সাগর শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে যেতে পারে! মানুষের ভুল পরিকল্পনা প্রকৃতিকে ধ্বংসের চুড়ান্ত উদাহরণ হল আরল সাগর

সাগর শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে যেতে পারে! মানুষের ভুল পরিকল্পনা প্রকৃতিকে ধ্বংসের চুড়ান্ত উদাহরণ হল আরল সাগর
08 Aug 2021, 07:50 PM

সাগর শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে যেতে পারে! মানুষের ভুল পরিকল্পনা প্রকৃতিকে ধ্বংসের চুড়ান্ত উদাহরণ হল আরল সাগর

 

কল্পনায় স্বর্গের একটা রূপ রয়েছে প্রত্যেকের মনেই। তাই তো মনের গোপনে কোথাও লুকিয়ে থাকে স্বর্গে পৌঁছনোর বাসনা। কিন্তু সে স্বর্গের অস্তিত্ব কেবলই কল্পনায়। কারণ, যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ ততক্ষণ সেখানে পৌঁছনোর কথা ভাবারও উপায় নেই। অথচ, এ বিশ্বেই এমন বহু স্বর্গীয় দৃশ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। প্রকৃতির সেই উজাড় করা সৌন্দর্য হয়তো কল্পনার স্বর্গকে হার মানাতে পারে। সেখানকার মানুষের আচার-আচরণ, কৃষি, অর্থনীতি, ভূপ্রকৃতি- সত্যিই অন্য অনুভূতি জাগায়। তারই পাশাপাশি মিলতে পারে অনেক অজানা তথ্য। বিশ্বজুড়ে এমন কত ছোটখাটো দেশ, ভাস্কর্য, ঘটনা-অঘট‌ন রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এমনই একটি ঘটনার কাহিনী লিখছেন-

দীপান্বিতা ঘোষ

 

প্রকৃতিকে অবহেলা, অসচেতনতা, প্রকৃতির উপর মানুষের প্রতিনিয়ত হস্তক্ষেপ, অতিরিক্ত লোভ-লালসা মানুষের জন্যই যে কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হল আরল সাগর।

 

বর্তমানে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া এই সাগরটি একসময় মধ্য এশিয়ার কাজাখস্তান এবং উজবেকিস্তান নামক দেশ দুটোর বিস্তীর্ণ এলাকা বিস্তৃত ছিল। প্রায় ৬৭ হাজার বর্গকিমি আয়তনের এই হ্রদ শুধুমাত্র বিশালতার কারণেই সাগরের তকমা পেয়েছে। মধ্য এশিয়ার অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই হ্রদটির ১৯৯৬ সালেই ৭০% অংশ শুকিয়ে যায়। বর্তমানে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া আরল সাগরকে "সাগর" বলে চেনার জন্য অবশিষ্ট আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জাহাজের ভাঙা অংশ।

হ্রদের সৃষ্টি:

 

 ভুবিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী আনুমানিক ৩০ লক্ষ বছর আগে মধ্য এশিয়ার বর্তমান কাজাখস্তান-উজবেকিস্তান সীমান্তে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিলো, এর ফলে ওখানে একটি ডিপ্রেশন বা নিম্নাঞ্চলের সৃষ্টি হয়।

এর প্রায় ৫ লক্ষ বছর পর অর্থাৎ আনুমানিক ২৫ লক্ষ বছর আগে সিরদরিয়া নামক স্থানীয় একটি নদী ঐ নিম্নাঞ্চলে একটি বিশাল হ্রদের সৃষ্টি করেছিলো।

বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী আনুমানিক এক লাখ বছর আগে এখানেই প্রথম মানব বসতি স্থাপিত হয়েছিলো। তবে বিজ্ঞানীদের মতে সেই বসতি স্থাপনকারীরা আধুনিক মানুষের মতো হোমোস্যাপিয়েন্স প্রজাতির ছিলেন না। এরা সম্ভবত আধুনিক মানুষের পূর্বসূরী হোমোইরেক্টাস প্রজাতির বংশধর ছিলেন।

 

অমুদরিয়া নামক আর একটি নদী গতিপথ পরিবর্তন করায় এই নিম্নাঞ্চলে নূতন করে একটি জলাশয়ের সৃষ্টি হয়। কালের পরিক্রমায় সেই জলাশয়ের আয়তন দাঁড়ায় সাড়ে ২৩ হাজার বর্গমাইল। অর্থাৎ আয়তনের নিরিখে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম হ্রদ ছিলো এই আরল সাগর।

 

স্থানীয় ভাষায় আরল শব্দটির অর্থ দ্বীপপুঞ্জ। তাই এই জলাশয়টির নাম দ্বীপপুঞ্জের সাগর। একসময় এই জলাশয়ের বুকে ছোট বড়ো বিভিন্ন আয়তনের ১১০০ টিরও বেশি দ্বীপের অস্তিত্ব ছিল। এই কারণে স্থানীয়রা জলাশয়টির এমন নাম দিয়েছেন। আরল সাগরের তীরে অবস্থিত জনপদগুলোতে মাছ শিকার ছিল জীবিকা অর্জনের প্রধান উপায়।

নাম সাগর হলেও এই জলাশয়ে প্রধানত মিষ্টি জলের মাছই বেশি পাওয়া যেত। কারণ, এর লবণাক্ততা সমুদ্রের তুলনায় ৩ ভাগের এক ভাগ ছিল।

     

সমুদ্রে প্রতি লিটার জলে ৩৫ গ্রাম লবন থাকে। আরল সাগরে এর পরিমাণ মাত্র ১১ গ্রাম। এই মাছের উপর নির্ভর করে আরল সাগরের তীরবর্তী জনপদের মানুষজনদের ভালোই কাটছিলো।

কারণ এই মাছের উপর নির্ভর করেই আরলের বুকে গড়ে উঠেছিলো মৎস্য শিল্প।

 

শুকিয়ে যাওয়ার কারন:

 

          

সাগরটি শুকিয়ে যাওয়ার জন্য মূল খলনায়ক তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯১৮ সালে গড়ে তোলা সোভিয়েত তুলা শিল্প তখন সফলতার শীর্ষে আরোহণ করেছিলো। তাই সোভিয়েত সরকার বিশ্ব বাজার ধরে রাখতে তুলা উৎপাদন বৃদ্ধির প্রকল্প হাতে নেয়।

অমুদরিয়া, সিরদরিয়া দুই নদীকেই তুলা ক্ষেতে সেচের কাজে ব্যবহার করা হয়। ফলে আরলের দিকে বাহিত জলের যোগান কমে। হ্রদের সাথে কোনো সাগরের যোগাযোগ না থাকায় জলের পরিমান কমে। আরল সাগর তীরবর্তী এলাকায় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমানও কম। মাত্র ১০০ মিলিমিটার।

সোভিয়েত সরকার কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ করেনি। এদিকে জলের পরিমান কমতে থাকায় হ্রদের জলে লবণের ঘনত্ব মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়। লিটার প্রতি গড়ে ১০০ গ্রাম হয়ে যায়।

এখান থেকেই আরল সাগর ধ্বংসের সূচনা ঘটে। লবণের পরিমান বেড়ে যাওয়ায় আবহাওয়ার উপর মারাত্মক খারাপ প্রভাব পড়ে।

  

এছাড়া বিভিন্ন গবেষণাগারের রাসায়নিক বর্জ্য, বিষাক্ত কীটনাশক, শিল্প কারখানার বর্জ্য আরল সাগরের জলে নিষ্কাশন করা হত। ১৯৬০ সালের পর দ্রুত জল শুকাতে শুরু করে।যারা আরল সাগরের উপর নির্ভরশীল ছিল তারা উপায় না দেখে অন্য প্রদেশে চলে যেতে শুরু করে।

১৯৯৭ এর এক জরিপে দেখা যায় আরলের ৯০% জল শুকিয়ে গেছে। এক সময়ের বিশাল আরল সাগর সামান্য জলাশয়ে পরিণত হয়।

 

প্রভাব:

 

আরল সাগর বিপর্যয়কে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ধরা হয়। আরল সাগর শুকিয়ে গেলেও লবন থেকে যায়। পূর্বের আরল সাগর উপকূলে ঘন লবণের স্তুপ সৃষ্টি হয়। ফলে সেখানকার মাটির গুনাগুন নষ্ট হয়ে যায়। লবনাক্ত পরিবেশ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ফলে বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগ মহামারী হিসেবে দেখা দেয়।

প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ:

 

 ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলে আরল সাগর কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানের অধীনে আসে। "সাগর"এর তখন কোনও অস্তিত্ব নেই। মাত্র ১০% এলাকায় রয়েছে অতি লবনাক্ত জল। বিপর্যয় থেকে রক্ষার উপায় বের করতে দুই দেশের রাষ্ট্র নেতারা একত্রিত হন।

     

তাঁরা নানান দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প হাতে নেন। লম্বা খাল খনন করে দক্ষিণে সাগর থেকে জল আনার চেষ্টা করেন। কিন্ত প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে কোটি কোটি ডলার লোকসান হয়। শেষ পর্যন্ত পুরো প্রকল্প বাতিল হয়।

 

২০০৩ সালে কাজাখস্তান সরকার বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পুনরায় নদীর জলকে আরলে ফেলার ঘোষণা করে, কিন্তু উজবেকিস্তানের সঙ্গে মতের অমিলে তাও স্থগিত হয়।

         

পরে কাজাক সরকার নিজ অর্থায়নে কাজাখস্তান সীমানায় বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। ২০০৫ সালে বাঁধ নির্মাণ শেষ হয়। বাঁধের কারণে কাজাক অঞ্চলে আরল সাগরের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়। হ্রদে জলের পরিমান বৃদ্ধি পায় এবং উত্তর আরল সাগরে মাছ চাষ শুরু হয়।

কাজাখস্তান বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে হ্রদে জল আনতে সক্ষম হলেও, গবেষকদের মতে আর কখনই আরল সাগরকে আগের অবস্থানে ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে না।

ads

Mailing List