কন্যা সন্তান / গল্প

কন্যা সন্তান / গল্প
25 Sep 2022, 10:15 AM

কন্যা সন্তান / গল্প

 

বাসবী ভাওয়াল

 

সুমিতা দ্বিতীয় বার মা হতে চলেছে। তাই পরিবারের প্রত্যেকে একটু উৎকন্ঠায়। প্রথম কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে -এবার যদি পুত্র সন্তান হয় তাহলে ভালো হয়। বিশেষ করে সুমিতার শ্বাশুড়ি তার বংশপ্রদীপ আসবে এই আশায় প্রতীক্ষারত৷

সুমিতার মায়ের মনেও সুপ্ত আশা। এবার একটা ছেলে হলে নাতির মুখ দেখা যাবে। কিন্তু সুমিতার মা মুখে কিছু বলে না৷ সুমিতার বড়ো মেয়েকে প্রতিবেশীরা কেউ জিগ্যেস করলে, ‘তুমি সোনা কি চাও? ভাই না বোন৷’

চার বছরের সোনাই সপ্রতিভ উত্তর দিত, ‘বোন৷ বোন হলে আমি পুতুল দেবো, ভালো জামা দেবো, আমার খেলনা গাড়ি দেবো৷’ আপন মনে সোনাই বকে যেত আর ওর পরিবারের লোকজনের মুখে আঁধার নামতো৷

কেবল ওর মা হেসে বলতো বোনকে আদর করবে? মারবে না তো!

ও এককথায় উত্তর দিত 'না'৷

সুমিতা যেহেতু চাকরি করে তাই স্বাধীনভাবে ভাবতে পারে। তবে অনেক চাকরি করা মেয়েও দ্বিতীয় সন্তান কন্যা মেনে নিতে পারে না নিজেরাই৷ মন খারাপ করে, কান্না করে। এমন অনেক উদাহরণ আছে। কেউ বিশ্বাস করে বংশ কৌলীন্য রক্ষা করবে ছেলে, এই ভাবনা থেকে, আবার কেউ দুটোই প্রয়োজন এই ভাবনা থেকে ৷ কিন্তু সুমিতা সবসময় ভাবে ছেলে বা মেয়ে এটা ব্যাপার নয়, ব্যাপার হলো একটি সুস্থ সবল শিশুর জন্ম৷ শিশুর ক্ষেত্রে ওর নিষ্পাপ মুখ, ওর কান্না দেখে কোনো মা কি পারে আর অন্য কিছু ভাবনা নিয়ে থাকতে? এটা সুমিতার একেবারে নিজস্ব চিন্তার জগত৷

 

অবশেষে সব জল্পনা কল্পনার অবসান করে সেই দিন উপস্থিত। যেদিন সুমিতা দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিতে নার্সিংহোমে ভর্তি হলো৷ কথা ছিল, যে সন্তানই হোক লাইগেশন করে নেবে৷ পরের দিন অপারেশন থিয়েটারের টেবিলে তুলে স্পাইনাল কর্ডে ইনজেকশন দেবার পর ডাক্তার এসে সিজার করে৷ দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হল। পূর্ণিমার চাঁদের মতো গোল মুখ। মাথা ভর্তি কালো কোঁকড়ানো চুল। নার্সরা ঘাড় ধরে তুলে দেখিয়ে বললেন, দেখুন আপনার মেয়ে হয়েছে৷

সুমিতা হাসিমুখে মেয়েকে স্বাগত জানালো। এ হাসি মাতৃত্বের হাসি, বেশ অন্য অনুভূতি৷ হঠাৎ অনুভূতির জগতে আঘাত এলো ডাক্তারবাবুর কথায়৷ আপনার প্রথম সন্তান ছেলে না মেয়ে?

সুমিতা বলল, মেয়ে৷

ডাক্তার বললেন, এবারও মেয়ে। দেখুন লাইগেশন করবেন কিনা?

সুমিতা বলল, হ্যাঁ, তাতে কি? আপনার স্বামী যদি না চান, ওনার মতামত!

দেখুন তা তো আগেই বলা আছে, আপনার মনে হলে বাইরে আছেন জেনে নিন ৷

সুমিতার আরো আশ্চর্য লাগলো তার পরের কথায়৷ দেখুন আপনার মেয়েকে, পরে বলবেন না বাচ্চা পরিবর্তন হয়ে গেছে৷ পাশের বেডে ছেলে হয়েছে ওই দিকে দেখুন৷ সুমিতা উত্তর দিল আমার বাচ্চা আমি ঠিক চিনতে পারব, অহেতুক দুশ্চিন্তা করার কারণ নেই৷

 

অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে সুমিতা দেখলো সবাই প্রতীক্ষা করছে, ওর হাসিমুখ দেখে বাকিরা যেন অপ্রস্তুত৷ শুধু সোনাই বোনকে নেবার জন্য ব্যাকুল৷ সুমিতার বরের বন্ধু বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে। সুমিতার মায়ের মুখেও আঁধার৷ ও বলল কি হলো? তোমরা এমন মুখে কেন? আমার মেয়েকে হাসিমুখে স্বাগত জানাও৷

 

সুমিতার বরের মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠলো, "মনে পড়ে রুবি রায়"।সুমিতার বর বলছে, এতে সুমিতার দোষ কোথায়? আমার ছেলে হয়নি এটা আমার ব্যর্থতা, আমি সুমিতাকে পুত্র দিতে পারিনি৷ আমি সায়েন্স পড়েছি, আমি জানি৷

এরপর বেডে দিলে নার্সের কথা শুনে সুমিতা অবাক হলো৷ বলল বৌদি, আপনার দুঃখ হচ্ছে না, কতজন তো দ্বিতীয় বার মেয়ে হলে কেঁদে ভাসায়, বাচ্চাকে ধরে না৷

সুমিতা বলল, তাই! তাতে কি তাদের বাচ্চা মেয়ে থেকে ছেলে হয়ে যাবে! আর মেয়ে হয়ে মেয়ের জন্মে দুঃখ পেলে তো ধরে নিতে হবে এক দুঃখ আমার মাও পেয়েছিল আমার জন্মের সময়৷

নার্স হেসে বলল, সবাই এ ভাবে ভাবলে কন্যা সন্তানরা অবহেলিত হতো না৷ সব থেকে আশ্চর্য আপনার মতোই এক চাকুরিরতা মা দুদিন আগে দ্বিতীয় বার কন্যা সন্তান হয়েছে বলে খায়নি, বাচ্চাকে দুধ দিতে চায়নি৷ তার পর সবাই বুঝিয়ে ওকে স্বাভাবিক করে বলে তৃতীয় বার দেখবেন আপনার আশা পূরণ হবে। তারপর বাচ্চা নেয় কোলে। কিন্তু ভালো করে তাকিয়েও দেখে না৷

সুমিতা বলে, বাদ দাও, এবার বলো তো আমার মেয়ে একেবারে লক্ষী প্রতিমা তাই না! সামনে উপস্থিত সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নেয় সত্যিই খুব সুন্দর, খুব মিষ্টি, সবচেয়ে বড়ো কথা সৌভাগ্যবতী, আপনার মতো মা পেয়ে৷

.....

Mailing List