সত্যি ভূতের গল্প নিয়েই আজও দাঁড়িয়ে পুরুলিয়ার বেগুনকোদর স্টেশন! লিখছেন কৃষিবিজ্ঞানী ড: কাঞ্চন কুমার ভৌমিক 

সত্যি ভূতের গল্প নিয়েই আজও দাঁড়িয়ে পুরুলিয়ার বেগুনকোদর স্টেশন! লিখছেন কৃষিবিজ্ঞানী ড: কাঞ্চন কুমার ভৌমিক 
12 May 2022, 01:50 PM

সত্যি ভূতের গল্প নিয়েই আজও দাঁড়িয়ে পুরুলিয়ার বেগুনকোদর স্টেশন! লিখছেন কৃষিবিজ্ঞানী ড: কাঞ্চন কুমার ভৌমিক 

 

 

ড: কাঞ্চন কুমার ভৌমিক 

 

 

সালটা ২০০৮-২০০৯। চাকরি সুত্রে তখন পুরুলিয়ায় এক সরকারী ফার্মের (ডব্লিউ.বি.সি.এ.ডি.সি) কৃষি আধিকারিক পদে। পোষ্টিং ঝালদার বেগুনকোদর। সবে গিয়েছি। চারিদিকে মাওবাদীদের দৌরাত্ম। বামফ্রন্ট জমানা। আমাদের ঐ ফার্মে অনেকগুলি অফিসার কোয়ার্টার। আমি ছাড়াও ভেটেরিনারী অফিসার, ফিসারী অফিসার, ইঞ্জিনিয়ার, অ্যাকাউন্ট্যন্ট, কয়েকজন শিক্ষানবিশ ছেলেমেয়েরা এবং ভি.ও এমনই অনেকেই থাকেন।

আমাদের ও.সি অনেকটা দুরে ক্যম্পাসের মধ্যেই একটি দোতলায় কোয়ার্টারে থাকেন। ঐ সময়টাতে চারিদিকে মাওবাদীদের দৌরাত্মের জন্য আমাদের অফিস সংলগ্ন কয়েকটা হলঘরে প্রায় ২০০ জনের সেনা ব্যাটেলিয়ন ও তাদের কমান্ডো বাহিনী থাকেন। ফার্মটা অনেকটাই বড়। বেশ কয়েকশ একর জায়গা জুড়ে। পুকুরের মাছের প্রকল্পের পাশাপাশি হাঁস, মুরগি, ছাগল, শুকর ইত্যাদি ইত্যাদি প্রকল্প আছে। এছাড়াও দুরের ব্লকগুলিতে বীজধান তৈরির প্রকল্প রয়ে আছে। হর্টিকালচার প্রকল্পও আছে।

যাইহোক আমার জন্য ফার্মের কর্নারে একটি কোয়ার্টার বরাদ্দ হল। অদূরে কয়েকটি কোয়ার্টারে আমাদের কয়েকজন ভি.ও তাদের পরিবার নিয়ে থাকেন। একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট হঠাৎ এসে আমায় বলল, “স্যার ঠিক কোয়ার্টার টাই চয়েস করেছেন। আপনি এখানেই থাকবেন।’’

আমি বললাম, কেন? তাছাড়া আমি নতুন। আমিতো কোন কোয়ার্টার কিছুই জানি না। ছেলেটি উত্তর না দিয়ে এরকম হন হন করে হেঁটে চলে গেল।

আমিও নতুন। সব্বার সাথে ঠিকমতো আলাপও হয়ে ওঠেনি। কয়েকদিন পর আমার পরিবার নিয়ে এলাম ও থাকা শুরু করলাম। এবং মন দিয়ে অফিসের বিভিন্ন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখলাম। এইভাবে প্রায় ৫-৬ বছর কাটিয়েও দিয়েছি কখনো কোনও খারাপ কিছু ভাবিনি। হঠাৎ কলকাতা থেকে এই সি.এ.ডি.সি'র এক রিটায়ার্ড বয়ষ্ক আধিকারিক (ডেপুটি প্রকল্প অধিকর্তা) আমায় ফোনে জানালেন, তিনি এক দু’দিন থাকবেন। কিছু পেনশন সংক্রান্ত কাগজপত্রের সাইন করাতে আসবেন। ঐ সময় ও.সি অফিসে না থাকায় ওভার টেলিফোনে সম্মতি নিয়ে অনুমতি দিলাম।  ওনার জন্য আমার পাশের কোয়ার্টারে থাকার ব্যবস্থা করার কথা অ্যাসিস্ট্যান্টদের বলে রাখলাম। আমিও ফ্যমিলি নিয়ে আছি। তাই ভাবলাম আমার কাছেই খাওয়া দাওয়া করবেন। সেইমতো আমার পরিবারকেও বলে রাখলাম। সেইদিন অফিস করে আমি তখন আমার কোয়ার্টারে। সন্ধ্যাও নেমেছে। সামনেই অযোধ্যা পাহাড়। তাই সূর্যাস্ত একটু দেরিতে হয়। চারিদিকে তখন লোডশেডিং।

পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত ঐ ফার্মে প্রায়শই ইলেক্ট্রিক থাকত না। ওমা হঠাৎ দেখি অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে উনি এসে হাজির আমার সামনে। সেকি ভুত দেখছি নাকি? না সেই চেনা মুখ। আলাপচারিতা বলতে এর আগে পশ্চিম মেদিনীপুরের সি.এ.ডি.সি ফার্মে থাকাকালীন কয়েকবার দেখেছি। আর কয়েকবার কলকাতার সি.এ.ডি.সি হেড কোয়ার্টারে। যাইহোক ওনাকে থাকার জন্য নির্ধারিত গেষ্ট কোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হওয়ায় উনি মানা করলেন। অনেকটা ভয় চোখে মুখে। বয়ষ্ক মানুষ। সেই রাতটা ভাবলাম আমাদের পাশেই থাকুন।

ফ্রেশ হওয়ার পর রাতের খাওয়ার খেয়ে উনি গল্প শুরু করলেন। গল্প নয় এ যে সত্যি। ওই কোয়ার্টারে আমার যাওয়ার বেশ কয়েক বছর আগে এক অফিসারের ছেলে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। তারপর নাকি তার প্রেতাত্মা এই চত্ত্বরে ঘুরে বেড়ায়। সুযোগ পেলে ওই প্রেতাত্মা বিশেষ কিছু অঞ্চলে এমনকিছু কান্ড ঘটিয়েছে যা বিশ্বের ইতিহাসে রোমহর্ষক এক প্রেতাত্মার কাহিনী সব্বার মুখে মুখে এমনকি আমাদের ফার্মের কয়েক কিমি দুরে বেগুনকোদর রেলষ্টেশন যা ভুতুড়ে ষ্টেশন নামে সারা বিশ্বের রেলের মানচিত্রে জ্বলজ্বল করছে।

পুরুলিয়ার বেগুনকোদর রেলস্টেশন। দেশের রহস্যজনক ভুতুড়ে স্টেশনগুলির মধ্যে অন্যতম এই রেলস্টেশন। আজ থেকে নয়, বহু বছর থেকে পুরুলিয়ার এই বেগুনকোদর স্টেশন ভূতের তকমা গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আসল ঘটনা কী? শোনা যায়, আজ থেকে কয়েক দশক আগে এই বেগুনকোদর স্টেশন তৈরী হওয়ার পর একজন স্টেশন মাষ্টার সস্ত্রীক সেখানে বদলি হয়ে রেলের চাকরি নিয়ে আসেন। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করে কোনও এক রাতে ঘটে গেল এক ভয়াবহ ঘটনা। রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হল ওই স্টেশনমাষ্টার ও তাঁর স্ত্রীর। পরে স্টেশন সংলগ্ন একটি কুঁয়ো থেকে তাদের দেহ উদ্ধার হয় বলেও শোনা যায়।

কেউ কেউ বলেন, আততায়ীদের হাতে খুন হয়েছিলেন সস্ত্রীক স্টেশনমাষ্টার। আবার কারও মুখে শোনা যায়, তাঁরা দুজনেই আত্মহত্যা করেছিলেন। তদন্তের পর পুলিশও তাঁদের মৃত্যুর বিষয়ে কোনও তথ্য দিতে পারেনি। লোকমুখে প্রচলিত, এই ঘটনার পর থেকেই বেগুনকোদর স্টেশনে নেমে আসে কালো রাত। তৎকালীন সময়ে সারাদিন রাত বেগুনকোদর স্টেশন দিয়ে ট্রেন যাতায়াত করত। কিন্তু এই ঘটনার পর থেকেই লোকমুখে ক্রমে শোনা যেতে লাগল এই ষ্টেশনের নানা অলৌকিক কাহিনী। কেউ বলতেন, সন্ধ্যে নামলেই এই স্টেশনে নানারকম আর্তনাদ শুনতে পাওয়া যায়। আবার কেউ কেউ বলেন, এই স্টেশন দিয়ে ট্রেন পেরোলেই কোনও অশরীরী ছায়ামূর্তি ট্রেনের আগে আগে চলে যায়। ব্যস, সেই থেকে শুরু। বহু রেলকর্মীও একাধিক বার নানারকম ভূতূড়ে ঘটনার নিজেদের চোখে দেখার পর ভয়ে চাকরি ছেড়ে পালিয়ে যায় ধীরে ধীরে। বেগুনকোদর ষ্টেশনের এই সমস্ত ভূতূড়ে কাহিনী নিমেষে ছড়িয়ে পড়ে গোটা জেলা থেকে শুরু করে গোটা দেশ জুড়ে। অশরীরী আত্মার ভয়ে সন্ধ্যা নামলেই শুনশান হয়ে যায় বেগুনকোদর স্টেশন চত্বর। ভয়ে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ষ্টেশনের ত্রিসীমানায় আসা বন্ধ করে দেয় সাধারণ মানুষ।

যাইহোক ভূতের প্রসঙ্গে আসি।  তো এমনই এক চাঁদনি রাতে আমার ও.সি ও এক অ্যাসিস্ট্যন্ট কে নিয়ে পৌঁছে গেলাম বেগুনকোদর ষ্টেশনে। সবে সন্ধ্যা। এসে বেশ খুশি হলাম। এক মহিলা বৃদ্ধা চা বানাচ্ছিলেন। ভাবলাম তাহলে এতোদিন যা শুনতাম সব ভূল। ষ্টেশনে এইতো একটা চা-এর ষ্টল পেলাম। অবশ্য ষ্টল বলা ভূল। তিনটে ইট পেতে কাঠের জ্বালানি দিয়ে একটা সসপ্যানে চা। সাথে কয়েকটা বিস্কুটের কৌটো। মাথার উপর খোলা ছাউনি।

বললাম, দিদি আমাদের চা লাগবে। কোনও উত্তর নেই।  ভাবলাম ঠিক আছে উনি আমাদের জন্যইতো বানাচ্ছেন। তাছাড়া এখানে আরতো কেউ নেই।  হঠাৎ দুরে ট্রেনের হুইসেলের শব্দে আমরা ঐ দুরের ট্রেনের আসার অপেক্ষায় তাকিয়ে আছি।  এই আসছে ওই আসছে ট্রেন, এইসব বলাবলি করছি। খেয়াল নেই ওই চা এর বয়ষ্কা দিদি কি করছেন। হঠাৎ তাকাতেই আমরা অবাক!!! সেকি কোনকিছুর চিহ্ন নেই !!! তাহলে কি, আমরা এতক্ষণ কি দেখলাম.....

ভূতূড়ে এই ষ্টেশনের খবর রেলের কানে পৌঁছালে ধীরে ধীরে ওই রুটে বন্ধ হয়ে যায় সমস্ত লোকাল ট্রেন চলাচল। শুধুমাত্র পোড়ো বাড়ির মতো মিশ কালো অন্ধকারে ঢাকা পড়ে থাকে পুরুলিয়ার একসময়ের এই কোলাহলপূর্ণ স্টেশন। শুধুমাত্র আপ-ডাউন লাইনে কোনও দূরপাল্লার ট্রেন অন্ধকারের বুক চিরে চলাচল করে। তারপর আবারও নিকশ অন্ধকার গ্রাস করে বেগুনকোদর স্টেশনকে। কিন্তু এই ভূতূড়ে ষ্টেশনের ঘটনা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তেই বিপাকে পড়েন স্থানীয় মানুষজন। একেই তো এই ষ্টেশনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অশরীরী ঘটনার ভয়, তার ওপরে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একে একে যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার জেরে চরম সমস্যায় পড়েন পুরুলিয়া ও ঝালদা ব্লকের বিভিন্ন গ্রামের কয়কশো মানুষ। কারণ, আগে বেগুনকোদর স্টেশন থেকেই সমস্ত লোকাল ট্রেন যাওয়া আসা করায় বিভিন্ন জায়গায় তাদের কাজের জন্য যেতে অনেক সুবিধা হত, কিন্তু বেগুনকোদর স্টেশনে ভূতূড়ে ঘটনা আরম্ভ হওয়ার পর থেকে এবং যাত্রীরা বহুবার অলৌকিক ঘটনা চাক্ষুস করার অভিযোগ করায় একে একে সমস্ত ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়।

তাই সম্প্রতি এলাকার সাধারণ মানুষ স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে বেগুনকোদর ষ্টেশনের গায়ে লেগে থাকা ভূতূড়ে কাহিনী তকমা ঝেড়ে ফেলতে সচেষ্ট হয়েছেন। যাত্রীদের সচেতন করতে নানারকম প্রচারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কেউ অপপ্রচার করলে তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টাও চলছে। ২০০৭ সালে দ্বিতীয়বার বেগুনকোদর স্টেশনে দিনের বেলায় একটি লোকাল ট্রেন চালু হওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও এখনো আতঙ্ক থেকেই গিয়েছে। এখনো নিশুতি রাত্রে বহু বিচিত্র সব অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী আমার মতো অনেকেই। এবং ইদানীং এমনও শুনতে পাই পাশেই মুরগুমা ড্যামে একটা সুইসাইড পয়েন্টে ঐ প্রেতাত্মা ঘাপটি মেরে থাকে। কলকাতা কেন্দ্রিক বাবুরা জানেন যারা ঐ সুইসাইড পয়েন্টে কিংবা ঐ বেগুনকোদর ষ্টেশনে বেড়াতে এসেছেন। নিশুতি রাতের গা ছমছমের অভিজ্ঞতা নিয়েছেন। এই ঘটনাগুলি অনেকেই নানাভাবে তুলে ধরেছেন। অনেক কুসংস্কারমুক্ত সংস্থার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চও পাল্টা যুক্তি নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু তবুও কোথাও একটা মিথ্ আজও সব্বাইকে ভাবায়। আমার চাকরি জীবনে ঐ স্থান গুলিতে বহুবার গিয়ে রহস্যদঘাটন করার চেষ্টা করেও পারিনি। এক ভুতুড়ে মিথ আজও মনের মধ্যে উঁকি দেয়। ব্ল্যাক হোলের ভাইব্রেশন আজও মনে করিয়ে দেয়। ঐ বুঝি ভুউউউউউউততততত।

লেখক: কৃষিবিজ্ঞানী

ads

Mailing List