মনোরম বড়ন্তি লেক ও গড়পঞ্চকোটের সবুজ পাহাড়

মনোরম বড়ন্তি লেক ও গড়পঞ্চকোটের সবুজ পাহাড়
01 Nov 2020, 11:56 AM

মনোরম বড়ন্তি লেক ও গড়পঞ্চকোটের সবুজ পাহাড়

সুদর্শন নন্দী

করোনাকালে কাছে পিঠে ঘুরে আসতে পুরুলিয়ার জুড়ি নেই। পাহাড়, নদী, ফলস, ড্যাম , অরণ্য, মন্দির সব পাবেন পুরুলিয়া সফরে। হাতে যেমন সময় সেভাবেই  দর্শনীয় স্থান সাজান পর্যটকরা।  অনেকে আসানসোল- বরাকরকে কেন্দ্র করে ঘুরে নেন  মাইথন ড্যাম, পাঞ্চেত ড্যাম, কল্যানেশ্বরী  মন্দির, বড়ন্তি  লেক, জয়চণ্ডী পাহাড়, গড় পঞ্চকোট প্রভৃতি স্থান। হাতে  দুএকদিন সময় থাকলে ঘুরে নিতে পারেন মনোরম বড়ন্তি লেক ও গড় পঞ্চকোট পাহাড়।  ভোরে বের হয়ে রাতে বাড়ি ফেরার প্রোগামও করতে পারেন। তবে ট্রেন না থাকায় এখন একটু পরিশ্রম হয়ে যাবে কারে করে।  তবে ট্রেন কিছু দিনের মধ্যেই চলবে বলেই বিশ্বাস। সকাল ছটা পনের মিনিটে উঠুন ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেসে। পৌনে দশটা নাগাদ পৌঁছবেন আসানসোলে। এখান থেকে কারেও যাওয়া যায় আলোচ্য জায়গা দুটি।  

বড়ন্তি এখান থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার। সেখান থেকে গড় পঞ্চকোট আর বারো কিলোমিটার।  ভাড়া প্রায় হাজার দুয়ের মতো পড়বে। অথচ অনেকটা পথ ট্রেনে যাওয়া যেতে পারে। তাই এখান থেকে কার ভাড়া না করে এগিয়ে যান আদ্রাগামী লোকালে। নামুন তিনটি স্টেশন পর (বার্নপুর, দামোদর, মধুকুণ্ডা, মুরাডি)।  আসানসোল থেকে সময়  আধ ঘণ্টা। এবার মুরাডিতে ভাড়া করতে হবে অটো।  দরাদরি করে সাড়ে সাতশ আটশ লাগবে। বড়ন্তি লেক ঘোরা,  তারপর  গড়পঞ্চকোট। মুরাডি স্টেশনের দুদিকে এই দর্শনীয় স্থান দুটি। একটি দেখে  মুরাডি ফিরে এসে অন্যটি যেতে হবে। বড়ন্তি মুরাডি থেকে চার কিলোমিটার। আর গড়পঞ্চকোট মুরাডি থেকে প্রায় আট কিলোমিটার। গড় পঞ্চকোটের কিছু রাস্তা খারাপ হলেও বড়ন্তি যাবার রাস্তাটি এতো খারাপ ভাবলে অবাক হতে হয়।   অনেক পরে উঠবেন ভালো রাস্তায়। দূর থেকে পাহাড় দেখুন। যেতে যেতে দেখুন পুকুর, পুকুরে শালুক ফুল। চারদিকে গাছগাছালি আর দূরে পাহাড়। দেখতে দেখতে পৌঁছে যাবেন বড়ন্তি লেক। বড়ন্তি নদীকে বাঁধ দিয়ে যে ড্যাম তৈরি হয়েছে সেই লেক এটি। এর ভালো নাম হল রামচন্দ্রপুর জলাধার। দুরের পাহাড়ের নীচে বিস্তৃত জলরাশি দেখে মুগ্ধ হতেই হবে। লেক ঘেঁসে পাড়ের রাস্তায় অটো নিয়ে ঘুরুন খানিকক্ষণ। পাশাপাশি রয়েছে কয়েকটি থাকার জায়গা। রয়েছে বনদপ্তের রিসর্ট। ছবি তুলে উঠে পড়ুন  অটোতে। তবে এখানে থাকলে বিকেলে সূর্যাস্ত দেখে মুগ্ধ হবেন।  এবার গড় পঞ্চকোট চলুন গ্রামের পরিবেশের স্বাদ গ্রহণ করতে করতে। পৌঁছন সেই মুরাডি স্টেশন। যেতে হবে উল্টোদিকে মুরাডি থেকে  আরও আট কিলোমিটার । রঘুনাথপুর হাইওয়ে ধরে।  হাইওয়ে তে  আট নয় কিলোমিটার যাবার পর ডান হাতি মোড়। দূর থেকে দেখা যায় পাহাড়ের শোভা। মোড় ঘুরে  সেখান থেকে গ্রামের রাস্তা বেয়ে  প্রায় আধ ঘণ্টায় পৌঁছন গড়পঞ্চকোটে।  চারদিকে গাছগাছালি, সামনে বিশাল পঞ্চকোট পাহাড়, স্থানে স্থানে রাজপ্রসাদ, মন্দিরের ভগ্নাবশেষ।

আসি এখানকার ইতিহাস ভূগোলে। পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর মহকুমার অন্তর্গত নিতুড়িয়া থানায় পড়ে এই গড় পঞ্চ কোট। একসময় এখানকার পঞ্চ কোট রাজারা  পাশেই  দামোদর নদী  আর এই পাঞ্ছেত পাহাড়ের কোলে রাজত্ব করতেন। প্রসঙ্গত জানাই এই পাঞ্চেত বা পঞ্চকোট পাহাড়টির উচ্চতা ২১০০ ফুট। বিস্তৃত প্রায় ১৮ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে।  পাহাড় জুড়ে রয়েছে মন্দির ও দুর্গের ভগ্নাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। রাজরাজাদের সব কীর্তি এখন ধ্বংস প্রাপ্ত। মন্দিরগুলিও ধংসের পথে। এখানকার রাজারা প্রায় আটশ বছর রাজত্ব করেন। ৯৫০ থেকে ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ।  ১৬০০ খৃষ্টাব্দে  বিষ্ণুপুরের মল্লরাজা বীর হাম্বিরের উপস্থিতি এখানে লক্ষ্য করা যায়। হয়তো তখন এলাকাটি তাঁর অধীনে ছিল। কিন্তু ১৭৪০এর পর যে বর্গী হানা হয় (মারাঠা সৈন্য) তাতে সবই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সম্ভবত লুটেরা বর্গীর দল এদিক দিয়েই বাংলায় ঢোকে। কথিত বর্গীদের অত্যাচারে রাজার রানীরা আত্মহত্যা করে। পড়ে রাজা তাঁর রাজধানী, অদূরে কাশীপুরে স্থানান্তরিত করেন। পুরো এলাকা ঘুরুন ঘণ্টা খানেক।  পাহাড়ের দৃশ্য দেখে যেমন মন ভরবে তেমনি ভারাক্রান্ত হবেন ভগ্নস্তুপ দেখে। একটি পঞ্চশিখর মন্দির নতুন নির্মিত হলেও পুরানো মন্দিরটির আর কেন্দ্রিয়  শিখরটি অবশিষ্ট রয়েছে জীর্ণ শরীরে। খানিক দূরে পাবেন বড় এক বাঁধ। সবুজ জল  টলটল করছে, হাসছে শালুক ফুলের দল। সত্যি দেখার মতো। এবার ফেরার পালা। সন্ধ্যার ব্ল্যাক ডাইমণ্ড-এ মানে যে ট্রেনে ভোরে হাওড়া চেপেছেন সেই ফিরতি ট্রেনে কলকাতা ফিরুন। হাতে সময় থাকলে পাঞ্চেত ড্যাম বা বিহারিনাথ পাহাড় ঘোরা সম্ভব । দুটি রাত এখানে কাটাতে পারলে পাশাপাশি মাইথন ড্যাম, কল্যানেশ্বরী মন্দির, বিহারীনাথ পাহাড়, জয়চণ্ডী পাহাড়, কাশীপুর সব ঘোরা সম্ভব। বিকালের মধ্যে মুরাডি স্টেশন পৌঁছে  সেখান থেকে ট্রেনে আধঘণ্টায় আসানসোল আর ঘণ্টা চারেক পথ বেয়ে পৌঁছে যান হাওড়ায়। ঝটিকা সফর হলেও স্মৃতিতে গেঁথে নিতে পারবেন পুরুলিয়ার দুই ফেবারিট পর্যটন স্থান। সেটাই বা কম কি !

যাওয়া আসা এবং থাকাঃ আসানসোল বা ধানবাদগামী ট্রেনে আসানসোল বা বরাকর বা কুমারডুবিতে নেমে কার ভাড়া নেওয়া। অথবা আসানসোল থেকে আদ্রাগামী ট্রেনে মুরাডি স্টেশন (আধ ঘণ্টার রাস্তা আসানসোল থেকে)। মুরাডি থেকে ট্রেকার বা অটো ভাড়া। আটশ টাকার মতো পড়বে দুটি স্থান ঘুরিয়ে আনতে। আসানসোল বা মুরাডিতে খেয়ে নিতে পারেন।  কেউ থাকতে চাইলে বনদপ্তরের যোগাযোগ নম্বরঃ ০৩৩-২২৩৭০০৬০, ২২৩৬৫২০২, ২৩৩৪১৭৫৬।  রিসর্টের হেল্প লাইন- ৮০১৬৩০৪৭০৯, ৯৭৭৫৩২৪৫০২। এছাড়া অন্য প্রাইভেট রিসর্টের জন্য  ৮০০১৭০২০৮৭, ৯৭৩২০৩৮৩৯৭।

ছবি: লেখক

ads

Mailing List