উৎসব যখন বিজ্ঞান: কৃষি বিজ্ঞান ও ইতু পুজো

উৎসব যখন বিজ্ঞান: কৃষি বিজ্ঞান ও ইতু পুজো
23 Nov 2021, 11:00 AM

উৎসব যখন বিজ্ঞান: কৃষি বিজ্ঞান ও ইতু পুজো

সুকান্ত পাল

 

অগ্রহায়ণ মাস চলছে। গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে সারা মাস জুড়ে ইতু পুজো।

 

"এল ফুল, বেল ফুল তুলতে গেলাম

সেথায় ইতুর তিনটি কথা শুনে এলাম

সেই শুনলে কি হয়?

বাঁজা জমি সোনা হয়, নির্ধনের ধন হয়

অপুত্রের পুত্র হয়,,,,,,,,,,,,,"

 

একটি সুন্দর মাটির খোলাতে মাটি ভরে তার মধ্যে মান, কচু, কলমীলতা, হলুদ, আখ, শুষনি, সর্ষে, মটর, তিল ছোলা, খেসারি  ফুলের মালা, ধূপ-দ্বীপ-সিঁদুর প্রভৃতি পুজোর উপকরণ ও ফল-মিষ্টান্ন ও নবান্ন সহযোগে ইতু পূজা করা হয়।

 

ইতুর এক নাম মিত্র। অগ্রহায়ণ মাসে সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে অবস্থান করে এবং এই অবস্থানে সূর্যের নাম মিত্র। প্রধানতঃ রবিবার পুজো করা হয় বলে সূর্যের পুজো বলা হয়।

 

ইতুকে লক্ষ্মী নামে অভিহিত করা হয়৷ বলা হয় ইতু লক্ষ্মী৷ আসলে সূর্য্যের অকৃপণ দাক্ষিণ্যে, ধান ও সমৃদ্ধি রূপিনী দেবী লক্ষ্মীর আরাধনাই ইতু পুজো৷

ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে সূর্যের আদিত্য নাম থেকে ইতু কথাটির উদ্ভব৷ কারুর কারুর মতে, মিত্র^ মিতু^ইতু এইভাবে কথাটি এসেছে।

 

প্রাচীন কৃষি ব্যবস্থা ও ইতুপুজো:  সাধারণতঃ রবিশস্যের অঙ্কুরোদগম পরীক্ষারই ধর্মীয় মোড়ক ইতু পুজো। প্রাচীন কৃষি ব্যবস্থায় শস্য বীজ সংরক্ষণে কোনো যাথোপযুক্ত ব্যবস্থা ছিল না, সেই জন্যেই অঙ্কুরোদগমের নির্দিষ্ট শতকরা হিসেব পাওয়া যেত না। এই সমস্যার হাত থেকে বাঁচার জন্য একটি পাত্রে জমির মাটির ওপর বীজ ছড়িয়ে অঙ্কুরোদগম-এর শতকরা হিসেব মেপে নেওয়া হত।

 

জায়গা ভেদে রবিশস্যের বীজগুলি কোথাও নয়টি, কোথাও এগারোটি আবার কোথাও তেরোটি করে দেবার বিধান আছে। এর মধ্যে কতগুলি বীজের অঙ্কুরোদগম হলো সেই হিসেবে মাঠে বীজের পরিমান (seed rate) ঠিক করা যেত। অঙ্কুরোদগম-এর উপযুক্ত আদ্রতা (optimum moisture condition) রাখার জন্য সরার মাঝখানে একটি ছোট জল ভর্তি মাটির ঘট রাখা হয়। এই মাটির ঘটের গা থেকে চুঁইয়ে আসা জলই পাত্রের মাটির উপযুক্ত আদ্রতা বজায় রাখে।

 

শীতকালীন চাষের আগে রবিশস্যের বীজের অঙ্কুরোদগম-এর তথ্য সংগ্রহই ছিল ব্রতপালনের উৎস। বিবাহিত ও অবিবাহিত‚ সব মেয়েই এই ব্রত পালন করতে পারে। একবার ব্রত শুরু করলে পালন করতে হয় আজীবন। যতদিন না ব্রতপালনের ভার মেয়ে বা পুত্রবধূ নিচ্ছে‚ ততদিন ব্রতধারীকে পালন করতেই হবে ইতুপুজো। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মাটির ছোট ঘটকে লাল সাদা রঙে সাজানো হয়। তাতে দেওয়া হয় গোবর মেশানো মাটি। সেখানে বীজ বপন করা হয়। চারাগাছ অঙ্কুরিত হলে ধরে নেওয়া হয় তা সংসারের সুখ সমৃদ্ধির প্রতীক।

 

 অর্থাৎ জমিতে শস্যের বীজের যথোপযুক্ত অঙ্কুরোদগম হলে মাঠের ফসল ভালো হবে এবং কৃষকের সমৃদ্ধি হবে।

 

 এইভাবেই ধর্ম ও কৃষিবিজ্ঞান অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে যায় বাংলার ব্রত কথায় আর প্রেক্ষাপটে কোথায় যেন ভেসে ওঠে বাঙালির সেই আকুল আকুতি " আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে"।

ads

Mailing List