শিকাগো বক্তৃতা: স্বামীজি বিশ্বকে বুঝিয়েছিলেন ধর্মের অন্তর্নিহিত অর্থটি, যা আজও প্রাসঙ্গিক

শিকাগো বক্তৃতা: স্বামীজি বিশ্বকে বুঝিয়েছিলেন ধর্মের অন্তর্নিহিত অর্থটি, যা আজও প্রাসঙ্গিক
13 Sep 2020, 06:57 PM

শিকাগো বক্তৃতা: স্বামীজি বিশ্বকে বুঝিয়েছিলেন ধর্মের অন্তর্নিহিত অর্থটি, যা আজও প্রাসঙ্গিক

সুদর্শন নন্দী                        

১৮৯৩-এর ১১ সেপ্টেম্বর। শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে বসেছিল ‘দ্য পার্লামেন্ট অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়নস’। প্রথম দিনেই আমেরিকাবাসীদের মন জয় করে নিয়েছিলেন তিনি। ১১-এর পরে আরও পাঁচ দিন স্বামীজি ১৫, ১৯, ২০, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বরও বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং ধর্ম, সংস্কৃতি, মানবসভ্যতা নিয়ে অনেক কিছু বলেছিলেন যা আজও প্রাসঙ্গিক। বলা ভাল প্রাসঙ্গিক  থাকবে যুগে যুগে।
ঠাকুর বলেছিলেন নরেন হাঁক দিবে। অর্থ্যাৎ সারা পৃথিবীকে জানান দেবে। কি জানান দেবে? সেটি হল ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দর্শন। ধর্মে কোন ভেদাভেদ নেই। সব ধর্মই ঈশ্বরের পথটি বলে দেয়। আর নিজের স্বরূপকে চেনা। জীবের মধ্যেই ঈশ্বরের প্রকাশ। এই অনুভূতিগুলি থাকলেই সব হিংসা, মারামারি, ধর্মের নামে হানাহানি বন্ধ হবে।
সনাতন হিন্দুধর্মের উদার ভাবটি বিশ্বকে বলতে গিয়েছিলেন তিনি। এতো গেল মূল দিক। এর মধ্যেও আরো কয়েকটি কারণ রয়েছে বলেই স্বামীজির প্রিয় মানুষেরা মনে করেন। স্বামীজি সারা ভারত চষে বেড়িয়ে মানুষের ক্ষুধা, শিক্ষা, সাম্যের অভাবটা লক্ষ্য করেছিলেন। খালি পেটে মানুষের আত্মজাগরণ সম্ভব নয়। তাই পাশ্চাত্যের উন্নতির পিছনে বিজ্ঞান, কারিগরীর বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়েছিল। অনেকের মতে একদিকে ভারতের সুদৃঢ় অধ্যাত্মবাদকে প্রচার করা ও অন্যদিকে পাশ্চাত্ত্যের উন্নতির দিকগুলি আত্মীকরণ করাও অন্য এক তাগিদ ছিল তাঁর। অর্থ্যাৎ তাঁর বিদেশ যাবার কারণগুলি হল ভারতবর্ষের এবং ভারতবাসীর উত্থান। এবং বিশ্ববাসীকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বাঁধা।
উত্তর-পূর্ব রাজস্থানে খেতড়ির রাজা অজিত সিংহ বিবেকানন্দকে শিকাগো যাওয়ার জন্য ‘ওরিয়েন্ট’ জাহাজে ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কিনে দেন। কিন্তু সেখানে গিয়েও ছিল থাকা খাওয়া ও বর্ণ-বিদ্বেষের সমস্যা। তাছাড়া ধর্ম সম্মেলনে যোগ দেওয়ার মতো কোনও পরিচয় বা সুপারিশ তাঁর কাছে ছিল না। 


শেষ পর্যন্ত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হেনরি রাইটের ব্যক্তিগত পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি ওই সম্মেলনে মাত্র তিন মিনিট বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং শুরুতেই আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন। তিনি বললেন, সাম্পদায়িকতা, গোঁড়ামি ও এগুলির ভয়াবহ ফলস্বরূপ ধর্মোন্মত্ততা এই সুন্দর পৃথিবীকে বহুকাল অধিকার করে রেখেছে। এরা পৃথিবীকে হিংসায় পূর্ণ করেছে, সভ্যতা ধ্বংস করেছে এবং সমগ্র জাতিকে হতাশায় মগ্ন করেছে। বললেন, আমি সেই ধর্মের মানুষ হতে পেরে গর্বিত, যে ধর্ম গোটা পৃথিবীকে সহিষ্ণুতা এবং বিশ্বজনীনতার শিক্ষা দিয়েছে। ... আমরা চিরন্তন সহিষ্ণুতায় বিশ্বাস করি, শুধু তাই নয়, আমরা সব ধর্মমতকেই সত্য বলে স্বীকার করি। আমি সেই জাতির প্রতিনিধি হিসেবে গর্বিত, যে জাতি পৃথিবীর সব ধর্মের এবং সব জাতির নিপীড়িত মানুষকে এবং শরনার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে। স্বামীজির শিকাগো বক্তৃতার অন্যতম বিষয় ছিল ধর্ম নিয়ে হানাহানি এবং সংকীর্ণতাবোধ।  স্বামীজি এ বিষয়ে সবাইকে চমকে দিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর একটি উদাহরণ দিয়েছিলেন যা যুগে যুগে প্রাসঙ্গিক ও শিক্ষণীয়। ধর্ম-মহাসভার পঞ্চম দিনে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিরা তর্ক বিতর্কে নিযুক্ত হন; শেষে স্বামী বিবেকানন্দ এই গল্পটি বলে সকলের মুখ বন্ধ করে দেন। “আমি আপনাদিগকে একটি ছোট গল্প বলিব। এইমাত্র যে সুবক্তা ভাষণ শেষ করিলেন, তাঁহার কথা আপনারা সকলেই শুনিয়াছেন-‘এস আমরা পরস্পরের নিন্দাবাদ হইতে বিরত হই’। মানুষে মানুষে সর্বদা একটা মতভেদ থাকিবে ভাবিয়া বক্তা-মহাশয় বড়ই দুঃখিত। তবে আমি আপনাদের একটি গল্প বলি, হইতো তাহাতেই বুঝা যাইবে-এই মতভেদের কারণ কি।
একটি ব্যাঙ একটি কুয়ার মধ্যে বাস করিত। সে বহুকাল সেইখানেই আছে। যদিও সেই কুয়াতেই তাহার জন্ম এবং সেইখানেই সে বড় হইয়া উঠিয়াছে, তথাপি ব্যাঙটি আকারে অতিশয় ক্ষুদ্র ছিল। অবশ্য তখন বর্তমান কালের ক্রমবিকাশবাদীরা কেহ ছিলেন না, তাই বলা যায় না, অন্ধকার কূপে চিরকাল বাস করায় ব্যাঙটি দৃষ্টিশক্তি হারাইয়াছিল কি না; আমরা কিন্তু গল্পের সুবিধার জন্য ধরিয়া লইব তাহার চোখ ছিল। আর সে প্রতিদিন এরূপ উৎসাহে কুয়ার জল কীট ও জীবাণু হইতে মুক্ত রাখিত যে, সেরূপ উৎসাহ আধুনিক কীটাণুতত্ত্ববিদ্‌গণেরও শ্লাঘার বিষয়। এইরূপে ক্রমে ক্রমে সে দেহে কিছু স্থূল ও মসৃণ হইয়া উঠিল। একদিন ঘটনাক্রমে সমুদ্রতীরের একটি ব্যাঙ আসিয়া সেই কূপে পতিত হইল।
কূপমণ্ডূকে জিজ্ঞাসা করিল, ‘কোথা থেকে আসা হচ্ছে?’
‘সমুদ্র থেকে আসছি।’
‘সমুদ্র? সে কত বড়? তা কি আমার এই কুয়োর মতো বড়?’ এই বলিয়া কূপমণ্ডূক কূপের এক প্রান্ত হইতে আর এক প্রান্তে লাফ দিল।
তাহাতে সাগরের ব্যাঙ বলিল, ‘ওহে ভাই, তুমি এই ক্ষুদ্র কূপের সঙ্গে সমুদ্রের তুলনা করবে কি ক’রে?’ ইহা শুনিয়া কূপমণ্ডূক আর একবার লাফ দিয়া জিজ্ঞাসা কলিল, ‘তোমার সমুদ্র কি এত বড়?’
‘সমুদ্রের সঙ্গে কুয়োর তুলনা করে তুমি কি মূর্খের মতো প্রলাপ বকছ?’
ইহাতে কূপমণ্ডূক বলিল, ‘আমার কুয়োর মতো বড় কিছুই হ’তে পারে না, পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় আর কিছুই থকতে পারে না, এ নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী, অতএব একে তাড়িয়ে দাও।”
এই গল্প বলে স্বামীজি সকলকে ভাই সম্বোধন করে বললেন, এমন সংকীর্ণ ভাবই আমাদের মতভেদের কারণ। আমি একজন হিন্দু -আমি আমার নিজের ক্ষুদ্র কূপে বসে আছি এবং সেটিকেই সমগ্র জগৎ বলে মনে করছি! খ্রীষ্টধর্মাবলম্বী তাঁর নিজের ক্ষুদ্র কূপে বসে আছেন এবং সেটিকেই সমত্র জগৎ মনে করছেন! মুসলমানও নিজের ক্ষুদ্র কূপে বসে সেটিকেই সমগ্র জগৎ মনে করছেন!
এই বক্তব্য শুনে সবধর্মের মানুষজন একেবারে চুপ হয়ে গেলেন। 
এভাবে স্বামীজি জগৎবাসীর কাছে তাঁর যুক্তিপূর্ণ ও বুদ্ধিদীপ্ত বক্তৃতার মধ্য দিয়ে ধর্মের অন্তর্নিহিত অর্থটি বুঝিয়েছিলেন, জানিয়েছিলেন এ দেশের সনাতন ধর্মের মূলকথা যে মানুষ তথা সবের মধ্যেই রয়েছে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সেই চিরন্তন সত্যটি।

                          ****

Mailing List