আক্ষেপ করে গাঁধীজি বলেছিলেন, ‘সবাই আমার ছবি আর মূর্তিতে মালা দিতেই আগ্রহী, আমার কথা শুনতে নয়’, গাঁধীজির অহিংসা-তত্ত্ব বিতর্কিত হলেও আজও প্রাসঙ্গিক  

আক্ষেপ করে গাঁধীজি বলেছিলেন, ‘সবাই আমার ছবি আর মূর্তিতে মালা দিতেই আগ্রহী, আমার কথা শুনতে নয়’, গাঁধীজির অহিংসা-তত্ত্ব বিতর্কিত হলেও আজও প্রাসঙ্গিক   
02 Oct 2022, 11:49 PM

আক্ষেপ করে গাঁধীজি বলেছিলেন, ‘সবাই আমার ছবি আর মূর্তিতে মালা দিতেই আগ্রহী, আমার কথা শুনতে নয়’, গাঁধীজির অহিংসা-তত্ত্ব বিতর্কিত হলেও আজও প্রাসঙ্গিক

 

সত্যব্রত দোলই

 

অদ্বৈত বেদান্ত মতকে মনে নিয়ে, বৈষ্ণব ভাবকে পাথেয় করে, অহিংসা তত্ত্বকে পাদপীঠে রেখে, শঙ্করের মতাদর্শকে স্বীকার করে, বুদ্ধের ভাবাদর্শকে সম্বল করে, মিলাবে মিলিবে- এ ভাব নিয়ে, এক সনাতনী হিন্দু তার স্বধর্মে ভক্তি রেখে, সর্বধর্ম সমভাবকে মেনে নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন সুদীর্ঘকাল পরাধীন একটি দেশকে স্বাধীন করতে। অহিংস পথে রুখে দিতে চেয়েছিলেন এক শাসনকে, যার অস্তিত্বই টিকে ছিল হিংসাকে আশ্রয় করে। কঠিন পরীক্ষা কঠিনতর পথ। তবু দুঢ়প্রতিজ্ঞ এক মহামানব। মধ্যযুগে যখন সনাতন বৈদিক ধর্ম-সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে অসীম শক্তি নিয়ে ভক্তি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের ঋষি ও সাধককুল অহিংস পথে দৃঢ়তার সঙ্গে এক বৈরী মনোভাবাপন্ন শাসক শ্রেণিকে তার ধর্ম-সংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদী প্রচেষ্টার প্রকট ইচ্ছাকে অনেকাংশে রুখে দিয়েছিলেন, তেমনই আধুনিক যুগে এক ততোধিক নিষ্ঠুর বৈদেশিক শাসককে অহিংস পথের সাধনায় ভারত ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন এক মহাত্মা। অভেদ দর্শনে প্রীতি, বেদান্তে ভক্তি, নরমপন্থায় অনুরাগ, রঘুপতিতে মতি, বুদ্ধের অষ্টমার্গে আস্থা ও সকল বর্ণের প্রতি সমভাব নিয়ে তাদের সেবাব্রতী হয়ে এসেছিলেন ‘জাতির পিতা'-মোহনদাস কর্মচাঁদ গান্ধী।

গান্ধীজী বলেছেন, ছোটবেলা থেকেই সত্যের প্রতি তার সহজাত আকর্ষণ ছিল। কিন্তু অহিংসা তাঁর সহজাত ধর্ম নয়। সত্যের সন্ধান করতে করতেই তিনি অহিংসা আবিষ্কার করেন। তাঁর আত্মজীবনীতে দেখা যায়, তিনি ছোটবেলায় লুকিয়ে লুকিয়ে মাংস খেতেন। কেননা সহপাঠিরা তাঁকে বুঝিয়েছিল মাংস না খেলে গায়ে শক্তি হয় না। ইংরেজদের সঙ্গে লড়াও যায় না। কিন্তু মোহনদাস মাংস খাওয়া একদিন ছেড়ে দিলেন। মাংস খাওয়াতে দোষ, এ বুঝে নয়। লুকিয়ে লুকিয়ে খেতে হয় বলে, মিথ্যে কথা বলতে হয় বলে, সেই লজ্জায়। অহিংসার প্রতি আকর্ষণ তাঁর জীবনের গভীরতম সংকট ও সংগ্রামের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছিল। গাঁধী দর্শনের অমূল্য সম্পদ তাঁর অহিংসা তত্ত্ব"। তাঁর জীবনদর্শনের সমগ্র ভাবনা মূলত সত্য ও অহিংসার মানদণ্ডেই নিরূপিত। সন্ত তুলসীদাসের বাণী ভগবদগীতা, মনুস্মৃতি প্রভৃতি তাঁর চিন্তা-চেতনার মনন গড়ে তুলেছিল। আবার উপনিষদের তত্ত্বকে তিনি আত্মস্থ করেছিলেন। এইসকল ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা থেকেই তাঁর মনে অহিংস ও সত্য আদর্শের ভিত গ্রথিত হয়েছিল। এছাড়াও জন রাসকিনের 'আনটু দ্য লাস্ট' এবং লিও টলস্টয়ের 'দ্য কিংডম অফ গড ইজ উইনিন ইউ' বই দুটিও তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা নির্মাণে দিশারি হয়েছিল।

গাঁধীজি অনুধাবন করেছিলেন যে পৃথিবীর সব ধর্মই যুগে যুগে সত্য ও অহিংসার শিক্ষা দেয়। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, যিনি সত্যের পথে অবিচল থাকেন, তিনি অহিংস না হয়ে পারেন না। সত্যাগ্রহীর মধ্যে সত্য এবং অহিংসার ধারণা মূর্ত হয়ে উঠে, কেননা এ দুটি ধারণা পরস্পরের অবিচ্ছেদ্য। অহিংস নীতি নিষ্কিক্রয় প্রতিরোধ থেকে ভিন্ন। নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের মধ্যে প্রতিপক্ষকে পরাজিত ও পর্যুদস্ত করার বাসনা থাকে। অহিংস ব্যক্তি জয়-পরাজয়ের চিন্তা করে না। অহিংস ব্যক্তি প্রতিপক্ষের মানসিক উত্তরণ ঘটানোরও চেষ্টা করে। অহিংস ব্যক্তির মনে থাকে অন্যায়কারীর প্রতি অগাধ ভালোবাসা। অহিংস পথে যুদ্ধ হল ভালোবাসা ও প্রেমবৃত্তির সমন্বয়ে এক মানবীয় সংগ্রাম পদ্ধতি। গাঁধীজির কাছে সত্য ছিল গন্তব্য, আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর একমাত্র মাধ্যম ছিল অহিংসা। তিনি বলেছেন, “অহিংসা আমাদের অভিজ্ঞান আর পশুদের ধর্ম হল হিংসা। মানুষের মর্যাদাবোধই তাকে এই উচ্চতর বৈশিষ্ট্যের আসনে বসিয়েছে।” জীবন আর সত্য যেহেতু একাকার, তাই যা কিছু জীবনকে নিরাপত্তা দিচ্ছে, উৎসাহ দিচ্ছে বা তার সংরক্ষণ করছে, তাকেও তিনি সত্যের উপাদান বলে ভাবতেন। এগুলিকে তিনি অহিংসা আখ্যা দিতেন। অন্যদিকে যা কিছু জীবনকে ব্যাহত করে সত্যের পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে, গাঁধীজি তাকেই বলতেন হিংসা। 'অহিংসা' কোনও ব্যক্তিবিশেষের ওণমাত্র নয়, এ হল যৌথ জীবন যাপনের এক পদ্ধতি। উপচে পড়া ভালোবাসায় একে অপরের দুঃখ দূর করার দৃষ্টিভঙ্গি এটি। জিন শার্প বলেছেন, গাঁধীজির অহিংসা আসলে এমন এক আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যা সবাইকে যথাযথ মাধ্যম, কাঠামো, পদ্ধতি ও অভিমুখ ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে জীবনযাপনের ন্যায়সঙ্গত সুযোগ করে দেয়। গাঁধীজির সত্যানুসন্ধান যেসব উজ্জ্বল অহিংস ধারণার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছিল, সেগুলি হল- স্বরাজ (সৎ ও বিবেকবান জীবনযাপন), সর্বোদয় (সকলের কল্যাণের মধ্যে নিজের কল্যাণ দেখা), স্বদেশি (প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রাণবন্ত সম্পর্ক), খাদি (পারস্পরিক অস্তিত্ব), সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি (বৈচিত্র্যের মধ্যে সহিষ্ণুতা) এবং নঈ তালিম (সর্বাত্মক জীবন যাপনের যে শিল্প তার শিক্ষা)। গান্ধীজী বিশ্বাস করতেন, প্রতিযোগিতা বা ঈর্ষা নয়, সভ্যতার মূল কথা হল সহযোগিতা ও সম্মিলন এবং এই সম্মিলনের প্রধান কারক হল অহিংসা। সত্যাগ্রহের মতো অহিংসাকেও তিনি প্রয়োগ করলেন রাজনীতির "আঙিনায়। তাঁর 'অহিংসা' কাপুরুষ বা ক্লীবের অহিংসা নয়, বীরের অহিংসা। অহিংসা দুর্বলের হাতিয়ার নয়। 'অহিংসা ও গান্ধী' প্রবন্ধে জে বি কৃপালিনী লিখেছেন- গান্ধীজি শুধু লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের উৎকর্ষ নয়, পন্থা বা পদ্ধতির উৎকর্ষের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। গান্ধীবাদী অহিংসার অনুশীলন ভারতীয় গণতন্ত্রকে বরাবর স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জয়ী হতে সাহায্য করেছে। বস্তুত স্বৈরতন্ত্রের মূল শিকড়টি থাকে হিংসার মধ্যে। আর গণতন্ত্রের শিকড়টি থাকে অহিংসার মধ্যে।

তবে গাঁধীজির অহিংস তত্ত্ব'টি বিতর্ক ও সমালোচনার উর্ধে নয়। এই তত্ত্বটি কতটা মৌলিক, বাস্তবসম্মত তা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। ভগবদ্‌গীতা ভক্তি গাঁধীজির মতে, ভারতীয় সংস্কৃতিতে হিন্দু ধর্মের উল্লেখযোগ্য অবদান হল অহিংসার তত্ত্ব। অর্থাৎ, অহিংসা শুধু অসহযোগ বা অন্যান্য রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি ব্যবহারিক অস্ত্র নয়, অহিংসা একটি সর্বজনীন নৈতিক সত্য এবং সেটি হিন্দুধর্মের উপর আধারিত। সমস্যা এখানেই। চৌরিচৌরাতে আন্দোলনকারী ভারতীয়দের হাতে, কয়েকজন ব্রিটিশ পুলিশের মৃত্যু হলে গাঁধীজি আসমুদ্রহিমাচল ব্যাপী সেই আন্দোলন তুলে নেন, যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তিনি নিজে। তার মানে এখানে মূর্ত রাজনীতির ঊর্ধে স্থান পেল বিমূর্ত, সর্বজনীন নীতিশাস্ত্র। স্বাধীনতা আন্দোলনের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াল অহিংসার তত্ত্ব। এর পরিণামে ব্রিটিশ শাসকদের শক্তিবৃদ্ধি হয়। গাঁধীজি রাজনীতির মানুষ না হলে এটা তাঁর ব্যক্তিগত নীতি-সিদ্ধান্ত বলে মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু তিনি তো একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। অথচ পরবর্তী সময়ে 'ভারত ছাড়ো আন্দোলন' কি তাঁর এই অহিংসা তত্ত্বের সমাধির উপরেই সার্থকতা লাভ করেনি? তা হলে, রাজনীতির অঙ্গনে কোথায় রইল তাঁর অহিংস তত্ত্বের প্রয়োগ সার্থকতা? যারা বলেন, সহিংস যুদ্ধই ক্ষত্রিয়দের স্বধর্ম আর স্বধর্মে নিধনং শ্রেয় পরাধর্ম ভয়াবহ, তারা কী করে অহিংসার পরাকাষ্ঠা হতে পারে। এই স্ববিরোধিতা অনেক গাঁধী বিশেষজ্ঞকে ভাবায়। ভারতীয় সংস্কৃতিতে হিন্দুধর্মের সবচেয়ে বড় অবদান অহিংসার তত্ত্ব বাস্তব অনুশীলন থেকে গাঁধীজির এই ধারণার বিশেষ সমর্থন মেলে না। হিন্দু ধর্মে হিংসাটাই বাস্তব, অহিংসাটা ঈপ্সা। বাবাসাহেব আম্বেদকর অন্য এক দৃষ্টিকোণ থেকে শ্লেষের সুরে বলেছেন— বর্ণাশ্রমের ভিত্তিই হল হিংসা। অথচ গাঁধীজি বর্ণাশ্রমের সমর্থক। কারণ তাঁর ভয়, এর বিরোধিতা করলে রাজনীতিতে তিনি নিজের স্থান হারাবেন। কেননা তাঁর রাজনীতি ক্ষেত্রটি বর্ণাশ্রম ও জাতিভেদপন্থী হিন্দুতে ভর্তি। সত্য ও অহিংসার পুজারী হলেও সে হিংসাকে মেনে নিতে মহাত্মার অসুবিধে নেই। মহাত্মা বলেন, তাঁর অহিংসা-অস্ত্রের প্রয়োগেই তিনি উপনিবেশবাদীদের পরাজিত করবেন। অহিংসা অস্ত্রের শক্তিতে যদি তাঁর এতই আস্থা, তা হলে সবার আগে হিন্দু বর্ণাশ্রম প্রথার বিরুদ্ধে সে-অস্ত্র প্রয়োগ করছেন না কেন? আম্বেদকরের মতে, অহিংসা তত্ত্বের উপলব্ধিতে 'রাজনীতিবিদ’ গাঁধী আর ‘মহাত্মা’ গাঁধীর মধ্যে অনেক ফারাক। এ প্রসঙ্গে ১৯৩৬-এ মহাদেব দেশাইকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যটি মর্মভেদী, "ব্যাপক জনসাধারণের উপর মহাত্মাজীর যে প্রভাব তা সত্যিই বিপুল, তা সত্যিই আমাদের মধ্যে জাগরণ এনেছে। তবু আমি জানি না, আরও কত দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাঁর শিক্ষা আমাদের মাটির গভীর অন্ধকারে প্রোথিত বিষাক্ত শিকড়গুলির উপর ঠিকমতো কাজ করতে পারবে। অথচ আমরা জানি, অমঙ্গলের কন্টকাকীর্ণ পথে পথে ছড়িয়ে থাকা বিপর্যয় কখনো দিনক্ষণ মেনে আসেনা। কবে আমরা তার নিরাময় ঘটাতে পারব, সেই হিসেব করে তো বিপর্যয় আসে না। যে ওষুধ রোগ সারাতে অতিরিক্ত সময় নেয়, প্রায়শ সে-ওষুধ ধরবার আগেই রোগীর মৃত্যু হয়।’’ আবার রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত নাটক 'বিসর্জন'-এ ত্রিপুরার রাজপুরোহিত রঘুপতি হিংহার অনিবার্যতার স্বপক্ষে জোরালো যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর পালিত রাজপুত্র যুবক ও রাজমন্দিরের সেবক জয় সিংহের দ্বিধাজর্জর মন থেকে হিংসার সর্বময় বৈধতা সম্বন্ধে যাবতীয় সংশয় দূর করবার জন্য বলেছেন, ... কে বলিল হত্যাকাণ্ড পাপ। এ জগৎ মহা হত্যাশালা। জানো না কি।... হত্যা অরণ্যের মাঝে, হত্যা লোকালয়ে/ হত্যা বিহঙ্গের নীচে, কীটের গহ্বরে, / অগাধ সাগরজলে, নির্মল আকাশে। হত্যা জীবিকার তরে, / হত্যা খেলাচ্ছলে,/ হত্যা অকারণে, হত্যা অনিচ্ছার বশে/ চলেছে নিখিল বিশ্ব হত্যার তাড়নে...’’

 

নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন- লক্ষ্য ছিল সেই সমাজ গড়ে তোলা যেখানে হিংসার চর্চা হয় না। পৃথিবী জুড়ে সন্ত্রাসবাদের কথাই যদি বলি, তা হলে মানতে হবে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদীদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিবৃত করা গাঁধীবাদী রাজনীতির প্রাথমিক উদ্দেশ্য নয়। এই রাজনীতির ব্যাপ্তি অনেক ছড়ানো। তার মূল লক্ষ্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে, ব্যক্তিমানুষের বিশ্বাস ও অঙ্গীকারকে অন্তর্ভুক্ত করা। গান্ধীর এক মহৎবার্তা এই যে, যতক্ষণ না আমি নিজেকে বদলাচ্ছি ততক্ষণ হিংস্রতাকে পরাস্ত করা সম্ভব নয়। এই বার্তা এই ২০২২-এও সমানভাবে কার্যকরী।

সন্ত্রাসবাদবিরোধী পালটা হিংস্রতা পরিণামে আরও উগ্র সন্ত্রাস ডেকে আনে। রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন শেষবিচারে খুব বেশি সুফল দেয় না। কেননা, গাঁধীর শিক্ষা হল একজনের নৈতিক অবস্থানের অবক্ষয় তার হিংস্র প্রতিপক্ষের শক্তি অনেক বাড়িয়ে দেয়। তাই দেখি গাঁধী বহুবার একথা বলেছেন যে, সত্যের অনুসন্ধানে তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলি বাজি ধরতে প্রস্তুত। এমনকি, নিজের জীবনও। মোক্ষের সন্ধানে এই আত্মত্যাগের ব্রত একজন সত্যাগ্রহী হিসেবে গাঁধীকে এতখানি অপ্রতিরোধ্য করেছিল।

জীবন সায়াহ্নে গাঁধী ছিলেন একাকী, নিঃসঙ্গ। ১৯৪৭-এর মে মাসে তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন- আজ আমার কথা কে শুনছে? আমাকে অবসর নিয়ে হিমালয়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সবাই আমার ছবি আর মূর্তিতে মালা দিতেই আগ্রহী, আমার কথা শুনতে নয়। ২৬ সেপ্টেম্বরের প্রার্থনা সভায় তার আরও আক্ষেপ, নতুন ব্যবস্থায় তাঁর আর কোনও স্থান নেই। কেননা, দেশ চায় মেশিন, নৌবাহিনী, বিমানবহর, আরও কত কী। এসবের তিনি কেউ নন। ১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি প্রার্থনাসভায় যেতে গাঁধীজির দশ মিনিট দেরি হয়। এ জন্য তিনি মিনু আর আভাকে ভর্ৎসনা করে বলেন- “আই অ্যাম লেট বাই টেন মিনিটস। আই হেট বিইং লেট।” মৃত্যুর ক্ষণিক আগে যে-মানুষটি এমন কথা বলছেন, সেই মানুষটি সম্ভবত ভারতবর্ষের স্বরাজের জন্য অনেক দূর এগিয়ে ছিলেন।

....

লেখক: অধ্যক্ষ, রয়্যাল অ্যাকাডেমি, মেদিনীপুর।

Mailing List