ওষুধের অসুখ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কি আমরা সত্যিই অবহিত?  

ওষুধের অসুখ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কি আমরা সত্যিই অবহিত?   
04 Oct 2022, 01:15 PM

ওষুধের অসুখ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কি আমরা সত্যিই অবহিত?  

 

ডঃ শ্রীধারা গুপ্ত

 

"ঔষধ খেতে মিছেই বলা"- কি? ছোটবেলার ছড়া মনে পড়ে গেল তো? আর সত্যিই তো, ওষুধ খেতে কার-ই বা ভাল লাগে! কিন্তু ভেবে দেখুন তো, রোজ হয়তো চিকিৎসার প্রয়োজনে বা কখনো নিতান্তই অভ্যাস বশতঃ আমরা নানাবিধ ওষুধ খাই। এখন তো আবার গুগুল মহাশয়ের শরনাপন্ন হয়ে আমরা অনেকেই নিজের ডাক্তারি দেখিয়ে রোগ বুঝে ওষুধ খাই। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কিছু ওষুধ কিন্তু একদম নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।

যেমন গ্যাস, অম্বল, পেটব্যথা, চোঁয়া ঢেকুর - একটা অ্যান্টাসিড খেয়ে নিলেই শান্তি। আর যদি বমি বমি ভাব হয়, সে বাড়িতেই হোক বা বাস কিংবা গাড়িতে, অনেকটা পথ যাওয়া হোক অথবা পাহাড়ে বেড়াতে গিয়েই- কুছ পরোয়া নেহি! বাজারচলতি যে কোনও বমি বন্ধের ওষুধ নির্দ্বিধায় খেয়ে নিই। হঠাৎ হাঁচি, কাশি, গলা খুশখশ- আরে চিন্তা নেই, অ্যান্টিঅ্যালার্জিক আছে তো, সাথে একটু কাফসিরাপ হলে তো দারুণ। এখন তো ঘরে ঘরে রোজ পা ব্যথা, হাঁটু ব্যথা, কোমর ব্যথা, পিঠ ব্যথা এবং সর্বোপরি প্রচন্ড মাথা ব্যথার সমস্যা- আট থেকে আশি, নারী পুরুষ নির্বিশেষে কোনও না কোনও ব্যথায় কাহিল। ফলস্বরূপ পেইন কিলার মুড়ি মুড়কির মতো খেয়ে চলেছি রাত দিন। আর জ্বর হলে প্যারাসিটামল তো আছেই, আগেই খেয়ে নিই, নিয়ম করে ৬ ঘন্টা পর পর। তিন চার দিনেও যদি জ্বর না কমে, তখন ডাক্তার দেখানোর উদ্যোগ নিই। রইলো পড়ে হাই ব্লাড প্রেশার, হাই সুগার, হার্ট-জনিত অসুখ। এসব ক্ষেত্রে অবশ্য আমরা সচরাচর ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খেতে থাকি।

সমস্যা হল, এই যে প্রতিনিয়ত নিজেরাই বুঝে শুনে এত রকমের ওষুধ খেয়ে নিচ্ছি, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কি আমরা সত্যিই অবহিত? আসুন একটু জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি।

ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা সাইড এফেক্ট আসলে কি? এগুলো হল ওষুধ খাওয়ার পরে এমন কিছু উপসর্গ যা অনভিপ্রেত, আকস্মিক এবং অনেকাংশেই অজানা। নানা ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। যেমন- নাক দিয়ে জল পড়া, পেটখারাপ, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাথা ঘোরা, অ্যাসিডিটি, বমি ভাব, অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া, সারাদিন ক্লান্তি অনুভব করা, অনিদ্রা, নানাবিধ র‍্যাশ, অ্যালার্জি, হঠাৎ ওজন কমা অথবা বেড়ে যাওয়া, হাত পায়ের পেশীতে টান ধরা, মাথাব্যথা - এই সব উপসর্গ খুব সহজেই অনুভব করা যায়। কিন্তু কিছু কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হানা দিতে পারে আপনার কিডনি, লিভার, হার্ট, অন্ত্র, রক্তকণিকা, লাংস, এমনকি মস্তিষ্কের কোষেও, ছড়িয়ে দিতে পারে আভ্যন্তরীণ ইনফেকশন। সেটা তৎক্ষনাৎ জানার কোনো উপায় নেই। আর যেদিন টের পাবেন, তখন হয়তো রোগ পৌঁছে গেছে তার চরম সীমায় যা আপনাকে মৃত্যুর মুখেও ঠেলে দিতে পারে। এছাড়াও কিছু মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা দেখা যায় যেমন মানসিক অবসাদ, হঠাৎ রেগে যাওয়া, সব কিছুতেই বিরক্তি অনুভব হওয়া, ব্যবহারের বিশেষ পরিবর্তন ইত্যাদি।

আমরা দৈনন্দিন জীবনে যে সমস্ত ওষুধ, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজেরাই খেয়ে ফেলছি, সেই সব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে আমরা কি সত্যিই ভাবছি? আমরা হয়তো বুঝতেই পারছি না এই সমস্ত ওষুধের বহুল ব্যবহার কি মারাত্মক ক্ষতি করছে আমাদের শরীরে। রোগের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে গিয়ে আমরা নিজেরাই ডেকে আনছি আরোও অনেক বড় বিপদ!

যেমন অতিরিক্ত অ্যান্টাসিড খাওয়ার ফলে নানা উপসর্গ দেখা দেয়। আমাশয়, পেটখারাপ, পেশী সংকোচন, কোষ্ঠকাঠিন্য, ক্ষুধামন্দা, বিপাকজনিত ব্যাধি, শরীরে অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস উৎপাদন এবং কিডনিতে পাথর।

বেশী মাত্রায় অ্যান্টিঅ্যালার্জিক এবং কাফসিরাপ খেলে সবসময় একটা ঝিমুনি ভাব লক্ষ্য করা যায়। সাথে হতে পারে নানা উপসর্গ যেমন মাথা ঘোরা, গলা জিভ শুকিয়ে যাওয়া, পেটের অসুখ, বমি ভাব, মাথা ব্যথা, মূত্রজনিত সমস্যা, চোখের নানা সমস্যা। দীর্ঘদিন মেয়াদি প্রতিক্রিয়া হিসাবে পেশীর সমস্যা, চোখে ছানি পড়া, ব্লাড সুগার বেড়ে যাওয়া, পেটের আলসার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

পেইন কিলার অর্থাৎ ব্যথা কমার ওষুধ বেশি খেলে অনেক রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। যেমন- অ্যাসিডিটি, বমিভাব, মানসিক উদ্বেগ, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, তন্দ্রা, ক্লান্তি ঝিমুনি, শ্বাসকষ্ট, ত্বকের সমস্যা, কানে কম শোনা, চোখে ঝাপসা দেখা, পেশী শিথিলতা, বার বার গলা শুকিয়ে যাওয়া, মনসংযোগের অভাব, খিটখিটে ব্যবহার করা, বিরক্তি ভাব, অল্পতেই রেগে যাওয়া, মানসিক অবসাদ, কিছু পাগলামির আচরণ করা, নানারকম হরমোন জনিত সমস্যা প্রভৃতি। দীর্ঘদিন এই ধরনের ওষুধ খাওয়ার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কিডনি, হার্ট, লাংস, লিভার, পৌষ্টিকতন্ত্র এবং তা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

তবে প্যারাসিটামলের ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে অ্যালার্জি, হার্টবিট বেড়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া, রক্তজনিত কিছু সমস্যা, লিভার এবং কিডনিজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এখন প্রশ্ন হল, এই সমস্ত নিত্য ব্যবহারের ওষুদের যদি এত মারাত্নক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়, তাহলে আমরা কি করবো? ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দেব? সেটা তো কোনো মতেই সম্ভব নয়।

প্রথমেই যা করা উচিত তা হল, ছোট বড় যে কোনো রোগের জন্যই সব সময় কোনও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া। নিজের জানা তথ্যের উপর নির্ভর না করে একমাত্র ডাক্তার যে ওষুধ দেবেন সেটাই খাওয়া। তবে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে জেনে কখনই অসুখ লুকিয়ে রাখবেন না। প্রয়োজনে রোগ নিরাময়ের জন্য ওষুধ-ই একমাত্র কার্যকরী এবং বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ-ই জীবনদায়ী। তাই রোগের উপসর্গ দেখা দিলেই ডাক্তার দেখাবেন, ওষুধ-ও খাবেন।

 

আমরা তো সবাই জানি "প্রতিরোধ রোগের চিকিৎসার চেয়ে বেশী ভাল"। তাই সব থেকে জরুরী হল আমাদের প্রত্যেকের নিজেকে সুস্থ রাখা। তাহলেই বেশি ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হবে না। সুষম আহার, নিয়ম মেনে আহার, সময়ের সাথে চলা এবং প্রাত্যহিক কিছু শরীরচর্চা- এই কয়েকটি দায়িত্ব পালন করলেই আমরা অনেক রোগ থেকে বাঁচতে পারবো। ওষুধ যত কম খেতে হবে, ওষুধের অসুখ-ও নিরাময় হবে।

লেখক: অধ্যাপক, যোগমায়াদেবী কলেজ, কলকাতা।

Mailing List