মোনালিসা পাহাড়ীর পাঁচটি কবিতা

05 Jul 2020, 10:52 AM

মোনালিসা পাহাড়ীর পাঁচটি কবিতা

তুচ্ছ জীবনের ধারা

 

ইদানিং দুপুর রোদে ঘুম আসে না

ঠায় বসে থাকি বালিশে হেলান দিয়ে

জানালায় আটকে দুচোখ

ওপারে একটা জঙ্গল, রকমারী পাখিদের আনাগোনা

সাজানো ঘরকন্না, ছবির মতো।

দেখে দেখে বড় বেশি পাখি হতে ইচ্ছে করে

জীবনটাকে স্বাধীন ভাবে উপভোগ করতে...

 

এতকাল ভাতঘুমের জন্য হা-হুতাশ করতাম

পলক ফেলার অবকাশ ছিল না,

আজ অফুরন্ত সময় জীবনের হাতে

বিশ্বাসঘাতক চোখের পাতা ঘুমকে ঠাঁই দিতে চায়না

 

এ জীবন ক্ষুদ্র পাখিদের থেকেও তুচ্ছ

তুচ্ছাতিতুচ্ছ কেন্নো কেঁচোর উপভোগ্য যাপনের কাছে।

      ....................

 

 

শহীদের নিশ্বাস বুকে মেখে

 

তোমার জন্য এক আকাশ ভালোবাসা

লিখে রেখেছি মেঘ পিওনের খামে

কফিনের শান্ত শহরে বড় বেশি শান্তির ঘুম তোমার

মায়ের আঁচলের গন্ধ মেখে নিশ্চিন্ত আরাম

 

পাঞ্জাবের কিশোরী মেয়েটি মনমরা

খেলা ফেলে অশ্রু নাড়াচাড়া করে

উড়িষ্যার দুর্গম পাহাড়ের নিশ্ছিদ্র জঙ্গলে পশুচারণরত বৃদ্ধ মুসলমান আজানে দোয়া চেয়েছেন তোমার জন্য

মাদুরাইয়ের ফ্ল‍্যাটে বসে তোমার শেষকৃত্য দেখতে দেখতে গলা ভার হয়ে আসে খ্রীষ্টান কর্পোরেট এমপ্লয়ির

সন্ধ‍্যাদীপের ধোঁয়ায় দীর্ঘশ্বাস ভাসিয়ে দিচ্ছেন মায়েরা

 

গ্রাম জেলা রাজ‍্য ছাড়িয়ে, ধর্ম বর্ণের বেড়া ডিঙিয়ে দেশটা শুধুই তোমার

জলপাই রংয়ের আদরে আবেশে ভরাডুবি... প্লাবন

হিসেবের বাইরে গিয়ে জ্বলন্ত অভিমানে রাঙা

বুকের বাতাস ভারী করে পাঁজরের দেওয়ালে মুখ ঢাকো।

         ...................

 

শিক্ষারা ছড়িয়ে আনাচে কানাচে

 

প্রিয় কবির প্রোফাইলে দেখলাম

সানন্দে কাক পোষার রোজনামচা।

হতবাক আমি!!এভাবে তো কখনো ভাবিনি।

কাক কর্কশ স্বরে বিপদ বয়ে আনে

প্রিয়জনের মৃত্যুর আভাস পৌঁছে দেয় দরজায় এ আমার অন্ধ বিশ্বাস

সযত্নে এড়িয়ে চলি কাকেদের ছায়াও

 

খোলা চোখ খুলে গেলে জীবনের নতুন সঙ্গা দেওয়া যায়...

 

ছোট্ট মেয়ের হাতে বাসি রুটি

কাকেদের উল্লাস, শুকনো খাবারে।

ওর দুচোখে উপচানো খুশি, হাততালি

 

তিন কাল গিয়ে এককালে ঠেকলো

এখনো কতকিছুই শেখার বাকি...

 .............

 

আমার বাবা প্রথামাফিক বাবা নন

 

না, আমার বাবা প্রথামাফিক বাবা নন

সাংসারিক দায়িত্ব কর্তব্যের বিমুখ ছিলেন তিনি

কাজে অনীহা, আলস‍্য প্রিয়, অত্যন্ত সহজ সরল ভালোমানুষ বাবা

ভালোবাসার অন‍্যরকম সঙ্গা জানতেন।

আমাদের সামান্য সর্দি কাশিতে যিনি রীতিমতো বিচলিত

নিরন্ন রাত্রির দিনগুলোতে তিনি ততটাই উদাসীন।

মা'কে চোখে হারানো বাবা সারাজীবনের সমস্ত অক্ষমতার দায় সযত্নে মায়ের ঘাড়ে তুলে দিয়েছেন।

জরাজীর্ণ সংসার ফুটিফাটা হয়েছে

সম্পর্কের আঁটোসাঁটো বাঁধুনি গিঁট খুলতে খুলতে আলগা

অশান্তির বেনোজলে ভেসে গেছে গার্হস্থ্য যাপন

তাসের আড্ডায় বসে বাবা কষ্টে বুক ভেঙেছেন

বাড়ি ফিরে দেখিয়েছেন রক্তচক্ষু

শতচ্ছিন্ন সংসারের মাথায় বসে বালখিল্য করেছেন আমার বাবা,আমাদের পৃথিবী

 

সমস্ত না পাওয়ার পরেও ভালোবাসায় অন্ধ আমরা

বাৎসল‍্য স্নেহে অন্ধ বাবাও।

.................

 

মধু মুর্মুর বৌ এবং দুখিনী ভারতবর্ষ

 

ওঁরাও পাড়ার মধু মুর্মুর বৌ সোমবারি

মারীর খোঁজ রাখেনি

তিন কাঠা জমিনের ফসল নষ্ট হয়েছে অকাল বর্ষায়

ভাঙা উঠোনে রোদ জলের বিচিত্র খেলা।

কোলের ছেলে মেয়েরা মায়ের মুখের দিকে তাকায় গভীর প্রত‍্যয়ে-

বাবা ফেরেনি বাড়ি দূর দেশ থেকে

নিরক্ষর সোমবারি জানে জীবনের থেকে বড় সত‍্যি কিছু নেই

ভাতের থেকে নেই বড় কোনো ঈশ্বর

সন্তানের মুখের হাসির কাছে জাগতিক সবকিছু বড় বেশি ফিকে

 

অজস্র ক্ষত বুকে নিয়ে দুখিনী ভারতবর্ষ লড়াই করে

মায়ের বুকে জীবন সংগ্রামে লিপ্ত অজস্র সোমবারি

মা দুগ্গার মতো অন্ধকারে ছেনে আলোর টুকরো খুঁজে ফেরে...

Mailing List