ছৌ মুখোশের আঁতুড়ঘর পুরুলিয়ার চড়িদা

ছৌ মুখোশের আঁতুড়ঘর পুরুলিয়ার চড়িদা
04 Nov 2022, 03:15 PM

ছৌ মুখোশের আঁতুড়ঘর পুরুলিয়ার চড়িদা

ড. সমরেন্দ্র নাথ খাঁড়া

     

পুরুলিয়া ভ্রমনের এবং অযোধ্যা পর্যটনের অন্যতম একটা প্রধান স্থান (স্পট) হলো মুখোশ গ্রাম। পুরুলিয়া মানে "ছৌ মুখোশ"।ছৌ মুখোশের গ্রামের নাম চড়িদা। পুরুলিয়া থেকে ৫৬ কিমি দূরে (অযোধ্যা হিল পথে) অবস্থিত। পুরুলিয়া শহর থেকে দুই ঘন্টার কিছু কম পথ।বাঘমুন্ডি দিয়ে গেলে ৬০ কিমি।পুরুলিয়া জেলার বাঘমুন্ডি ব্লকে অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে এই গ্রামটি বাঘমুন্ডি থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ইংরেজরা বলত বা ম্যাপে লেখা আছে Chorda ( চোর্দা)।

       

২০১৬ সালের হোলির ছুটিতে পরিবারের এগারো জন মিলে পুরুলিয়া ভ্রমনের সময় এই গ্রাম দেখেছিলাম। আবার ২০২২ সালের মার্চ ও অক্টোবর মাসে অফিসের কাজের সূত্রে আবার চড়িদার মুখোশ গ্রাম খুব ভালোভাবে দেখলাম ও শিল্পীদের সাথে বেশ আলাপচারিতা হলো।চড়িদায় শ'-খানেক পরিবার ছৌ মুখোশ তৈরি করে৷ শিল্পীর সংখ্যা প্রায় ৩০০-র মতো৷ কয়েক প্রজন্ম ধরে এরা ছৌ নাচের মুখোশ তৈরী করে চলেছেন।এখানে একের পর এক ছোট ছোট বাড়িতে সার দিয়ে সাজানো শুধুই রঙ বেরঙের মুখোশ। এই গ্রামটিকে ছৌ-নাচের মুখোশের জন্মস্থান তথা আঁতুরঘর বলা যায়।রাস্তার দু'ধারে সারি সারি মুখোশের দোকান৷ সাধারণ অন্যান্য মুখোশের সাথে, প্রাধান্য ছৌ নাচের মুখোশ৷ ছৌ নাচের সাজসজ্জায় প্রধান উপকরণ মুখোশ৷ গ্রামে ঢোকার পথেই রাস্তার দু'ধারে ছৌ মুখোশের  দোকান৷শুধু দোকান বলা ভুল হবে, এগুলো একাধারে শিল্পালয়৷এখানে বসেই দিন-রাত শিল্পীরা মুখোশ তৈরির কাজ করেন।এই গ্রামের বাসিন্দাদের জীবিকা বলতে এই একটাই—ছৌ মুখোশ তৈরি৷তাদের তৈরি মুখোশ শুধু নাচেই ব্যবহৃত হয় না,এখন দেশ-দেশান্তরের চড়িদার মুখোশ সুসজ্জিত ড্রইংরুম আলো করে থাকে।পশ্চিমবঙ্গের মতো ঝাড়খণ্ড, সেরাইকেলার ও ওড়িশার ময়ূরভঞ্জের ছৌ বিখ্যাত৷ কিন্তু ঝাড়খণ্ড,সেরাইকেলা ও ময়ূরভঞ্জে মুখোশ ব্যবহার করা হয় না৷ মুখোশের জন্য পুরুলিয়ার ছৌ বিশিষ্টতা পেয়েছে।পুরুলিয়ায় ছৌ দলগুলি এই গ্রাম থেকেই সারা বছরের প্রয়োজনীয় মুখোশ সংগ্রহ করে৷ পুরুলিয়ার আরও কয়েকটি গ্রামে শিল্পীরা এখন ছৌ মুখোশ তৈরি করছেন। ইদানিং ঝাড়খণ্ড, ওডিশার ছৌ নাচের দলগুলি চড়িদার মুখোশ কিনে নিয়ে যায়।

বাঘমুন্ডি রাজপরিবারের দুর্গাপুজোর প্রতিমা গড়তে বর্ধমানের সূত্রধরেরা এসেছিলেন। তাদের মাধ্যমেই মুখোশের প্রচলন শুরু হয়েছিল। জনশ্রুতি বাগমুন্ডির রাজা মদন মোহন সিং দেও দেড় শো বছর আগে বর্ধমান থেকে চড়িদা গ্রামে কারিগর সূত্রধরদের নিয়ে এসেছিলেন। তাদের বংশধররাই এই কাজ করে চলেছেন। চড়িদা গ্রামের নামে দা বা দহ শব্দটি আছে। দা শব্দের অর্থ ‘দহ’ বা ‘হ্রদ’। এই গ্রামে ভূগর্ভে প্রচুর জল ছিল। তাই এখানকার মানুষ আগে পুরোপুরি কৃষিনির্ভর ছিলেন। সূত্রধর পরিবারগুলি কাঠের কাজ করতেন।কেউ কেউ মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছৌ নাচের হাত ধরে এখানে মৃৎশিল্পের বিকাশ ঘটে।কয়েক দশক আগেও সারা বছর ধরে মুখোশের কাজ চলত না, তখন তারা সিন্দুক, পালকি তৈরী করতো।বর্তমানে বিভিন্ন কারণে এদের বিকল্প পেশার খোঁজ করতে হয় না।যেমন - দুর্গাপুজো-কালীপুজোর থিমের মন্ডপ তৈরী করতে, পুরুলিয়া শহরের সরকারি দপ্তরগুলি, অসংখ্য হোটেল, লজ, হোম স্টে, পর্যটন আবাসের রিসেপশনে, ঘরে ঘরে, পর্যটকদের নিজস্ব বাড়ী সাজাতে ও আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধবকে উপহার দিতে, অন্য রাজ্য তথা বিদেশে চাহিদাও বেড়েছে। গম্ভীর সিং মুড়া বিদেশে ছৌ নাচের অনষ্ঠানের মাধ্যমে এই মুখোশের বিশ্বায়ন ঘটানোয়,তার  অবদানকে শিল্পীরা সম্মান ও গর্বের সাথে স্বীকার করেন। এখন গাঙ্গুলী, দত্ত, রায় বিভিন্ন পদবীর মানুষ এই কাজের সাথে যুক্ত।

  

চৈত্র সংক্রান্তিতে প্রথম ছৌ মুখোশ পরিহিত ছৌ নাচ পালা লহরিয়া শিব মন্দিরে শিবের আশীর্বাদ নিতে অনুষ্ঠিত হয়। মূলত মহিষাসুরমর্দিনীকে তুলে ধরার জন্য এই ছৌ নাচ পালা অনুষ্ঠিত হয়।বিশেষত পুরুষেরা এই ছৌ নাচ পালায় অংশগ্রহন করে থাকে।চৈত্রমাস থেকে জ্যৈষ্ঠ মাসে মুখোশের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।

 রামায়ন, মহাভারত বই দেখে শিব, দুর্গা, কালি প্রভৃতি দেবতার মুখের আদল বুঝে প্রথম মুখোশ তৈরী করা হয়েছিল।প্রথম দিকে গাছের ফল, পাতা, শেকড়, নদীর পাথর প্রভৃতি প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে ছৌ মুখোশ তৈরী করা হতো। বর্তমানে মুখোশ তৈরী করতে আঠালো মাটি, পুরনো পাতলা কাপড়, খবরের কাগজ, তেঁতুল বীজের বা ময়দার আঠা, পাট, ধুনো, ছাইয়ের গুঁড়ো, পাখীর ও ময়ূরের পালক, রাংতা, পুঁতি, সলমা চুমকি, গর্জন তেল, বিভিন্ন রং ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।যন্ত্র যা ব্যবহার করা হয় - কাঁচি, ছুরি, বাটালি, কর্নিক, হাতুড়ি ইত্যাদি।

প্রথমে 'ছাঁচা'  অর্থাৎ আঠালো কাদার তাল দিয়ে একটা নমুনা মুখমণ্ডলের আদল তৈরী করা হয়।দুদিন ধরে রোদে শুকানোর পর,তার উপর মিহি ছাইয়ের গুঁড়ো ছড়িয়ে দেওয়া হয়।এর পর পুরনো খবরের কাগজ আঠায় চুবিয়ে দলা পাকিয়ে, সেটাকে আবার খুলে ছাঁচার উপর আট-দশ টা স্তরে লেপটে দেওয়া হয়।একে বলা হয় 'চিটানো '। কাগজ সাঁটা শেষ হলে তার উপর মাটি দিয়ে চোখ, নাক, ভ্রু, ঠোঁট ও থুতনির যথাযথ রুপটান দেওয়া হয়।আঠালো কাদামাটির মধ্যে ভিজিয়ে রাখা একদম পাতলা পুরানো কাপড়ের টুকরোগুলোকে এর ওপর লেপটে দেওয়া হয়। একে 'কাবিজ লেপা' বলে। মূর্তিটার উপর বিশেষ এক ধরনের কাঠের কর্নিকের মতো যন্ত্র দিয়ে মসৃণ করার জন্য পালিশ করা শুরু হয়।একে বলে 'থুপি' পালিশ। রোদে শুকিয়ে নেবার পর মাটির ছাঁচ থেকে কাগজ-কাপড়ের আস্তরণ টাকে খুলে মুখোশের প্রতিকৃতিটাকে বের করে নেওয়া হয়। এবার মুখোশটায় চোখ ও নাকের ছিদ্র করে প্রথমে খড়ি গোলা রং করা হয়।তারপর চরিত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট রং করা হয়। যেমন - নীল রং করা হয় রাম ও কৃষ্ণের,কালো রং মহিষাসুরের, সাঁওতাল দম্পতির ক্ষেত্রে কালচে বাদামী বা চকলেট রংয়ের করা হয়। এরপর তুলি-রং দিয়ে চোখ, মুখ, গোঁফ আঁকার পর গর্জন তেল দিয়ে উজ্জ্বল করা হয়।আসল মুখোশ তৈরী হবার পর অঙ্গ সজ্জা ও মুকুট পড়ানো হয়। নাইলনের চুল বা কালো রং করা শনের চুল লাগানো হয়।এরপর লোহার তার দিয়ে রাংতা,পুঁতি,সালমা চুমকি,পাখীর ও ময়ূরের পালক,জামির পাতা শক্তপোক্ত করে বাঁধা হয়। এইভাবেই তৈরী হয় 'পাঁচ-খিলান' মুখোশ।

      এখন রাম, লক্ষ্মণ, সীতা, হনুমান, রাবণ, ভীম, অর্জুন, পরশুরাম, দুর্যোধন, অভিমন্যু, মহিষাসুর, কার্তিক, গণেশ, শিব, মনসা। তাছাড়া বাঘ, সিংহ, ময়ূর, ঘোড়া, বরাহ প্রভৃতি এবং ঘর সাজাতে জটাধারী শিব, টিয়াপাখি, সাঁওতাল দম্পতি তৈরী হচ্ছে।

 স্থানীয় মানুষের মতে, নকুল দত্ত প্রথম বড়ো ছৌ মুখোশকে ঘর সাজানোর ছোটো মুখোশে পরিনত করেছে।প্রথম ছোটো মুখোশ হলো আদিবাসী নর-নারীর।কোনো শিল্পী পরিবার শুধু ঘর সাজানোর ছোট মুখোশ,কোনো পরিবার আবার দু-ধরনেরই মুখোশ বিক্রি করে৷মোটের উপর পরিস্থিতি একটু ভালো হয়েছে, সবার ঘরে হাসি ফুটেছে।

  ছৌ-নাচের পদ্মশ্রী নেপাল মাহাতো সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন। তিনি বলেছিলেন 'চড়িদাকে দেখে শিখতে হবে ছৌ দলগুলিকে। চড়িদা এখন শুধু মুখোশ করে না। শিল্পীরা ঘর সাজানোর মৃৎশিল্প করছেন। এটাকে জীবিকা করেছেন।'

    আসলে ছৌ নাচের যে মুন্সিয়ানা আছে তার অন্যতম আকর্ষণ মুখোশ।বিশ্বের যে কোনও জায়গায় ছৌ দল যায়, তারা মহিষাসুর বধ পালা প্রদর্শন করে। মুখোশ পরা দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, মহিষাসুর ও সিংহ যখন প্রতিমার মতো দাঁড়িয়ে পড়ে,তখন সকলে হতবাক হয়ে যান।

  এখানকার অন্যতম বড় শিল্পালয় 'সুচাঁদ মুখোশ ঘর'-এর এ প্রজন্মের কর্ণধার কিশোর সূত্রধরকে পাওয়া গেল৷ তিনি জানালেন 'পুরুলিয়ার প্রায় তিনশো ছৌ দল আমাদের কাছ থেকে প্রতি বছর মুখোশ নেয়৷ আমাদের তৈরি মুখোশ দিয়ে ৭০-৮০টি নাইট ছৌয়ের পালা হেসেখেলে অভিনয় করা যায়৷ প্রতি বছর একটি দল এর থেকে বেশি পালাও করে৷''

      এখন শহরের পাকা ও ঘেরা মঞ্চে ছৌ প্রদর্শন হলেও গ্রামীণ এলাকায় খোলা মঞ্চেই এই পালা উপস্থাপিত হয়৷ ছৌ নাচের অন্যতম বৈশিষ্ট্য শারীরিক কসরত৷ এর ফলে মেঠো খোলা মঞ্চ থেকে ধুলো ওড়ে৷ তাতে মুখোশ নষ্ট হতে থাকে৷একটা মরশুমের বেশি চালানো যায় না৷এই মুখোশের দাম কত, জানতে চাইলে, কিশোর সূত্রধর জানান 'দল যেমন চায় সেই দামে তৈরি করা হয়৷চার হাজার থেকে ছয় হাজার পর্যন্ত হয়৷ কী দিয়ে এবং কী দিয়ে মুখোশ তৈরি হচ্ছে তার উপর দাম নির্ভর করে৷'

  রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তে পরিস্থিতি অনেকটা বদলেছে। এখন ছৌ শিল্পীদের মাসিক এক হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়৷এই অর্থের একাংশ তাদের দল চালানোর পুঁজি হিসেবে কাজ করছে৷ এখন ছৌয়ের দল বাড়ার ফলে মুখোশের চাহিদাও বেড়েছে।কিশোরের বাবা দ্বিজেন সূত্রধর বলেন,‘বছরে লাখ দেড়েক টাকা একটি দলের সাজসজ্জা বাবদ খরচ লাগে।শুধু মুখোশ নয়,তার সঙ্গে পোশাকও আছে৷এই টাকা জোগাড় করা মুশকিল হতো৷ ভাতা মেলায় শিল্পীদের সেই সমস্যা মিটেছে৷'

        একটা সময় ছৌ দলের শিল্পীদের জন্য মুখোশ তৈরিই একমাত্র কাজ ছিল চড়িদার মানুষদের৷ কিন্তু ছৌ জনপ্রিয়তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর মুখোশের চাহিদা বাড়তে লাগল৷এর ফলে চড়িদার অনেক শিল্পালয়ে এখন ঘর সাজানোর মুখোশ তৈরি হচ্ছে৷এগুলি স্বাভাবিকভাবেই নাচের মুখোশের থেকে অনেক ছোট ও কম দামি৷ এই গ্রামে নিত্য পর্যটকদের আনাগোনা লেগে থাকে৷তারাই সফরের স্মৃতি হিসেবে এই মুখোশ সংগ্রহ করে নিয়ে যান৷ এর ফলে এখানকার গড়পরতা শিল্পীদের আর্থিক অবস্থা উন্নত হয়েছে৷প্রবীণ শিল্পী সজল দত্ত জানান, ‘‘আমি আগে গ্রামের ভিতর বাড়িতে এই কর্মশালা চালাতাম৷কিন্তু রাস্তার উপর দিয়ে পর্যটকরা যাতায়াত করেন বলে এখানে বিক্রি বেশি৷ তাই এখানে দোকান খুলেছি৷ ভালোই হচ্ছে বিক্রিবাটা৷''

     এখন মুখোশ বিক্রির ব্যবস্থাও বেড়েছে। যদিও বাজারের অভাব পুরোপুরি দূর হয়নি৷পুরুলিয়া জেলা প্রশাসনের ই-গ্রামীণ হাটের মাধ্যমে অনলাইনে মুখোশ কেনার ব্যবস্থা থাকলেও ছৌ নাচের দলগুলি এখনো চড়িদা আসে মুখোশ কিনতে৷ছৌ শিল্পী জগন্নাথ চৌধুরী তার নিজের দলের জন্য মুখোশ কিনতে এই গ্রামে যেতে পছন্দ করেন৷ তিনি বলেন, ‘‘শিল্পীদের মুখের মাপের সঙ্গে মিলিয়ে মুখোশ কিনতে হয়৷ তাই অনলাইনে কেনা যায় না৷ তাই চড়িদা যেতেই হয়৷''

      ২০১৪ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদ ও রুরাল ক্রাফ্ট হাবস অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল-এর যৌথ উদ্যোগে চড়িদায় ছৌ মুখোশের মেলা হচ্ছে৷আয়োজনে চড়িদা ছৌ মুখোশ শিল্পী সূত্রধর সমিতি ও বাংলা নাটক ডট কম৷এই সংস্থার তরফে অমিতাভ ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘শুধু শিল্পের প্রচার হলেই শিল্পী বাঁচে না৷ গ্রাম,শিল্পী ও শিল্প এই তিনটের একটি ইউনিট হিসেবে প্রচার ও প্রসার করতে হবে৷আগে ছৌ নাচের ২০টি দল ছিল৷ তা থেকে আজ ৩০০ দল হয়েছে৷ তেমন ভাবেই যে ছৌ মুখোশ শিল্পটা ধুঁকছিল, তা চাঙ্গা হয়েছে৷এর ফলে এই শিল্প নির্ভর গ্রামে অর্থনীতিও পাল্টেছে৷'

    দ্বিজেন সূত্রধর বলেন ‘আমরা ছৌ শিল্পের অঙ্গ।কিন্তু ছৌ শিল্পীদের ভাতা আছে,আমাদের নেই৷ আমাদের জন্যও ভাতার ব্যবস্থা করা হোক৷এ ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানানো হয়েছে৷''

   ফাল্গুনী সূত্রধর মুখোশ নির্মাণের কাজে খুবই পরিচিত একজন শিল্পী। তিনি সবসময়েই নিজের কাজে নতুন সৃষ্টির সন্ধান করেন। ঐতিহ্যবাহী মুখোশ ছাড়াও, তিনি অনেক নতুন সৃষ্টির উদ্ভাবন করেছেন যা অজস্র মানুষের প্রশংসা পেয়েছে। তিনি রাজ্য এবং জাতীয় স্তরের অনেক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন শুধুমাত্র নিজের শিল্পকর্ম বিক্রির উদ্দেশ্য নিয়ে নয়,তিনি নিজেদের শিল্পশৈলীর প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

     ত্রিগুণী সূত্রধর একজন মুখোশ নির্মাণ শিল্পী এবং যখন তার মাত্র ১০ বছর বয়স তখন বাবা এবং ঠাকুরদার কাছ থেকে এই কাজটি শেখেন।বর্তমানে তিনি ৫৫ বছর বয়সী এবং পরিবারের অন্যান্য তরুণ শিল্পীদের সঙ্গে সঙ্গে নিজেও কাজ করে চলেছেন।

    সজল দত্ত, বয়স ৫১ বছর। তিনি ছোটোবেলা থেকেই মুখোশ নির্মাণের কাজটি শিখেছেন।এই কাজের শুরু তার বাবার তত্ত্বাবধানে যিনি তাকে হস্তশিল্প নির্মাণ কাজের এই চর্চায় প্রভুতভাবে সমর্থন জুগিয়েছেন।নিজেদের শিল্পকর্মটিকে প্রদর্শিত করার জন্য তিনি জাতীয়স্তরের অনেক সেমিনার ও প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। এই কাজে তার গভীর জ্ঞানের দিকটিকে বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা বাহবা জানিয়েছেন।

   পরিমল দত্ত,বয়স ৩৫ বছর,একজন সুদক্ষ ছৌ মুখোশ নির্মাতা হিসেবে পরিচিত।যখন তার ৭ বছর বয়স তখন থেকেই বাবা বিমল দত্তের কাছে এই কাজ শিখেছেন। এই তরুণ শিল্পী নতুন নতুন বিভিন্ন রকমের মুখোশ তৈরি করতে পারেন।

   ধর্মেন্দ্র সূত্রধর,বয়স ৩৩ বছর।মাত্র ১০ বছর বয়সে মুখোশ তৈরির কাজ শুরু করেন।ছৌ নাচে ব্যবহারের জন্য ঐতিহ্যবাহী মুখোশ এবং তার বাইরের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও মুখোশ তৈরি করেন।রবীন্দ্র সাহিত্য-নির্ভর কাজ যেমন তাসের দেশ, ধর্মীয় বিষয় যেমন পশুপতিনাথ ইত্যাদির জন্য মুখোশ তৈরী করেছেন।

     ২০১০ সালে ছৌ নাচ ইউনেস্কোর স্বীকৃতি যেমন পেয়েছে তেমনি,এবার সেই মুখোশের জি,আই ( Geographical Indication) ট্যাগ পেল বাংলার চড়িদা গ্রাম।তারা ৫৬৫ নম্বর যুক্ত শংসাপত্র পেয়েছেন।প্রসঙ্গত, পুরুলিয়া জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের সভাকক্ষে, ৮ই আগস্ট ২০২২ সেই বাঘমুন্ডির ব্লকের ছৌ-মুখোশ প্রস্তুতকারী শিল্পীদের হাতে মুখোশের জি,আই প্রাপ্তির শংসাপত্র তুলে দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও জৈব প্রযুক্তি দফতরের উদ্যোগে এবং পুরুলিয়া জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে বাংলার জি,আই ট্যাগ প্রাপ্ত জিনিসের তালিকায় নতুন এক সংযোজন ঘটল।এবার থেকে তারা বিশ্বের যেকোনও বাজারে নিজেদের তৈরি মুখোশ বিক্রি করতে পারবেন।তারা অনলাইনের মাধ্যমেও জিনিসপত্র বিক্রি করতে পারবেন।

 

ছবি: নিজস্ব ও শ্রী মুরলী মোহন কুইরী।

তথ্য সূত্র:

১) মুখোশ শিল্পীদের সাথে কথোপকথন।

২) এখন খবর: বাংলা শিরোনাম:August 11, 2022.

৩) ছৌ -মুখোশের গ্রাম: শুভাশিস চক্রবর্তী: আনন্দ বাজার পত্রিকা: ১৬/১০/২০২২

৪) আন্তর্জাল।

লেখক: উদ্যানপালন দফতরের পদস্থ আধিকারিক, পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

Mailing List