দূরের চিঠি / গল্প, লিখেছেন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক সুদীপ সরকার

দূরের চিঠি / গল্প, লিখেছেন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক সুদীপ সরকার
13 Mar 2022, 12:00 PM

দূরের চিঠি


সুদীপ সরকার

 

 

স্নেহের টুক্লু,

কয়েকদিন ধরেই তোকে লেখার কথা ভাবছিলাম। অনেক গুলো কথা মনের ভিতর ঘুরপাক খেতে খেতে হাপিয়ে উঠেছে। যেমন মুখ বন্ধ করা কেটলির ভিতর জল বাস্পায়িত অবস্থায় পৌঁছে গেলে ঢাকনা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়, সেরকম আর কি।

সে এমন সব উপলব্ধি, যা নিয়ে কারুর সাথে বকবক করা সমীচীন নয়। বোধহয় ঠিক বললাম না, আসলে কাকেই বা বলতে যাব সে সব আগডুম বাগডুম! সুতরাং একে তাকে বিরক্ত না করে তোকে পাকড়াও করার পিছনে যুক্তিটা সহজ বোধ্য। আসলে সেটাও বোধহয় সবটা ঠিক নয়।

সোজা কথায় বলি, আবার কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে বলেই লিখছি, সে হাবিজাবি বটে, তবু লেখকের স্বাধীনতা তো কেউ কেড়ে নিতে আসছে না। ভুল তো সবসময়ই বলি, করিও, এই যেমন কি বলতে কি বলে ফেললাম। লেখক আবার হলাম কবে!

তবু, কুঁজোর যেমন চিৎ হয়ে শোয়ার ইচ্ছে হয়, সেরকম ভেবে নিস, তাহলেই সব পাপস্খলন। মনের ভিতরে পাক খাওয়া কথা গুলো এরই মধ্যে কোথায় যেন সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, তাই আসল কথায় ফিরি। প্রায় দেড় দশক পর, দুদিনের জন্য, মেদিনীপুর গিয়েছিলাম। শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং পড়ুয়াদের মানবিক গঠন প্রক্রিয়ায় তার প্রভাব বিস্তার, এই সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট তৈরির ব্যাপারে কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের প্রয়োজনে ওখানে যাওয়া। পুরনো কাজের জায়গায় এলে স্বাভাবিক ভাবেই অনেক স্মৃতি ভিড় করে আসে। চেনা জায়গাগুলোর পাল্টে যাওয়া চেহারাটা দিব্য ধরা পড়ছিল আমার মতো আনাড়ির চোখেও। বেশ কিছু পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হোল, স্মৃতি মেদুরতায় আপ্লূত হলাম। তারপর বিদ্যালয় পরিদর্শককে সঙ্গে নিয়ে দুপুর দুপুর রওনা দিলাম। শহর ছাড়িয়ে জাতীয় সড়ক ধরে মাইল তিনেক গিয়ে ভাদুতলার মোড় থেকে একটা বাঁক নিয়ে আরও কিছুটা এগোলেই পাথরকুমকুমি গ্রাম। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলটার সামনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ল, এই স্কুলে আগেও এসেছি, যখন কর্মরত ছিলাম এখানে। পুরনো হাড় জিরজিরে চেহারা আর যা কিছু জীর্ণ দীর্ণ সব ঝেড়ে ফেলে সেই স্কুল এখন নতুন রুপে মাথা তুলেছে দেখলাম। ভিতরে ঢুকে আরও এক প্রস্ত তাজ্জব হলাম। বিভিন্ন দফতরের সম্মিলিত প্রয়াসে এখানে নানা রকমের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। সার দিয়ে ডজন খানেক কম্পিউটার দেখলাম একটি নির্দিষ্ট ঘরে। এক দশকের সময় সীমায় অনেক কিছুই পাল্টে গেছে বুঝলাম, পড়াশোনার মান এবং দৃষ্টিভঙ্গিও।

কোলকাতা থেকে আধিকারিক আসছেন জেনে হেড মাস্টার মশাই হয়তো আগে থেকেই কিছু প্রস্তুতি নিয়েই ছিলেন। বাচ্চাদের উপস্থিতিও বেশ ভালো। দু-একটি বাচ্চাকে কিছু জিগ্যেস করতেই দেখলাম তারা বেশ চটপট উত্তর দিল। যা কিছু দেখলাম, বুঝলাম, নোট বইতে লিখে নিলাম। তারপর পাথরকুমকুমি থেকে আধ-ঘণ্টার পথ পেরিয়ে পৌঁছলাম ভালুকশোল গ্রামের আরও একটি স্কুলে। প্রত্যন্ত গ্রামের ভিতর এত ভালো একটি স্কুল থাকতে পারে এ আমার ভাবনার বাইরে ছিল। বড় বড় গাছগাছালির মায়াময় পরিবেশে স্কুলটি যেন প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। দোতলা ভবনের প্রত্যেকটি কক্ষের প্রতিটি দেওয়ালে নানা ছবির সমাহার। রঙের বিভিন্নতায় দেওয়ালে দেওয়ালে কোথাও বর্ণ পরিচয়ের পাঠ তো কোথাও আবার নামতার ছক। সামনের ফাঁকা জমিতে টয় ট্রেনের ধাঁচে বসার জায়গা, সুসজ্জিত পার্কে দোলনা এবং ছোট ছেলেমেয়েদের মনকাড়া বিনোদনের অন্যান্য ব্যবস্থা। হেড মাস্টার মশাই খুব উৎসাহ নিয়ে দেখালেন সব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। কৌতূহল চেপে না রেখে জিগ্যেস করেই বসলাম, “এই ভাবে সাজাতে তো অনেক টাকা খরচা, পেলেন কোথায়? সরকারি বরাদ্দ থেকে তো বোধহয়…।“

আমাকে থামিয়ে দিয়ে, স্কুল পরিদর্শক বললেন, “সে আর বলেন কেন স্যার, বারিদ বাবু যা করেছেন, সেরকমটা কেউ করার কথা ভাবতেও পারবে না। মানুষটা স্ত্রীর গয়না বেচে সেই টাকায়…।“ অবাক হলাম না জানিস, আসলে কিছু মানুষ তো থাকেন এমন, যাঁরা নিজের সংসার, টাকা পায়সা, ব্যক্তিগত সঞ্চয় এসব নিয়ে ভাবেন না। কিম্বা উল্টো করে দেখলে, ব্যক্তিগত জীবনের বৃত্তে বহিরঙ্গের অনেক কিছুই নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে নিতে দুবার ভাবেন না, কর্মক্ষেত্রের পরিধি বা মাস মাইনের যাবতীয় হিসেব নিকেশ যাদের আত্মিক বোধের কাছে নিতান্তই গৌণ বিষয়। আসলে এঁরাই সেই মানুষ যাদের আড়ালে আবডালে হয়ত আমরা পাগল বলি। ভয় হোল, ভদ্রলোক আবার না অর্থের আবেদন করে বসেন, রাজ্য শিক্ষা দফতর থেকে কোনও আধিকারিক কে সামনে পেলে স্কুলের স্বার্থে প্রায়শই যেটা করে থাকেন মাস্টার মশাইরা।

কিন্তু বারিদ বরণ বাবু সেই পথেও হাঁটলেন না, বুঝলাম ভদ্রলোক একেবারেই অন্য প্রকৃতির মানুষ। মোবাইল ফোনের ক্যামেরাতেই কিছু ছবি নিলাম। আসলে বোধহয় কিছু মুহূর্তকেই ক্যামেরা বন্দি করার চেষ্টা করলাম, টুকিটাকি কিছু নোট নিলাম, আর স্বাভাবিক ভাবেই বাচ্চাদের এটা সেটা জিগ্যেস করলাম। এক্ষেত্রেও একটা ব্যাপারে বিস্মিত হলাম। এত প্রত্যন্ত একটি গ্রামের বাচ্চারাও যে এতটা সপ্রতিভ, সেটা না দেখলে বিশ্বাস হত না আমার। একটি বাচ্চাকে জিগ্যেস করলাম, কোথায় যুদ্ধ হচ্ছে জানো?

চটপট উত্তর দিয়ে বাচ্চাটা বলল, ইউক্রেন-রাশিয়া। তারপর সেই ক্লাস টুয়ের বাচ্চাটা আমাকে বেশ বিড়ম্বনায় ফেলে দিয়ে জিগ্যেস করে বসল, “স্যার, যুদ্ধ কেন হয়?”

এহেন আপাত সহজ কিন্তু কঠিন প্রশ্নের মুখে আমাকে ইতস্তত হতে দেখে বারিদ বরণ বাবু এগিয়ে এলেন আমার পরিত্রাতা হয়ে। ছোট ছেলেটির মাথায় হাত রেখে বললেন, “স্যারকে অনেক দূর ফিরতে হবে, আর কথা নয়, পরে আমি তোমাকে ভালো করে বুঝিয়ে বলব।“

বিকেল হয়ে আসছিল, সন্ধ্যে নামার আগেই বেড়িয়ে পড়লাম মেদিনীপুরের উদ্দেশ্যে।

ফেরার সময়, বাচ্চা ছেলেটার নির্ভেজাল প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। সত্যি কি এর উত্তরটা আমার জানা? নাকি যারা যুদ্ধ করছে তারা জানে? একটা দেশ গঠন করতে, সঠিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে কত সময় লাগে? কত শ্রমের বিনিময়ে, কত পরিকল্পনার ফল স্বরূপ একটা জাতি সফল ভাবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে? সামরিক শক্তি আর পেশি শক্তির নির্লজ্জ আস্ফালনে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সমস্ত কিছু যে রাষ্ট্র নায়ক নিমেষের দাম্ভিক এবং অরাজক সিদ্ধান্তে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার প্ণ করে বসেন, তিনিও কি জানেন এর উত্তর?

ছবির মত সাজানো একটা দেশের সব হারাতে বসা মানুষ গুলোর সঙ্গে কোথায় যেন আত্মীয়তার টান অনুভূত হয়। শিউরে উঠি এই ভেবে যে, আমাদের ওপরেও যদি কখনো একই ভাবে আছড়ে পরে কোন ক্ষেপণাস্ত্র! বীভৎস সাইরেনের আওয়াজে কোন এক কাকভোরে ঘুম ভেঙে উঠে বসে দেখি বাড়ির পাশের বিরাট স্কুল বাড়িটা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে বোমারু বিমানের বেহিসেবি গোলা বর্ষণে!

এই নিয়ে ভাবতে ভাবতে হাঁপিয়ে উঠলাম নিজের মনেই। হাল্কা মনে বাইরের দিকে তাকালাম।

পশ্চিমের আকাশ তখন সিঁদুর রাঙা, প্রসস্ত রাস্তার দুই পাশের ঘন শাল পিয়ালের জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে ইতিউতি পলাশের ডালে রক্তিম উদ্দামতা জানান দিচ্ছে, ডালে ডালে পলাশ ছেয়ে যাওয়ার সময় আগত। ড্রাইভার ছেলেটিকে এসি বন্ধ করতে বলে জানলার কাচ নামিয়ে দিলাম। একটা উদ্দাম হাওয়া দমকে এসে আমার সবকিছু যেন ওলটপালট করে দিতে চাইল। আমার অবিন্যস্ত মন নিয়ে চারপাশের অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা করলাম। বিদ্যালয় পরিদর্শক মশাই দেখলাম ততক্ষণে গাড়ির দুলুনির আমেজে ঢলে পড়েছেন গভীর ঘুমে।   

>>>><<<<<<

Mailing List