অপরূপার স্টুডিও / গল্প

অপরূপার স্টুডিও / গল্প
24 Jul 2022, 02:00 PM

অপরূপার স্টুডিও

 

সুমন ঘোষ

 

 

ওই, কি গো। ঘুম থেকে উঠলে?

ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে পড়ে যাওয়ার জোগাড় সতীশের। কাঁচা ঘুম তো। বাঙালিও বটে। বাঙালির কাঁচা ঘুম ভাঙানো কতটা অনুচিত, এ দেশে ক’জন বোঝে।

 

লেপ ভেঙে, মশারির গোলা পাকানো ছেড়ে, খালি গায়ে কাঁপতে কাঁপতে যখন ড্রয়িং রুমে এলো, তখন তো হতবাক। টেবিলে চা, বিস্কুট রেডি। বৌ সেজে গুজে তৈরি। যেন প্রতি বছর ছুটির সময় বাইরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হবে। আমার কাঁপুনি নিয়ে তিনি ভাবিত নন। কড়া ধমক দিয়ে বলল, ‘‘কাঁপছ কেন? আর কত দেরি করবে? জলদি তৈরি হয়ে নাও। নাহলে চাও জুটবে না।’’

 

আমি তো কিংকর্ত্যব্যবিমূঢ়। বলে কী?

তার মাঝেই বলে বসল, চলো চলো, হাতে সময় নেই। অনেক কষ্টে রাজি করিয়েছি। এ সূযোগ হাতছাড়া করা উচিত হবে না।

আমি তাড়াহুড়ো চা, বিস্কুট খেয়ে সোজা স্নানঘরে। তারপর রেডি হয়ে বৌয়ের কথা মতো বেরিয়ে গেলাম। কোনদি‌ন এত সকালে ড্রাইভারকে ডাকিনি। ড্রাইভারও অবাক।

ড্রাইভার বলে বসল, কোথায় যাবেন স্যার।

আমি শুধু ইশারা করলাম। মানে গৃহিনীর দিকে।

সে তখন মিউ মিউ করে বলল, ম্যাডাম কোথায় যাব?

বউ গম্ভীর ভাবে বলল, স্টুডিও।

 

স্টুডিও! অদ্ভুত লাগল কথাটা শুনতে। সেই ছোটবেলায় শুনেছিলাম। তখনও ক্যামেরার বাড়বাড়ন্ত ছিল না। সাদা কালো ছবি। রিল ছিল। এখন তো অ্যান্ড্রোয়েড। তাও হাতে হাতে। এত কিছুর পরেও স্টুডিও কেন? তাহলে কী কোনও ফিল্মের শ্যুটিং টুটিং নাকি! বিশ্বাস কিছু নেই। আমার বউ তো। মাথায় কি খেলে বলা খুব কঠি‌ন। অগত্যা যেতেই হল। যাওয়ার পথে কত লোকের সঙ্গে দেখা। কত কথা। একজন তো বলেই বসল, কি হে, কত্তা গিন্নি এত্ত সকালে কোথায়? সূর্যও লজ্জা পাবে যে।

 

মনে মনে ভাবছিলাম, সত্যিই তো, কিছু ভুল বলেনি ওরা।

তারপর দেখা গে‌ল আমাদের পরিচিত, পুরনো এক স্টুডিওতেই হাজির।

ভাবলাম বুড়ো বয়সে ভিমরতি বুঝি। ঘরে বৌমা, ছেলে, নাতি নাতনি। সব ছেড়ে আলাদা ছবি তুলতে চায়। শখ হয়েছে বুড়ির। তাই হোক। এই বয়সে এটুকু করব না, তা কী হয়!

আমি যাওয়ার পরই গদাই তো টলমল। হাসতে হাসতে বলল, এসেছেন?

আমি তো থ, আসব না কেন?

প্রশ্নটা করতেই গদাই একটু গম্ভীর হল। না, ঠিক তা নয়। আসলে ভাবছিলাম...

কী ভাবছিলে? প্রশ্ন করতেই গদাই স্পিকটি নট। উল্টোদিকে তাকিয়ে দেখি বউ গদাইয়ের দিকে কটমট করে তাকিয়ে।

 

গদাই তড়িঘড়ি বলল, বাবু ভেতরে চলুন।

বউয়ের দিকে তাকাতেই সেও ইশারা করল। আমি ভেতরে ঢুকলাম। 

গদাইকে এই প্রথম দেখলাম চটপট কাজ সারছে। আমাকে জলদি শুইয়ে দিল। তারপরেই নাকে তুলো, কপালে চন্দনের ফোঁটা, চোখে তুলসী পাতা। গায়ে নামাবলীও জড়িয়ে দিল। সর্বাঙ্গে রজনীগন্ধার মালা। পাশে জ্বালিয়ে দেওয়া হল ধূপও।

তারপরেই খিচিক, খিচিক করে দু‘চারটে ফোটো তুলেই বাইরে বেরিয়ে গেল।

মিনিট দু’য়েকের মধ্যেই বাইরে প্রবল চিৎকার। বুঝতে পারছি বউ তুলকালাম করছে। আমি তো হতভম্ব হয়েই ছিলাম। চিৎকারের চোটে হাত, পা দূরের কথা, মাথাও কাজ করছে না।

তারমধ্যেই দেখি বউ স্টুডিওর ভেতরে ঢুকছে।  

লজ্জা করে না। এতবার বলার পরেও তোমার খেয়াল নেই। তোমার ওপর তো কোনও ভরসা রাখা যাবে না গদাই।

গদাই যেন মেঘ করার সময়ের গাছ। বৃষ্টি না আসা পর্যন্ত নড়তেও পারছে না।

এমন সময় ফের চিৎকার, পায়ের পাতায় আলতা কোথায়? ভালো করে আলতা মাখা। তারপর ছাপটা ঠিক করে নিস! সব ফোটো ঠিক হওয়া চাই। আমাদের দেখে কিন্তু বাইরে ভিড় জমেছে। কেউ জানতে পারলে, তোকে সত্যিই এমন করেই ছাড়ব গদাই।’

গদাইয়ের তো ক্যামেরা ছাড় বাবা, নিজে ফোটো হই অবস্থা।

সব সাজানোর পর বলল, নিজেই একটু কেঁদে নিই। বাড়ির লোক দেখলে মড়াকান্না কেঁদে ফেলত। থানায় ডায়েরি করত। আমি জেলে।

ছবি তোলার পর প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করল গদাই। জীবনে প্রথম। ‘‘কি ব্যাপার বলুন তো?'

গদাইয়ের রূপ দেখে আঁৎকে উঠেছিল অপরূপা। যে কিনা পায়ের দিকে তাকাতেও মনে মনে একশো কোটি দেবতার স্মরণ দিত, সে সরাসরি, মুখোমুখি চ্যালেঞ্জ করে বসল আমার বৌয়ের সঙ্গে?

 

গদাইয়ের রূপ দেখে মনের মধ্যে কূ গাইছে অপরূপার। আমতা আমতা করে বলতে শুরু করে, 'দাঁড়া, সব বলছি। দিনকাল তো ভালো নয়। হঠাৎ করোনা বলে দিলে তো সোজা হাসপাতালে। আমায় দজ্জাল বলতে পারেন সকলে, কিন্তু উনি আমায় ছাড়া আবার থাকতে পারেন না। আর করোনা হাসপাতালে কাকে কে থাকতে দিচ্ছে। হার্ট অ্যাটাক বললেও করোনা বলে চালাবে। তারপর পিপিই কিট নামে পলিথিন বেঁধে কী করবে কে জানে। আমি কী শ্রাদ্ধ-শান্তি ছাড়া বাঁচতে পারব। তখন ছবি পাবো কোথায়? তাই করিয়ে রাখলাম।’’

সেই যে গদাই স্টুডিও বন্ধ করেছে, এখনও তার খোঁজ মেলেনি।

গদাই সবাইকে বলে গিয়েছিল, যেদিন অপরূপা দিদিমনির মতো প্রকৃত ভালোবাসার খোঁজ পাব, সেদিন আবার ফিরে আসব।

 

Mailing List