বনবাসীরা কী পেয়েছে জঙ্গলের অধিকার? তার গুরুত্ব কতটা মেনে চলছে সরকার, স্বচক্ষে দেখলেন পরিবেশবিদ প্রভাত কুমার শীট

বনবাসীরা কী পেয়েছে জঙ্গলের অধিকার? তার গুরুত্ব কতটা মেনে চলছে সরকার, স্বচক্ষে দেখলেন পরিবেশবিদ প্রভাত কুমার শীট
17 Jul 2022, 01:15 PM

বনবাসীরা কী পেয়েছে জঙ্গলের অধিকার? তার গুরুত্ব কতটা মেনে চলছে সরকার, স্বচক্ষে দেখলেন পরিবেশবিদ প্রভাত কুমার শীট

 

 

প্রভাত কুমার শীট

 

দেখতে দেখতে তিন পুরুষ কেটে গেছে জঙ্গলের ভিটেতে। আজও দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে জঙ্গলে। জন্ম, বড় হওয়া, বিবাহ, সংসার সবই জঙ্গলে। কখনো জ্বালানী কাঠ সংগ্রহে,  ছাতু কুড়োতে অথবা গরু চরাতে হয় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই নীলমণি হাঁসদার। স্বামী শুকনো জ্বালানি কাঠ বেচে বাজার নিয়ে এলে তবেই রান্না চড়বে। সেই ছোটোবেলা থেকে মায়ের হাত ধরে জঙ্গলে যাওয়া,  জাম পেড়ে খাওয়া, মাঝে মধ্যে গরু চরানো। জঙ্গলের প্রতি ভালোবাসার বন্ধন আজও অটুট আছে।

প্রায় দুই শত পরিবার নিয়ে বসতি, জঙ্গল ঘেরা গ্রাম ভাদুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা। সকলের এরা  আদিবাসী সম্প্রদায়। শুধু নীলমণি নয় লক্ষ্মী মুর্মু, কল্পনা হেমরম, গৌরী মান্ডি এর মতো শত শত মেয়েদের কষ্টে দিন কাটে জঙ্গলমহলের জেলাগুলিতে। রান্নার গ্যাস তো দূরের কথা অনেকের বাড়িতে সুলভ শৌচালয় ও পরিশোধিত পানীয় জল টুকু পাচ্ছে না ঠিকমত। সকাল হলে মেয়েরা ছুটছেন জঙ্গলে কাঠ ও শুকনো পাতা জোগাড়ে। জঙ্গলমহলের ৮৪ শতাংশের বেশি পরিবারের হাঁড়ি চড়ে বনের শুকনো কাঠে। কেন্দ্রীয় সরকারের "প্রধানমন্ত্রী উজ্বালা যোজনায়" গ্যাস কানেকশন পেয়েছিল মাত্র ২২ শতাংশ আদিবাসী পরিবার।  তাঁরা অতি কষ্টে ৪৫০ - ৬০০ টাকা জোগাড় করে গ্যাস সিলিন্ডার সংযোগ নিয়ে ছিল। এখন ইচ্ছে থাকলেও নতুন গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি করার সুযোগও নেই। কারন ফড়েদের কাছ থাকে গ্যাসের বই। কে কখন গ্যাস সিলিন্ডার তুলছে বা ভর্তুকি টাকার হদিস রাখে না ওরা। যাঁরা কানেকশন নিয়ে ছিল একবারও ব্যবহার করেনি, এমন বহু পরিবার আছে।

যেমন - হাদি হেমরমেরও গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার রয়েছে তিন বছর ধরে। গ্যাসের ওভেন কোথায়, তার খোঁজ কেউ রাখে না। এরা কাঠের উনুনে চিরাচরিত রীতিতে রান্না করতে অভ্যস্ত ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এক দিকে গ্যাসের লাগামছাড়া ক্রমাগত দাম বৃদ্ধি, অপরদিকে জঙ্গলে পর্যাপ্ত কাঠের যোগান দূরে ঠেলে দিয়েছে গ্যাস সিলিন্ডার। যাঁরা শখ করে ছিল তাঁদের প্রায় ৯৫ শতাংশ আদিবাসী সম্প্রদায় উজ্বালা গ্যাস সিলিন্ডার পরিত্যাগ করেছে। ফলে বন নির্ভর জ্বালানী দিকে ঝোঁক বাড়ছে।

 

এই সব তথ্য এসেছে বিগত তিন বছর ধরে জঙ্গলমহলের ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ছয়টি ব্লকের ২৪৫ টি গ্রামে ৩৫১০ পরিবারের ওপর ক্ষেত্রসমীক্ষা থেকে। তাতে দেখা গিয়েছে একশো শতাংশ গ্রামীণ আদিবাসী পরিবার বনের কাঠের ওপর নির্ভরশীল। আদিবাসীরা বন সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ করায় প্রতি বছরে বেড়েছে জঙ্গল ও শুকনো কাঠ জ্বালানীর ব্যবহার।

 আইপিসিসি-র রিপোর্ট অনুযায়ী কাঠ পুড়িয়ে রান্না করলে কার্বন উৎপন্ন হবে। তা শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করবে, বায়ুমণ্ডল দূষণ ঘটাবে ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ফেলবে। কেন্দ্রীয় সরকারের হিসেব অনুসারে কাঠ পুড়িয়ে রান্না করার ফলে ৫৩৫ মিলিয়ন টন কার্বন উৎপন্ন হয়েছে ২০২০ সালে এবং ২০৩০ সালে তা গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৬২৭ মিলিয়ন টন কার্বন। গ্রীনহাউস গ্যাস কার্বন উৎপন্ন কমানোর লক্ষ্যে গাছ লাগানোর পাশাপাশি ২৪ কোটি গ্রামীণ পরিবারকে বিনামূল্যে এলপিজি (উজ্জ্বলা) গ্যাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল মোদী সরকার।  কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। ঘরে ঘরে গ্যাস তো দূরের কথা। যারা পেয়েছিল তারা দুই একবার ব্যবহার করে বেশির ভাগ গ্যাস সিলিন্ডার যত্ন করে তুলে রেখেছে অথবা সিলিন্ডার বিক্রি করে দিয়েছে।

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৯০ শতাংশ মহিলাদের জঙ্গল থেকে শুকনো জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে ব্যায় করে দিনের অনেটা সময়। তাছাড়াও বছরে তিন চার মাস হাতির আনাগোনা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রহ করতে হয় জ্বালানী। ফলে গ্রামীণ পরিবারগুলির বনাঞ্চলের কাঠ সংগ্রহ করতে ঝুঁকি বেড়েছে। যৌথ বন পরিচালন কমিটির (জেএফএমসি) সহায়তায় ক্ষয়প্রাপ্ত ভূমিতে ইউক্যালিপটাস, অ্যাকাসিয়া বা সোনাঝুরি মোনোকালচার প্লান্টেশন হওয়ায় সারা বছর পর্যাপ্ত জ্বালানির যোগান রয়েছে এই সব অঞ্চলে। কিন্তু মোনোকালচার প্ল্যানটেশন হওয়ায় বনজ উপজাত সম্পদ কিছুটা কমেছে - মহুল, হরিতকি, কেন্দু,  বন আলু,  কালমেঘ, বন কুন্দ্রি ইত্যাদি। যাইহোক, যারা সরাসরি জঙ্গল থেকে শুকনো কাঠ সংগ্রহ করে না তাঁদেরও এক হাজার টাকার জ্বালানী কাঠ কিনলে তিন থেকে চার মাস চলে। সংসারে আর্থিক অনটন তাছাড়া তিনবেলা ভাত রান্না করতে দুই-তিনটি গ্যাস লাগে মাসে। গরিব পরিবারে গ্যাস কিনে ব্যবহার করা, বিলাসিতা তা ছাড়া অন্য কিছু নয়।

ভারত সরকারের ২০০৬ সালে অরন্যের অধিকার আইন পুরোপুরি কার্যকর হয়েছিল। তাতে উল্লেখ ছিল চিরাচরিত ভাবে জঙ্গলে যাঁদের বাস তাঁদের স্বার্থ রক্ষা করা ও তাঁদের অনুমোদনক্রমে জঙ্গলে ব্যবহার করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক এনডিএ সরকারের তৈরি অরণ্যের অধিকার আইনকে লঘু করে শিল্পপতিদের সুযোগ করে দিচ্ছে মোদী সরকার। বেসরকারি সংস্থা গুলি বনবাসীদের অনুমোদন ছাড়াও জঙ্গল কাটা ছাড়পত্র দিচ্ছে। গত ২৮ জুন বন ও পরিবেশ মন্ত্রক নতুন নিয়ম বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। তাতে দাবি করা হচ্ছে, পরিকাঠামো তৈরি ও উন্নয়নের কাজে জঙ্গলের জমি কাজে লাগানো হবে। অথচ আদিবাসীরা সরকার নির্ধারিত নুন্যতম দাম পাচ্ছে বনজ সম্পদের। যেমন শাল বীজ সরকারী দাম প্রতি কিলোগ্রাম ২০ টাকা,  কিন্তু বনবাসীদের বাজারে বিক্রি করতে হয় ১০-১২ টাকায়।

শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলের জেলা নয়,  ওড়িশা,  ছত্রিশগড়, ঝাড়খণ্ড,  উত্তর প্রদেশের মত অনেক রাজ্যে এরকম দুর্দশা। অনেক সময় আদিবাসীরা বন পরিচালনা কমিটি থেকে বাদ পড়ছে। বন দফতর তাদের কর্তৃত্ব ছাড়তে রাজি নয়। তাদের যুক্তি, ওদের বন পরিচালনার ক্ষমতা নেই। তাঁরা সেই অধিকার পেলে বন ধ্বংস করবে। অথচ আদিবাসীরা পরিচালিত বন সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকায় বন ধ্বংস হওয়ার প্রবনতা কম। শুধু তাই নয়,মহিলা পরিচালিত পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার আড়াবাড়ি জঙ্গলে বনবাসীদের উন্নয়ন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মেয়েদের দিয়ে গাছ লাগানো, পরিচর্যা ও বন সুরক্ষা কমিটিতে কাজের সুযোগ দিলে যেমন আয় বাড়বে ঠিক তেমনই সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন ঘটবে। বনভূমি শুধু সংসারের জ্বালানি নয়, লক্ষ লক্ষ পরিবারের জীবন জীবিকা ও আয়ের প্রধান উৎস। এই বনভূমিকে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বর্তায় বনবাসীদের উপর। বর্তমানে বনের অধিকার আইন পরির্বতন করে আদিবাসীদের অরন্যের অধিকার কি কেড়ে নিতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার? এতে লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মহিলা, ভূমিহীন,  দলিত ও আদিবাসীরা বিপন্ন হবে। অথচ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মহিলা দ্রৌপদী মুর্মু কে উন্নয়নের মডেল হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী করেছে কেন্দ্রীয়  সরকার। দেশের সাংবিধানিক পদে আদিবাসী সম্প্রদায় প্রতিনিধিত্ব করলে বনবাসী মহিলাদের কষ্ট কি লাঘব হবে?  সেই আশায় বুক বেঁধেছে লক্ষ্মী,  গৌরী,  কল্পনার মত লক্ষ লক্ষ পরিবার।

.....

লেখক: রাজা নরেন্দ্র লাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয়, মেদিনীপুর, মেদিনীপুর জেলা।

Mailing List