বাস্তব এমনও হয় / গল্প

বাস্তব এমনও হয় / গল্প
20 Mar 2022, 11:00 AM

বাস্তব এমনও হয়

 

ড. গৌতম সরকার

 

 আর্টস বিল্ডিং পেরিয়ে ডানদিকে কাঠের পুল, তারপর একদিকে যাদবপুর বিদ্যাপীঠের দেওয়াল, মাঠের মধ্যে দিয়ে সংকীর্ণ পায়ে চলা রাস্তা। যদিও একটু বাঁদিকে এগোলেই কংক্রিটের চওড়া রাস্তা, তবু বেদান্তের এই রাস্তাটাই ভালো লাগে। মাঠের মাঝ বরাবর বাঁদিকে এসি ক্যান্টিন, তারপর ডানদিকে গান্ধীভবন, এরপর সেন্ট্রাল লাইব্রেরি যাওয়ার রাস্তা বৃত্তাকারে ঘুরে গেছে। গান্ধীভবনের পিছন দিকে একপ্রস্থ স্টাফ কোয়ার্টার, বেদান্তকে সেখানেই যেতে হবে।

 দোতলা বাড়ি, বেশ পুরোনো, স্যাঁতসেঁতে না হলেও গোটা বাড়ি জুড়ে বুড়োটে গন্ধ ঘুরে বেড়াচ্ছে। দোতলার জানালার খড়খড়ি অধিকাংশই ভাঙা। একটা একমানুষ সমান পাঁচিল বাড়িটাকে ঘিরে আছে। খিড়কির দরজা দিয়ে ঢুকে অপ্রশস্ত উঠোন, তারমধ্যেই ডানদিকে একটা কুয়ো আর পাশে বাঁধানো কলতলা, একটা টিউবওয়েল সমেত। কুয়োতলায় গামছা পরে উদোম গায়ে যিনি স্নান করছিলেন উনিই মনোরঞ্জনবাবু। ওনার সঙ্গেই দেখা করতে আসা। বেদান্তের আসতে পাঁচমিনিট দেরি হয়ে গেছে দেখে অপেক্ষা না করে স্নান করতে শুরু করে দিয়েছেন। উনি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির প্রবীণ কর্মী।

  

মনোরঞ্জনবাবুর বক্তব্য এইরকম-- "গোলপার্কে ক্লাস ইলেভেনের একটি মেয়েকে টিউশন পড়াতে হবে। মেয়েটির বাবা ওনার বিশেষ পরিচিত। তবে একজন বিশ্বস্ত টিচার চাই। যিনি মূলত পড়ার ব্যাপারেই ধ্যান দেবে"। শেষের বাক্যটা ঠিক কিভাবে বললে 'সাপও মরবে আবার লাঠিও ভাঙবে না' মানুষটা ঠিক করতে পারছিলেন না। বেদান্ত হ্যাঁ হ্যাঁ করে উঠল, আসলে ওর ব্যাপারটা আগে থেকেই জানা ছিল। কথা শেষ হতে বেদান্ত সোজা হোস্টেলে ফিরল।

   

প্রথমদিন মেয়েটিকে দেখে বেদান্তের মনে হল কয়েকটা হার্ট বিট যেন মিস হল। 'রূপের ঝলকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া' বলে একটা কথা আছে, এ একদম তাই, শুধু এইরূপ পুড়িয়ে সবকিছু ছারখার করে দেয় না, দীর্ঘদিন ধরে ধিকিধিকি পোড়াতে থাকে। দেবাংশুর শত সাবধানবাণী সত্ত্বেও সব ভুলে বেদান্ত হাঁ করে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা যে খুব লজ্জা পেল তা মনে হলনা, আসলে একটু বড় হওয়ার পর থেকেই সে এইরকম নির্লজ্জ পুরুষ দৃষ্টিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। মেয়েটি সামনে এসে চেয়ার টেনে বসার পর নিজেকে কিছুটা সামলে নিল বেদান্ত। মনে হল সচেতনভাবেই চেয়ারটায় একটু বেশি আওয়াজ করলো, এটাতেও হয়ত সে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। চেতনায় ফিরে বেদান্ত প্রানপনে পড়াতে লাগল, চেষ্টা করল যতটা কম মুখের দিকে তাকাতে, তবু ভালো মেয়েটি পোশাক-আশাকে যথেষ্ট রক্ষণশীল। পড়ানো শেষ করে বেদান্ত উঠে পড়তে মেয়েটি বলল, 'আপনি কিন্তু দারুন পড়ান।" ব্যাস, যেটুকু তখনও পর্যন্ত ধরে রাখতে পেয়েছিল সেটুকুও বিসর্জন দিয়ে হোস্টেলে ফিরে এল তেইশ বছরের ছেলেটি।

 মেয়েটিকে আগে পড়াতো সুযশ, সুযশের বাবা ইউনিভার্সিটিতে পড়ান, সেই সূত্রে ওরা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ফ্যাকাল্টি ক্যাম্পাসে থাকে। ও দেবাংশুর বন্ধু, বেদান্তের সাথে শুধু মুখদেখাদেখি আলাপ। সেই সুযশ দুমাস পড়ানোর পরই মেয়েটির প্রেমে পাগল হয়ে প্রোপোস করে বসে, আর সেই থেকেই অশান্তি। সুযশকেও মনোরঞ্জনবাবুই ঠিক করে দিয়েছিলেন। মনোরঞ্জনবাবু সেদিন বেদান্তকে এধরণের ঘনিষ্ঠতা থেকে দূরে থাকার ইঙ্গিত দেওয়ারই চেষ্টা করছিলেন। তবে দেবাংশু সব কিছু পরিষ্কার করে দিয়ে বলেছিল, "দ্যাখ বেদান্ত তোর পয়সার জন্য টিউশন দরকার। যাবি পড়াবি চলে আসবি। অন্য কোনোদিকে তোর তাকাবার দরকার কী?" কিন্তু প্রথমদিনেই বেদান্তের মনে হল শরীরে অক্সিজেন স্যাচুরেশন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। তানাহলে হোস্টেলে ফেরার দুঘন্টা পরও দম নিতে এরকম অসুবিধা হচ্ছে কেন!

 টিউশন চলতে লাগল। বেদান্তের একটা সুবিধা হল মেয়েটি খুব বুদ্ধিমতী। ফলে পড়িয়ে আনন্দ পাওয়া যায়। আর সিরিয়াস স্টুডেন্টরা পড়াশোনার বাইরে ফালতু আড্ডার অবকাশ রাখেনা। বেদান্তের টিচার হিসেবে সুনাম আছে। তাই সব মিলিয়ে ইলেভেনের বাৎসরিক পরীক্ষা হয়ে গেল, আর বেদান্তের বিষয়ে খুব ভালো নম্বর পেয়ে মেয়েটি পাশ করল। ইলেভেনে রেসাল্ট আউটের পর মেয়েটির বাবা এসে আলাপ করে গেলেন। তার পড়ানোর প্রশংসাও করলেন। এর আগে ভদ্রলোককে দুয়েকবার দূর থেকে দেখেছে বেদান্ত, বেশ গম্ভীর মনে হয়েছিল। বেদান্তের মনে হয়েছে ভদ্রলোক প্রথম দিন থেকে ওকে মেপে যাচ্ছিলেন, যখন দেখলেন মেয়ে ভালো রেজাল্ট করেছে তখন কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে আলাপ সেরে গেলেন। মা ভদ্রমহিলা অবশ্য খুব ভালো, আধুনিকা হলেও সারা শরীরে মা মা রূপ ছড়িয়ে আছে। প্রতিদিনই মিষ্টি হেঁসে চা আর অল্পবিস্তর জলখাবার দিয়ে যান। দুটো একটা কুশল সংবাদ নিয়ে চলে যান। তবে বেদান্ত দেখেছে ওইটুকু সময়ের মধ্যেই বেদান্তের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মেয়ের দিকে বারবার তাকান। কি জানি! হয়ত মেয়ের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে কিছু বুঝতে চান। এটাও হয়ত ভদ্রলোক শিখিয়ে দিয়েছেন।

      এরপর বেদান্তের ফাইনাল পরীক্ষা চলে এল, দিন পনেরো টানা ছুটি নিতে হল। পরীক্ষার পর আবার টিউশন শুরু হল। মেয়েটির টেস্ট পরীক্ষা সামনে, বেদান্ত আগের নেওয়া ছুটি মেকআপ করতে সপ্তায় একদিন পড়ানো বাড়িয়ে দিল। ছয়মাস হয়ে গেল বেদান্ত পড়িয়ে চলেছে, কিন্তু দুঘন্টার পরিসরে এই দশ-বাই-বারো ঘরে দুজনের নিবিড় অনুষঙ্গে যে অপার্থিব পরিবেশ সৃষ্টি হয় সেটা তার কাছে একদম প্রথম দিনের মত টাটকা রয়ে গেছে। ফিজিক্সের জটিল থিওরেম বোঝাতে বোঝাতে, ক্যালকুলাস বা কো-অর্ডিনেট জিওমেট্রির আঁকেবাঁকে পড়ানোর ফাঁকে সতর্ক চোখে কিছু একটা খুঁজে ফেরার কাতর চেষ্টা বারংবার মাথা খুঁড়ে মরেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পিজি হোস্টেলের রংচটা দেওয়ালে।

   দেখতে দেখতে বেদান্তের রেসাল্ট বেরিয়ে গেল। রেসাল্টের পর হোস্টেলে থাকার নিয়ম নেই। যাদবপুরের আশেপাশে মেসের খোঁজখবর চালালো, কিন্তু কোনোটাই মনঃপুত হলোনা। অগত্যা একটা এককামরার ঘর ভাড়া নিয়ে কম্পিটিটিভ পরীক্ষার জন্য জোরকদমে প্রস্তুতি শুরু করল। বাবা একবার দেশের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথা বলেছিল। বেদান্ত চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির বাহানা দিলে বাবার উত্তর ছিল সেগুলো বাড়িতে বসেও করা যায়। বোন শমি তো দাদা বাড়ি ফেরার কথায় নেচে উঠেছিল। আসলে ও দাদাকে সেভাবে আর পেল কই? হায়ার সেকেন্ডারি দিয়ে  বেদান্ত যখন যাদবপুরে পড়তে চলে এল তখন শমির ক্লাস সেভেন। অনেক কষ্টে মাকে বুঝিয়ে টিউশনের দোহাই দিয়ে কলকাতায় পালিয়ে আসতে পেরেছে। কিন্তু একটা কথা বেদান্তের কাছেও খুব পরিষ্কার, এভাবে পালিয়ে পালিয়ে বেশিদিন চালাতে পারবে না। বাবার কিছু জমানো টাকা আর সামান্য পেনশনে কোনোরকমে সংসার চলছে। বেদান্ত যদিও কিছু নেয়না, তবুও বোনের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে সংসারের যাবতীয় খরচ সামলানো আজকের বাজারে বেশ চ্যালেঞ্জিং। তারপর বোনের বিয়ে। এখনও গ্রামেগঞ্জে মেয়েদের অল্পবয়সেই বিয়ের চল। শমির গ্রাজুয়েশন চলছে, পাশ করার পরই বিয়ের যোগাযোগ শুরু হবে। এইসময় বাবা চায়, ছেলে তার পাশে দাঁড়াক। মা একদিন খাবার সময় কায়দা করে বেদান্তকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ও এরপর কি করবে! বেদান্তের মা বাবার শেখানো কথা বলে যাচ্ছে বেদান্ত বুঝতে পেরেছিল। আসলে ওরা জানতে চাইছে, বেদান্ত আরও পড়তে চায় না চাকরির চেষ্টা করবে। কলকাতায় ফিরে সত্যি পড়ানো ছাড়া আর কোনও কাজ রইলো না। অন্যান্য টিউশনের সাথে গোলপার্কের টিউশনও চলতে লাগল। মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে এক শনিবার শেষবারের মত পড়াতে গেল বেদান্ত। মনটা ভারাক্রান্ত, ছাত্রী কিন্তু একদম স্বাভাবিক। আজকে তারও বেদান্তের কাছে শেষ পড়া তাতে কোনো হেলদোল চোখে পড়ছে না। পড়া শেষে ছাত্রীই তাকে ফিসের এনভেলপটা বাড়িয়ে দিতে একটু অবাক হয় বেদান্ত। বরাবর এটা সে মেয়েটির মায়ের হাত থেকেই পেয়ে এসেছে।

   খামটার কথা ভুলেই গিয়েছিল। সন্ধ্যেবেলা বাসায় ফিরে প্যান্ট ছাড়তে গিয়ে খামটা হাতে পড়ল। খুলতে গিয়ে চমক। টাকার সাথে একটা সাদা কাগজ চারভাগে ভাঁজ করা। কয়েকটামাত্র লাইন লেখা- "অপেক্ষা করবেন। বাড়িতে চতুর্দিকে সতর্ক পাহারা তাই কিছু বলা সম্ভব ছিলোনা। পরীক্ষার পর দেখা করবো, কথা হবে।" তলায় একটা ফোন নম্বর লেখা। বেদান্ত অনুভব করল, এই অকাল বসন্তেও চারদিকে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। পলাশ-শিমুল-কৃষ্ণচূড়া রঙের ফাগে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে আশপাশ। কোথা থেকে একদল টিয়া, ফিঙে, বউ-কথা-কও এসে আশপাশের গাছগুলোতে হুড়োহুড়ি শুরু করে দিয়েছে। ভীমসেন জোশীর মালকোষে দাদরার বোল ঠুকে আল্লারাখা সাহেব পেরিয়ে যেতে চাইছেন থর মরুর উদ্দাম বালুপ্রান্তর, আর তার ছোট্ট ঘরের ছোট্ট বারান্দা ভরে উঠছে আলপনা রঙা ছোট ছোট লক্ষীর পায়ের ছাপে। তারপর দিন চলতে লাগল আপন নিয়মে, বেদান্তের প্রতীক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠল, কিন্তু সেই প্রতীক্ষা কোনও বিরক্তির উদ্রেক করলোনা। তার মনে হল সারাজীবন ধরে সে এই মধুর অপেক্ষা করে যেতে পারে।

  অষ্টমীর সকাল। গ্রাম বাংলার বুক চিরে সবুজরঙা ট্রেন ছুটে চলেছে। দুদিক দিয়ে হু হু করে পেরিয়ে যাচ্ছে সবুজ ফসল ভরা ক্ষেত, মাটির বাড়ি, পানিফল ভর্তি ছোট ছোট পুকুর। কামরাতে বেশ ভিড়। অনেকে বাড়ি ফিরছে। কেউ কেউ গতকাল সারারাত কোলকাতার ঠাকুর দেখে আজ ফিরছে। সবাইয়ের মুখেই শারদোৎসবের আবির লেগে আছে। বেদান্ত জানলার পাশে বসে আছে, অন্যদিকের জানালায় দিঠি। ভালো নাম রাধিকা। বেদান্ত চোখ তুলে প্রশ্ন করলো, “জিজ্ঞাসা করলে না তো কোথায় যাচ্ছি!” মিষ্টি হেঁসে ওঠে দিঠি। কোনও উত্তর করে না। হাঁসলে ওর একটা গালে টোল পড়ে। বেদান্ত একবারের জন্যও সেই দৃশ্য মিস করতে চায়না। দিঠি সত্যি একবারও জিজ্ঞাসা করেনি, কোথায় যাচ্ছি। শুধু জিজ্ঞাসা করেছিল রাত নটার মধ্যে ফিরতে পারবে কিনা! আসলে আজকের পরিকল্পনা পুরোটাই বেদান্তের। অষ্টমীতে প্রতিবছরের মত দিঠির প্ল্যান ছিল বন্ধুদের সাথে ম্যাডক্স স্কোয়ারে কাটাবে। বিকেলে মা-জেঠিমারা আসেন সন্ধিপূজোয় অঞ্জলি দিতে। এবছর মা-বাবা জ্যেঠু-জেঠিমার সাথে বারাসাতে গেছে মণিদির শ্বশুরবাড়ি। তাই সুযোগ হয়েছে বেদান্তের সাথে বেরিয়ে পড়ার। বেদান্ত যদিও তার প্ল্যান নিয়ে খোলসা করে কিছু বলেনি, দিঠিও জিজ্ঞাসা করেনি।

    নটার আগেই বাড়ি ঢুকে পড়ল দিঠি। তখনও মায়েরা ফেরেনি। ঠাকুমা সবে পাড়ার ঠাকুরের আরতি দেখতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে, আর আরতি মাসি মেঝেতে বসে টিভিতে ঠাকুর দেখছে। দিঠি ফ্রেস হয়ে ছাদে গেল। ছাদ থেকে দূরে বাবুবাগান, সেলিমপুর পল্লী, এদিকে আদি বালিগঞ্জের পূজোর আলো দেখা যাচ্ছে। এর আগে কখনও দুর্গাপূজায় ছাদে ওঠা হয়নি। ছাদটা মূলত কালীপূজা আর দেওয়ালির জন্য বুক করা থাকে। আজ অন্যরকম আলো ঝলমল দক্ষিণ কলকাতা দেখতে খুব ভালো লাগছে। আজ দিনটা দারুন কেটেছে। এরকম দিনগুলো সারাজীবনের সঞ্চয় হয়ে থাকে। আজ বেদান্ত দিঠিকে তাঁর গ্রামের বেশ কাছাকাছি অন্য একটা গ্রামে নিয়ে গিয়েছিল। নিজের গ্রামে নিয়ে যেতে সাহস করেনি। কারণটা দিঠি আগেই জানে। বেদান্ত দিঠিকে কিছুই লুকোয়নি, বাড়িতে অবিবাহিত বোন থাকতে বেদান্ত-দিঠির এই সম্পর্ক ওর রক্ষণশীল বাবা-মা মেনে নেবেন না। দিঠি কলকাতার মেয়ে হলেও, গ্রামীন মানুষের এই ধরনের চিন্তাভাবনার কথা জানে। আজ তারা যে গ্রামটায় গিয়েছিল নামটা ভারি মিষ্টি! পিপলি। হাওড়া-বর্ধমান কর্ডলাইনের একটা স্টেশনে নেমে রিকশাভ্যানে আধঘন্টার রাস্তা। স্টেশনে নেমেই দিঠি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাল-নারকেল গাছে ঘেরা ছোট্ট একটা নির্জন স্টেশন। দূরে মেটে সিঁদুর রঙা একটা ছোট টিকিট ঘর। বাদামি মাটির বুক চিরে ইস্পাতের দুটি সমান্তরাল লাইন দিগন্তে মিশে গেছে। বেশি দূরে তাকাতে চাইলে দুচোখ জ্বালা করে ওঠে। স্টেশন থেকে নেমে রিকশা ভ্যানে উঠতেই কোত্থেকে এক সরসী নদী ওদের সঙ্গ নিল। বেশি চওড়া নয়, ওপারের মানুষজনকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ইতস্তত পূজোর প্যান্ডেল, রাস্তায় নতুন জামাকাপড় পরে মানুষের যাতায়াত সব বোঝা যাচ্ছে। এপারের দৃশ্যও একইরকম। চারদিকে পূজো পূজো গন্ধ। নদীর চর বরাবর কাশফুলের বাহার দেখে দিঠি বলেই ফেলল, "এই গাড়িটাকে একটু থামতে বলোনা। কাশের জঙ্গলে যাবো। আমি কখনও কাছ থেকে কাশফুল দেখিনি"। বেদান্ত হেঁসে আশ্বস্ত করল, কিন্তু ভ্যানচালককে থামতেও বললোনা। ভ্যান গিয়ে একটা গঞ্জ মতো জায়গায় থামলো। জায়গাটা একটু জঙ্গম। ওরা প্রথমে একটা দোকানে ঢুকে কচুরি আর ছানার গজা খেয়ে নিল। তারপর দুই কিশোর-কিশোরী নদীর পাড় ধরে ঠাকুর দেখতে চলল।

  গ্রামের পূজো কেমন হয় তার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিলনা দিঠির। বাড়ির মেয়েদের পুরোনো কাপড় দিয়েও যে প্যান্ডেল করা যায়, না দেখলে বিশ্বাস করত না। সঙ্গতি অতি স্বল্প, কিন্তু নিষ্ঠা ও ভক্তির কোনও অভাব নেই। এমন পাড়াও দেখলো যেখানে তিনটি প্রান্তিক পরিবার বাস করে, তারা নিজেরাই কাদামাটি দিয়ে প্রতিমা গড়েছে। বহু কষ্টে দূর গাঁয়ের এক ব্রাহ্মণকে পূজো করে দিতে রাজি করিয়েছে। নদীর একদম ওপরে গ্রামটি। বর্ষায় বাড়িঘর কোথায় ভেসে চলে যায়। বাঁশের দেওয়াল আর খাপড়ার চাল। বৃষ্টির সময় পঞ্চায়েত থেকে দেওয়া ত্রিপল চালের মাথায় বিছিয়ে দেয়; আর অতি বৃষ্টি বা বন্যার সময় বাড়ি ছেড়ে উঁচুজমিতে এলাকার প্রাইমারি স্কুলে আশ্রয় নেয়। এবছর তারা দুর্গতিনাশিনীর পূজো করছে, দেবী যদি তাদের দূর্দশার দিকে মুখ তুলে তাকায়। সেখান থেকে নদীর উত্তর দিকের পাড় বরাবর আরও এগিয়ে চলল। এদিকটা ঘন কাশবন। দিঠির আনন্দ আর ধরেনা। মাইলের পর মাইল জুড়ে কাশের বন নদীবক্ষে ছড়িয়ে আছে। আজ আকাশ একদম পরিষ্কার। ঘন নীল জমিতে সাদা পালক মেঘগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো উড়ে বেড়াচ্ছে। কলকাতার আকাশ কখনও এত নীল হয়না, এইটুকু তফাতে আকাশের এই রূপবদল বেশ দেখার মত। এদিকটায় একটা নৌকোঘাটও আছে। তাদের দেখতে পেয়ে নিচের ঘাটা থেকে একটা বারো-তের বছরের ছেলে লাফাতে লাফাতে উঠে এল। হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, "দাদা, দিদি, তোমরা নৌকা চড়বে? ওপার থেকে ঘুরিয়ে আনবো, একশো টাকা দেবে।" ওর বলার কায়দায় দুজনেই হেসে ফেলল। নদীভ্রমণ বোধহয় বেদান্তের হিসেবে ছিলনা। একটু ইতস্তত করে রাজি হল। তবে শর্ত দিল ওপারে গিয়ে ওরা আধাঘন্টা ঘুরে-বেরিয়ে তারপর ফিরবে। বাচ্চাটা এককথায় রাজি। সকাল থেকে হয়ত সে এই প্রথম সওয়ারী পেয়েছে। সে এবার দৌড়ে গিয়ে নৌকার গলুইয়ে হাল বাগিয়ে বসে পড়ল। এখনও চোখ বুজলে দিঠি নৌকার সেই দুলুনি অনুভব করতে পারছে। রাত হয়েছে, কার্তিক মাসে রাতে হালকা হিম পড়ে। দিঠির আবার অ্যাজমার সমস্যা আছে। উন্মুক্ত ছাদে আর থাকা ঠিক হবেনা। কাশের গুচ্ছের মত সাদা স্বপ্নগুলোকে ভাঙতে ভাঙতে নিচে নেমে এল।

     দিঠি কলকাতার এক নামি কলেজে ফিসিক্স অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছে। পড়াশোনার যথেষ্ট চাপ আছে। কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকারা একদম স্কুলের স্যার-ম্যামদের মত। পড়ান, পড়া ধরেন, নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর ক্লাস টেস্ট নেন। তাই ফ্রি-সময় পাওয়া দুষ্কর। তার মধ্যেই সপ্তায় একবার দুবার বেদান্ত-দিঠির দেখা হয়। বেদান্ত কখনোই নিজের শিক্ষকের ভূমিকার কথা ভোলেনা। সে সবসময় বলে, "প্রেম অ্যাট দ্য কস্ট অফ পড়াশোনা, কখনোই না।" বেদান্ত নিজের লক্ষ্যের কথাও কখনও ভোলে না। সে জানে ঘরে বাইরে সমস্যা দানা বাঁধছে। ওদিকে শমির দেখাশোনা শুরু হয়েছে, আর এদিকে দিঠির বক্তব্য বেদান্ত একটা ভালো চাকরি যোগাড় করতে পারলে ওর বাড়িতে বলার একটা জোর তৈরি হয়। কিন্তু প্রথম বছর ডব্লিউবিসিএস রিটনে কোয়ালিফাই করেও ইন্টারভিউয়ে হলোনা। বেদান্ত হতাশ হয়ে পড়ল। দিঠি সমানে তাকে সাহস যুগিয়ে গেল, সবসময় সবকিছু একচান্সে হয়না, পরেরবার আরও চেষ্টা করবে, নিশ্চয়ই হবে। কিন্তু পরেরবারও একই ঘটনা ঘটলো। এবার হতাশা নয়, ভয় পেয়ে গেল বেদান্ত। নিজের ওপর কনফিডেন্স কমতে লাগল। এর মধ্যে দিঠির পার্ট-ওয়ান ফাইনাল শুরু হল। দেখাসাক্ষাৎ একদম কমে গেল। বেদান্তের সমস্যা আরও বেড়ে গেল।

   ঠিক সেইসময় বাড়ি থেকে তলব এল। শমির বিয়ে ঠিক হয়েছে। বর্ধমান শহরে বাড়ি। ছেলে একটি হাই স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার। এছাড়া জমিজায়গা এবং বাবার একটা সারের গোডাউন আছে। ছোট ভাই কলেজে পড়ে। কোনও বোন নেই। একদম ঝাড়া হাত-পা পরিবার। বাবা তো এখানে সম্পর্ক তৈরির জন্য ফুটছে। বেদান্ত যখন পৌঁছল তখন আর বেশিকিছু আলোচনার বাকি ছিলনা, শুধু বিয়ের ডেট ফাইনাল করা ছাড়া। সুরঞ্জনবাবুর কোনদিনই ছেলের ওপর বিশাল কিছু ভরসা ছিলোনা। আর ইদানিং ছেলের মতিগতির তেমন কোনো হালহদিশ পাচ্ছিলেন না। তাই ছেলের ওপর নির্ভর না করে কথাবার্তা অনেকটা এগোনোর পর ছেলেকে জানিয়েছেন। শমির বিয়ে হয়ে গেল। সুরঞ্জনবাবু একমাত্র মেয়ের বিয়েতে সাধ্যের অতীত খরচ করলেন। বিয়ের পর বেদান্তকে ডেকে একটা কথাই বললেন, "এবার তোমার ব্যাপারটা তোমাকেই দেখতে হবে। আমি সব সঞ্চয় ভেঙে তোমান বোনের বিয়ে দিলাম। পেনশনের টাকায় আমাদের বুড়োবুড়ির কোনরকমে চলে যাবে। এই দুকামরার ঘর ছাড়া তোমার জন্যে কিছুই রেখে যেতে পারবো না।" বাবার সেই অমোঘবাণী মাথায় নিয়ে কলকাতায় ফিরে এল বেদান্ত।

   আশঙ্কা ছিলই, অবশেষে বিপদটা একদিন সশরীরে উপস্থিত হল। এক বিকেলে দিঠি এসে জানালো, বাড়িতে ওর বিয়ের দেখাশোনা শুরু হয়েছে। কোনও এক এনআরআই ইঞ্জিনিয়ার পাত্রের খবর এসেছে, ছেলে নাকি রূপে কন্দর্প গুনে বিশ্বকর্মা। বাড়ির লোকজনের মুখে পাত্রের গুণপনা শুনতে শুনতে দিঠির কান ঝালাপালা হয়ে উঠছে। দিঠির বাবা তো পারলে ফাইনাল পরীক্ষার আগেই বিয়ে দিয়ে দেয়। দিঠি ভেজা চোখে বেদান্তের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, "কি করবো? বাড়িতে কি বলবো?" এমন পরিস্থিতিতে পড়লে কি বলতে হবে বা করতে হবে বেদান্ত আগে থেকে ভেবে রাখেনি। তাই দিঠির প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিতে পারলোনা। দিঠি উত্তরের জন্য মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বেদান্ত কোনরকমে বলে, "কি বলবো বলো তো! এত ভালো ছেলে...আর আমি একজন ব্যর্থ..... অসফল।" এই প্রথম স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে চেঁচিয়ে উঠল দিঠি...."চুপ, একদম চুপ....পুরুষমানুষের মতো কথা বলতে পারলে বলবে, না পারলে চুপ করে থাকবে। এধরণের কথা বলতে তোমার লজ্জা করছে না?" বেদান্ত দিঠির দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটা হাউ হাউ করে কাঁদছে। সাময়িকভাবে সে সান্ত্বনা দিতেও ভুলে যায়। অবশেষে সম্বিৎ ফিরতে দুহাতের ঘেরে দিঠিকে জড়িয়ে নেয় বেদান্ত। মুখে বলে, "আমি তো চেষ্টা করছি দিঠি। তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে সারাদিন চাকরির পিছনেই ছুটে বেড়াচ্ছি। না লাগলে আমি কি করতে পারি বল?" বেদান্তের বুকের মধ্যে এতটুকু হয়ে কুঁকড়ে পড়ে থাকে মেয়েটি। আস্তে আস্তে শ্বাস স্বাভাবিক হয়। ফোঁপানি কমে। বেদান্তের কোলের আশ্রয়ে থেকে বলে, "আমি আজ বাড়িতে তোমার কথা জানাবো!

বেদান্ত চমকে ওঠে, "মানে!"

"মানে আবার কি? যা সত্যি তাই বলবো"৷

"কিন্তু! আমার এই অবস্থায়?"

"অবস্থা! অবস্থা আবার কি? এই অবস্থা কি সারাজীবন থাকবে? তুমি অনেস্টলি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছ। আজ না হয় কাল, ভালো একটা কিছু হবেই"।

বেদান্ত উদাস স্বরে বলে, "দিনদিন আমি কেমন দিশা হারিয়ে ফেলছি, দিঠি। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা আর কিছু হবে না"৷

দিঠি উঠে বসে। বেদান্তের চুলে, মুখে হাত বোলাতে বোলাতে বলে, "তুমি ভেঙে পড়লে কি করে হবে, বেদ? আমি তাহলে কার মুখের দিকে তাকিয়ে লড়াই করবো? এই লড়াইটা কিন্তু আমাদের দুজনের, মনে রেখো"৷

     চারমাস পর দিঠির ফাইনাল পরীক্ষা। কিন্তু বাড়িতে যা শুরু হল পড়াশোনা মাথায় উঠল। যেদিন সে বেদান্তের কথা জানালো, সেদিন থেকে বাড়িতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বাবার চিৎকার আর হুঙ্কারে সবাই তটস্থ হয়ে উঠেছে। মা, জেঠিমা, জেঠু সবাই দিঠির সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু ঠাকুমা তার কষ্ট কিছুটা হলেও বোঝার চেষ্টা করছে। এরমধ্যে বাড়ির বড়দের অনেকবার মিটিং হয়েছে, দিঠি যথারীতি অনাহুত থেকেছে। তার বিচার হচ্ছে, অথচ আত্মপক্ষ সমর্থনে তাকে কেউ কোনও সুযোগ দিচ্ছেনা। দিনদশেক পর একদিন জেঠু দলের প্রতিনিধি হয়ে এসে তাকে একটি প্রশ্ন ও একটি বিধান জানাল।

প্রশ্নটা হল, 'তুমি কি এখনও নিজের সিদ্ধান্তে অটুট আছো?' উত্তর সদর্থক হওয়াতে এবার সিদ্ধান্তটি জানালেন, 'তাহলে তোমাদের একবছর সময় দেওয়া হল। এরমধ্যে বেদান্ত যদি কোনও সরকারি অফিসারের চাকরি জোগাড় করতে পারে তখন তোমাদের সিদ্ধান্ত ভেবে দেখা যাবে'৷

     দিঠি উড়তে উড়তে এসে বেদান্তকে খবরটা জানালো৷ তার কাছে এটা একটা দারুন সুযোগ। বেদান্ত কিন্তু সব শুনে দিঠির মত উছ্বসিত হতে পারলো না যেটা দিঠির চোখ এড়ালো না। সে দুহাত দিয়ে বেদান্তকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, "বেদ, এটা আমাদের শেষ সুযোগ, এটায় আমাদের জিততেই হবে। তুমি মনপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করো বেদ। আমি সেই দিনটার ভরসায় সমস্ত কষ্ট-অপমান সহ্য করে থাকবো। তুমি শুধু নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকো"। বেদান্তের মনের মধ্যে অনেক কথা, অনেক আশঙ্কা, অনেক অস্পষ্টতার আনাগোনা, কিন্তু দিঠির ঘন নীল দুচোখের আর্তি লক্ষ্য করে কিছু বলতে পারলোনা। শুধু নিজের দুটো হাতে দিঠির ঘামে ভেজা হাতদুটো চেপে ধরল।

     একটা একটা করে দিন কাটতে লাগল, দুটি ছেলে-মেয়ে শহরের দুটো জায়গায় দুরকমের জীবন কাটাতে লাগলো। একবাড়ি আত্মীয়ের মধ্যে নিরন্তর টন্ট-টিটকিরির মধ্যে দিঠির নির্বান্ধব দিন কাটতে লাগল। অন্যদিকে একলা ঘরে একরাশ বইখাতার ভিড়ে বেদান্তের মনে হল দিনদিন চারপাশের দেওয়ালগুলো একটু একটু করে তার দিকে এগিয়ে আসছে। এভাবে এগোতে এগোতে পরিসর ছোট হতে হতে একসময় তাকে চেপে ধরবে। ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে ওঠে বেদান্তের, ছটফট করতে থাকে। পরীক্ষা যত কাছে আসতে লাগলো ভয় আর আশঙ্কায় বেদান্তের খিদে চলে গেল। সিগারেটের ধোঁয়ায় সারাঘর অন্ধকার, মুহুর্মুহু ছাইদানি ভরে উঠতে লাগল। দিঠি জেদি মেয়ে, সমস্ত প্রতিকূলতা মেনে নিয়ে ভালো রেসাল্টের জন্যে সে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। সেই ঝাঁজ কোনোভাবেই বেদান্তের মধ্যে দেখা যাচ্ছেনা। দু-দুবার অকৃতকার্য হয়ে তৃতীয়বার কৃতকার্য হবে এই বিশ্বাসটাই সে নিজের মধ্যে আনতে পারছে না। এইসব মিলিয়ে এখন দুজনের দেখাসাক্ষাৎ হয়না বললেই চলে। বেদান্ত দেখা করার ইচ্ছেটাই হারিয়ে ফেলেছে। দিঠিকে দেখলে তার এখন ভয় লাগে। ওর গভীর চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, ও একটা গভীর নদীতে ডুবে যাচ্ছে। হাত-পা ছুঁড়ে বাঁচার জন্য চিৎকার করছে, দিঠি হাতটা না বাড়িয়ে কঠিন ভর্ৎসনার চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। দিঠির মুখে শুনেছে ওর বাড়ির লোক অতি উৎসাহে ওই এনআরআই পাত্রের সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে। ওরা ধরেই নিয়েছে এই চ্যালেঞ্জে দিঠি-বেদান্তের হার অনিবার্য। তাই বাড়ির লোক দিঠিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে বিয়ের কেনাকাটাও শুরু করে দিয়েছে।

       আজ দিঠির বিয়ে। যাদবপুর কলোনি এলাকার ভাড়া করা এক কামরার একটা ফ্ল্যাটের জানলা দরজা বন্ধ। না, কোনো পচা খারাপ গন্ধ ভিতর থেকে আসছে না, কারণ ঘরের মানুষটা বেঁচে আছে। তবে এই বাঁচাকে বেঁচে থাকা বলে কিনা সেটা তর্কসাপেক্ষ। উবু হয়ে বসে ছেলেটা চক খড়ি দিয়ে সারা মেঝে ভরিয়ে তুলেছে, 'আমি পারলাম না দিঠি, ক্ষমা কোরো'। ঘরে অনেকগুলো মাথাভাঙা পেন্সিল ইতস্তত ছড়িয়ে আছে। চারটে দেওয়াল আগেই পেন্সিলের আঁকিবুঁকিতে ভরে উঠেছে, 'পারলাম না......পারলাম না.....পারলাম না...ক্ষমা কোরো...ক্ষমা কোরো...."৷

                                     ......শেষ.......

Mailing List