একটি পরিযায়ী শ্রমিকের আখ্যান

একটি পরিযায়ী শ্রমিকের আখ্যান
13 Sep 2020, 01:17 PM

একটি পরিযায়ী শ্রমিকের আখ্যান

গৌতম সরকার

বুক ভর্তি টেনশন নিয়ে ওরা অপেক্ষা করছিল। ফোনটা এলো রাত ঠিক সাড়ে ন’টায়। অন্যদিন এতক্ষণ রাতের খাওয়া মিটে যায়। সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর চেষ্টা করে রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে। কিন্তু আজ ওদের কারও চোখে ঘুম নেই। এই বিদেশ বিভুঁইয়ে পড়ে আছে আজ প্রায় ছয় মাস। প্রত্যেকের পরিবার কোন দূর দেশে তাদের প্রতীক্ষায় দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু সব কিছু কেমন ওলটপালট হয়ে গেল। ফোনটা পাওয়ার পর মানিক, পিতাম্বর, হায়দর আর রুস্তমজির মুখে কোনও কথা এল না। ঠিকাদার সাহেব শর্মাজির ফোনে এটা স্পষ্ট হয়ে গেল, কাল থেকে ‘নো ওয়ার্ক নো পে’।

দিল্লীর জনকপুরী এলাকার এক বস্তিতে ঘর ভাড়া নিয়ে ওরা রাস্তা সারাইয়ের কাজ করে। ঠিকাদারের অধীনে দিন মজুরীর কাজ। নিজের নিজের দেশ ছেড়ে গত বছর পুজোর পর এসেছিল, প্রায় ছ’মাস হতে চলল। রাস্তা তৈরির কাজে মানিক একজন অভিজ্ঞ কারিগর। পিছনে আছে প্রায় পনেরো বছরের অভিজ্ঞতা। এর আগে ভারতবর্ষের বহু জায়গায় গিয়ে রাস্তার কাজ করেছে। কাজের সূত্রে একবার হিমাচলপ্রদেশ আর শেষবার গিয়েছিল ২০১৪ সালে হড়কা বানে ভেঙে যাওয়া কেদারনাথের রাস্তা সারাতে। কেদারের রাস্তা সারানোর সুযোগকে মানিক মহাদেবের করুণা আর বাবা-মায়ের আশীর্বাদ বলেই মনে করে। আরেকবার গিয়েছিল হিমাচলের ছিটকুলে। পৃথিবী যে এত সুন্দর হতে পারে সে কোনওদিন ভাবতেই পারেনি। সেই কাজ জুটিয়ে দেওয়ার জন্যে সে চ্যাটার্জি সাহেবের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। এই মানুষটি তারপর যখন যখন ডেকেছে শত অসুবিধা সত্বেও মানিক কাজে যোগ দিয়েছে। তবে এবারে দিল্লি আসা নিয়ে প্রতিমার সাথে খুব মন কষাকষি হয়ে গেছে। আসলে মানিক ভেবেছিল এবছরে কোথাও বেরোবে না। গত কয়েকমাস ধরে মেয়েটা খুব ভুগছে। কেমন যেন ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে যাচ্ছে। ডাক্তার দেখিয়েছে, ওষুধও চলছে। কিন্তু রোগের ঠিক নিরাময় হচ্ছে না। প্রতিমা অনেকদিন থেকে বলে আসছে –মেয়েটাকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে বড় ডাক্তার দেখাতে। সেটা আর হয়ে ওঠেনি। তারপরই মুখার্জী সাহেবের ডাক এল। যখন রাস্তার কাজ থাকে না তখন নিজের এক চিলতে জমিতে টুকটাক চাষ করে আর একটু আধটু লোকের ফাইফরমাস খেটে দুবেলা দুমুঠো জুটে যায়। প্রতিমা চেয়েছিল এবছর ঘরে থেকে মেয়েটার চিকিৎসাটা ঠিকঠাক করতে। কিন্তু চ্যাটার্জী সাহেবের ফোন এল পূজোর ঠিক আগে আগে। এই কাজটার জন্যে এমনভাবে ধরলেন, মানিক না করতে পারল না। প্রতিমার কথা রাখতে কাঁচুমাচু মুখে সাহেবের কাছে নিজের সমস্যার কথা বলেছিল। কিন্তু চ্যাটার্জী সাহেব একঘর ভদ্রলোকের সামনে চেয়ার থেকে উঠে মানিকের হাত দুটো ধরে ফেললেন। এটা নাকি প্রধানমন্ত্রী সড়ক যোজনার কাজ। এই কাজের ওপর ওনার ভবিষ্যত নির্ভর করছে। অত লোকের সামনে কি করে ওনাকে না করে! তাই রাজি হয়ে ঘরে ফিরতেই প্রতিমার সঙ্গে অশান্তি। সে সব মিটিয়ে আশ্বিনের শেষাশেষি দিল্লিতে এসেছে। এত জায়গায় কাজ করলেও মানিকের দিল্লি আসা এই প্রথম। এখানে এসে প্রথম কিছুদিন কাজের চাপ কম ছিল। তাই প্রাণ ভরে লালকেল্লা, যন্তরমন্তর, কুতুব মিনার, রাষ্ট্রপতি ভবন, পুরানা কিলা, জামা মসজিদ, ইন্ডিয়া গেট সব ঘুরে নিয়েছে। তারপর কাজের চাপে সাইট থেকে ঘর আর ঘর থেকে সাইট। প্রথমে পিতাম্বরের সাথে মানিক একটি ঘর ভাড়া নেয়। পিতাম্বর বিহারের সমস্তিপুরের মানুষ। তারপর হায়দর আর রুস্তমজি এসে যোগ দেয়। হায়দর উত্তপ্রদেশ থেকে আর রুস্তমজি হরিয়াণা থেকে এসেছে। একমাসেই ওদের মধ্যে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। হায়দর ছাড়া সবাই সাদিসুধা। পরিবার প্রতি পালনই লক্ষ্য। তবে হায়দরের ব্যাপারটা বেশ রহস্যজনক। দেখে মনে হয় একটু আধটু লেখাপড়া জানে। বাড়ির অবস্থাও কথা শুনে মনে হয়েছে খারাপ নয়। ওকে ঠিক এই কাজে মানায় না। তবু কেন ও এই কাজে এসেছে বুঝতে অসুবিধা হয়। তবে ছেলেটা খুব প্রাণবন্ত। ওই খাটুনির পর ঘরে ফিরে হাসি ঠাট্টায় সবাই কে মাতিয়ে রাখে। রান্নার হাত অসাধারণ। নিজে থেকেই রাতের রান্নার দায়িত্ব নিয়েছে। আর মানিকরা যোগানদার। তার সাথে গানের গলাটাও ঈশ্বরপ্রদত্ত। রান্না করতে করতে সমানে গান গেয়ে যায়। আর শুয়ে বসে সেই গান শুনে সারাদিনের ক্লান্তি অনেকটাই লাঘব হয়। এমন করেই সুন্দর কেটে যাচ্ছিল দিন। হঠাৎ তাল কেটে গেল এক অজানা আশঙ্কায়। মানিকরা স্বপ্নেও ভাবেনি এমন দিন আসতে পারে। শুধু মানিকরাই কেন, সারা দেশই কী তা ভেবেছিল।

আজ ২৩ শে মার্চ। একটু আগেই প্রধানমন্ত্রী আগামী ২১ দিনের জন্য সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা করেছে। গত রবিবার যখন ১৪ ঘন্টা ঘর থেকে বেরোতে বারণ করেছিলেন এবং সন্ধ্যা সাতটায় কাঁসর-ঘন্টা বাজিয়ে ডাক্তার-নার্স-পুলিশ-প্রশাসন সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে বলেছিলেন, ওইদিন ছুটি ছিল মানিকদেরও।

ওই সময় এখানকার মালিক শর্মা সাহেব বলেছিলেন, ‘এ দু’এক দিনের চমক। সব কাজকর্ম বন্ধ করে থাকা যায় নাকি! তাহলে লোকজন খাবে কি?’

তাই মানিকরাও এসব নিয়ে কিছু ভাবেনি। শর্মা সাহেবের কথা শুনে রোজ কাজে গিয়েছে। হঠাৎ এদিন একটু আগে শর্মা সাহেবের ফোন এল। কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন আকাশটা কালো হয়ে গেল। কাল থেকে রাস্তা তৈরির কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ এসেছে। শর্মা সাহেব দৈনিক মজুরিতে কাজ করান। অর্থাৎ মজুরিও বন্ধ হয়ে গেল। সপ্তাহান্তে যে টাকা রোজগার হয় তা দিয়ে নিজের খরচ রেখে বাকিটা বাড়িতে পৌঁছে দেয়। গতকালই টাকা পাঠিয়েছে। হাতে ঠিক তিনশো টাকা আছে। কাল থেকে শুধু দোকান-বাজার নয়, বাস-ট্রেন-ট্রাম কিছুই চলবে না। ভয়ে সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

মানিক ভাবতে থাকে, কাল যে হাজার টাকা পাঠিয়েছি, তার মধ্যে পাঁচশো টাকা গত মাসের মুদিখানার বাকি মেটাতেই চলে যাবে। তাহলে ওরা খাবে কি? ঈশ্বরকে অশেষ ধন্যবাদ আগের সপ্তাহের টাকা দিয়ে প্রতিমা মেয়ের একমাসের ওষুধ আর ন’মাসের মোবাইল রিচার্জ করিয়ে রেখেছিল। বিপদের মধ্যে একটাই স্বস্তি, যোগাযোগটা অন্তত রাখতে পারবে। রোজ শোয়ার আগে ফোনে মেয়েটার সাথে কথা বলে। আজ আর কিছু ভালো লাগছে না। কোনও রকমে একটু কিছু খেয়ে ফোন অফ করে শুয়ে পড়ে মানিক।

লকডাউন তৃতীয় সপ্তাহে পড়ল। মানিক এখন মেসে একা। বাকি তিনজন একে একে কিছু না কিছু ব্যবস্থা করে দেশে চলে গেছে। একমাত্র হায়দরই দিল্লিতে কোনও এক আত্মীয় বাড়িতে উঠেছে। ছেলেটি খুব ভালো।

যাওয়ার আগের রাত্রে বলল, “দাদা, আপভি চলিয়ে মেরে সাথ, মেরেকো বেওস্থা হোগি তো আপকো ভি হো জায়েগা। আপকো একেলা ছোড়কর ম্যায় ক্যায়সে জাউগি!”

মানিক তাকে ঠান্ডা মাথায় বাস্তবটা বুঝিয়েছিল। তবু যাবার সময় ছলছল চোখে দুটো হাত জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “দাদা, কোঈ জরুরত পরেগা তো মেরেকো তুরন্ত কল কর দিজিয়ে, ম্যায় মদত করনেকেলিয়ে আজাউঙ্গা।“

মানিকের চোখ দুটোও ভিজে গিয়েছিল। মনে মনে ভাবছিল, এখন আমার কোথাও যাওয়ার নেই। কিচ্ছু করার নেই। নির্জীব, ক্লীব এক দিনযাপনে সামিল হয়েছে। মেসে আগুন জ্বলে না বহুদিন। গত দু-সপ্তাহ মুড়ি, ছিঁড়ে, ছাতু খেয়ে চলছিল, আজ দেখে চিঁড়ে-মুড়ি দুটোই শেষ, কৌটোর নীচে কিছুটা ছাতু পড়ে রয়েছে মাত্র। আজ সকাল থেকে মেয়ের কোনও মেসেজও আসেনি। কলচার্জের ভয়ে ফোন করা ছেড়ে দিয়েছে দু’জনেই। মেসেজটা বিনাপয়সায় করা যায়, সেটাই ভরসা। মেয়েটা ক্লাস ফোরে পড়লে কি হবে, মোবাইল চালানোর ব্যাপারে ওস্তাদ। প্রতিমা ওসব মেসেজ-টেসেজ করতে পারে না। কিছু দরকার হলে মেয়েকে বলে, মেয়ে লিখে দেয়। কাল একটা মেসেজ পেয়েছিল। সেই থেকে মনটা একদম ভালো নেই।

মাঝে একদিন খুব আনন্দ করে লিখেছিল, “বাবা জানো, আজ কতগুলো আঙ্কল এসে আমাদের অনেকটা চাল, আলু, মুড়ি, আর একটা দুধের প্যাকেট দিয়ে গেছে। আজ আমি আর মা গরম ভাত আর আলু সেদ্ধ খেয়েছি। তুমি কি খেলে বাবা?”

মেসেজটা পড়ে চোখে জল এসে গিয়েছিল। এতদূর থেকেও গরমভাতের গন্ধ আর মেয়ের পেট ভরা তৃপ্ত মুখটা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল মানিক। সাময়িকভাবে নিশ্চিন্ত হয়েছিল, যাক অন্ততঃ কয়েকটা দিনের জন্য চিন্তা নেই। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েকে মিথ্যে উত্তরও দিয়েছিল।

লিখেছিল, “আমিও আজ গরম ভাত খেয়েছি মা।’’

উত্তরে মেয়ে লিখেছিল, “তুমি খুব ভালো বাবা, আমি তোমাকে এত্তটা ভালোবাসি।’’

কাল লিখেছে, “আজ আমার পুতুলরানীর বিয়ে হল, পাশের বাড়ির বিন্তি ওর পুতুল বর নিয়ে এসেছিল। ইচ্ছে ছিল খুব ধুমধাম করে বিয়ে দেব, কিন্তু কি করব! তুমি নেই, মায়ের হাতের টাকাও শেষ। তাই ধুলোর ভাত, পাতার লুচি আর কুশি আমের চাটনি করেছিলাম। তুমি কবে আসবে বাবা! তুমি আসার সময় পুতুলরানীর জন্যে একটা বেনারসী শাড়ি আর কিছু গয়না এনো।’’

কিছুক্ষণ পর মোবাইলে আমার মেসেজ আসার টিং আওয়াজ। খুলে দেখে মেয়ে লিখেছে, “জানো বাবা, বিন্তিটা খুব ভালো। আমি ভেবেছিলাম মেয়ের বিয়েতে ভালো খাওয়াতে পারিনি, মেয়েকে কাপড় গয়না দিতে পারিনি, তাই ও ছেলে নিয়ে চলে যাবে। কিন্তু ও বললে, এখন লকডাউন। বিয়েতে কি আর করবি! আমিও জানিনা তোর মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কি খেতে দেব! জানো বাবা, আজ ওরা চারজন মিলে দুটো বাসি রুটি ভাগ করে খেয়েছে। দুপুরে ওদের বাড়িতে কোনো খাবার নেই। তাই দুজনে ঠিক করলাম মেয়ে এখন আমার বাড়িতেই থাকবে। লকডাউন উঠে গেলে যখন ওর বাবা আবার কাজে যেতে শুরু করবে তখন আমার মেয়েকে বৌ করে ওদের বাড়ি নিয়ে যাবে। ততদিন তো তুমিও চলে আসবে বাবা! তোমার আনা শাড়ি আর গয়না পরিয়ে ওকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাব। খালি গায়ে খালি হাতে মেয়েকে পাঠালে শ্বশুরবাড়িতে তো আমারই বদনাম হবে। তাই না বাবা!”

শিশু মনের সেই আত্মপোলব্ধি এক অসহায় মজুর বাবার সমস্ত জবাবকে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মানিক কোনও উত্তর দিতে পারেনি।

এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহেই সূর্যের তেজে পৃথিবী জ্বলছে। রাস্তায় জনপ্রাণীও নেই। সবাই ঘরের মধ্যে দরজা-জানালা এঁটে শুয়ে বসে আছে। আজ আর ছাতু খেতে ইচ্ছে করছে না। এটা সেটা নাড়ানাড়ি করতে গিয়ে মানিক দেখল, চালের টিনের নিচে একমুঠো চাল এখনও রয়ে গিয়েছে। অমনি ভাতের গন্ধে ম ম করতে থাকে যেন চারদিক।

মানিক ভাবে, কতদিন ভাত খাইনি! আজ একমুঠো গরম ভাত খাই।

কিন্তু ঘরে একফোঁটাও কেরোসিন নেই। বহুদিন ধরে পড়ে থাকা একটা কাঠের তক্তাকে চিড়তে বসল। যাইহোক একটা কাজ মিলল। সারাদিন শুধু শুয়ে থাকা আর ঘুমনো। নয়তো উলটপালট চিন্তা। দরজার বাইরে রোদের মধ্যে বসে পরিশ্রমের কাজটা করতে পেরে ভালোই লাগছিল। তাছাড়া গরমভাতের আগাম সোয়াদ গোটা মুখগহ্বর জুড়ে। কাজের জোশ বাড়িয়ে দিছিল। চটপট কাঠটাকে কয়েক টুকরো করে তিনটে ইঁট জোগাড় করে উনুন বানিয়ে ভাত বসিয়ে দিল। শুকনো কাঠ হুহু করে জ্বলতে থাকে। টগবগ করে ফুটতে থাকে জল। আস্তে আস্তে গরম ভাতের গন্ধ হালকা হাওয়ায় ভর করে গোটা বস্তিতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। ভয় হল এক্ষুনি না ভাতের গন্ধে দলে দলে মানুষ দরজা খুলে বেরিয়ে আসে।

মানিক যেন মানসচক্ষে দেখতে পেল, তাদের চোখের ক্রুদ্ধ দৃষ্টি। তীব্র লজ্জা আর ভয়ে মনে হল ভীষণ অন্যায় করে ফেলেছি! এখানকার গরীব মানুষগুলো যখন ভাতের গন্ধের সাথে ভাতের চেহারাও ভুলতে বসেছে। তখন দরজার বাইরে প্রকাশ্য দিবালোকে আমি টগবগ করে ভাত ফোটাচ্ছি। আর সেই ভাতের মনমাতানো গন্ধ এই সমস্ত অসহায় মানুষগুলোকে আরও বেশি ক্ষুধার্ত আর হিংস্র করে তুলবে।

ভাত একটু সেদ্ধ হতেই আগুন নিভিয়ে চটপট ভাতের হাঁড়ি ঘরে ঢুকিয়ে ফেলল। কোনও অবস্থাতেই এইটুকু ভাতের ভাগ কাউকে দেবে না! এবার একটু স্নান করতে হবে। আজ যেন উৎসবের মেজাজ। অনেকদিন পর আজ আবার সব আগের মতো লাগছে। যেন স্নান সেরে একমুঠো খেয়েই কাজে বেরিয়ে পড়বে। স্নান করে এসে থালাটা নিয়ে ভাতের হাঁড়ির সামনে বসতেই ‘টুং’ করে আওয়াজ এল। বিছানার ওপরে রাখা মোবাইলের আলোটা কয়েক সেকেন্ড জ্বলেই আবার নিভে গেল। চামচে করে থালায় ভাত বাড়তে থাকল, খেয়ে উঠে দেখা যাবে। যেন গরম ভাতের গন্ধ মেঝের সাথে আটকে রেখে দিয়েছে। ভাত বেড়ে মনে হল, আরে একটু লবন তো চাই, নাহলে তো খাওয়াই যাবে না। তরকারি যে নেই।

অগত্যা উঠতে হল। ঠিক সেই সময়ে দ্বিতীয় ‘টুং’ টা হল। মোবাইলের দিকে চোখ পড়তেই মেয়ের নামটা ভেসে উঠেই নিভে গেল। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে মোবাইলটা তুলে নিল মানিক। মেসেজ অপশনে গিয়ে দেখল দুটো মেসেজ।

প্রথমটায় লেখা, “বাবা আজ দু’দিন পুতুলরানী ভাত খেতে পায়নি। কাল একটা রুটি খেয়েছিল। আজ একমুঠো মুড়ি। তাতে পুতুলরানীর একটুও পেট ভরেনি।’’

পরের মেসেজে লিখেছে “পুতুলরানীকে বলেছি, তোমার বাবা শিগগির আসবে। আর এত্ত চাল নিয়ে আসবে। ও খুব লক্ষী মেয়ে, খিদে পেলেও একটুও কাঁদে না। ও জানে কাঁদলে মা কষ্ট পাবে, বাবা কষ্ট পাবে। আমি বলেছি, তোমার বাবা ফিরলে তোমার আর কোনও কষ্ট থাকবে না। আমি ঠিক বলিনি বাবা?”

মানিকের সারা শরীরটা থরথর করে কেঁপে উঠল। চোখের সামনে সাদা দেওয়ালটা ঝাপসা হয়ে গেল। কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না। ভাতের থালাটাও না। গন্ধও না। কাঁপতে থাকা হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে গেল। বালিশটাকে আঁকড়ে ধরে বিছানায় মুখ গুঁজে কতক্ষণ যে বেহুঁশের মতো পড়েছিল খেয়াল নেই। বেশ কিছুক্ষণ পর একটা আওয়াজে চোখ তুলে দেখল, ভুলু কুকুরটা হাঁড়ি উল্টে ভাতটুকু খেয়ে চলেছে। একবার কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে মানিকের দিকে তাকিয়ে আবার খাবারে মন দিল ভুলু। মানিক যেন অসাড়। শুধু শুয়ে শুয়ে দেখল, ভুলু চেটেপুটে থালা-হাঁড়ি সাফ করে খেল, তারপর আবার একবার তাকিয়ে, ভুক করে ডেকে যে‌ন ধন্যবাদ জানিয়ে হেলতে দুলতে চলে গেল।

এভাবেই দিনের পর দিন কাটতে লাগল। প্রতিদিন মেয়ের একটা করে মেসেজ। ওর পুতুলরানী গত দু’দিন ধরে কিচ্ছু খাবার পায়নি, তারপরও বাবা-মায়ের কথা ভেবে একটুও কান্নাকাটি করেনি। এখন শুধু বুকটা হুহু করে আর দমটা যেন বন্ধ হয়ে আসে, চোখের জল কবেই শুকিয়ে গিয়েছে। আর বিধাতা পুরুষ মানুষকে বোধহয় কম চোখের জল দিয়ে পাঠায়। ফলে শরীরের আর মনের ভেতরের বেদনাকে গলিয়ে বাইরে বের করে দেবার ফেলার কোনও সহজ পদ্ধতি পুরুষের হাতে নেই। বুকের মধ্যে একটা কষ্ট অনবরত এ দেওয়াল থেকে সে দেওয়ালে ধাক্কা খেতে খেতে চলতে থাকে। মোবাইল ছুঁতে এখন ভয় হয়। সারাদিন এক ভয়াবহ আতঙ্কে কাটে কখন ’টুং’ শব্দটা হয়। বিছানার এক কোণে বসে আতঙ্কের দৃষ্টিতে মোবাইলটার দিকে চেয়ে থাকে। সব সময় ভয় পাই- এই বুঝি লাল আলোটা জ্বলে উঠল। এই বুঝি টুং আওয়াজটা হল। অন্য কোনো আওয়াজ হলেও মনে হয়, ওই বুঝি মেসেজ ঢুকল। মাঝে মাঝে ভাবে, আছাড় মেরে যন্ত্রটাকে টুকরো টুকরো করে ফেলে। পারে না। বহুদূরে থাকা এক শিশু মুখের কাতর চাহনি ভেসে ওঠে। হাতকে পঙ্গু করে দেয়।

বাধ্য হয়ে গত দু’দিন কলকাতায় মুখার্জী সাহেবকে এবং এখানকার ঠিকাদার দু’জনকেই ফোন করার চেষ্টা করেছে মানিক। এখানকার ঠিকাদারের ফোন লাগেনি। আর মুখার্জী সাহেবও এখন ঘরবন্দি। তারপক্ষে এই অবস্থায় মানিকের পরিবারের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বাড়িতে বসে ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিংয়ের মাধ্যমে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু সেটাকা প্রতিমা তুলবে কিভাবে। ব্যাঙ্কও যে বাড়ি থেকে দশ কিলোমিটার দূরে। গ্রামে এটিএমই কোথায়। তাই সে সব ভাবার চিন্তাও হয়নি কোনওদিন। এই সময়ে তো অধিকাংশ ব্যাঙ্কও বন্ধ। গণ্ডগ্রামের ওই ব্যাঙ্ক কি খোলা থাকবে!

এখন অতি প্রয়োজন ছাড়া বিছানা ছেড়ে নামে না মানিক। ঘরে আজ তিনদিন কোনও খাবার নেই। পাশের ঘরের মাসিমা গতকাল এক প্যাকেট মুড়ি দিয়ে গিয়েছিল। কোনও এক কোম্পানি থেকে পরশু নাকি বড় রাস্তার কাছে ত্রাণ নিয়ে এসেছিল, ভেতরে ঢোকেনি। ওখান থেকেই বস্তির লোকেদের কিছু কিছু দিয়েছে। মানিক যায়নি। মাসিমা সেটা নজর করে কাল সকালের দিকে একবার খোঁজ নিতে এসেছিল। মানিকের অবস্থা দেখে নিজেদের ভাগ থেকে জোর করে এক প্যাকেট মুড়ি দিয়ে গিয়েছে।

যাবার সময় বলে গিয়েছেন, “এইরকম ভেবে ভেবে শরীর নষ্ট করা কোনও কাজের কথা নয়। পুরুষ মানুষ তুমি! বিপদে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। ভগবান আছেন, তিনি নিশ্চয়ই কিছু একটা রাস্তা দেখাবেন।’’

তারপর কিছুক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একমনে মানিককে নিরীক্ষণ করে যাবার সময় বলে গেলেন, “বিকেলে বরং ন্যাড়াকে পাঠিয়ে দেব, একটু  গল্পগুজব করে যাবেখন।’’

খিদে পেলে মাসিমার দিয়ে যাওয়া মুড়ি একগাল করে খায়। বদ্ধ ঘরে থেকে চোখের দৃষ্টিও কেমন ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। চিন্তাভাবনাগুলোও তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। সেদিন একটু তন্দ্রামত এসেছিল, কিছুটা পরে ঘুমের ঘোর কাটতে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না, তখন বিকেল না ভোর। কিছুতেই ঠাহর করতে পারেনি। শেষে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে দেখে- বাদলের বৌ সন্তোষী মায়ের মন্দিরে সন্ধ্যাপ্রদীপ দেখিয়ে ফিরছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, বোধ হয় পাগল হয়ে যাচ্ছে সে।

আজ আকাশের মতিগতি বোঝা দায়। কাল সারারাত খুব গরম ছিল। সকালে উঠে দেখেছিল ঝকঝকে রোদ। এখন আবার সারা আকাশ কালো করে টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। যদিও আকাশের মতিগতির সাথে এখন তার কোনও লেনাদেনা নেই। দিনযাপনে কোনও চমক নেই, সেই বদ্ধঘরে বিছানায় বসে আবোলতাবোল চিন্তা, নয়তো চিন্তাশূন্য মাথায় দেওয়ালের দিকে নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকা। গতপরশু আবার আঠাশ দিনের লকডাউন ঘোষণা হয়েছে। মেয়েটার কাছ থেকে গত তিনদিন ধরে কোনও মেসেজ আসেনি। গতকাল ভয় কাটিয়ে নিজেই একটা মেসেজ করেছিল। তারও কোনও উত্তর আসেনি। আজ সকাল বেলায় দরজায় খটখট আওয়াজ। অনেক কষ্টে বিছানা থেকে দেহটা তুলে দরজা খুলে দেখে, বাইরে ন্যাড়া দাঁড়িয়ে আছে। দরজা খুলতে একটা বাটি আগিয়ে দিয়ে বলল, “মা পাঠিয়ে দিয়েছে”।

কোনও কথা না বলে মলিন হেঁসে বাটিটা নিয়ে আবার দরজা বন্ধ করে দেয়। একটা বাটিতে একটু চিঁড়ে সেদ্ধ আর একটু নুন। সেদিন মুড়ি দিয়ে যাওয়ার পর থেকে মাসিমা ওনাদের যেদিন যা জোটে তা থেকে একটু পাঠিয়ে দেন। এই দুর্দিনে যখন নিজের পরিবারের মুখে একবেলাও পেট ভরে কিছু জোটে না, তখন কোন স্নেহের বশে পরিমিত খাবার থেকে দিনের পর দিন এক অনাত্মীয়ের জন্যে কিছুটা খাবার বাঁচিয়ে রেখে চলেছেন সেটা ভাবার মতো মানসিক সঙ্কুলতাও মানিকের নেই। যন্ত্রের মতো সেই খাবার খেয়ে দিন কাটিয়ে চলেছে শুধু। বাটিটা ছোট টুলের ওপর রেখে বাথরুমে ঢুকল। ফিরে এসে মোবাইলটা হাতে নিতেই দেখি মেয়েটার একটা মেসেজ এসেছে। মেসেজের আতঙ্ক দিনের পর দিন গ্রাস করে রাখলেও, গত তিনদিন ধরে ভালোমন্দ কোনও খবর না পেয়ে খুব চিন্তায় ছিল। তাড়াতাড়ি মোবাইলটা নিয়ে বিছানায় বসে মেসেজটা দেখে। বেশ বড় মেসেজ। আগ্রহ নিয়ে পড়তে শুরু করে।

মেয়ে লিখেছে, “বাবা আজ আমার পুতুলরানীর খুব আনন্দ! ওর মা বলেছে আজ রাত্রে ও ভাত খাবে। কবে যে ভাত খেয়েছে, মনেই পড়ে না! কিন্তু সকালবেলায় ওর জন্য কোনো খাবার নেই। কি করে থাকবে বলো! পুতুলরানীর মা তো আজ ঘরে নেই, তাহলে খাবার কে বানাবে! জানো বাবা, আজ পুতুলরানীর খুব রাগ হয়েছে মায়ের ওপর! তুমি এসে ওর মাকে খুব বকে দিও.....আজ মা ওকে মেরেছে..ওর কি দোষ বলো!! ওর মা সকালে খুব সাজছিলো। সুন্দর সিল্কের শাড়ি, লাল ব্লাউস, মুখে পাউডার আর ঠোঁটে লিপস্টিক! পুতুলরানীরও খুব ইচ্ছে করছিল ঠোঁটে একটু লিপস্টিক লাগাতে। কিন্তু মা বারবার বলছিল কাছে না আসতে, বাইরের বারান্দায় খেলা করতে। তারপর মা যখন সেজেগুজে বেরোলো, আমি তখন বারান্দায় পুতুলরানীকে স্নান করাচ্ছিলাম। মাকে কি সুন্দর দেখতে লাগছিল বাবা! ঠিক পরীর মতন! মা আমাকে জড়িয়ে ধরে যখন আদর করছিল আর লক্ষী হয়ে থাকতে বলছিল। তখন আমি মায়ের ঠোঁট থেকে আঙুলে করে একটু লিপস্টিকের রং নিয়ে আমার ঠোঁটে লাগিয়ে নিই। তখন মা রেগে গিয়ে আমার গালে খুব জোরে চড় মারল। আমার খুব লেগেছিল বাবা। তারপর মা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল। চোখের জ্বলে মায়ের কাজল, পাউডার, লিপস্টিক সব কিছু নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তখন মায়ের জন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো। সকাল থেকে মা এত কষ্ট করে সাজলো, আর আমার জন্যে অত সুন্দর সাজটা নষ্ট হয়ে গেল। আমি চোখের জল মুছে মাকে বললাম, মা কেঁদো না, চলো তোমাকে আমি আবার সাজিয়ে দেব। কিন্তু বাইরে একটা আঙ্কল মোটর সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই লোকটা মাকে খুব বকছিল, মাকে আর সাজার সুযোগ দিল না। আঙ্কল আমার দিকে একটা চকলেট ছুঁড়ে দিয়ে মাকে পিছনে বসিয়ে কোথায় চলে গেল। আমার তখন খুব কান্না পাচ্ছিল বাবা। আমি কিন্তু কাঁদিনি! আমাকে কাঁদতে দেখলে আমার পুতুলরানীও তো কেঁদে ফেলবে বলো!”

এক পাল্লা খোলা জানলা দিয়ে বাইরের ধূসর আকাশের এক চিলতে চোখে পড়ছে। ধোঁয়ারঙা আলোয় মানিক দেখতে পাচ্ছে দরজার ওপরে দেওয়ালে একটা বিশাল বড় টিকটিকি একদৃষ্টে নজর করছে কয়েক হাত তফাতের এক শীর্ণ মাকড়সাকে, যে কোনও মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বাইরে শাঁখের আওয়াজ হল তিনবার। আজ কি বৃহস্পতিবার! লক্ষ্মী পূজো হচ্ছে! একটু ধূপেরও গন্ধ আসছে মনে হল। গাটা গুলিয়ে উঠল! উঠে বসল, ন্যাড়ার দিয়ে যাওয়া চিঁড়ের বাটিতে কালো পিঁপড়ের ঝাঁক। মেসেজ বক্স বন্ধ করতেই গোটা পর্দা জুড়ে ভেসে উঠল মেয়ের মুখ। গভীর আশ্লেষে ঠোঁটটা রাখল স্ক্রিনের ওপর। তারপর পকেটে ঢোকাল। ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে চিঁড়ের বাটিটা তুলে টান মেরে ছুঁড়ে মারল ঘরের মেঝেয়.....খা খা!! যত পারিস খা!!!

কাঠের টুলটা বিছানায় তুলল। মাপটা চোখের আন্দাজে দেখে নিল। হ্যাঁ ঠিক আছে।

এবার একটা কাজই বাকি! একফালি জানলার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ল আকাশ আরও ঘন কালো হয়ে উঠেছে। এবার একটা প্রলয় না ঘটিয়ে ছাড়বে না। জানালার পাল্লাটা গিয়ে বন্ধ করে দিল। একটা কাজই বাকি! হ্যাঁ মাত্র একটা কাজ! বাথরুমে ঢুকে গামছাটার দিকে হাত বাড়াল মানিক।

                                     xxx....শেষ.....xxx

 

Mailing List