কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এখনও গর্বিত ‘বাংলার বাঘ’ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জন্য, তাঁর জন্মদিনে ফিরে দেখা

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এখনও গর্বিত ‘বাংলার বাঘ’ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জন্য, তাঁর জন্মদিনে ফিরে দেখা
01 Jul 2021, 01:23 PM

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এখনও গর্বিত বাংলার বাঘ’ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জন্য, তাঁর জন্মদিনে ফিরে দেখা

 

ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী

 

স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় (২৯ জুন ১৮৬৪ - ২৫ মে ১৯২৪)। যাঁর একশত আটান্নতম জন্মদিন পেরিয়ে গেল গতকাল ২৯ জুন, বুধবার। যাঁকে ‘বাংলার বাঘ’ নামেই চেনেন সকলে। কিন্তু কেন তিনি ‘বাংলার বাঘ’? তিনিও যে বাংলার অন্যান্য পন্ডিতপ্রবরদের থেকে কোনও অংশে কম ছিলেন না, তা হয়তো অনেকের অজানা। তাঁর জন্মদিনে ছোট্ট পরিসরে তাঁর জীবনকে ফিরে দেখা।

 

‘বাংলার বাঘ’ নামে পরিচিত স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় একজন সফল বাঙালি| কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় উপাচার্য ও কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন| কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেছেন| ১৯১১ সালে পেয়েছেন ‘নাইটহুড’ উপাধি|

 

১৮৬৪ সালের ২৯ জুন কলকাতার ভবানীপুরে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম| তাঁর বাবা ছিলেন বিখ্যাত চিকিৎসক গঙ্গাপ্রসাদ মুখার্জী| মাতা জগত্তারিণী দেবী| জন্মেছেন কলকাতার ভবানীপুরে|

 

ছাত্রজীবন শুরু চক্রবেড়িয়া ও সাউথ সুবার্বন স্কুলে| গণিতে অসাধারণ মেধাবী ছিলেন| বিজ্ঞান ও সাহিত্যের আবহে আশুতোষ ছোটোবেলা থেকে বেড়ে উঠেছেন| ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ও কথোপকথন তাঁকে গভীর ভাবে নাড়া দেয়| ১৮৭৯ সালে ১৫ বছর বয়সে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন এবং প্রথম শ্রেণীর বৃত্তি পান| ১৮৮০ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন, সেখানে সহপাঠী হিসেবে পেয়ে যান আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (১৮৬১-১৯৪৪) ও নরেন্দ্রনাথ দত্ত—কে (১৮৬৩-১৯০২), যিনি স্বামী বিবেকানন্দ পরবর্তীকালে| ১৮৮৩ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন| ১৮৮৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে প্রথম শ্রেণীতে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করার পর তিনি ‘প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ স্কলারশিপ’ পান| ১৮৮৬ সালে আবার তিনি পদার্থ বিজ্ঞানে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন| কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনিই প্রথম দু’টি বিষয়ে এম.এ.|

 

১৮৮৮ সালে তিনি বি.এল. ডিগ্রি লাভ করেন| আইনজীবী হওয়ার পাশাপাশি তিনি তাঁর পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে থাকেন| ১৮৮০ থেকে ১৮৯০ সালের মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে উচ্চতর গণিতের ওপর তাঁর লেখা গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়| ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোশিয়েসন ফর দি কালটিভেশন অব সায়েন্স’-এর সাথে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন| ১৮৮৭ থেকে ১৮৯১ সালের মধ্যে তিনি গণিতের ওপর একাধিক বক্তৃতা দেন| তাঁর দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত ‘জিওমেট্রি অব কনিক্স’ (Geometry of Conics) এবং ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত ‘ল অব পারপিচুইটিস’ (Law of Perpetuities) | ১৯০৮ সালে তিনি ‘ক্যালকাটা ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন| ১৮৯৪ সালে তিনি আইনের উপর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৮৯৮ সালে ‘টেগর ল প্রফেসর’ নিযুক্ত হন| ১৯০৪ সালে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতির পদে অধিষ্ঠিত হন| মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ফেলো হয়েছিলেন ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষা ও গবেষণার একটি মুখ্য কেন্দ্রে পরিণত করেন| ১৯০২ সালে লর্ড কার্জন তাঁকে ‘বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন’-এর সদস্য হিসেবে নিযুক্ত করেন| ১৯০৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর পদে অধিষ্ঠিত হন এবং ১৯১৪ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন|

 

স্যার আশুতোষের সুযোগ্য পরিচালনায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় একটি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হয়| দেশের ও বিদেশের বহু কৃতবিদ্য মানুষ তাঁর আহ্বানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেছেন| সি.ভি.রমন (১৮৮৮-১৯৭০), আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (১৮৬১-১৯৪৪), মেঘনাদ সাহা (১৮৯৩-১৯৫৬), সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ (১৮৮৮-১৯৭৫), সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০-১৯৭৭), সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১৮৯৪-১৯৭৪), হাসান সোহরাওয়ার্দী (১৮৮৪-১৯৪৬), অক্সফোর্ডের অধ্যাপক পল ভিনোগ্রাফড, ফরাসী অধ্যাপক সিলভা লেভি (১৮৬৩-১৯৩৫) এঁরা স্যার আশুতোষের অনুরোধে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন| পরাধীন ভারতবর্ষে তাঁর নির্ভীক প্রচেষ্টায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্বয়ংশাসিত প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পায়|

ভারত সরকার ১৯৬৪ সালে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি পোষ্ট স্ট্যাম্প চালু করেন| পালি, ফার্সি ও রুশ ভাষার মত বিভিন্ন ভাষায় দক্ষ হওয়ার জন্য বাঙালি পন্ডিতেরা তাঁকে ‘সরস্বতী’ ও ‘শাস্ত্রবাচস্পতি’ উপাধিতে ভূষিত করেন| তিনি তাঁর মাতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ চালু করেছেন| ১৯২৪ সালের ২৫ মে পাটনায় আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়|

 

বাঙালি হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে যখন আমরা গর্ববোধ করি, তখন একথা স্মরণ করা প্রয়োজন যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে একদা একটি উচ্চ মানের সারস্বত সাধনার ক্ষেত্র হিসেবে তৈরি করেছিলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়| আজ তাঁর ১৫৮ তম জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করি, সুগভীর শ্রদ্ধায়|

 

লেখক: ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী, রাষ্ট্রপতি-পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও রবীন্দ্র গবেষক

ছবি: সংগৃহীত 

ads

Mailing List