সন্দীপ সাহু-র পাঁচটি কবিতা

সন্দীপ সাহু-র পাঁচটি কবিতা
28 Jun 2020, 11:45 AM

সন্দীপ সাহু-র পাঁচটি কবিতা

 

কবি-জীবন

হিসেবি মানুষ ঘর বানায় ইঞ্চি-ফুটের নক্সায়

পাঁচিল দেয়, সিংহদুয়ার বসায়, বড় তালা ঝোলায়,

সামন্ত সাম্রাজ্যের কড়াগণ্ডা বুঝে নিয়ে,

বংশ-প্রদীপের খোরাক সঞ্চিত করে, ঘুমায়!

 

কবিদের গুরুমস্তিষ্কে আকাশ সাগর খেলে।

খাল বিল ডোবার হিসাব তাতে থই পায় না।

প্রচণ্ড আলোড়নে কবিতা ধ্বংস বয়ে আনে

পাঁচিল ভাঙে, ছাদ ভাঙে, দেওয়াল ভাঙে!

 

ব্ম্ভাণ্ড দিয়ে বাড়ি বানায় মানুষের কসেরুকায় গেঁথে।

সেখানে জলতরঙ্গে বেহিসাব খেলে,

প্রাণ থেকে প্রাণে ঝরে চলে ঝর্ণা,

সাগর আকাশ ছুঁয়ে জীবন পাড়ি জমায়---

 

অন্য কোনো ব্রহ্মাণ্ডে হিসেব ভাঙার অদম্য নেশায়।

           …………………

 

মা-কোলে সুশান্ত

সুশান্ত রাজপুত, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা

হাজার ফেলের মধ্যে পাশ করা সেই ছেলে!

পাশ করা বললে ভুল হবে, ডবল প্রমোশন পাওয়া!

এই পাশ করা যে পাশ করা নয়,

বিমল প্রমান করেছিল, করল রাজপুতও!

আসলে পাশ যদি আকাশ-ছোঁয়া কল্প-সিঁড়ি হয়,

মাটি রক্ত-মাংস বন পাহাড় নদী ফুল পাখির

সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক থাকে না।

আকাশে তো এগুলোর কোনোটাই নেই।

আকাশের পর আবার আকাশ, আকাশ আকাশ

কল্প-সিঁড়ি যত উঁচু হয় আকাশ তত

সরে সরে যায় উপরের দিকে। মানুষ বড় অবুঝ।

বিমল বুঝেনি, রাজপুতও বুঝল না।

প্রাণের সঙ্গে যোগ না থাকলে বাঁচা যায়!

 

সাফল্য তো প্রাণ নয়, সুখ-যন্ত্রণার কারাগার!!

সুপ্রিমকোর্টের কঠোর নির্দেশে সেখানে ঢোকা নিষেধ

হাসি-কান্না কূজন বন্ধুকে জড়িয়ে ধরা...!

অনেক অনেক আলোকবর্ষ দূরে নির্জনে তারা-জ্বলা

অন্ধকার-জীবনে কতদিন থাকা যায়!

যাদের এই অন্ধকার সয়ে গেছে,

বা…

       ……………

 

মহাকালের অপেক্ষা

 

 

কবিতা-কুটির। সামনে সমুদ্র।

মাথার ওপরও সমুদ্র।

চারপাশ সুন্দরী গরান হেঁতাল...

পা-তলায় মা মাটি, ধারণ করে আছেন।

এ অনেক দিন আগের কথা।

 

আজ আর এসব কিছুই নেই প্রায়।

কবিতা-কুটির নেই। রাজপ্রাসাদ এখন।

স্বার্থপর দৈত্য থাকে সেখানে।

হৃদয়ের পরাগরেণু প্লাস্টিকে তৈরী!

মহার্ঘ প্যারিস-ফুলদানিতে সাজানো।

 

সুপানপাত্রে রাখা স্বপ্ন-রঙ।

পাঞ্জাবিতে শান্তিনিকেতন, কাঁধেও।

ভাগ্যিস রবিঠাকুর গড়েছিলেন!

রাজপ্রাসাদ বানানো শেখা খুব সহজ

পরিপাটি চুল, গাম্ভীর্য ও চালচলনে।

 

রাখাল ছেলে সাম্যেরগান ছাড়পত্র

আরো কত পর্ণকুটির আশ্রম,

গড়তে লেগে গিয়েছে সারাজীবনের রক্ত ঘাম।

এ কবিতা-কুটির কে গড়বে মূর্খদের মতো!

এখন আমরা সবাই রাজা রাজপ্রাসাদে!

 

তবু কেন যেন মনে হয়

সমস্ত জ্যোৎস্না ফুল পাখি শিশু

ঘিরে থাকে কবিতা-কুটিরকে।

সূর্য-আলো প্রথম আসে নিকানো উঠোনে।

পরাগরেণুতে পরাগরেণুতে ঘটে মিলন।

 

মহাকাল যেন জন্মের জন্য অপেক্ষা করে থাকে!

    ……………………

 

দুরন্ত এক সময় এখন

দুরন্ত এক সময় এখন

চিল শকুন বাজপাখিও

চরুই শালিখ টুনটুনির

সঙ্গে সন্ধি করতে চাইছে।

 

কাঁটাতার উপড়ে নিয়েছে কেউ

গোটা পৃথিবীটা আজ একাকার লাশে!

ছোট্ট হৃদপ্রকোষ্টে ভয়, ভয়ে ভয়ে ঝরছে

ঝরেই চলেছে জীবন-চিহ্ণ বহন করে!

 

তফাৎ যাও তফাৎ যাও

মনটাকে ধোও আগাপাশতলা

কনুই পর্যন্ত হাতটাকে বারবার ধুয়ে।

চোখ মুখ বন্ধ করেই তার পদধ্বনি শোনো।

 

তুমি যত বড় কেউকেটা হও নাকো

আদপে শালিখ টুনটুনি চরুই মাত্র!

হৃদপ্রকোষ্টের ভয়ে তা বাজছে করুণ সুরে!

মন ধোয়া হলে মানুষ হবে।

 

সেটাই একমাত্র জয়ের পথ!বাঁচারও!!

………………………..

 

আমাদের বাস অমরাবতীতে

 

যে বর্ণময় চিত্ররূপে লেগে থাকে দূতিয়ালমেঘ,

সেই বর্ণময় চিত্ররূপ এখনো

জীবন্ত হয়ে ভাসাতে চায় দিগন্তে।

যেখানে গোলাপ মেলে ধরে নিজেকে

আকাশ নুয়ে এসে চুম্বন রাখে!

 

গান্ধর্ববিবাহের মন্ত্র উচ্চারণ করে

মাটি বাতাস নদী পাহাড় গাছ পাখি আর বর্ষা।

আষাঢ়স্য প্রথম দিবসেই!

সেই বর্ণময় চিত্ররূপে আমার তোমার

ছবি আঁকা হয়েগেছে

 অনন্তকালের ক্যানভাসে।

 

আমাদের বাস এখন অমরাবতীতে।,,

 

লেখক পরিচিতি: জন্ম ৫|৬|৭১। তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর। পেশায় শিক্ষক। পত্রিকা সম্পাদনার কাজেও যুক্ত। কবিতা ছাড়া প্রবন্ধ ও গল্প লেখেন। তিনখানি কাব্যগ্রন্থও প্রকাশের অপেক্ষায়।

Mailing List