‘নীল আঁচল’ - মৌমিতা বিশ্বাসের কলমে

‘নীল আঁচল’ - মৌমিতা বিশ্বাসের কলমে
08 May 2022, 09:00 AM

‘নীল আঁচল’ - মৌমিতা বিশ্বাসের কলমে

 

মৌমিতা বিশ্বাস

 

এবার আষাঢ় মাস পড়তে না পড়তেই আকাশ যেনো ভেঙে পড়েছে। বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে নরম হয়ে গলে পড়ছে গ্রীষ্ম পেরিয়ে আসা আপাত রুক্ষ চরাচর। আর কদিন বাদেই রথ। ভালোবাসার ঈশ্বর সেদিন তার প্রাসাদ ছেড়ে নেমে আসবেন ধুলি ধূসর পথে হাজার হাজার ভক্তদের সাথে মিলিত হতে। রথের রশিতে ভক্তদের হাতের ছোঁয়া পেলে তবে এগোবে তার চাকা। ভালোবাসা, মমতা, আনন্দ সব জড়িয়ে মরিয়ে একাকার হয়ে আছে যেনো এই দেশটাতে। ভক্ত আর ঈশ্বরের এই মিলন দেখে প্রকৃতিও যেনো ঠিক এই সময় হয়ে ওঠে যৌবনের উৎসবের মতো পান্না সবুজ।

গাঁয়ে একটা অনেক পুরনো রথ বেরোয়। রাধাবিনোদের রথ। সেই কোনকালে পাঁচটা গাঁয়ের জমিদার রায়চৌধুরীরা এই রথ বের করা শুরু করেছিলেন তাদের কুলদেবতার মন্দির থেকে। জমিদারি নেই। সেই বংশও আজ বিলুপ্তপ্রায়। কিন্তু প্রথা অব্যহত রয়ে গেছে।

চারুমনি পরম কৃষ্ণভক্ত। সত্তরোর্ধ্ব বয়স। সংসারে আছে বলতে শুধু এক ভাইপো, তার বউ আর ছোট একটা নাতনি। বিয়ের পরে সুখের সংসারই ছিলো তার। কিন্তু দীর্ঘদিন ছেলেপুলে না হওয়ায় শ্বশুরবাড়ির লোক বাপের বাড়ি রেখে গেলো তাকে। যেনো কিছুদিনের জন্য একটা যন্ত্র কিনে নিয়ে গেছিলো ঘরে ব্যবহার করার জন্য। সামান্য খুঁত ধরা পড়তে সেই যন্ত্র আবার দোকানদারকে ফেরৎ দিয়ে গেলো তারা। সেই থেকে এই সংসারেই ঠাঁই হলো তার। বাপ বুদ্ধি করে মরার আগে মেয়ের নামে কিছু টাকাপয়সা ব্যাংকে গচ্ছিত রেখে গেছিলেন। আর অল্প কিছু জমিজমাও লিখে দিয়েছিলেন। তাই বাবা মারা যাওয়ার পরে দাদা বৌদির সংসারে টিকে গেছিলেন তিনি।

লেখাপড়া কিছুই প্রায় শেখেননি। টাকাপয়সার ব্যাপারে দাদা যখন যেমন বলতো সই সাবুদ করে দিতেন। তো দাদা বৌদিও গত হয়েছেন বেশ কিছু বছর হলো। এখন এই ভাইপোই সম্বল। কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন ছোটো থেকে। নিজের ছেলেপুলে না থাকায় তার সমস্ত হৃদয়ের স্নেহ মমতার পাত্রটি উজাড় করে দিয়েছিলেন এই ভাইপোর ওপর। ভাইপো শ্যামেরও যত বায়না যত দাবী দাওয়া ছিলো পিসির কাছে। তার ন্যাওটা ছিলো খুব ছোটো থেকেই। পিসি খাইয়ে দেবে তবে তার খাওয়া হবে। পিসি চুল আঁচড়ে দেবে তবে সে নেমন্তন্ন বাড়ি যাবে। পিসি তার পছন্দের তরকারি রান্না করে দেবে তবে সে ছুটির দিনে ভাত খেতে বসবে। চারুমনিও এইসব স্নেহের অত্যাচার সামাল দিতেন হাসিমুখে। ঠিকই চলছিলো সব। দাদা বৌদি থাকতে থাকতেই ছেলের বউ কে বরণ করে ঘরে তুলেছিলো। বৌমাটিকে মনে ধরেছিলো চারুরও। বেশ মিষ্টি ভরাট গড়ন পেটন। খুব মানিয়েছিলো দুটিকে। তা সে বউ ও বেশ কিছুদিন পিসিমা বলতে অজ্ঞান ছিলো। তারপর আস্তে আস্তে কোথা থেকে কিসব যেনো হয়ে গেলো।

 

দাদা বৌদি স্বর্গে গেলেন। নাতনির মুখ দেখা হয়নি তাদের। কিছুদিন পরেই ঘর আলো করে এলো ওই একরত্তি ফুটফুটে মেয়েটা। তাকে অদেয় যেনো কিছুই নেই চারুমনির। তার বালগোপাল আর ওই নাতনি নিয়েই বাকি জীবনটুকু কেটে যাবে ভেবেছিলেন। কিন্তু এরমধ্যেই ভাইপোর কারখানায় তালা ঝুললো একদিন। কোম্পানি নাকি এই রাজ্য থেকে ব্যবসাপত্তর গুটিয়ে অন্য রাজ্যে চলে যাবে। এ রাজ্যে তাদের বিস্তর লোকসান হচ্ছে বিভিন্ন কারনে।সেটাও ঠিক এরকমই একটা বর্ষাকাল ছিলো। সামনে রথ। চাকরি খুইয়ে বাড়ি এলো শ্যাম। কোথা থেকে চলবে সংসার? কোথা থেকে দুধের যোগান হবে ওই একরত্তি মেয়ের? আস্তে আস্তে যেটুকু জমি জমা ছিলো বিক্রিবাটা হলো। ভাইপো ভ্যান কিনলো একটা মোটর লাগানো। চারুমনি নিজের নামে বাপের লিখে দেওয়া অল্প জমিটুকু বিক্রি করে পয়সা দিলেন। বড় সাধ ছিলো তার ওই জমি বিক্রির টাকায় একবার জগন্নাথধামে যাবেন রথ দেখতে। কিন্তু তা আর হলোনা। ভাইপো কে বললেন - "তোর অবস্থা একটু ফিরলে আমাকে একবার শ্রীক্ষেত্রে রথ দর্শন করাতে নিয়ে যাবি বাপ?" শ্যামের তখন টাকাটা দরকার। তাই বললো -" নিয়ে যাবো পিসি"

-"কথা দিলি তো বাপ?"

-"দিলাম পিসি, দিলাম"

রান্নাঘর থেকে বউ মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলো।

-"খেতে না পেয়ে মরার দশা এসেছে সবার। আর ওনার রথ দেখার সাধ যায়না। প্রেতিবার তো রথের তিনদিন আগে থেকে গাঁয়ের রথতলায় গিয়ে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন। রথের দড়িতে উনি হাত না ছোঁয়ালে যেনো চাকা গড়াবে না। তাতেও হচ্ছেনা আবার শ্রীখেত্তর যাওয়া চাই। সারাদিন রাত অত কেষ্টনাম জপে হলোটা কি? আদিখ্যেতা দেখে বাঁচিনে।"

চুপ করে থাকেন চারুমনি। অযথা গলার জোর করার অভ্যাস তার কোনোদিনই নেই। আজও না।

দেখতে দেখতে কেটে গেছে বেশ কিছু বছর। আজও জগন্নাথধাম যাওয়া হয়নি তার। এর মধ্যে শরীর ভেঙেছে আরও। স্কুলে পড়া নাতনির খরচ যোগাতে দু তিনটে বাড়িতে কাজ নিতে হয়েছে বউ কে। সংসারে চারু এখন বাড়তি একটা বোঝা। দুবেলার দুমুঠো অন্নে তার যতটা না পেট ভরে তার থেকে অনেক বেশী ভরে গাল মন্দ খেয়ে। তাও এখনও কৃষ্ণনাম সম্বল করে কোনমতে দিন পার করে চলেছেন তিনি।

 

আবার আরেকটা রথ আসতে চলেছে। তবে এবার রথের মাসখানেক আগে থেকেই কেমন যেন অন্যরকম একটা ভাব বাড়িতে সবার। একরাতে খেতে বসে ভাইপো জানালো -"এবার তোমার অনেক বছরের সাধ মেটাবো পিসি। রথে শ্রীক্ষেত্রে নিয়ে যাব তোমাকে। ট্রেনের টিকিট কাটা, হোটেল ভাড়া করা সব হয়ে গেছে। রথের আগেরদিন যাবো।"

-"সত্যি বলছিস বাপ?" আনন্দে আত্মহারা চারু। এতদিনে তবে জগন্নাথদেব তাকে টেনেছেন। জোড় হাত কপালে ঠেকান তিনি।

তারপর থেকে দিন গুলো শুধু গুনতে গুনতেই কেটে যায়। মাঝে মাঝে চোখে পড়ে ভাইপো আর বউ ঘরের মধ্যে সময়ে অসময়ে কিসব গুজগুজ, ফিসফাস করে। কৃষ্ণ নামে মগ্ন চারু কান করেন না সেদিকে।

#

কাল রথ। অবশেষে শ্রীক্ষেত্রে এসেছেন তিনি। জীবনে প্রথম সমুদ্র দেখা। এ যে তার প্রাণের ঠাকুরের মতোই নীলবর্ণের জলে ভরা। সমুদ্র দেখেও কপালে হাত ঠেকান তিনি। ঠাকুরের কি লীলা। ভেবে ভেবে ঘোর কাটেনা তার।

রথের দিন প্রায় মাঝরাত থাকতে থাকতে ভাইপো কে ব্যস্ত করে যে পথ দিয়ে রথ যাবে সেই পথের ধারে এসে উবু হয়ে বসেন তিনি। পথের ধুলো নেন মাথায়।

লাখো লাখো ভক্তের পায়ের ধুলো যে লেগে রয়েছে এ পথের প্রতিটা কণায়। তার ইচ্ছে করে আঁচল দিয়ে মুছিয়ে নেন প্রভুর আসার পথের শেষ ধূলিকণাটুকু। কিন্তু অশক্ত অসমর্থ শরীরে সে জোর তার কোথায়?

আস্তে আস্তে ভিড় বাড়ে। মোটা দড়ি দিয়ে সীমানা টানা রাস্তায় যেনো তিলধারণের জায়গা নেই আর। সবাই বলাবলি করছে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বেন প্রভু। পাশে বসা ভাইপো এবার একটু উসখুস করে ওঠে। পিসিকে বলে -" এখানে টুকুন বসো পিসি। আমি একটু খাবার জল নে আসি। বড় তেষ্টা পেয়েছে।"

-"এই ভিড়ে কোথায় যাবি বাপ? তারপর যদি খুঁজে না পায় তোরে"

-"আরে বসোনা। আমি এই যাবো আর এই আসবো"

 

তাড়াতাড়ি ভীড় ঠেলে বেরিয়ে আসে শ্যাম। দ্রুত হেঁটে চলে হোটেলের দিকে। আগে থেকেই সব প্ল্যান করা আছে তার বউ এর সাথে। পিসিকে এখানে রেখে আজই চম্পট দেবে সে গাঁয়ের দিকে। সে ঘরে ঢুকলেই মরাকান্না জুড়বে বউ। সবাই জানবে ভাগ্যমান চারুমনি শ্রীক্ষেত্রে দেহ রেখেছে।

কিছুটা এগোতেই কানে আসে উচ্চকিত হরিবোল ধ্বনি। যেনো শত সহস্র সমুদ্র গর্জন করে তার অর্ঘ্য নিয়ে প্রভুর পায়ে লুটিয়ে পড়তে ছুটে আসছে চারদিক থেকে। স্বর্গ মর্ত্য পাতাল একাকার করে উচ্চারিত হয় "জয় জগন্নাথ"। হঠাৎ করে চোখ তুলতেই শ্যামের চোখে পড়ে রথের চুড়া। আজ আত্মার আত্মীয়, পরম প্রিয় ভক্তদের সাথে মিলন হবে প্রভুর। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে আজ ধরবে রথের রশি। সে রথের চাকা গড়িয়ে চলবে কোনো পরাক্রমশালী রাজার আদেশ বা কোনো শাসকের অহংকারের শক্তিতে নয়। ভক্তদের ভালোবাসার টানে, প্রেমের অপার্থিব, অলৌকিক শক্তিতে। ভাবতেই হয়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে তার। আরেকবার তাকায় রথের দিকে।

ইতিমধ্যে আরও কিছুটা এগিয়ে এসেছে রথ। জয় জগন্নাথ ধ্বনিতে কান পাতা দায়। কপালে হাত ঠেকায় শ্যাম। পা বাড়াতে গিয়েও থমকে যায় সে।

যেদিক থেকে এসেছিলো সেদিকে ঘুরে দাঁড়ায় আবার....

..........

লেখিকা- অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার (রেভিনিউ)।

ads

Mailing List