ভিতরকনিকা মানেই গা ছমছম করা কুমীরের ঘুরে বেড়ানো, আর মন ভোলানো রকমারি ম্যানগ্রোভ অরণ্য  

ভিতরকনিকা মানেই গা ছমছম করা কুমীরের ঘুরে বেড়ানো, আর মন ভোলানো রকমারি ম্যানগ্রোভ অরণ্য  
19 Sep 2022, 02:50 PM

ভিতরকনিকা মানেই গা ছমছম করা কুমীরের ঘুরে বেড়ানো, আর মন ভোলানো রকমারি ম্যানগ্রোভ অরণ্য  

 

জীববৈচিত্রে ভরপুর ভিতরকনিকা। কোভিডের আগে ও ফনির কিছুদিন পর সেই ভিতরকনিকা ঘুরে দেখলেন একদল গবেষক। বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই ভ্রমণকাহিনীই শোনাচ্ছেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা ও বনবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অমলকুমার মন্ডল ও গবেষিকা অর্পিতা মাইতি।

 

রম্য বা বিচরণ যোগ্য নয় মানুষের পক্ষে এমন রম্যতা যুক্ত বনভুমিকে বলা হয় অরণ্য। এখানে পশুদের বাসভূমি গড়ে ওঠে তৃণ, বৃক্ষ, গুল্ম, ম্যানগ্রোভ এর মধ্যে। এদের সমবায়ে সন্নিবিস্ট হয়ে থাকে সমুদ্র, নদীতট কিংবা পাহাড় পর্বতের নিম্নভূমি। সেই সব জায়গা ভ্রমন যোগ্য নয় বলে আবিষ্কারের নেশা পেয়ে যায় মানুষের মনে। যা দুর্গম, সেখানকার রহস্য সন্ধানে আগ্রহী হয় মানুষ। স্থলে বাসবাসকারী পশু, তটভাগের উভচর, জলজ প্রাণী, বৃক্ষ-শাখার খেচর, এদের সাথে ফুল-ফল- লতা -গুল্ম সব নিয়ে অরণ্য। আর আছে সেই অরণ্যকে ঘিরে বাস করা কিছু মানুষজন এবং তাঁদের জীবন যাত্রা।

একটা সময়ে মানুষ অরণ্যেই বসবাস করতেন। বাঁচার জান্য একটা অন্যরকম লড়াই ছিল। সেইসব স্মৃতি বিচ্যুত হয়েছে অনেকেই। তবু অরণ্যের মধ্যে ফিরে যাওয়া যায় স্মৃতির দেশে। বাঘ, সিংহের সঙ্গে লড়াই করা জীবনের ভয়, তবু সাহসে ভর করে এগিয়ে চলা। নাম না জানা পশু, মাছ, কাঁকড়া, ফুল, ফল, নদী-খাল-বিল চেনার নেশায় মাতোয়ারা হয়ে মেলে ধরি আমাদের জিজ্ঞাসা। নববর্ষে সবাই যখন ব্যস্ত নিজের কাজে তেমনই আমি গবেষণার কাজে বেরিয়ে পড়েছিলাম সহ গবেষকদের সঙ্গে। ৯ জানুয়ারি। তখন শীত। সেদিন ছিল শুক্রবার। ল্যাবের কাজ গুছিয়ে সবাই সামিল হলাম খড়্গপুর জংশনে ৩.৪০ pm এর শতাব্দী এক্সপ্রেস। ঠিক ২ ঘণ্টা পরে ট্রেন পৌঁছল ভদ্রক জংশনে। সেখান থেকে আমরা এলাম চাঁদ বালি। রাতটুকু অপেক্ষা করলাম চাঁদ বালির গেস্ট হউসে। সেখানে রাতে বিশ্রাম করার পরে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম ভিতর কনিকা জাতীয় উদ্যানের পথে।

ভিতর কনিকা ভারতের ওড়িশা রাজ্যের কেন্দ্রাপাড়া জেলার ম্যানগ্রোভ জলাভুমি। এটি ব্রাহ্মনী ও বৈতরণী নদী ব-দ্বীপে ৬৫০ বর্গ-কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থিত। ১৯৭৫ সালে ৬৭২ বর্গ- কিলোমিটার এলাকাকে ভিতর কনিকা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। অভয়ারণ্যে থাকা ১৪৫ বর্গ-কিলোমিটার এলাকাকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গহিরমাথা সামুদ্রিক বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য নির্মিত হয়। ২০০২ সালে ভিতর কনিকার ম্যানগ্রোভকে আন্তর্জাতিক ভাবে রামসর জলাভূমি হিসেবে মনোনীত করা হয়।

সেই আনন্দ, সেই আবেগ ঘন মন নিয়ে এবার আমাদের যাত্রা শুরু হল জলপথে। আমাদের নৌকো ছাড়ার পর আমরা নিজেরা নিজেদের মতো আড্ডা, কিছু গল্প করতে করতে কিছু দেখা দৃশ্য ফ্রেমবন্দি করার ঝোঁকে ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখা। জলাভূমি, নদী–মোহনা, অরণ্য আর পশু পাখি- এই ন্যাশনাল পার্ক ভ্রমণ পিপাসু আর পরিবেশবিদদের কাছে স্বর্গতুল্য! এখানকার ব-দ্বীপ সৃষ্টিকারী খাঁড়িগুলির দুই পাড় অপরূপ সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। কোথাও সারিবদ্ধ নারকেল গাছ। আর সর্বত্র সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া, কেওড়া – এদের শ্বাসমূল ময় ঘন জঙ্গল লবনাক্ত জল আর ভুমিতে এদের বাড়বাড়ন্ত। এইসব উপভোগ করতে করতে কয়েক কিলোমিটার আসার পর বৈতরণীর দুধারে ম্যানগ্রোভ অরন্যের মাঝে কুমীরের ঘুমন্ত শয্যা। হ্যাঁ এখানকার বিখ্যাত দর্শনীয় কুমির প্রকল্প। ভিতরকনিকা হল নোনা জলের কুমিরের স্বাভাবিক আবাসভূমি। এই অভয়ারণ্যের খাঁড়িতে দেখতে পাওয়া যায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কুমিরের দল। এখানে পাওয়া একটি বড় কুমির প্রায় ২৩ ফুট ৩ ইঞ্চি লম্বা, ওজন প্রায় ২০০০ কেজি। গিনিস বুক ওয়ার্ল্ড এ এর উল্লেখ আছে।

এই দেখতে দেখতে ঠিক ৩ ঘণ্টা পরে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যস্থল হাবালিকটি। ম্যানগ্রোভ মোড়া জঙ্গলের রহস্যময় সৌন্দর্য পেরিয়ে প্রায় ৩ কিলোমিটার পথ আতিক্রম করে আমরা পৌঁছে গেলাম নদী ও ব-দ্বীপ পেরিয়ে সমুদ্র উপকূলে। তবে হ্যাঁ, ভ্রমনের সব রকমের সুযোগ সুবিধে এখানে আছে। তবে সাবধানতা-সহ ভ্রমন-দর্শনের সুযোগটা নেওয়াই ভালো। বড় ভালো ছিল চাঁদের আলোয় নির্জন বনভূমিতে সমুদ্র উপকুলের কটেজে বসে বন্য প্রাণীদের সজাগ বিচরণ উপভোগ করা। কটেজের উঠানে চলে আসে বিচিত্র প্রজাতির সজারু, বুনোশুয়োর, বুনো মোরগ। আর প্রায় ৩০ রকমের  ম্যানগ্রোভ প্রজাতি রয়েছে। যদিও সব দেখলেও সন্ধ্যে হয়ে যাওয়াতে সজারুর দেখা মেলেনি আমাদের। এখানে উচিত অনর্থক দাপাদাপি বন্ধ রাখা, জোরে কথা না বলা, অরণ্যের নিজস্ব শান্তি বজায় রাখা। তাহলে রাতের অরণ্য আপনার আশা পূরণ করবে, উন্মুক্ত করে দেবে তার আড়াল। আপনি তো শহরের কোলাহল নিয়ে সেখানে যাবেন না, কোলাহল ফেলে শান্তির বিচরণ ক্ষেত্রে যাবেন। সমুদ্রের গর্ভ থেকে সূর্য উদয় দেখতে দেখতে আমরা আমাদের সকালে নাস্তা সেরে রওনা দিলাম ভিতরকনিকা অরণ্যের উদ্দেশে।

জলপথ অতিক্রম করে প্রবেশ করলাম অরণ্যে। মনে হল আমাদের স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করছে আমাদের পূর্ব পুরুষের এক দল পরিবার। তারপর প্রবেশ করলাম আরও ঘন জঙ্গলে। দেখলাম লতা-গুল্ম-বৃক্ষের সারি। এখানে প্রায় ৯৪ প্রজাতির ম্যানগ্রোভের দেখা মেলে। এছাড়াও  তটভাগের উভচর, জলজ প্রানী, ম্যানগ্রোভ যেমন - সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া,  কেওড়া – এদের শ্বাসমূলময় ঘন জঙ্গল, আরও অনেক ওষধি গাছ যেমন - Crinum defixum Ker. Gawl., Dendrophthoe falcate (L.f.) Etting, Hibiscus tiliaceus L., Finlaysonia obovata wall. Hoya parasitica (Roxb.)Wall. Pongamia pinnata (L.) Pierre. Solanum trilobatum L. Tamarix dioica Roxb.  Tylophora indica (Burm.f.) Merr. Stychnos nux-vomica ইত্যাদি। এছাড়াও আধুনিক ওয়াচ টাওয়ার, পুরনো হান্টিং স্পট, ভাঙা মন্দিরের দেখা মেলে।

 

এই অরণ্যে গাছেদের পরিচিতি করে আমরা পৌঁছলাম ডাংমাল। কিছুক্ষন সারিবদ্ধ নারকেল গাছের সারি আর সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া, কেওড়ার পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম কটেজে। কটেজের উঠানে চলে আসে বিচিত্র প্রজাতির হরিণ, বুনোশুয়োর, বুনো মোরগ, পরিযায়ী পাখি। আর সমুদ্র গামী তীব্র জলস্রোত, কুমির, সকালের আলোয় যেমন স্পষ্ট আবার রাতের অন্ধকারে অস্পষ্ট মোহ। সব মিলে ভিতর কনিকা যেন একইসঙ্গে বাস্তব এবং জাগ্রত স্বপ্ন।

এই ম্যানগ্রোভ সারা পৃথিবীর গ্রীষ্ম মণ্ডলীয় অঞ্চলের উষ্ণ ও উপ উষ্ণ উপকূলীয় এলাকা জুড়ে। সেই ম্যানগ্রোভ বা লবনাম্বুজ উদ্ভিদ হল গুপ্তবীজী উদ্ভিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবারের অন্তর্গত। যা সাধারণত সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলের নোনা জলে জন্মায়। এই সমস্ত গাছ কম অক্সিজেন যুক্ত মাটিতে জন্মায়। এই ম্যানগ্রোভ কেবল নিরক্ষীয় অঞ্চলের নিকটবর্তী এবং উষ্ণমণ্ডলীয় অক্ষাংশে জন্মায়। কারণ, হিমায়িত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে না। প্রায় ৩০০ টি বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ রয়েছে। সাধারণত Avicenniaceae, Acantheceae, Euphorbiaceae, Rhizophoraceae, Lythraceae, Meliaceae, Sterculaceae, Primulaceae etc, ফ্যামিলির ম্যানগ্রোভ দেখা যায়।

 

 

এই ম্যানগ্রোভে প্রজাতির গাছের মধ্যে ১। সত্যিকারের ম্যানগ্রোভ (True mangrove) এবং ২।  সহকারী ম্যানগ্রোভ (Associated mangrove)। এই ২ প্রকারের হয়।

 

১। সত্যিকারের ম্যানগ্রোভ (True mangrove): যে সব ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের মধ্যে বিশেষ করে  শ্বাসমূল– ঊর্ধ্বমুখী শাখা যা ভূমি ও জলতলের উপরে জেগে থাকে এবং এর অগ্রভাগে নিউমাটোপোর নামে শ্বাসছিদ্র থাকে। অনেক ম্যানগ্রোভ অরণ্য গুলিকে প্রপ শেকড় গুলির ঘন জঞ্জাল দ্বারা চিহ্নিত করা যেতে পারে। জরায়ুজ প্রাজনন – বীজ মাতৃ দেহে থাকাকালীন ফলের মধ্যেই অঙ্কুরিত হয়ে থাকে। মাতৃদেহ থেকে পড়লেই মাটিতে গেঁথে মূল বিস্তার করে। 

 

৩০ রকমেরও বেশি True mangrove যেমন- Rhizophora sp.  Bruguiera sp. , Avicennia sp.  Ceriops sp.  Sonneratia sp. Aegiceras sp. Heriteria sp. Kandelia sp. Aegialitis sp. Sonneretia sp. Nypa fruticans, Excoecaria agallocha Linn.  Acrosticum sp. (mangrove fern). ইত্যাদি।

 

২। সহকারী ম্যানগ্রোভ (Associated mangrove): যে সব ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের মধ্যে বিশেষ করে  শ্বাসমূল থাকলেও জরায়ুজ প্রাজনন দেখা যায় না। যেমন- Porteresia coarctata (Roxb.) Sesuvium portulacastrum Linn. Suaeda sp.  Salicornia sp. Phoenix paludosa (হেতাল), Acanthus ilicifolius Linn. Pandanus sp., ইত্যাদি।

ম্যানগ্রোভ থেকে আমরা প্রত্যাক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে অনেক উপকার পেয়ে থাকি। যেমন- এই অরণ্যের উপকূলীয় এলাকাতে বন্যা জলোচ্ছ্বাস এবং ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে। ম্যানগ্রোভ অরন্যে অনেক প্রাণী নিজেকে খাপ খাইয়ে বসবাস করে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করে। 

সমুদ্র  উপকূলবর্তী অঞ্চলের মানুষ এই বনের উপর নির্ভর করে তাদের জীবিকা অর্জন করে।  যেমন – জেলেরা মাছ সংগ্রহ করে , মধু সংগ্রহ ও গাছের কাঠ বিক্রি করে । ম্যানগ্রোভ অরন্য দূষণ থেকে পরিবেশ কে রক্ষা করতে সক্ষম এবং ভূমি ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। সকাল ৯ টার মধ্যে ম্যানগ্রোভ এর পরিচিতি নিয়ে শেষ হল আমাদের প্রাতঃভ্রমন। তারপর ১১ টার মধ্যে গুছিয়ে এই জলাভূমি, নদী – মোহনা, অরণ্য আর পশু পাখি, এই ন্যাশনাল পার্ক, সারিবদ্ধ নারকেল গাছ আর সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া,  কেওড়ার ঘন জঙ্গল ছেড়ে রওনা দিলাম বাড়ির পথে।

(এই দলে আরও যাঁরা ছিলেন- অনুপকুমার ভুঁইয়া, ড. সৌরভ দুয়ারী, অয়নকুমার নষ্কর, ধীমান মন্ডল, সায়ন্তন ত্রিপাঠী এবং অশোক আহির)

Mailing List