বাঁদনা পরব কী জানেন? ওই সময় বুড়ো শিব মর্ত্যে আসেন পরিদর্শনে, সেই বিশ্বাস থেকেই সব আয়োজন

বাঁদনা পরব কী জানেন? ওই সময় বুড়ো শিব মর্ত্যে আসেন পরিদর্শনে, সেই বিশ্বাস থেকেই সব আয়োজন
23 Oct 2022, 01:30 PM

বাঁদনা পরব কী জানেন? ওই সময় বুড়ো শিব মর্ত্যে আসেন পরিদর্শনে, সেই বিশ্বাস থেকেই সব আয়োজন

 

বিপ্লব মাহাতো

 

জঙ্গলমহলের মাহাত কুড়মী তথা সমগ্র আদিবাসী সম্প্রদায়ের অন‍্যতম উৎসব হল এই বাঁদনা পরব।

কার্ত্তিক মাস পড়লেই শুরু হয় বিভিন্ন রকম প্রাকৃতিক রং এ রাঙিয়ে বা মাটিলেপে নাতা দিয়ে ঘর পরিষ্কারের পালা। ঘাওয়া থেকে বুড়হি বাঁদনা পর্যন্ত এই পরব বেশ কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত।

কার্ত্তিক মাসের অমাবস্যার আগের দিন ঘাওয়া। ওইদিন নাতা মাটি দেওয়া বন্ধ। পরেরদিন অমাবস্যার দুপুরে প্রত‍্যেক গবাদি পশুকে স্নান করিয়ে সিঙে কচড়া তেল (মহুয়ার বীজ থেকে তৈরী) দিয়ে তাদের যত্নসহকারে খাওয়ানো হয়। তারপর গ্রামের সব গবাদিপশুকে একত্রিত করে চারণভূমিতে নির্দিষ্ট রীতি মেনে গঠপূজো করা হয় ও খঁড় ডেঙহানো হয়। এতে যে গরু ডিম ভাঙে তাকে বরণ করা হয়। বিকেলে বা সন্ধ্যার দিকে কাসীজিওরী/কাঁচিজিওরী, চালগুড়িতে গুড় ঘি মধু কার্পাস তুলোর বাতিতে শালপাতায় মলতা ঘাঁসের সাথে সন্ধ্যা দ্বীপ দেওয়া হয়। রাত্রে আবার গবাদিপশুর সিঙে কচড়া তেল দিয়ে, খাবার দেওয়ার পর গোয়ালঘরে জাগরণের ঘৃতপ্রদীপ স্থাপন করা হয়।

অন‍্যদিকে গরু জাগাতে হাজির ঝাঁঙগইড়া বা ধাঁঙগইড়ার দল। তাদের গৃহস্থের তৈরী পীঠেপুলিতে আপ‍্যায়ন করা হয়। ঐহিরা গীতের মাধ্যমে চলে সারারাত্রি গরু জাগরণ। পরেরদিন কৃষি যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করে ঠাকুর পিঁড়হার সামনে রাখা হয়।

আর বাড়ির গৃহিণীরা স্নান সেরে ঢেঁকিতে চালগুঁড়ি দিয়ে তৈরী করেন গরইয়ার পিঠা। গোয়ালপূজা, চোকপুরার (গরুর গোয়ালঘরের প্রবেশ পথে নির্দিষ্ট আল্পনা) জন্য। দুপুরে গোয়ালঘরে নির্দিষ্ট রীতি মেনে হয় গোয়ালপূজা। বিকেলে চোকপুরার পর তাতে সিন্দুরের ফোঁটায় রাঙিয়ে দেওয়া হয় গবাদিপশুর গোয়ালঘরে প্রবেশের পথ। রাত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম রীতি মেনে হয় গরু চুমানো (বরণ)। বাড়ির গৃহিনী নববস্ত্র পরিধান করে গবাদিপশুর পা ধুইয়ে মোড় (ধানগাছের তৈরী অলংকার) সিন্দুর পরিয়ে নতুন কুলোয় ধান দূর্বা ধূপ দ্বীপ সহযোগে এই নেগাচার পালন করেন। পরেরদিন দুপুরের আবার একই ভাবে সব গবাদিপশুকে বরণ করা হয়। বিকেলে শুরু গরু খুঁটানো।

ঐহিরা গীত পরিবেশনের মাধ্যমে ঢোল মাদল ধামসা সহ বাদ‍্যযন্ত্র দ্বারা শুকনো চামড়া দ্বারা গরুকে খুঁটানো হয়। পরেরদিন বুড়হি বাঁদনা। আগের দিনের মতো একই ভাবে ঐহিরা গীত পরিবেশনে গরু মোষ খুটানোই মেতে ওঠে পুরো মাহাত কুড়মী সম্প্রদায় তথা পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার সমস্ত আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজন। শেষ দিন কাঁটা কাড়হা অর্থাৎ ঐ দিন যাঁরা গরু, মোষ চরান তাঁদের বিশ্রাম। আমরা বংশানুক্রমে এই উৎসব পালন করে আসছি। এটি যেমন একটি মিথ, তেমনই এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও রয়েছে। সবার বিশ্বাস এই কয়দিন বুড়হাবাবা শিব মর্তে আসেন গবাদিপশুর পরিদর্শনে। তাই তাঁকে তুষ্ট করতে ও কৃষি কার্যে সহায়তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে এইসব করা হয়। আর অলসতা ও আড়ষ্ঠতা কাটাতে তথা হিংস্র পশুর আক্রমণ থেকে দলকে রক্ষা করতে গরু খুঁটানো এক উৎসবের রূপ নিয়েছে।

লেখক: শিক্ষক

Mailing List