকে "দক্ষিণ ভারতের শস্যভান্ডার" বলা হয়।

b) উত্তর সরকার উপকূল বা অন্ধ্র উপকূল

চিলকা উপহ্রদ থেকে কৃষ্ণা নদীর বদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলটি অন্ধ্রউপকূল বা উত্তর সরকার উপকূল নামে পরিচিত। এখানে অবস্থিত কোলেরু ভারতের বৃহত্তম হ্রদ

C) উৎকল উপকূল

চিলকা হ্রদ থেকে বাংলাদেশের পশ্চিম সীমা পর্যন্ত বিস্তৃ উপকূলীয় অংশকে উৎকল উপকূল বলে। এখানকার চিলকা হ্রদটি ভারতের বৃহত্তম উপহ্রদ।

 

প্রশ্ন: পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের সমভূমির পার্থক্য লেখ

অবস্থান:

পশ্চিম উপকূল উত্তরে কচ্ছের রণ থেকে দক্ষিনে কুমারিকা অন্তরীপ পর্যন্ত বিস্তৃত। পূর্ব উপকূল উত্তরে সুবর্ণরেখা থেকে দক্ষিনে কুমারিকা অন্তরীপ পর্যন্ত বিস্তৃত।

উপকূলের নাম:

পশ্চিম উপকূলের প্রধান ভাগ—- উত্তর দিকে কোঙ্কন উপকূল মাঝে কর্ণাটক (কানাড়া )উপকূল দক্ষিণ দিকে মালাবার উপকূল নামে পরিচিত। পূর্ব উপকূলটি উত্তর দিকে উত্তর সরকার উপকূল দক্ষিণ দিকে করমন্ডল উপকূল নামে পরিচিত।

উৎপত্তি

প্রথমে ভূ-আন্দোলনের ফলে পরে সামুদ্রিক সঞ্চয়ের ফলে পশ্চিম উপকূলের সৃষ্টি হয়েছে। নদীর ও সমুদ্রের সঞ্চয় কার্যের দ্বারা পূর্ব উপকূল গঠিত।

বিস্তার ও উচ্চতা

পশ্চিম উপকূল ভাগ সংকীর্ণ। বিস্তার গড়ে 10থেকে 65 কিমি এবং উচ্চতা বেশি। পূর্ব উপকূল ভাগ প্রশস্ত।বিস্তার গড়ে 80 থেকে 100 কিমিএবং উচ্চতা কম।

বদ্বীপ

পশ্চিম উপকূলে নদী মোহনায় বদ্বীপ নেই। পূর্ব উপকূলে  নদী মোহনায় বড় বড় ব-দ্বীপ গড়ে উঠেছে।

বালিয়াড়ি

পশ্চিম উপকূলে শুধুমাত্র দক্ষিনে মালাবার উপকূলে বালিয়াড়ি দেখা যায় যা থেরিস নামে পরিচিত। পূর্বে প্রায় সর্বত্রই বালিয়াড়ি আছে।

হ্রদ ও উপহ্রদ

পশ্চিম উপকূলে ছোট বড় হ্রদ, উপহ্রদ বা কয়াল দেখা যায় ।যেমন ভেম্বানাদ ,অষ্টমুদি ।হ্রদের সংখ্যা পূর্ব উপকূল অপেক্ষা বেশি। পূর্ব উপকূলে চিলকা, পুলিকট প্রভৃতি হ্রদ দেখা যায়।হ্রদ উপহ্রদের  সংখ্যা পশ্চিম উপকূল অপেক্ষা কম ।

উপকূলের প্রকৃতি ও বন্দর

পশ্চিম উপকূলরেখা ভগ্ন হওয়ায় স্বাভাবিক বন্দরের সংখ্যাপূর্ব উপকূল অপেক্ষা বেশি। পূর্ব উপকূল রেখা তেমন ভগ্ন না হওয়ায়  স্বাভাবিক বন্দরের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম

দৈর্ঘ্য:

পশ্চিম উপকূল প্রায় 1600 কিমি দীর্ঘ। পূর্ব উপকূল প্রায় 1500 কিমি দীর্ঘ।

যোগাযোগ ব্যবস্থা

পশ্চিম উপকূল সংকীর্ণ, ভূমিভাগ ঢালু হওয়ায় যোগাযোগ তেমন উন্নত নয়। পূর্ব উপকূল প্রশস্ত ও সমতল হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত।

বৃষ্টিপাত:

দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমি বায়ু পশ্চিমঘাটে  বাধা পেয়ে উপকূলে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। পূর্ব উপকূলে মাঝারি প্রকৃতির বৃষ্টিপাত হলেও করমন্ডল উপকূলে বছরে দুবার বৃষ্টিপাত হয়।

কৃষিকাজ:

পশ্চিম উপকূলে মৃত্তিকা অনুর্বর তাই কৃষি কাজ তেমন উন্নত নয়। পূর্ব উপকূলে মৃত্তিকা উর্বর তাই কৃষিকাজ উন্নত।

জনঘনত্ব:

পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমির সর্বত্র অর্থনৈতিক বিকাশ সমানভাবে ঘটেনি।এটি অপেক্ষাকৃত কম জনঘনত্ব যুক্ত অঞ্চল। পূর্ব উপকূল অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ। এই উপকূলীয় সমভূমি অধিক ঘনত্ব যুক্ত।

প্রশ্ন: ভারতের জনজীবনে উপকূলীয় সমভূমির গুরুত্ব লেখ:

ভারতের জনজীবনে সুদীর্ঘ উপকূলীয় সমভূমির গুরুত্ব অপরিসীম —-

1.কৃষি সমৃদ্ধি:

উপকূলের উর্বর সমভূমিতে ধান, আখ,নারকেল, তৈলবীজ, ডাল, বিভিন্ন মসলা প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়।

2.খনিজ সম্পদ

এই অঞ্চল থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে খনিজ তেল, আকরিকলোহা,প্রাকৃতিকগ্যাস,মোনাজাইট প্রভৃতি সংগ্রহ করা হয়।

3.বনজ সম্পদ

উপকূল সংলগ্ন অরণ্য বিশেষত ভারতের ম্যানগ্রোভ অরণ্য বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ।

যেমন সুন্দরবন, ভিতর কণিকা।

4. মৎস্য সম্পদ

ভারতের উপকূল অঞ্চলে বহু সামুদ্রিক মৎস্য আহারন ক্ষেত্রের বিকাশ ঘটেছে।

5. শিল্পের প্রসার

উপকূলের সমভূমিতে জাহাজ নির্মাণ শিল্প, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, কাগজ শিল্প, মোটর গাড়ি নির্মাণ শিল্প, রাসায়নিক শিল্প বিকাশ লাভ করেছে।

6. বাণিজ্যিক সুবিধা

সামুদ্রিক বন্দর গুলি সাহায্যে বাণিজ্যের সুবিধা থাকায় শিল্প বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।

7. ঘন জনবসতি

এই সমভূমিতে বন্দরকে কেন্দ্র করে একাধিক ঘন জনবসতিপূর্ণ নগর বিকাশ লাভ করেছে যেমন মুম্বাই, বিশাখাপত্তনম, চেন্নাই।

লেখক: ভূগোলের শিক্ষিকা। নান্দারিয়া হাইস্কুল, শালবনি, পশ্চিম মেদিনীপুর।

Mailing List