বিপন্ন হোয়াইট স্টর্কও, ইউক্রেনকে মন্দ থেকে বাঁচাবে কে?

বিপন্ন হোয়াইট স্টর্কও, ইউক্রেনকে মন্দ থেকে বাঁচাবে কে?
24 Jun 2022, 02:00 PM

বিপন্ন হোয়াইট স্টর্কও, ইউক্রেনকে মন্দ থেকে বাঁচাবে কে?

 

সুমন ঘোষ

 

আবারও কী গান শুনিয়ে ইউক্রেনের বুকে বসন্ত আনবে হোয়াইট স্টর্ক? যদি আনেও তাহলে কতদিন পর সেই সুর প্রাণে বাজবে ইউক্রেন-বাসীর?

 

এ প্রশ্নের উত্তর দেবে কে? এটা যে এখনও সবার অজানা। যুদ্ধ এখনও চলছে। কবে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে তা বলতে পারছেন না বিশ্বের তাবড় রাষ্ট্রনেতারাও। এই সময় কে আর হোয়াইট স্টর্কের কথা ভাববে?

 

হোয়াইট স্টর্ক ইউক্রেনের জাতীয় পাখি। শুধু জাতীয় পাখি কেন? পাখিই আবার ইউক্রেনের জাতীয় প্রাণীও (অ্যানিমাল)। সেটি হল নাইটিঙ্গল।

হোয়াইট স্টর্ক হল ইউক্রেনবাসীর কাছে অত্যন্ত পবিত্র। শিশুদের মতোই। দেবদূতও বলা যায়। যা শান্তির প্রতীক। এমনকী, ইউক্রেনবাসীর বিশ্বাস, এই পাখি অর্থাৎ শান্তির দূত সব সময় যে কোনও খারাপ বা মন্দ থেকে ইউক্রেনবাসীকে রক্ষা করে।

নাইটিঙ্গলও অনেকটা সে রকম। ইউক্রেনীয় লোককাহিনী অনুযায়ী, বসন্তের আশ্রয়দাতা। যার মিষ্টি সুর চারদিকে শান্তি ছড়িয়ে দেয়।

আজ ইউক্রেনের বাতাসে কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, ফরমালডিহাইড, হাইড্রোজেন সালফেটের বাষ্প। সৌজন্যে রাশিয়ার হামলা। হুস হুস করে কখন যে ক্ষেপনাস্ত্র ছুটে আসছে, কোথায় কত বোমা পড়ছে, তার সঠিক খবর কে রাখে। ঠিক এমন সময় বসন্তের এই শান্তির দূতরা কোথায়? তারা কী আদৌ বেঁচে? নাকি বোমার আঘাতে ঝলসে গিয়েছে। বাসা পাল্টাতে পাল্টাতে ক্লান্ত হয়ে বিশ্রামের নিদ্রার সময় রাশিয়ান ফৌজের হাতে ধরা পড়ে খাবারের প্লেটেও চলে যেতে পারে। কে বলতে পারে ঠিক কী ঘটছে?

 

কারণ, যাঁরা বাইনোকুলার হাতে ঘুরে বেড়াতেন তাঁরাও যে সবাই বেঁচে রয়েছেন, এমনও তো হলফ করে বলা যায় না। আর বার্ড ওয়াচার না থাকলে পাখির খবর রাখবে কে? বছর ঊনপঞ্চাশের বার্ড ওয়াচার রাচকো অবশ্য জীবিত। কিন্তু তাঁর চোখের বাইনোকুলার এখন পাখি দেখার কাজ করতে ভয় পায়। বাইনোকুলার দিয়ে দেখেন রাশিয়ান সৈন্য আক্রমণ করতে আসছে কিনা? উদ্বাস্তুদের সেবা সুশ্রুষা করতে দিন রাত এক করছেন তিনি। মানুষও যে হাহাকার করছে।

শুধু এই দু’টি পাখিই নয়। আরও অনেক পাখি ছিল ইউক্রেনের আকাশে। ছিল বলছি, কারণ, এখন ক’টা আছে, আদৌ আছে কিনা কে বলতে পারে? হোয়াইট টেলড ঈগল, রেড-ব্রেস্টেড মার্গান্সার, ব্ল্যাক উইং স্টিল্ট- এদের খবরই বা কে রেখেছে?

তবে এটা ঠিক যে হোয়াইট স্টর্কের আর তেমন দেখা মিলছে না। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে এমনটাই। কিন্তু কেন হোয়াইট স্টর্ক দিয়েই দুশ্চিন্তাকে সামনে আনা হচ্ছে? এই প্রশ্নটা উঠতেই পারে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, দুর্ভিক্ষের সময়ও নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল এই পবিত্র দেবদূত। কিন্তু যুদ্ধে যদি শেষ হয়? তাহলে কে বলতে পারে ইউক্রেনে আবার কে বসন্ত আনবে? মন্দ থেকে ইউক্রেনবাসীকে কে বা বাঁচাবে।

 

আমরা মানুষ মরার খবর তো রাখিই। কিন্তু পশু-পাখির মৃত্যু সংবাদ? ইউক্রেন যুদ্ধে শুধু মানুষেরই কী মৃত্যু হয়েছে? বিপদে নেই কী প্রাণীকূলও। কৃষ্ণ সাগরের উত্তরভাগ, ব্ল্যাক সী বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ, ইউক্রেনের যে জীববৈচিত্র্যের আধার।

প্রথমেই ধরা যাক ইউক্রেনের বিখ্যাত মুজ হরিণের (Moose Deer) কথা। বিশালাকার হরিণ ওজনে পাঁচশো কেজি পর্যন্ত হতে পারে। তার স্বতন্ত্রতা কিন্তু অন্য জায়গায়। ভয়ঙ্কর চওড়া শিং এর জন্য। লাগাতর রাশিয়ার হামলায় ক’জনই বা বাসা পাল্টাতে পেরেছে কে জানে? এপ্রিল-মে মাস জুড়ে আবার তাদের প্রজননের সময় ছিল। সেটাও কী তারা করতে পেরেছে? কারণ, যুদ্ধের বয়স তো চার মাস পেরিয়ে গেল? হয়তো যুদ্ধ একদিন শেষ হবে। কিন্তু মুজ হরিণের দেখা মিলবে তো? যে ক’টা বোমার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে বেঁচে পালাবে তারাও আবার লড়াইয়ের ক্ষেত্রে সৈন্যদের পেটে চলে যাবে না তো? এই পশু খাদ্যও যে উপাদেয়। বিরল স্যান্ডি ব্লাইন্ড মোল (ছুঁচো) কী মাটির গর্ভে লুকিয়ে বাঁচাতে পেরেছে নিজেদের।

কৃষ্ণ সাগরের রয়েছে বটল নোজ ডলফিন। অসংখ্য কম্বোজ শামুক-ঝিনুক। কয়েক প্রজাতির মাছ। চেরনোবিল পরমাণু স্থলে তেজস্ক্রিয়তা বাড়ার সঙ্গেই কমতে শুরু করেছে প্রাণবৈচিত্র্যও। তাদের আর দোষ কোথায়? কী করে শ্বাস নেবে লাল শেয়াল, রেকুন কুকুর আর খাড়া কানের লিঙ্কস। আম্লিক হয়ে উঠেছে মাটি জলাভূমি। পুড়ে ছাই হয়েছে বহু বন-জঙ্গল। প্রাণীকূল কিভাবে নিজেদের বাঁচাবে?

বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, মানুষের তৈরি যে কোনও যুদ্ধ পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যে ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলে। মানুষের অহঙ্কার, হিংসার মূল্য চোকাতে হয় প্রাণীকূলকে। ইউক্রেনও তা ব্যতিক্রম হবে? কে বলতে পারে, হয়তো একদিন মুছে যাবে হোয়াইট স্টর্কের লোককথা। তখন হয়তো যুদ্ধের মাসুল দিতে গিয়ে নতুন লোককথা জন্ম নেবে।

............

Mailing List