ভোটে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ও বোমাবাজির অভিযোগ উঠলেও পূর্ব বর্ধমানে ভোট দিলেন ৮২ শতাংশের বেশি ভোটার

ভোটে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ও বোমাবাজির অভিযোগ উঠলেও পূর্ব বর্ধমানে ভোট দিলেন ৮২ শতাংশের বেশি ভোটার
22 Apr 2021, 08:50 PM

ভোটে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ও বোমাবাজির অভিযোগ উঠলেও পূর্ব বর্ধমানে ভোট দিলেন ৮২ শতাংশের বেশি ভোটার

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান

ষষ্ঠ দফায় বৃহস্পতিবার পূর্ব বর্ধমানে দ্বিতীয় পর্বে ৮টি বিধানসভা আসনে নির্বাচন সম্পন্ন হল। ওই ৮টি আসনের মধ্যে গলসি ছাড়াও এদিন অশান্ত হয় কেতুগ্রাম, মঙ্গলকোট, ভাতার ও আউশগ্রাম বিধানসভা এলাকা। পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হওয়ায় ভোটদানে সক্ষম হন ভোটাররা। তবে, অশান্তি যাই থাক ভোটদানে ভোটারদের উৎসাহ ছিল তুঙ্গে। এদিন সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত জেলায় ভোট পড়েছে ৮২,১৩ শতাংশ। ভোট দিতে পেরে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ভোটাররা।


গলসির পাশাপাশি এদিন বড় অশান্তির ঘটনা ঘটে জেলার কেতুগ্রামে ও মঙ্গলকোটে। এদিন বেলায় কেতুগ্রাম বিধানসভার ১০১ নম্বর বুথের বাইরে বিজেপি ও তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ বেঁধে যায়। সংঘর্ষ চলাকালীন বোমাবাজির ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ। দুই পক্ষের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন জখম হয়। সংঘর্ষ শুরু হতেই ভয়ে আতঙ্কে বুথে ভোট দিতে আসা ভোটাররা কেন্দ্র ছেড়ে পালিয়ে যেতে শুরু করেন।
অশান্তির কারণে এই বুথে ঘন্টাখানেক ভোট পর্ব থমকে থাকে। খবর পেয়ে বিশাল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার জন্য তৃণমূল ও বিজেপি নেতৃত্ব একে অপরের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে দায় সারেন। পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া প্রহরায় পরে বুথে ভোট গ্রহণ পর্ব চলে।
অন্যদিকে, মঙ্গলকোট বিধানসভার বড়গ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯ নম্বর বুথে এবং তালডাঙা গ্রামেও এদিন ভোট চলাকালীন অশান্তি চরমে উঠে। ৯ নম্বর বুথের তৃণমূলের এজেন্ট জগন্নাথ মণ্ডলকে মারধর করে মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতিদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, বিজেপির ২০-২৫ জন পাথর-বাঁশ-লাঠি নিয়ে হঠাৎ-ই বুথের বাইরে থাকা তৃণমূলের এজেন্ট ও সমর্থকদের উপরে চড়াও হয়। খবর পেয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রায় একই সময়ে অশান্ত হয়ে ওঠে মঙ্গলকোটের তালডাঙা গ্রাম। মঙ্গলকোটের বিজেপি প্রার্থী রাণাপ্রতাপ গোস্বামী অভিযোগে জানিয়েছেন, অজয় নদি পেরিয়ে অনুব্রত মন্ডলের লোকজন তালডাঙা গ্রামে ঢুকে বোমা ও গুলি নিয়ে এদিন বিজেপি কর্মীদের উপরে হামলা চালায়। রানাপ্রতাপবাবুর অভিযোগ তৃণমূলের লোকজন বুধবার রাত থেকে সমগ্র মঙ্গলকোট জুড়ে ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছে। তৃণমূলের সন্ত্রাসের কারণেই মঙ্গলকোট বিধানসভার অনেক বুথে বিজেপির এজেন্ট বসানো যায়নি বল বিজেপি প্রার্থী রানাপ্রতাপ গোস্বামী অভিযোগে জানিয়েছেন। বিজেপির প্রার্থীর এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে মঙ্গলকোটের তৃণমূল নেতা অপূর্ব চৌধুরী বলেন, কথায় আছে খেলতে না পারলেই উঠানের দোষ। সেই অবস্থা হয়েছে বিজেপির। সাধারণ মানুষ বিজেপিকে পরিত্যাগ করেছে বুঝতে পেরে বিজেপি প্রার্থী এখন শুধু তৃণমূলের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে মান বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধেও এদিন অভিযোগ উঠেছে। ভাতার বিধানসভার মুরাতিপুরের বাসিন্দা শেখ সাহদুল্লাহ জানান, এদিন দুপুরে তিনি তাঁদের এলাকার ৫৪ নম্বর বুথে ভোট দিতে যাচ্ছিলেন। বুথে ঢোকার আগে কেন্দ্রীয় বাহিনী বিনা প্ররোচনায় তাকে লাঠি পেটা শুরু করে। তিনি পালাতে গিয়েও পালাতে পারেননি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর মার তাঁকে হজম করতে হয় বলে শেখ সাহদুল্লাহ অভিযোগে জানিয়েছেন। কেন্দ্রীয় বাহিনীর এভাবে মারধর করা নিয়ে এদিন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ভাতারের ৫৪ নম্বর ও ৫৪-এ বুথের ভোটার মহলে। এই বিষয়ে ভাতার বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী মানগোবিন্দ অধিকারী বলেন, যে যে বুথে তৃণমূলের প্রভাব রয়েছে সেখানেই কেন্দ্রীয় বাহিনী পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছেন বিজেপি নেতাদের ইশারায়। ভোটে ভাতারের বাসিন্দারা এর যোগ্য জবাব দিয়ে দিয়েছে।
ভাতারের মতোই এদিন আউশগ্রাম বিধানসভা এলাকাতেও বিক্ষিপ্ত অশান্তির ঘটনা ঘটে। এদিন আউশগ্রাম বিধানসভা শিবদাগ্রামে বিজেপির বুথ ক্যাম্পে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। হামলায় বেশ কয়েকজন বিজেপি কর্মী আহত হন। তাদের গুসকরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করা হয়। বিজেপি নেতৃত্বের অভিযোগ আউশগ্রামে ২১০ ও ১১২ বুথের নির্দিষ্ট দূরত্বে রাস্তার ধারে বিজেপি কর্মীরা বুথ ক্যাম্পে বসেছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরা অতর্কিতে ক্যাম্পে চড়াও হয়ে বিজেপি কর্মীদের মারধর করে। যদিও তৃণমূল নেতৃত্ব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন বিজেপি নেতারা তৃণমূলের গোষ্ঠীদন্দ আড়াল করতে তৃণমূলে ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে। পাল্টা বিজেপির বিরুদ্ধেও আউশগ্রামে ১ ব্লক তৃণমূল সংখ্যালঘু সেলের সভাপতি জুলফিকার আলি মন্ডলকে মারধর করে। তাঁকে জখম করার অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসার জন্য তাকে ভর্তি করা হয়েছে গুসকরা হাসপাতালে। এলাকাবাসীর কথায় জানা গিয়েছে, এদিন আউশগ্রাম বিধানসভার ৮৫ নম্বর বুথে বিজেপি ও তৃণমূলের এজেন্টদের মধ্যে প্রথমে বচসা, পরে মারামারি শুরু হয়। সেই সংঘর্ষের মাঝে পড়ে জুলফিকারও আক্রান্ত হন। এরপর নিজের ছেলে ও দলীয় কয়েকজন কর্মী সমর্থক তাকে নিয়ে যখন চিকিৎসার জন্য বনগ্রাম স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসছিলেন তখন বিজেপি কর্মীরা তার গাড়ি আটকেও আক্রমণ চালায়। সেই হামলায় গাড়িতে থাকা ৬ তৃণমূল কর্মী ও সমর্থক আহত হন। সবচেয়ে বেশি আহত হন জুলফিকার ও তার ছেলে। জুলফিকার বলেন, ভোটের দিন তাকে যে এই ভাবে বারবার আক্রান্ত হতে হবে তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। আউশগ্রামের বিজেপি নেতৃত্ব যদিও তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে ঘটনার তদন্ত নেমে পুলিশ এক বিজেপি নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে।
ঘটনায় জেলার পুলিশ সুপার অজিত সিং যাদব জানিয়েছেন, বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া জেলায় ভোঠ পর্ব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে। অশান্তি বাঁধানোর অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

Mailing List