২১ আগস্ট বিভীষিকাময় কলঙ্কিত দিন, এ ধরনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া বিরল

30 Aug 2022, 01:19 PM

২১ আগস্ট বিভীষিকাময় কলঙ্কিত দিন, এ ধরনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া বিরল

        

সাইদ আহমেদ বাবু

 

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট এক বিভীষিকাময় কলংকিত দিন। সেদিন গ্রেনেড হামলা চালিয়ে বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরি শেখ হাসিনা তথা এদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার নেতৃত্বকে নিঃশেষ করতে চেয়েছিল। তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। হত্যাজজ্ঞ অবলোকন করে সারা পৃথিবীর বিবেক স্তব্ধ বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। বিশ্ব রাজনীতিবৃন্দ এই বীভৎস হত্যাকান্ডের হোতা ঘাতকদের প্রতি ঘৃণা ধিক্ষার জানালেন। পরিকল্পিত গ্রেনেড হামলা ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট তথা খালেদা-নিজামীর নীল নকশা আর জঙ্গীবাদ উত্থানের ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত।বিশ্ব জুড়ে তোলপাড় করা গ্রেনেড হামলার সেই ঘটনার ভয়াবহতা আমাদের হতবাক করে দিয়েছিল। প্রকাশ্য দিবালোকে রাজনৈতিক সমাবেশে এ ধরনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া বিরল। শোকবিহ্বল জাতি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে আজ ইতিহাসের ভয়াবহতম গ্রেনেড হামলার ১৮তম বার্ষিকী পালন করছে।

 

রাজধানী ঢাকা শহরে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায়  দেশের প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ আয়োজিত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড নিক্ষিপ্ত হয় ও আক্রমণের ঘটনা ঘটে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়।

 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির কলঙ্কিত অধ্যায়ের দ্বিতীয় অধ্যায় ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যাই ছিল মূল টার্গেট। ওই এক মিনিট অপেক্ষা না করলে হয়তো রচিত হতো অন্য ইতিহাস। হামলার ভয়াবহ সেই ঘটনা বাঙালি জাতি কোনোদিন ভুলবে না। ওই জনসভায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে এ হামলা চালানো হয়। আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীরা মানববর্ম তৈরি করে তাঁকে রক্ষা করেন। ১৭ বছর আগে এই দিনে মুহুর্মুহু গ্রেনেডের বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। মানুষের আর্তনাদ আর কাতর ছোটাছুটিতে তৈরি হয় এক বিভীষিকা। গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে পড়ে ওই হামলায়। আজ সেই ২১ আগস্ট, নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ভয়াল দিন।

 

এই বর্বরোচিত আক্রমণে  আহত হন প্রায় তিনশোর ওপরে। আর অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা এই আক্রমণে গুরুতর আঘাত পান। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিক, দলীয় কর্মী এবং তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর তৎপরতায় তিনি কোনওক্রমে রক্ষা পেলেও তাঁর দেহরক্ষী ও দলের এক  বিশিষ্ট নেত্রী মহিলাবিষয়ক সম্পাদক গুরুতর আহত আইভী রহমান সেদিনের গ্রেনেড হামলায় ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মারা যান ২৪ আগস্ট। ২৪ জন এই ঘটনায় নিহত হন। জঙ্গিরা তাদের সঙ্গে থাকা ১৫টি গ্রেনেডের মধ্যে দুই দফায় ১৩টি গ্রেনেড চার্জ করে। ১২টি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হলেও একটি বিস্ফোরিত হয়নি। রমনা ভবনের পাশের গলি থেকে দুটি গ্রেনেড অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ।

 

এই আক্রমণের মূল লক্ষ্য যে শেখ হাসিনাই ছিলেন, সে ব্যাপারে প্রায় কেউই সংশয় প্রকাশ করবেন না। প্রসঙ্গত, তাঁর ওপরে এর আগেও ১৮ বার আক্রমণের চেষ্টা হয়েছে। এবারের আক্রমণটি যে যথেষ্ট পরিকল্পিতভাবেই করা হয়েছিল তাতে সন্দেহের বিশেষ অবকাশনেই। শুধু গ্রেনেড হামলাই নয়, সেদিন শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার গাড়িলক্ষ্য করেও চালানো হয় ছয় রাউন্ড গুলি। সেদিন বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রাণে বেঁচে গেলেও তার দুই কান ও চোখ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপূরণীয় ক্ষতি হয় তার শ্রবণশক্তির। গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের জাতীয় নেতাদের হত্যা করে দেশকে রাজনৈতিক মেধা শূন্য করার পায়তারা করেছিল তারা; কিন্তু তাদের এ প্রচেষ্টা সফল হতে পারেনি।

 

এ আক্রমণ বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরি শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রক্তপিপাসু বিএনপি-জামায়াত অশুভ জোটের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। অলৌকিকভাবে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসেন তিনি। এছাড়া আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দসহ দলের অগণিত নেতাকর্মী গ্রেনেড হামলার স্পিন্টার দেহে বহন করে চলছে দুর্বিষহ যন্ত্রণা নিয়ে। এর মধ্যে ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, অভিজ্ঞ পার্লামেন্টেরিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ অনেকেই গ্রেনেড হামলার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

 

সমাবেশের প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে বিকাল ৫টায় পৌঁছালে, একটি ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে তিনি ২১ মিনিটের বক্তৃতা শেষে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু-কন্যা মঞ্চ থেকে নিচে নেমে আসার মুহূর্তেই শুরু হয় মঞ্চ লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গ্রেনেড হামলা। মাত্র দেড় মিনিটের ব্যবধানে বিস্ফোরিত হয় ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেড। গ্রেনেডটি ট্রাকের বাঁ-পাশে পড়ে বিস্ফোরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেখ হাসিনা ট্রাকের ওপর বসে পড়েন। তার সঙ্গে থাকা অন্য নেতারা এ সময় মানবঢাল তৈরি করে তাকে ঘিরে ফেলেন। আরও দুটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ও সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নিরাপত্তা কর্মকর্তা মেজর (অব.) শোয়েব, ব্যক্তিগত স্টাফ নজীব আহমেদসহ দেহরক্ষীরা শেখ হাসিনাকে ধরে ট্রাক থেকে দ্রুত নামিয়ে তার মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িতে তুলে দেন। শেষ টার্গেট হিসেবে চক্রান্তকারীরা ওই গাড়ি লক্ষ্য করেও গুলি ছুড়েছিলেন।একটা দুইটা নয়; পর পর ১৩টা গ্রেনেড ছোড়া হয়। তার মধ্যে দুই-তিনটা গ্রেনেড অক্ষত (অবিস্ম্ফোরিত) ছিল।'

 

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এই মামলার সঠিক তদন্ত তো হয়ইনি, বরং ষড়যন্ত্রের হোতাদের রক্ষার উদ্দেশ্যে মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এবং আলামত ধ্বংস করার নানাবিধ ষড়যন্ত্র হয়েছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে পুনরায় এ মামলার তদন্ত শুরু হয়।

 

২১ আগস্টের হামলার সময় তৎকালীন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল- আহতদের সাহায্যে এগিয়ে না এসে পুলিশ উল্টো তাদের হেনস্তা করে। এই ঘটনার পর হত্যা, অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে মতিঝিল থানায় দুটি মামলা করা হয়। তবে মামলা নিয়ে ওই সময় ক্ষমতায় থাকা বিএনপি সরকারের ভূমিকা নিয়েও নানা অভিযোগ তোলে আওয়ামী লীগ। জজ মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে গ্রেনেড হামলার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার বিষয়টি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। ২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ওই হামলার পুনঃতদন্ত হয়।সেই তদন্তে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান এবং তৎকালীন বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর নাম বেরিয়ে আসে। বিএনপি-জামায়াত সরকার এ হামলা চালাতে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের জড়ো করেছে, প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং তাদের নিরাপদে বিদেশে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

 

একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারসহ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ওই হামলার ঘটনায় তখনকার ক্ষমতাসীনরা সরাসরি জড়িত ছিল। বিএনপি-জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতায় এই হামলা হয়েছিল বলেই সেদিন তারা এই হামলার আলামত নষ্ট করেছিল। সংসদে ওই ঘটনা নিয়ে আওয়ামী লীগকে কথা বলতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল।২০০৪ সালের পর থেকে নারকীয় গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে ও হতাহতদের স্মরণে সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদবিরোধী নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে।

 

গ্রেনেড হামলার পর পুলিশ হামলাকারীদের নির্বিঘ্নে ওই এলাকা ত্যাগ করার সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে। বিএনপি-জামায়াতপন্থি চিকিৎসকরাও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আওয়ামী লীগের আহত নেতাকর্মীদের চিকিৎসা দেননি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে কোনো রোগীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বিএনপি-জামায়াত সরকার সরাসরি এ হামলার সঙ্গে জড়িত না হলে কি এভাবে বাধা দিত? ঘটনার পেছনে নিশ্চিতভাবে বিএনপি ও ইসলামি জঙ্গিদের যে হাত রয়েছে তা যথেষ্ট স্পষ্ট। হামলার পর বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের তত্বাবধানে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তাতে জজ মিয়া নামের এক ব্যক্তি, একজন ছাত্র, একজন আওয়ামী লীগের কর্মীসহ ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী তদন্তে তাদের কারো বিরুদ্ধেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

 

পুনরায় তদন্তে পুলিশ এই হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ২১ জনকে চিহ্নিত করে। এর আগে বেশ কয়েকটি বিদেশি মিশন যেমন ব্রিটিশ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড, ইউএস ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এবং ইন্টারপোল বাংলাদেশি তদন্তকারীদের সাথে যোগ দিলেও বিএনপি সরকার তাদের সহযোগিতা করেনি বলে এসব প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করেছিল।

 

 

বস্তুত, এই ন্যক্কারজনক ঘটনার ব্যাপারে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ও  জামাত-এ-ইসলামির জোট সরকার তার দায় পুরোপুরি এড়াতে পারে না। দেশের বিরোধী নেত্রী ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব একটি গণতান্ত্রিক দেশের সরকার কখনওই উপেক্ষা করতে পারে না।

 

মামলার অভিযোগ আছে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিকারের ব্যাপারে তৎকালীন বিএনপি সরকার নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করেছিল। শুধু তাই নয় হামলার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের রক্ষা করতে বিএনপি সরকারের কর্মকর্তারা ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালায়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত পাঁচটি গ্রেনেড ধ্বংস করে দিয়ে হামলার আলামত নষ্ট করার চেষ্টাও হয়েছিল।

 

চাঞ্চল্যকর এ মামলায় বিচারিক আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে প্রধান কৌসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, ‘এ মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে সাক্ষ্য তথ্য প্রমাণে দেখেছি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার জঙ্গি গোষ্ঠীর সহায়তা নিয়ে ইতিহাসের জঘন্যতম এ ঘটনা ঘটিয়েছে।’

 

২০১৮ সালের অক্টোবরে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায় হয়। এর মধ্য দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। আইনি বিধিবিধান ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যত দ্রুত সম্ভব এই রায় কার্যকর করা হবে বলে আশা করাযায়।

 

মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান, দলটির নেতা হারিছ চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়ে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর রায় দেন বিচারিক আদালত। এই রায়ের বিষয়ে হাইকোর্টে আপিল মামলা শুনানির অপেক্ষায় আছে। গুরুত্বপূর্ণ সব আলামত ধ্বংস করে। কিন্তু সত্য কখনো চাপা থাকেনি। পরবর্তীকালে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তে বেরিয়ে আসে বিএনপি-জামায়াত জোটের অনেক কুশীলব এ হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল।

 

মানবতার দর্শনের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদীদের বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব – তারাও ঘর ছাড়ে, পথে বেরহয়, কেবল হত্যা করবে বলে। এখন সময় এসেছে এই হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেবার, কেবল ধিক্কার জানানো ই যথেষ্ট নয়। একটা আগাম মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ চালাতে হবে সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে এবং আরো বেশি করে তাদের যারা উস্কানি দেয় তাদের বিরুদ্ধেও। যে- মৌলবাদীরা সন্ত্রাসবাদকে  ঘৃণ্য ঘোষণা করতে অপারগ তাঁদের হয় নতুন করে শেখাতে হবে, নয়তো অমান্য করতে হবে পুরোপুরি। আর যা  যারা মতবিরোধের অজুহাতে সন্ত্রাসকে ছাড়পত্র দিচ্ছেন, তাঁদের কণ্ঠস্বরকেও রোধ করা জরুরি। ঘাতক চক্রের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বহীন করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে রুখে দেওয়া এবং দেশে স্বৈরশাসন ও জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ তা হতে দেয়নি।’

 

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলায়, জঙ্গি হানার দিনগুলিতে বাংলাদেশের মানুষ সন্ত্রাসের বিপরীতে  যেমন সংযমী অকর্মণ্য প্রশাসনের বিপরীতে তেমনি নির্মম। এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর, স্বজন হারানো মানুষগুলির মুখ বারবার উঠে এসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় হত্যাকান্ডের পরিপ্রেক্ষিতে এমন কিছু ঘটনা সামনে এসেছে, যা আমাদের অন্যরকম ভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

 

বাংলাদেশের জনগণের একথা  ঠেকে  শিখেছেন যে, সন্ত্রাসবাদীদের কোন ধর্ম হয় না। তারা যে কোনও বর্ণের, যে কোনও জাতের, যে-কোনোও ভাষাভাষী হতে পারে। তাদের একটাই পরিচয়, তারা সন্ত্রাসবাদী। কোন ধর্মই ধর্মের নামে নিরপরাধ অসহায় মানুষকে হত্যার কথা বলে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা আর নরহত্যার মাধ্যমে সন্ত্রাস ছাড়ানো এক জিনিস নয়। সৃষ্টিকর্তা অনন্ত মঙ্গলময়। তাই মানুষের কল্যাণ কামনায় সব ধর্মের মূল লক্ষ্য।

 

রাজনীতি এই শব্দের মধ্যে যে 'নীতি' এই অংশটি আছে তার অর্থ নিয়ম, তার অর্থ হলো ঋণ, তার অর্থ হল সত্য। এই দৃষ্টিতে ধর্ম ও রাজনীতি সমার্থক যিনি রাজনীতির চর্চা করেন তাঁর জীবন এক সত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত । জীবন ধর্মময় হবে, জীবন রাজনীতির উচ্চ আদর্শে প্রতিষ্ঠত হবে এইতো কাম্য। আমরা সেই ধর্ম ও সেই রাজনীতিকে আশ্রয় করবো। যার কল্যাণে সমস্ত বিশ্ব এক নিড় হবে। পৃথিবীর মানব সমাজকে প্রাচ্য ও প্রতীচ্য এই দুই ভাগে বিভক্ত করা নিতান্তই অসমীচীন। বিশ্ব এক নীড়, রাজনীতির উচ্চ আদর্শ ব্যক্তি, গোষ্ঠীর বা দলের মধ্যে বিভেদ বিবাদ শান্ত করে ঐক্যের প্রতিষ্ঠাকরে।

 

সব ধর্মেই  মুষ্টিমেয় মৌলবাদী ও  ভ্রষ্টাচারীর জন্য অসংখ্য সাধারণ মানুষকে দুর্বিপাক সহ্য করতে হয়।এই সন্ত্রাসবাদীদের ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা দেখে আমরা শিউরে উঠি, মানুষ কি করে এমন হিংস্র হয়, ভেবে অবাক হই। কিন্তু মানবসভ্যতার তো এদের ছাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা। এই সন্ত্রাসবাদীদের যারা উস্কানিদাতা, তারা কি জোর করে সভ্যতাকে পিছিয়ে দিতে চাইছে এখানেই আমাদের পরীক্ষা। সন্ত্রাসবাদীদের অস্ত্র যতই আমাদের দিকে তাড়া করে আসুক, তবু সভ্যতার অগ্রগতিকে  আমরা কিছুতেই রুদ্ধ হতে দিব না। বিএনপি যারা  ২১ আগস্ট ঘটনা ঘটিয়েছে সেই দল প্রায় ৩০০ নিরীহ, নির্দোষ মানুষের জীবনপঙ্গু করে দেয়। ২৪ জনের জীবন কেড়ে নেয়, কোন স্বার্থে, কোন আদর্শে! এই হামলার নেপথ্যের কুশীলব ভট্টাচারিদের  শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।

 

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষকেই তাঁদের দেশ ও সমাজে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই চালাতে হবে। যে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনগণ স্বাধীনতা ও পরে গণতন্ত্র অর্জন করেছিলেন সেই কষ্টার্জিত সম্পদ তারা নিশ্চয়ই সহজে হারাতে চাইবেন না। কিন্তু ধর্মান্ধতা উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে অচিরেই জোট বদ্ধ   না হলে তাঁদের বিপদ ঘনীভূত হবে, এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। এ লড়াই মোটেই সহজ নয়। তবে বাংলাদেশের মানুষের নিরলস সংগ্রামের ঐতিহ্য নিশ্চয়ই তাঁদের পাথেয় হতে পারে।

 

লেখক: সভাপতি, আমরা কজন মুজিব সেনা ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, উত্তরণ

Mailing List