আদিবাসীরা কি হিন্দু? শ্রেণিকরণের আগে সতর্কতা জরুরি, আলোচনা করছেন নৃবিজ্ঞানী ড. সুমহান বন্দ্যোপাধ্যায়

আদিবাসীরা কি হিন্দু? শ্রেণিকরণের আগে সতর্কতা জরুরি, আলোচনা করছেন নৃবিজ্ঞানী ড. সুমহান বন্দ্যোপাধ্যায়
17 Nov 2022, 12:55 PM

আদিবাসীরা কি হিন্দু? শ্রেণিকরণের আগে সতর্কতা জরুরি, আলোচনা করছেন নৃবিজ্ঞানী ড. সুমহান বন্দ্যোপাধ্যায়

ড. সুমহান বন্দ্যোপাধ্যায়

 

সম্প্রতি একটি বিষয় নিয়ে বেশ চর্চা শুরু হয়েছে। বিষয়টি হল আদিবাসী হিন্দু কি না। রাজনৈতিক বা অন্য কোনও বিতর্ক উসকে দেওয়ার কোনও উদ্দেশ্য ছাড়াই, তাত্ত্বিক, তথ্যগত ও বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে, এই ক্ষুদ্র পরিসরে দু'একটি কথা বলার প্রয়াস করি।

'আদিবাসী' সম্বন্ধে যথার্থ ধারণার ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে বেশ কিছুটা খামতি আছে। সাম্প্রতিক বা অনতি অতীতে দায়িত্বশীল উচ্চপদে থাকা মানুষের আদিবাসী সম্পর্কে বক্তব্য বা আচরণ তা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে। প্রথমত. যেটা ভাবা দরকার তা হল, 'আদিবাসী' বলতে স্বাধীন ভারতে আমরা যে আইনি-প্রশাসনিক সংবর্গটি ব্যবহার করি, তা হল সিডিউলড্ ট্রাইবস্ বা এসটি। ভারতের রাষ্ট্রপতি দেশের সংবিধানের ৩৪২ ধারা মতে, একটি তালিকা প্রকাশ করেন, সেখানে যে জনগোষ্ঠীগুলির নাম থাকে তারা এসটি। এসটি হিসেবে নির্বাচিত তথা তালিকাভুক্ত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দেশে স্বাধীনতার পর থেকে ধারাবাহিক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ভারতে আদিবাসী (এসটি) জনসংখ্যা ১১ কোটির বেশি।

ভারতের এই সুবিশাল আদিবাসী জনগোষ্ঠী আর্থ-সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে কোন সমসত্ত্ব অস্তিত্ব নয়। এক গোষ্ঠীর সঙ্গে অন্য গোষ্ঠীর, এমনকি একই গোষ্ঠীর মধ্যে বিস্তর বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। এই বৈচিত্র্যের প্রতিফলন আদিবাসীদের ধর্মাচারের ক্ষেত্রেও লক্ষণীয়। এখন আদিবাসীরা হিন্দু কিনা এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হেল 'ধর্ম' বলতে আমরা কি বুঝছি বা কিভাবে বুঝছি সেই বিবেচনাও জরুরি। যেভাবে 'ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়ন' এর বিভাগটি করা হয়, যার মধ্যে ক্রিশ্চান, ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ইত্যাদি ধর্মগুলি রয়েছে, সেক্ষেত্রে হিন্দু বলতে যা বোঝানো হচ্ছে তা যদি কোনও আদিবাসী তার নিজধর্ম বলে মনে করে বা উল্লেখ করা হয়, তাহলে খাতায় কলমে এই আদিবাসীদের ধর্ম দেখাবে হিন্দু। কিন্তু এর দ্বারা একইভাবে যদি সমস্ত আদিবাসীদের ধর্ম হিন্দু বলা হয়, তথ্যগতভাবে তা যথার্থ হবে না। কেননা ধর্মীয় পরিচয়ের দিক দিয়ে হিন্দু আদিবাসী ছাড়াও আছেন ক্রিশ্চান ধর্মাবলম্বী আদিবাসী, (উত্তর-পূর্ব ভারতের একাধিক আদিবাসী গোষ্ঠী ছাড়াও সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা প্রভৃতি জন গোষ্ঠীর মধ্যে ক্রিশ্চান ধর্ম অনুসারির সংখ্যা নগণ্য নয়), আছে বৌদ্ধ আদিবাসী (লেপচা, ভুটিয়া প্রভৃতি), এমনকি লাক্ষাদ্বীপের জনসংখ্যার সিংগভাগই ইসলাম ধর্মাবলম্বী আর পরিচয়ে আদিবাসী। তাহলে দাঁড়াল এই যে, আদিবাসীরা কী হিন্দু? এর উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে আদিবাসীরা বৌদ্ধ, মুসলমান এবং ক্রিশ্চানও বটে।

যদিও মৌলিক প্রশ্নটা ছিল আরও গভীরে। তা হচ্ছে, ধর্মীয় উপাদানগত বিচারে জবাবদিহির ব্যাপার। এক্ষেত্রে যদি বলা হয়, আদিবাসীর ধর্মাচারের মূল উপাদানগুলি হিন্দু ধর্মের। সে হিসেবে তারা আদিতে হিন্দু ছিল। সমাজশাস্ত্রবিদ গোবিন্দ সদাশিব ঘুরে আদিবাসীদের ‘পশ্চাদপদ হিন্দু’ বলে দেন। পূর্বে সবাই একই রকম সামাজিক অবস্থায় ছিল। এর থেকে একদল জাতি-বর্ণ-ব্যবস্থা কেন্দ্রিক সমাজ কাঠামো তৈরি করল, আর একটি অংশ এর বাইরে মূল পাহাড় জঙ্গল আচ্ছাদিত ভূখন্ডের অধিবাসী হয়ে থেকে গেল। জাত-বর্ণ ব্যবস্থার এর সমাজ কাঠামো অধিবাসী হয়ে থেকে গেল। জাত-বর্ণ ব্যবস্থার এর সমাজ কাঠামোটিকেই আমরা হিন্দু সমাজ কাঠামো বলছি। সুতরাং, স্পষ্ট হয়ে গেল, এই কাঠামোর বাইরে রয়েছেন আদিবাসীরা।

যদিও বাস্তব প্রক্রিয়াটির এতটা সরলীকরণ করা উচিত নয়। নির্মল কুমার বসুর 'হিন্দু মেথড অব ট্রাইবাল অ্যাবর্জপসান' মতে, হিন্দু সমাজে আদিবাসীদের আত্তীকরণ যেমন প্রচলিত ধারণা তেমন কোনও কোনও গোষ্ঠী বৌদ্ধ ধর্মে আত্তীকৃত হয়েছে। এর ফলে তাদের আদি ধর্মাচারও পাল্টে গেছে, কিংবা পূর্বের উপাদানগুলি সঙ্গে নতুন উপাদান সংযোজিত হয়েছে। পূর্বের উপাদানগুলির সঙ্গে নতুন উপাদান সংযোজিত হয়েছে। যেসমস্ত লেপচারা বৌদ্ধ হয়েছেন, তাদের আদি ধর্মাচারকে বলা হত 'মন' অথবা ‘বন’। সাঁওতাল সমাজের একাংশ যেমন তাদের নিজ ধর্মকে বলছে, 'সারি ধরম'। এর ফলে কোথাও কোথাও একটি সংশ্লেষিত অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে, যাকে তত্ত্বগতভাবে 'সিনক্রেটিজম্' বলা হয়।

আদিবাসীদের ধর্মকে প্রশাসনিক ভাবে দেখতে গিয়ে বা পরিসংখ্যানের মধ্যে দিয়ে তুলে ধরতে গিয়ে, আরেক ভাবেও বলা হয়েছে। যেমন, ১৯১১ সালে হার্বাট হোপ রিজলে এদের বলেছিলেন, 'ট্রাইবাল অ্যানিমিস্ট অর পিপল ফলোয়িং ট্রাইবাল রিলিজিয়ন'। আবার ১৯০১ সালের সেন্সাস রির্পোটে তিনি এদের 'অ্যানিমিস্ট ' বলেছিলেন। আসলে 'ধর্ম' হিসাবে 'অ্যানিমিস্ট' আর 'হিন্দু', 'বৌদ্ধ' এদের সংবর্গগত ভিত্তি এক নয়। 'অ্যানিমিস্ট' বিভাগটি হল ধর্মের মরফোলজিক্যাল বিভাজন। হিন্দু ধর্মেও এই সর্বাত্মাবাদ আছে। ধর্ম আর ধর্মাচারকে গুলিয়ে ফেলা বোধ হয় ঠিক হবে না। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে, তাই যেকোন শ্রেণিকরণের আগে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

 

লেখক বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ব বিভাগের অধ্যাপক

Mailing List