ছোটদের ভূগোল শিক্ষা, যান্ত্রিক আবহবিকার

ছোটদের ভূগোল শিক্ষা, যান্ত্রিক আবহবিকার
15 Nov 2022, 10:30 AM

ছোটদের ভূগোল শিক্ষা, যান্ত্রিক আবহবিকার

দীপান্বিতা ঘোষ

 

উষ্ণতা, বৃষ্টিপাত, তুষার, অভিকর্ষজ বল, নদী, বায়ুপ্রবাহ, হিমবাহ এমন কি উদ্ভিদ ও জীবজন্তু দ্বারা ভূপৃষ্ঠের শিলার যান্ত্রিক পরিবর্তন ঘটার প্রক্রিয়াকে যান্ত্রিক আবহবিকার বলে।

যান্ত্রিক আবহবিকার নিম্নলিখিত কারণে ঘটে—--

a)তাপমাত্রার পরিবর্তন দ্বারা: তাপমাত্রা বা উষ্ণতার পার্থক্যের জন্য যান্ত্রিক আবহবিকার বিভিন্নভাবে ঘটে যেমন—

i)প্রস্তর চাঁই-খন্ডীকরণ:

সজ্ঞা:উষ্ণতার তারতম্যের কারণে সৃষ্ট প্রসারণ ও সংকোচন বলের প্রভাবে শিলাস্তর যখন বড় বড় চাঁই-এর আকারে ভেঙে পড়ে তখন তাকে প্রস্তরচাঁই-খন্ডীকরন বলে।

প্রক্রিয়া: দিনের বেলা প্রখর সূর্য তাপে(প্রায় 55ডিগ্রি সেলসিয়াস ) শিলাস্তর উষ্ণ হয়ে প্রসারিত হয়। আবার রাতে উত্তাপ খুব কম (প্রায় 15-17 ডিগ্রী সেলসিয়াস)হওয়ায় শিলা দ্রুত তাপ বিকিরণ করে শীতল ও সংকুচিত হয়ে পড়ে। এইভাবে প্রতিনিয়ত অসম প্রসারণ ও সংকোচনের কারণে শিলা স্তর ব্যাপক পীড়ন সৃষ্টি হয়।

পীড়ন নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করলে শিলাস্তরে অসংখ্য উল্লম্ব ও সমান্তরাল ফাটলের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীকালে এই ফাটল বরাবর বড় বড় চাঁই মূল শিলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

উদাহরণ: মরু বা মরুপ্রায় অঞ্চলে পাললিক শিলা ওব্যাসল্ট শিলায় এই আবহবিকার অধিক দেখা যায়।

ii) শল্কমোচন:

অর্থ: "শল্ক" কথার অর্থ বাকল বা ছাল। "মোচন" কথার অর্থ ত্যাগ।

সংজ্ঞা: উষ্ণতার হ্রাস বৃদ্ধির কারণে যখন কোন শিলার উপরের স্তরটি পেঁয়াজের খোসার মতো খুলে যায় তখন তাকে শল্কমচন বলে।

প্রক্রিয়া: শিলা তাপের কুপরিবাহী হওয়ায় দিনের প্রখর সূর্যতাপে শিলাস্তরের বাইরের অংশ প্রসারিত এবং রাত্রে ঠান্ডায় সংকুচিত হয়।কিন্তু ভিতরের অংশ অপরিবর্তিত থাকে ।সমসত্ব শিলার(Homogeneous Rock) ক্ষেত্রে বাইরের স্তরটি দীর্ঘদিন ধরে প্রসারিত ও সংকুচিত হতে হতে একসময় নিচের স্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মূল শিলার স্তর থেকে পেঁয়াজের খোসার মতো খসে পড়ে ভিতরের স্তরটি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে এবং মুসলিম ও গোলাকার দেখায় আবহবিকারের এই বিশেষ প্রক্রিয়াকে শল্কমোচন গোলাকার বিচূর্ণীভবনও বলে।

উদাহরণ: গ্রানাইট শিলায় এই আবহবিকার অধিক দেখা যায়। তামিলনাড়ুর মহাবলীপুরমের কৃষ্ণভেন্দাই পানধ নামক বিখ্যাত গ্রানাইট গম্বুজটি এইভাবে সৃষ্ট।

iii)ক্ষুদ্র কণা বিশরণ:

সংজ্ঞা: দিন ও রাতের উষ্ণতার তারতম্যের কারণে সৃষ্ট সংকোচন ও প্রসারণের প্রভাবে যখন কোন শিলা ফেটে গিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয় তখন তাকে ক্ষুদ্র কণা বিশরণ বলে।

প্রক্রিয়া: বিভিন্ন খনিজ দ্বারা গঠিত বিষম সত্য শিলার বিভিন্ন খনিজ গুলি উষ্ণতার হ্রাস বৃদ্ধির ফলে ভিন্ন ভিন্ন হাড়ের সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। এইভাবে বারংবার অসম সংকোচন ও প্রসারণের ফলে শিলাটি বিভিন্ন খনিজের সংযোগ বরাবর সশব্দে ফেটে গিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোনায় ভেঙে যায়

উদাহরণ: থর, সাহারা, কালাহারি প্রভৃতি মরুভূমিতে সূর্যাস্তের পর প্রায়ই পিস্তলের গুলি ছোঁড়ার মতো শব্দ করে শিলা ফেটে যায়।

b) তুষারের কাজের ফলে আবহবিকার বা তুহিনখন্ডীকরণ :

সজ্ঞা: শীত প্রধান অঞ্চলে শিলার ফাটলের মধ্যে থাকা জল বরফে পরিণত হওয়ার ফলে প্রবল চাপে শিলা ফেটে গিয়ে টুকরো টুকরো হলে আবহবিকারের সেই প্রক্রিয়াকে তুহিন খন্ডীকরণ বলে।

প্রক্রিয়া: হিমশীতল জলবায়ু, উচ্চ অক্ষাংশ বা বা পার্বত্য অঞ্চলে দিনের বেলা বা গ্রীষ্মকালে সূর্যতাপে বরফ গলে গেলে এছাড়া বর্ষাকালে ফাটলের মধ্যে জল ঢুকে গেলে পরবর্তী কালে শীতকালে বা রাত্রিবেলায় অত্যধিক ঠান্ডায় জমে বরফে পরিণত হয়।

জল বরফে পরিণত হলে আয়তনে শতকরা নয় ভাগ বৃদ্ধি পায় বলে ফাটলের মধ্যস্থিত জল বরফে পরিণত হয়ে ফাটলের দুপাশের দেয়ালে প্রচন্ড চাপের সৃষ্টি করে। এই চাপের ফলে শিলাস্তরের ফাটল বৃদ্ধি পায় এবং শিলার স্তরটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।তুষারের কার্যের ফলে সংঘটিত হয় বলে এই প্রক্রিয়ায় আবহবিকারকে তুহিন খন্ডীকরণ বলে।

হিমায়িত কীলক গঠন: উচ্চ অক্ষাংশে বা পার্বত্য অঞ্চলে অনেক সময় বরফের কীলক গঠিত হয়,যা শিলাস্তরকে ভঙ্গুর করে তোলে।

উদাহরণ: অতি শীতল জলবায়ু অঞ্চল, উচ্চ অক্ষাংশ, উচু পার্বত্য অঞ্চলে।

তুহিন খন্ডীকরণ প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য :

i) পাললিক শিলাস্তরে তুহিন খন্ডীকরণ বেশি কার্যকরী।

ii) স্ক্রী বা ট্যালাস— তুহিন খন্ডীকরণ প্রক্রিয়ায় পর্বতগাত্রে যে কোনাকৃতি শিলাচূর্ণের সৃষ্টি হয় তাদের একসঙ্গে স্ক্রী বা ট্যালাস বলে।

iii) প্রস্তরক্ষেত্র বা ব্লকস্পেড বা ফেলসেনমার:

তুহিন খন্ডীকরণের ফলে পর্বতের পাদদেশে নুড়িক্ষেত্র সৃষ্টি হয়।এই ধরনের ভূমিরূপ ফেলসেনমার বা ব্লকস্পেড বা প্রস্তর ক্ষেত্র নামে পরিচিত।

c) জল দ্বারা:

i) বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে বৃষ্টির ফোঁটার আঘাতে শিলা দুর্বল হয়।

ii) আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে শিলার মধ্যেকার খনিজ গুলির আয়তন বৃদ্ধি পায় এবং শিলা ভঙ্গুর হয়।

iii)  দ্রুত প্রবাহমান জলধারার মধ্যেকার বুদবুদ ও ঘূর্ণি শিলাকে দুর্বল করে।

 

d)সমুদ্র তরঙ্গ দ্বারা: সমুদ্র তরঙ্গের আঘাতে শিলাস্তর চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়।

e)বজ্রপাতের দ্বারা: ভূপৃষ্ঠের যেসব অঞ্চলে বজ্রপাত বেশী হয়, সেখানে বজ্রপাতের প্রচণ্ড শব্দে শিলা ফেটে যায়।

f) শিলাস্তরের চাপ হ্রাস: নদী হিমবাহ বায়ুপ্রবাহ ইত্যাদি প্রাকৃতিক কারণে উপরের শিলা স্তর অপসারিত হলে নিচের উন্মুক্ত হয়ে পড়ে এবং চাপমুক্তির কারণে আয়তনে প্রসারিত হয় ফলে পার্শ্ববর্তী শিলা স্তরের সঙ্গে সমতা রাখতে না পেরে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়।

g)লবণ কেলাস: সূর্য তাপে জল বাষ্পীভূত হলে শিলার মধ্যে লবণ করার সৃষ্টি হয় ,ওই লবণ কণা শিলাস্তরে ফাটল সৃষ্টি করে।

h) কলয়েডীয় উৎপাটন: মৃত্তিকার একটি কুদরতি ক্ষুদ্র কণা হল ফলের এক প্রকার জৈব ও খনিজের সমন্বয়ে গঠিত আঠালো পদার্থ এই কলয়েডশিলার সংস্পর্শে এলে শিলা শিথিল হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়।

i)জৈবিক কার্যাবলী: বৃক্ষ ছেদনের পর মাটি নিচে থাকা শিলা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে কিন্তু ইন্দুর প্রেজি কুকুর খরগোশ পিঁপড়ে ওই ভূপৃষ্ঠে গর্ত করে শিলাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে।

লেখক: ভূগোলের শিক্ষিকা, নান্দারিয়া হাইস্কুল, শালবনি, পশ্চিম মেদিনীপুর.

Mailing List