রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রথম দেখতে এসে ১৬ টাকা ফি নিয়েছিলেন ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, তারপর কবির সঙ্গে কেমন সম্পর্ক হল? তাঁর জন্ম-মৃত্যু দিনে ফিরে দেখা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রথম দেখতে এসে ১৬ টাকা ফি নিয়েছিলেন ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, তারপর কবির সঙ্গে কেমন সম্পর্ক হল? তাঁর জন্ম-মৃত্যু দিনে ফিরে দেখা
01 Jul 2021, 10:15 AM

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রথম দেখতে এসে ১৬ টাকা ফি নিয়েছিলেন ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, তারপর কবির সঙ্গে কেমন সম্পর্ক হল? তাঁর জন্ম-মৃত্যু দিনে ফিরে দেখা

ডঃ বিবেকানন্দ চক্রবর্তী

 

রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) বিধানচন্দ্রের (১৮৮২-১৯৬২) চেয়ে ২১ বছরের বড়ো| ১৮৯৭ সালের ১৫ আগষ্ট ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় অসুস্থ কবিকে দেখতে আসেন| সেই সূত্রে কবির সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে| ইতিপূর্বে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিধানচন্দ্রের পিতা প্রকাশচন্দ্র রায়ের (১৮৪৭-১৯১১) ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল| ১৯০৭ সালের কোনো এক সময় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের পিতা-মাতা প্রকাশচন্দ্র ও অঘোরকামিনীর (১৮৫৬-১৮৯৬) জীবনীমূলক গ্রন্থ ‘অঘোরপ্রকাশ’ (১৩১৪) গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের হাতে আসে| ১৯০৭ সালের ১৩ মার্চ তিনি প্রমথলাল সেনকে (১৮৬৬-১৯৩০) লেখেনঃ 

 

‘এই বইটির কথা যতই ভাবছি ততই এ দম্পতির সাধনার ভিতর থেকে যে শক্তির বিকাশ হয়েছে তার অসামান্যতা ভুলতে পারছি নে| যখন মনে করা যায় এই সাধনার ভিতর দিয়ে না এলে জীবন কতই সামান্য এবং তুচ্ছ আকার ধারণ করত অর্থাৎ সে কোনো আকারই লাভ করতে পারত না, তখন বুঝতে পারি এ ব্যাপারটি সামান্য নয়| ...যাই হোক গ্রন্থটি পড়ে আমার যে উপকার হয়েছে—উপকার কথাটা ছোট—আমার যে মঙ্গল হয়েছে—সে জন্য গ্রন্থকর্ত্তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ|’

 

নবীনচন্দ্র সেনের (১৮৪৭-১৯০৯) পুত্র ও কেশবচন্দ্র সেনের (১৮৩৮-১৮৮৪) ভ্রাতুস্পুত্র প্রমথলাল সেন (১৮৬৬-১৯৩০) ছিলেন ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক| ছোটবেলা থেকেই তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) ও ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের (১৮৬১-১৯০৭) সঙ্গে| তিনি ১৯১০ সালে বিলেতে রবীন্দ্রনাথের ইংরেজী কবিতা প্রথম প্রকাশ করেন| তিনি ‘নালুদা’ নামে বিশেষ পরিচিত ছিলেন| তাঁর লেখা চিঠিগুলো ‘নালুদার চিঠি’ শিরোনামে চারখণ্ডে প্রকাশিত|

এই বছর ৮ মার্চ, কবি প্রিয়ম্বদা দেবী (১৮৭১-১৯৩৫) কে রবীন্দ্রনাথ যে চিঠি লিখেছিলেন তাতে ‘অঘোরপ্রকাশ’ গ্রন্থটির উল্লেখ আছে|

 

‘আমাকে নববিধান সমাজের প্রমথ বাবু ‘অঘোরপ্রকাশ’ নামক একটি জীবনচরিত পাঠিয়েছেন—এ বইটি তুমি দোকান থেকে আনিয়ে পোড়ো| এতে একটি দম্পতির জীবনবৃত্তান্ত আছে—তার সমস্ত বিবরণই আমার কাছে যে হৃদ্য বলে বোধ হয়েচে তা নয় কিন্তু মোটের উপর বইটার ভিতর একটা জোর আছে তাতে আমি উপকার অনুভব করেছি—এবং আমার নিশ্চয় বিশ্বাস তুমিও উপকার পাবে| ...আমি বলি আগামী নববর্ষের প্রথম দিনে ঈশ্বরের কাছে একান্তমনে আত্মনিবেদন করে দিয়ে তোমার জীবনের কল্যাণের প্রবাহে নিঃসঙ্কোচে ভাসিয়ে দাও—আগামী বত্সর থেকে সমস্ত তুচ্ছ শোক হতে মনকে মুক্ত কর—সমস্ত ক্ষুদ্র লজ্জাভয়কে একেবারে পরিত্যাগ কর–একেবারে বিশ্বক্ষেত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরের মুখের দিকে মুখ তুলে চাও| ...আমার অনেকবার মনে হয়েছে—প্রিয় বড় দুর্ব্বলভাবে লালিত হয়ে এসেছে সে কি নিজেকে মঙ্গলের উপরে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে? আর তা যদি না পারে তাহলে ত কেবলি দুঃখ হতে দুঃখে, দুর্ভিক্ষ হতে দুর্ভিক্ষেই সে যাত্রা করবে| কিন্তু ঈশ্বর তোমাকে জাগ্রত করবেন বলেই অনেক দুঃখ দিয়েছেন| এত দুঃখও যদি সার্থক না হয়ে ওঠে তবে হল কি|’

 

প্রিয়ম্বদা দেবী (১৮৭১-১৯৩৫) ছিলেন সাহিত্যিক ও সমাজসেবক| মাতামহের কর্মক্ষেত্র পাবনার গুনাইগাছায় তাঁর জন্ম| পিতা কৃষ্ণকুমার বাগচী|

১৯১৫ সালে প্রিয়ম্বদা ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন| নারী শিক্ষার প্রসারে বহু মহিলা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন এবং দীর্ঘকাল ভারত-স্ত্রী-মহামন্ডলের প্রধান ছিলেন| ‘ভাস’-এর  সংস্কৃত নাটক ‘স্বপ্নবাসবদত্তা’ এবং ‘ভক্তবাণী’ নামে বাইবেলের কিছু অনুবাদ করে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন| জাপানের গেইশা রমণীদের জীবনী নিয়ে লেখা তাঁর বড় গল্প ‘রেণুকা’ একটি উল্লেখযোগ্য রচনা| তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ: ‘রেণু’ (১৯০০), ‘তারা’ (১৯০৭), ‘পত্রলেখা’ (১৯১১), ‘অংশু’ (১৯২৭), ‘চম্পা ও পারুল’ (১৯৩৯), ‘কথা ও উপকথা’ (১৯২৩), ‘পঞ্চুলাল’ (১৯২৩), ‘ঝিলেজঙ্গলে শিকার’ (১৯২৪), ‘অনাথ’ (১৯৩৫) ইত্যাদি| সাহিত্যচর্চায় তিনি রবীন্দ্রনাথের সহযোগিতা লাভ করেন|

 

১৯১০ সালের ২২ ডিসেম্বর (৭ পৌষ, ১৩১৭) শান্তিনিকেতনে বিংশ সাম্বৎসরিক উৎসব মহাসমারোহে পালিত হয়| মন্দিরে সকালে কবির ভাষণ ‘জাগরণ’, সন্ধ্যায় পাঠ ‘সামঞ্জস্য’| এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ মীরা দেবীকে (১৮৯৩-১৯৬৯) লিখেছিলেনঃ

‘৭ই পৌষ কাছে আস্‌চে—তাই নিয়ে ব্যস্ত আছি| দু বেলা আমাকে বল্‌তে হবে| এবারে গান এখানকার ছেলেরাই করবে—কলকাতা থেকে গাইয়ে আসবে না|’

 

মীরা দেবী রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠা কন্যা| মীরা দেবীর বিবাহ হয় বরিশালের ব্রাহ্মসমাজের নিষ্ঠাবান ভক্ত বামনচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র নগেন্দ্রনাথের সঙ্গে|

 

এই উৎসবে অনেক বিশিষ্ট অতিথির সমাগম হয়েছিল| ‘তত্ত্ববোধিনী’-তে তার উল্লেখ আছেঃ

‘এবারকার উৎসবে বাঁকীপুর হইতে শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত প্রকাশচন্দ্র রায় মহাশয় ও শিলঙ হইতে জনৈকা ব্ৰাহ্ম মহিলা ও দুইজন ব্রাহ্মবন্ধু আসিয়াছিলেন| এছাড়া কলিকাতা হইতেও অনেক বন্ধু ও উপাসক আগমন করিয়াছিলেন|’

 

তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা ছিল ব্রাহ্মসমাজের তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপত্র| ব্রাহ্মধর্মের প্রচার এবং তত্ত্ববোধিনী সভার সভ্যদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার উদ্দেশ্যে ১৮৪৩ সালের ১৬ আগস্ট অক্ষয়কুমার দত্তের (১৮২০-১৮৮৬) সম্পাদনায় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়| এর সার্বিক তত্ত্বাবধনায় ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫)| উনিশ শতকের শ্রেষ্ঠ গদ্যলেখক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১), রাজনারায়ণ বসু (১৮২৬-১৮৯৯), দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪০-১৯২৬) প্রমুখ এ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন এবং তাঁদের লেখার মাধ্যমে তখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এক নবযুগের সূচনা হয়|

 

১৯১৭ সালের ১৫ আগষ্ট যেদিন ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় কবিকে দেখতে এলেন সেদিন তিনি ভিজিট নিয়েছিলেন ১৬ টাকা| ঠাকুরবাড়ির ‘ক্যাশবহি’-তে তার উল্লেখ আছে| তারপর থেকে কবির সঙ্গে বিধানচন্দ্রের একটি স্নেহের সম্পর্ক গড়ে ওঠে ও তা অটুট ছিল রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত| রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ হলে ডাক পড়তো বিধানচন্দ্রের ও বিধানচন্দ্র ওষুধ-পথ্য সহ বিধান দিতেন| ১৯১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি সুশীলকুমার রুদ্রকে একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লেখেনঃ

 

‘The sentence of internment has been passed upon me by the medical authority and I am not allowed to carry on correspondence for some time. Of course, this letter is an infringement of that order. My doctor has declared that I am suffering from mental fatigue, so I am in that happy state when my conscientious objection to work of all kinds will be considered as valid.’

 

১৯২৫ সালের ১৬ জুন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের জীবনাবসান হয়| যুবক চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল| ১ জুলাই চিত্তরঞ্জন দাশের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়| এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লেখেনঃ

 

‘আপন দানের দ্বারাই মানুষ আপন আত্মাকে যথার্থভাবে প্রকাশ করে| চিত্তরঞ্জন তাঁহার যে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ দান দেশকে উৎসর্গ করিয়াছেন তাহা কোনও বিশেষ রাষ্ট্রিক বা সামাজিক কর্ত্তব্যপালনের আদর্শমাত্র নহে; তাহা সেই সৃষ্টিশক্তিশালী মহাতপস্যা যাহা তাঁহার ত্যাগসাধনের মধ্যে অমৃতরূপ ধারণ করিয়াছে|’

 

ইংরেজীতে লেখেনঃ

‘Man truly reveals himself through his gift, and the best gift that Chittaranjan has left for his countrymen is not any particular political or social programme, but the creative force of a great aspiration that has taken a deathless form in the sacrifice which his life represented.’

 

চিত্তরঞ্জন ভবানীপুরে তাঁর সুরম্য প্রাসাদ দেশবাসীর উদ্দেশ্যে দান করেছিলেন| সেখানে ‘চিত্তরঞ্জন সেবাসদন’ নামে মেয়েদের জন্য একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সংকল্প নিয়ে ‘দেশবন্ধু স্মৃতি তহবিল’ গঠিত হয়| এই তহবিলে অর্থসংগ্রহের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ কয়েকদিন আগে একটি কবিতিকা লিখে দেন|

 

প্রভাতচন্দ্র গুপ্ত লিখেছেনঃ

একদিন বিকেলবেলায় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় জোড়াসাঁকোতে তাঁর কাছে গিয়ে উপস্থিত হলেন| বললেন—‘দেশবন্ধু স্মৃতিভাণ্ডারে অর্থসংগ্রহের জন্যে আমরা আবেদনপত্র প্রচার করছি, তাতে দেশবন্ধুর অন্তিম শয়নের ছবির নীচে দেবার জন্যে একটা ছোট কবিতা লিখে দিতে হবে আপনাকে, যাতে বিগতপ্রাণ দেশবন্ধুর ছবিতে প্রাণসঞ্চার হয়|’ ...বোধ হয় মিনিট পাঁচসাত পরেই ফিরে এলেন| লিখে এনেছেন সেই বিখ্যাত চার লাইনের কবিতা—

‘এনেছিলে সাথে করে

মৃত্যুহীন প্রাণ,

মরণে তাহাই তুমি

করে গেলে দান|’

চিত্তরঞ্জন, রসা রোডে ৪ বিঘা জমির উপর নির্মিত বিশাল ভবনটি দেশবাসীকে দান করেছিলেন, কিন্তু তাঁর প্রায় দু’লক্ষ টাকা দেনাও ছিল| তাই গান্ধীজি ২২ জুন সেই ভবনে মেয়েদের জন্য একটি চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠার জন্য দশ লক্ষ টাকার ‘দেশবন্ধু স্মৃতি তহবিল’ গড়ার প্রস্তাব দিয়ে একটি বিবৃতি প্রচার করেন| ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, নির্মলকুমার চন্দ্র, তুলসীচরণ গোস্বামী, কুমার সত্যমোহন ঘোষাল, নলিনীরঞ্জন সরকার, ডাঃ নীলরতন সরকার (১৮৬১-১৯৪৩) ও সতীশরঞ্জন দাশ ট্রাস্টী মনোনীত হন, কোষাধ্যক্ষ হন স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৫৪-১৯৩৬)|

১৯৩১ সালের ২৫ ডিসেম্বর কবির চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রজয়ন্তী উৎসবের সূচনা হয়| কবির নানা বয়সের প্রতিকৃতি তাঁর রচিত গ্রন্থগুলিও প্রদর্শিত হয়| ত্রিপুরার মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মানিক্য এই প্রদর্শনীর দ্বারোদঘাটন করেন| সেই দিন অপরাহ্ণে অনুষ্ঠিত হয় ‘সাহিত্য-সম্মেলন’| এই সাহিত্য-সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮)| ২৬ ডিসেম্বর ‘ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হল’-এ অনুষ্ঠিত হয় গীত-উৎসব| ২৭ ডিসেম্বর টাউন হলে কবি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান| বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে কবিকে মানপত্রাদি প্রদান করা হয়| সেদিনের এই অনুষ্ঠানে কলকাতা কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে মেয়র ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদের পক্ষ থেকে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় (১৮৬১-১৯৪৪), হিন্দি-সাহিত্য সম্মেলনের পক্ষ থেকে অম্বিকাপ্রসাদ বাজপেয়ী, প্রবাসী বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনের প্রতিনিধিরূপে প্রতিভা দেবী, রবীন্দ্র-জয়ন্তী উৎসবের পক্ষ থেকে জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮-১৯৩৭) প্রভৃতি ব্যক্তিগণ অভিনন্দন-পত্র পাঠ করেন| রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় (১৮৬৫-১৯৪৩) উপস্থাপিত করলেন ‘The Golden Book of Tagore’ গ্রন্থটি|

 

‘The Golden Book of Tagore’ রবীন্দ্রনাথের ৭০তম জন্ম-জয়ন্তীতে প্রকাশিত হয়, যেটি সম্পাদনা করেন ‘দ্য মর্ডান রিভিউ’ ও ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়| এই গ্রন্থ প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮), রঁমা রোঁল্যা (১৮৬৬-১৯৪৪), আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫), কোস্টেস পলামাস ও আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮-১৯৩৭)|  এই গ্রন্থের ভূমিকা লিখতে গিয়ে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেনঃ

‘ALONG with the readers of this volume and the members of the Golden Book of Tagore Committee, I am grateful to and cordially thank the ladies and gentlemen who have contributed to it, as they have enabled all of us thereby to have some idea of the genius, personality and achievement of Rabindranath Tagore. But these are so great and many-sided that a complete appraisal of them is hardly practicable within any manageable compass. Nevertheless, I, too, on whom has been conferred the honour of editing this book, must venture to write briefly what I know of the Poet-if only in obedience to a natural public desire.’

 

১৯৪১ সাল, কবির জীবনের শেষ বছর, অস্তাচলের দিকে ঢলে পড়ছেন কবি| জানুয়ারি ২৪, মাঘের উৎসব| কিন্তু মন্দিরে যাবার শক্তিটুকুও নেই কবির| অধ্যাপক গুরুদয়াল মল্লিক মন্দিরে প্রার্থনার কাজ সমাধা করলেন| তবে এদিনও কবি দু’টি কবিতা লেখেন| সকালে লিখলেন জন্মদিনে-র ১৩ সংখ্যক কবিতাঃ

 

সৃষ্টিলীলাপ্রাঙ্গণের প্রান্তে দাঁড়াইয়া

দেখি ক্ষণে ক্ষণে

তমসের পরপার,

যেথা মহা-অব্যক্তের অসীম চৈতন্যে ছিনু লীন|

আজি এ প্রভাতকালে ঋষিবাক্য জাগে মোর মনে|

করো করো অপাবৃত হে সূর্য,আলোক-আবরণ,

তোমার অন্তরতম পরম জ্যোতির মধ্যে দেখি

আপনার আত্মার স্বরূপ|

যে আমি দিনের শেষে বায়ুতে মিশায় প্রাণবায়ু,

ভস্মে যার দেহ অন্ত হবে,

যাত্রাপথে সে আপন না ফেলুক ছায়া

সত্যের ধরিয়া ছদ্মবেশ|

এ মর্তের লীলাক্ষেত্রে সুখে দুঃখে অমৃতের স্বাদ

পেয়েছি তো ক্ষণে ক্ষণে,

বারে বারে অসীমেরে দেখেছি সীমার অন্তরালে|

বুঝিয়াছি, এ জন্মের শেষ অর্থ ছিল সেইখানে,

সেই সুন্দরের রূপে,

সে সংগীতে অনির্বচনীয়|

খেলাঘরে আজ যবে খুলে যাবে দ্বার

ধরণীর দেবালয়ে রেখে যাব আমার প্রণাম,

দিয়ে যাব জীবনের সে নৈবেদ্যগুলি

মূল্য যার মৃত্যুর অতীত|

[উদয়ন | শান্তিনিকেতন | ১১মাঘ, ১৩৪৭ | ২৪ জানুয়ারী, ১৯৪১]

আর সন্ধ্যায় লিখলেন আরোগ্য-এর ৩৩ সংখ্যক কবিতাঃ

এ আমির আবরণ সহজে স্খলিত হয়ে যাক;

চৈতন্যের শুভ্র জ্যোতি

ভেদ করি কুহেলিকা

সত্যের অমৃত রূপ করুক প্রকাশ|

সর্বমানুষের মাঝে

এক চিরমানবের আনন্দকিরণ

চিত্তে মোর হোক বিকিরিত|

সংসারের ক্ষুব্ধতার স্তব্ধ ঊর্ধ্বলোকে

নিত্যের যে শান্তিরূপ তাই যেন দেখে যেতে পারি,

জীবনের জটিল যা বহু নিরর্থক,

মিথ্যার বাহন যাহা সমাজের কৃত্রিম মূল্যেই,

তাই নিয়ে কাঙালের অশান্ত জনতা

দূরে ঠেলে দিয়ে

এ জন্মের সত্য অর্থ স্পষ্ট চোখে জেনে যাই যেন

সীমা তার পেরোবার আগে|

[উদয়ন | শান্তিনিকেতন | ১১মাঘ, ১৩৪৭ | ২৪ জানুয়ারী, ১৯৪১]

 

এগুলি কবিতা না উপনিষদের কোন ঋষির উপলব্ধিজাত মন্ত্র তা পাঠকেরাই বিচার করবেন| এ বছর বসন্ত উৎসব যাতে নিখুঁত হয় তার জন্য শৈলজারঞ্জন মজুমদার (১৯০০-১৯৯২) ও শান্তিদেব ঘোষকে (১৯১০-১৯৯৯) কবি নির্দেশ দিলেন|

১৪ এপ্রিল কবির শেষ নববর্ষ| কবি লিখে ফেলেছেন— ‘সভ্যতার সংকট’| ভাষণ পড়বার ক্ষমতা কবির ছিল না| তাঁর হয়ে সেটা পড়ে শোনালেন ক্ষিতিমোহন সেন (১৮৮০-১৯৬০)| মে ৮, ২৫ বৈশাখ কবির শেষ জন্মদিন| ২৩ বৈশাখ কবি লিখলেন—

হে নূতন,

দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ| |

তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদ্ঘাটন

সূর্যের মতন|

রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন|

ব্যক্ত হোক জীবনের জয়,

ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়|

উদয়দিগন্তে শঙ্খ বাজে,   মোর চিত্তমাঝে

চিরনূতনেরে দিল ডাক

পঁচিশে বৈশাখ | |

[২৩ বৈশাখ/১৩৪৮]

এ দিন সন্ধ্যায় ছাত্র-ছাত্রীরা অভিনয় করলেন ‘বশীকরণ’| কবি বসে বসে সবটুকুই দেখলেন|

মে ১৩, ত্রিপুরা থেকে রাজ-প্রতিনিধিগণ এলেন কবিকে সংবর্ধিত করতে| কবিকে তাঁরা ‘ভারত-ভাস্কর’ উপাধি প্রদান করলেন| কবির ভাষণ পাঠ করলেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ (১৮৮৮-১৯৬১)|

 

গ্রীষ্মাবকাশে বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) সপরিবারে শান্তিনিকেতনে পৌঁছলেন| কবির সঙ্গে তাঁর নানা বিষয়ে আলোচনা হল, বিশেষত সাহিত্য ও চিত্রকলা প্রসঙ্গে| বুদ্ধদেব বসুর ধারণা ছিল বয়সের ভারে বৃদ্ধ কবি হয়তো বেশি কথা বলবেন না| কিন্তু কার্যকালে বিস্মিত হয়ে লক্ষ করলেন কবির মন আগের মতই জাগ্রত, যথাসময়ে উপযুক্ত শব্দের জন্যও তাঁকে হাতড়ে বেড়াতে হয় না|

 

বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) একজন বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, গল্পকার, অনুবাদক, সম্পাদক ও সাহিত্য-সমালোচক| বিংশ শতাব্দীর বিশ ও ত্রিশের দশকের নতুন কাব্যরীতির সূচনাকারী অন্যতম কবি হিসেবে তিনি সমাদৃত| তবে সাহিত্য সমালোচনা ও কবিতা পত্রিকার প্রকাশ ও সম্পাদনার জন্য তিনি বিশেষভাবে সম্মানীয়|

 

শান্তিনিকেতনে ভয়াবহ উত্তাপ| একদিন কবি এই গ্রীষ্মাধিক্যের পরোয়া করেননি, কিন্তু এবার আর পারছেন না| লেডি রানু কবিকে একটি এয়ার কন্ডিশনার যন্ত্র উপহার দিয়েছিলেন, সেটা এবার কবির কাজে লাগল|

 

লেডি রাণু মুখার্জি (১৯০৬-১৯৮২) ভারতের শিল্প ও সাহিত্য জগতের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব| তিনি ভারতের চারুকলা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’, কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা| ‘রাণু’ রবীন্দ্রনাথের বিশেষ স্নেহধন্যা ছিলেন|

 

শরীরের ক্লান্তি এবং গ্লানিকে উপেক্ষা করেও চিত্রকলা প্রসঙ্গে দু’খানি মূল্যবান চিঠি লিখলেন দু’জনকে| প্রথম চিঠিখানি শিল্পী যামিনী রায়কে (৩ জুন, ১৯৪১) আর পরের চিঠিখানি বিশু মুখোপাধ্যায়কে (২৩ জুন, ১৯৪১) |

এদিকে মিস র‍্যাথবোন ভারত-বিষয়ে অপমানকর উক্তি করেছেন| কবি তার প্রতিবাদ করলেন| মিস র‍্যাথবোন, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যা| জহরলাল নেহরু-সহ দেশের অনেক নেতাই তখন জেলে|

 

সুতরাং তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদের ভার কবিকেই নিতে হল| কবির বক্তব্য খোলা চিঠির আকারে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের মাধ্যমে সব ইংরেজি পত্রিকায় ৫ জুন প্রকাশিত হল| কবি লিখলেনঃ ‘মিস র‍্যাথবোনের এই পত্র প্রধানত জওহরলাল নেহরুর (১৮৮৯-১৯৬৪) উদ্দেশ্যেই লিখিত| মিস্ র‍্যাথবোনের দেশবাসীগণ আজ যদি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই মহানুভব যোদ্ধার কন্ঠ কারাপ্রাচীরের অন্তরালে না রাখিত, তাহা হইলে তিনি এই অযাচিত উপদেশের যথাযোগ্য ও সতেজ উত্তর দিতেন| বলপ্রয়োগ জনিত তাঁহার মৌন আমাকেই রোগশয্যা হইতেও এই প্রতিবাদ জানাইতে বাধ্য করিয়াছে |... ব্রিটিশরাজ আমাদের খাওয়াইতে পারেন নাই বটে কিন্তু আমাদের দেশে আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষা করিয়াছেন, এই জন্যই কি আমরা ইংরেজের নিকট কৃতজ্ঞ থাকিব? চর্তুদিকে চাহিয়া দেখুন দেশের সর্বত্র দাঙ্গার উদ্দাম প্রাদুর্ভাব চলিতেছে... নারীদের সম্ভ্রম নষ্ট হইতেছে কিন্তু শক্তিমান ইংরেজের অস্ত্র তাহার প্রতিকারের নিমিত্ত নড়িতেছেও না |’

 

অত্যন্ত অভিনিবেশ সহকারে কবি পড়লেন অবনীন্দ্রনাথের (১৮৭১-১৯৫১) ‘ঘরোয়া’র পাণ্ডুলিপি | ২৭ জুন তাঁকে কবি লিখলেনঃ ‘কী চমৎকার তোমার বিবরণ, শুনতে শুনতে আমার মনের মধ্যে মরা গাঙে বান ডেকে উঠল |... এ তো ঐতিহাসিক পাণ্ডিত্য নয়, এ যে সৃষ্টি—সাহিত্যে এ পরম দুর্লভ |’ ১৩ জুলাই ‘ঘরোয়া’র জন্য একটি ভূমিকাও লিখে দিলেন কবি|

 

‘আমার জীবনের প্রান্তভাগে যখন মনে করি সমস্ত দেশের হয়ে কাকে বিশেষ সম্মান দেওয়া যেতে পারে তখন সর্বাগ্রে মনে পড়ে অবনীন্দ্রনাথের নাম| তিনি দেশকে উদ্ধার করেছেন আত্মনিন্দা থেকে, আত্মগ্লানি থেকে তাকে নিষ্কৃতি দান করে তাঁর সম্মানের পদবী উদ্ধার করেছেন| তাকে বিশ্বজনের আত্ম-উপলব্ধিতে সমান অধিকার দিয়েছেন| আজ সমস্ত ভারতে যুগান্তরের অবতারণা হয়েছে চিত্রকলায় আত্ম-উপলব্ধিতে| সমস্ত ভারতবর্ষ আজ তাঁর কাছ থেকে শিক্ষাদান গ্রহণ করেছে| বাংলাদেশের এই অহংকারের পদ তাঁরই কল্যাণে দেশে সর্বোচ্চ স্থান গ্রহণ করেছে| এঁকে যদি আজ দেশলক্ষ্মী বরণ করে না নেয়, আজও যদি সে উদাসীন থাকে, বিদেশী খ্যাতিমানদের জয়ঘোষণায় আত্মাবমান স্বীকার করে নেয়, তবে এই যুগের চরম কর্তব্য থেকে বাঙালি ভ্রষ্ট হবে| তাই আজ আমি তাঁকে বাংলাদেশে সরস্বতীর বরপুত্রের আসনে সর্বাগ্রে আহ্বান করি|’

 

কবি লেখাপড়া করছেন, চিঠিপত্রের উত্তর যথাসাধ্য দিচ্ছেন, কিন্তু সবাই বুঝতে পারছেন কবির সেই প্রাণপ্রাচুর্য ক্রমে কমে আসছে| কবির চিকিৎসা নিয়েও সবাই চিন্তিত| ডাক্তারেরা দু’দলে ভাগ হয়ে গেলেন| নীলরতন সরকার (১৮৬১-১৯৪৩) প্রমুখ ডাক্তার যাঁরা কবিকে দীর্ঘদিন ধরে দেখছেন তাঁরা কোনোরকম অস্ত্রোপচারের পক্ষে নন| অন্য দিকে বিধানচন্দ্র রায়-প্রমুখ ডাক্তারেরা অপারেশনের পক্ষে| এখানেই বলে রাখা ভালো—কবির রোগটা ছিল মূত্রকৃচ্ছতাজনিত| ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে এ রোগ প্রায় কিছুই নয়| সামান্য একটা অপারেশন— ‘পিউবিকস্টোমি সিস্টোস্কোপি’ হলেই কবি ভাল হয়ে যাবেন বলে তাঁরা নিশ্চিত| সবদিক বিবেচনা করে কবিকে কলকাতায় আনবার ব্যবস্থা হল, একই সঙ্গে এতদিন চলছিল কবিরাজী চিকিৎসা| বিমলানন্দ তর্কতীর্থ সেই চিকিৎসার ভার গ্রহণ করেছিলেন| কবিকে যখন কলকাতা নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হল তখন তাঁর আর বিশেষ কিছুই করবার ছিল না| কবি চাননি শেষ বিদায়ের আগে শরীরে অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন কিছু থাকুক| ডাঃ নীলরতন সরকারেরও এই একই মত ছিল| রথীন্দ্রনাথ চিরকাল পিতার ছায়ায় বড়ো হয়েছেন, কিছু ভাববার বা কোনো সিদ্ধান্ত নেবার কোনো শক্তি বা সাহস তাঁর ছিল না| ডাক্তারদের সিদ্ধান্তের ওপর তিনি ভরসা করলেন|

জুলাই ২৫, শান্তিনিকেতন থেকে কবির শেষ বিদায়| ‘ইস্ট ইণ্ডিয়া রেলওয়ে’র অধিকর্তা নিবারণচন্দ্র ঘোষ কবিকে কলকাতা নিয়ে যাবার জন্য তাঁর ব্যক্তিগত সেলুনটি বোলপুরে পাঠিয়ে দিলেন| জোড়াসাঁকোর বাড়িতে উঠলেন কবি| স্থির হয়ে গেছে ১৪ শ্রাবণ তাঁর অপারেশন হবে| অপারেশন করবেন বিখ্যাত সার্জন ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়| তাঁকে পরামর্শ ও উপদেশ দেবার জন্য আরও কয়েকজন ডাক্তারকে নিয়ে একটি কমিটি গঠিত হল, যাতে ছিলেন ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, ডাঃ অমিয় সেন, ডাঃ সত্যসখা মৈত্র প্রমুখ খ্যাতনামা চিকিৎসকেরা| যথানির্দিষ্ট দিনে অস্ত্রোপচার হল| কিন্তু অসুস্থ কবি আর সুস্থ হলেন না| দেখা দিল নানা উপসর্গ|

জুলাই ২৭, মৃত্যুপথ যাত্রী কবি লিখলেনঃ

‘প্রথম দিনের সূর্য

প্রশ্ন করেছিল

সত্তার নূতন আবির্ভাবে—

কে তুমি?

মেলেনি উত্তর|

বৎসর বৎসর চলে গেল|

দিবসের শেষ সূর্য

শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল পশ্চিম সাগরতীরে

নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়—

কে তুমি?

পেল না উত্তর | |’

 

কবি যে বার-বার নানাভাবে নানা-সুরে আজীবন গেয়েছিলেন–‘আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না…’ সেই জানার চেষ্টার উপর শেষ যবনিকার পতন আসন্ন হল|

 

ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের পরামর্শ মেনে ১৯৪১ সালের ৩০ জুলাই ডাঃ ললিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় কবির শরীরে অস্ত্রোপচার করলেন| অপারেশনের পূর্বে কবি তাঁর জীবনদেবতার উদ্দেশ্যে লিখলেন তাঁর শেষ কবিতা|

 

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি

বিচিত্র ছলনাজালে,

হে ছলনাময়ী|

মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে

সরল জীবনে|

এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত;

তার তরে রাখ নি গোপন রাত্রি|

তোমার জ্যোতিষ্ক তা’রে

যে-পথ দেখায়

সে যে তার অন্তরের পথ,

সে যে চিরস্বচ্ছ,

সহজ বিশ্বাসে সে যে

করে তা’রে চিরসমুজ্জল|

বাহিরে কুটিল হোক অন্তরে সে ঋজু,

এই নিয়ে তাহার গৌরব|

লোকে তা’রে বলে বিড়ম্বিত|

সত্যেরে সে পায়

আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে|

কিছুতে পারে না তা’রে প্রবঞ্চিতে,

শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে

আপন ভান্ডারে|

অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে

সে পায় তোমার হাতে

শান্তির অক্ষয় অধিকার|

অপারেশনের পর থেকে রবীন্দ্রনাথের শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি হতে থাকল| ৭ আগস্ট (২২শে শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) বেলা ১২.১০ মিনিট সময়ে কবির মহাপ্রয়াণ হল|

কবি প্রয়াত হয়েছেন ১৯৪১ সালের ৭ আগষ্ট| ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় ১৯৪৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন ও আমৃত্যু তিনি ওই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন| তিনি পশ্চিমবঙ্গের রূপকার| ১৯৬১ সালে তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ সম্মান প্রদান করা হয়| শিক্ষাব্রতী বিধানচন্দ্র রায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের (১৮৫৭) উপাধ্যক্ষ ছিলেন| তাঁরই উদ্যোগে গড়ে উঠেছে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬২), বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬০), বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ (১৯২৬), পুরুলিয়া (১৯৫৭), রহড়া (১৯৪৯), নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয় (১৯৫৮)| বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় আজীবন রবীন্দ্র অনুরাগী ছিলেন| ১৯৬২ সালের ১ লা জুলাই তিনি প্রয়াত হয়েছেন| ১ লা জুলাই তাঁর জন্ম আবার ১ লা জুলাই তাঁর মৃত্যু| প্রতিভাবান এই চিকিৎসকের জন্ম ও মৃত্যু দিন ‘চিকিৎসক দিবস’ রূপে ভারতবর্ষে পালিত হয়|

 

(ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী, রাষ্ট্রপতি-পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও রবীন্দ্র গবেষক)

ads

Mailing List