শিক্ষার আলো দেখলেও চাকরির দেখা মিলছে না শবরদের, বাড়ছে দুশ্চিন্তা

শিক্ষার আলো দেখলেও চাকরির দেখা মিলছে না শবরদের, বাড়ছে দুশ্চিন্তা
30 Jul 2022, 07:28 PM

শিক্ষার আলো দেখলেও চাকরির দেখা মিলছে না শবরদের, বাড়ছে দুশ্চিন্তা

                                                                  

আনফোল্ড বাংলা প্রতিবেদন: রাজ্যের শবর সম্প্রদায়ের মধ্যে সদ্য এমএ পাশ করেছেন রমণীতা শবর। সংবর্ধনাও পেয়েছেন অনেক। কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত এখান থেকেই। এতদিন তো স্নাতকোত্তর পড়ার লক্ষে নির্দিষ্ট স্রোতে এগোচ্ছিলেন তিনি। এখন বিএড পড়ার পরিকল্পনা আছে। কিন্তু চাকরি কোথায়? সেই চিন্তাই ভাবিয়ে তুলেছে তাঁকে।                       

এই চিন্তা শুধু রমণীতার নয়। গোটা শবর সম্প্রদায়ের। তফসিলি উপজাতিদের মধ্যে সংখ্যায় খুবই কম রয়েছেন এই সম্প্রদায়। কিন্তু এখন ক্রমশ ধীরে ধীরে শিক্ষার আলো দেখছেন এই সম্প্রদায়ের মানুষ। রমণীতার ছোট বোন একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। মেজো বোন মাধ্যমিক পাশ করেছেন। একই এলাকায় থাকেন শকুন্তলা শবর। তিনি স্নাতক হয়েছেন গত বছর। তাঁর মেজো বোন বসুমতী ইংরেজিতে সান্মনিক স্নাতক স্তরে তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করেন। আর এক বোন এবার মাধ্যমিক দেবে। ভাই শুভংকর এবার উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন। সমাজ ও অর্থনৈতিক এতো বাধা পেরিয়ে তাঁরা লেখাপড়ায় এতদূর পৌঁছালেও বিশেষ কোনও সরকারি সুবিধা পাননি। এঁদের সবারই আশঙ্কা চাকরি না পেলে শেষ পর্যন্ত কী হবে?                          

রমণীতা বলেন, 'আমি তো আর মা বাবার মত দিনমজুরের কাজ করতে পারবো না। যদি স্কুলে চাকরি না পাই তাহলে আর বিএড করে কী করব? এমনিতেই বাড়ি থেকে অনেক কষ্টে এতদূর পড়িয়েছে। তার উপর বোনদের পড়াতে হচ্ছে। '                                    

শকুন্তলা শবর স্নাতক হলেও চাকরি না পেয়ে ঘরে বসিয়ে রাখার বিলাসিতা করতে পারেনি তাঁর পরিবার। তাই তাঁকে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। শবর সম্প্রদায়ের মধ্যে ২০০৬ সালে প্রথম মাধ্যমিক পাশ করেন পুরুলিয়ার সবিত্রী শবর। তিনিও আর্থিক দুর্দশায় আর পড়তে পারেননি। তারও বিয়ে হয়ে গিয়াছে বাঁকুড়ায়।                   ২০০৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে বিএ ক্লাসে ভর্তি হয়েও আর পড়তে পারেননি পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের শ্যামলী শবর। তাঁর পরিবারের মা বাবা বাদে পরবর্তী প্রজন্মের সবাই মাধ্যমিক পাশ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, রাজ্যের পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর এই চার জেলায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার শবর আছেন। এঁরা খেরিয়া শবর। দুবেলা খাবারের কোনও নিশ্চয়তা নেই। রেশন কার্ড, আধার কার্ডের ব্যবস্থা হচ্ছে অল্প কয়েক বছর হল। দুয়ারে সরকারের দৌলতে কিছু কিছু সুবিধা পেতে আরম্ভ করেছে গ্রাম। তার আগে পর্যন্ত কোনও সরকারি সুবিধাও জুটত না। পুরুলিয়ায় প্রত্যন্ত গ্রাম ফুলঝোর।  বড়াবাজার থানা এলাকার এই গ্রামে প্রায় ১৪০ ঘর শবর পরিবারের বাস। না আছে এঁদের জমি, জায়গা না পান সরকারি চাকরি। একশো দিনের কাজ আর সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দুয়ারে সরকারের দৌলতে পেতে শুরু করেছেন। রমণীতা জানান, বাম আমলে নাগরিক হিসাবে সামান্য পরিচয়টুকুও জোটেনি তাঁদের। চাকরির কথা ভাবার তো কোনও উপায়ই ছিল না। এখানকার বাসিন্দা অরূপ মুখোপাধ্যায় শবর ছেলে, মেয়েদের  শিক্ষার আলো দেখাতে উদ্যোগ নিয়েছেন। বহু বছর ধরে তিনি নিজস্ব টাকা খরচ করে এই জনসেবার কাজ করছেন। পেশায় কলকাতা ট্র্যাফিক পুলিশের কর্মী হলেও শবরদের নিয়েই তাঁর সংসার। তাই পুরুলিয়ায় তিনি শবর পিতা বলে পরিচিত। তিনি জানান, ছেলে মেয়েরা যদি চাকরিই না পায় তাহলে লেখাপড়ায় তাদের টেনে আনবো কী করে ?                              

পুরুলিয়ার বান্দোয়ান বিধানসভা এলাকায় তফসিলি উপজাতির ৫৬ শতাংশ ভোটের মধ্যে শবর ভোট আছে মাত্র দুই শতাংশ। বান্দোয়ানের বিধায়ক রাজীব লোচন সোরেন বলেন, 'উপজাতি পরামর্শদাতা কমিটিতে আমি শবরদের চাকরির প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু তফসিলি উপজাতির মধ্যে রাজ্যে ৩৮ টি সম্প্রদায় আছে। তাঁদের মধ্যে শবর, টোটোরা লুপ্ত প্রায়। কিন্তু আলাদা করে প্রত্যেকের জন্য কিছু করা সম্ভব নয়। তাও বিষয়টি দেখবো। তবে, সরকারি যা সুবিধা আছে সেগুলি প্রত্যেকের কাছে স্থানীয় প্রশাসনের তরফে পৌঁছে দিচ্ছি। যাঁরা পড়াশোনা করছেন তাঁদেরও নানা সাহায্য প্রশাসন থেকে দিচ্ছে।' কিন্তু এই সাহায্যের থেকে সরকারি চাকরি অনেক বেশি প্রত্যাশিত সম্প্রদায়ের কাছে। তাই কিছুদিন আগে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও সেই দাবি জানিয়েছিলেন লোধা-শবরদের আর এক নেতা বলাই নায়েকও।

Mailing List