অন্তরিন / ষষ্ঠ পর্ব (গল্প)

অন্তরিন / ষষ্ঠ পর্ব (গল্প)
13 Feb 2022, 06:30 PM

অন্তরিন / ষষ্ঠ পর্ব (গল্প)

 

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

নেপুর বন্ধুরা চলে যাবার পর, দরজা বন্ধ করে বাড়ির ভেতরে আসবার সময়ে মনে মনে কেমন যেন একটু ভয় ভয় করতে শুরু করল সুন্দরের। 

না, চিন্তাটা একা এতবড় বাড়িটায় থাকার জন্য ন। করোনা নামক ভাইরাসের সংক্রমণের জন্যও নয়। কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। যা ঠিক নিজের কাছে পরিষ্কার নয়, অন্যকে তো আরও বোঝানো সম্ভবপর নয়। 

পরিবারের সে আর নবনীতা ছাড়া আরো তিন জন সদস্য। বড়ো ছেলে সৌম্য ও তার স্ত্রী রিম্পি। আরো একজন কনিষ্ঠ সদস্য ছিল, যার নাম বর্তমানে বাড়িতে উচ্চারণ-ই করা হয় না। 

সে সুন্দরের ছোট ছেলে অর্কজিৎ। 

 

 বিলেত থেকে গাইনোকলোজিস্টের ডিগ্রিটা নিয়ে আসার পর বাবার নার্সিং হোমেই প্র্যাকটিস করত। ফার্মাসিস্টটা আগেই ছিল। পাশে নীচেই প্রায় পুরোটাই নিয়ে অর্কের চেম্বার করে দিয়েছিল সুন্দর। 

নবুও বারণ করেছিল তাকে পুরো টাকাটা খরচ করে ওর চেম্বার করতে। বড় ছেলেরও খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। তবুও কারো কথা না শুনে অনেকগুলো টাকা খরচা করে এসি চেম্বার, নানান আধুনিক উন্নত মানের মেশিন এনে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল সে ছোট ছেলেকে। 

---- সে বছরই ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ করা নিষিদ্ধ হয়েছে সরকারি ভাবে। আর বহু অর্থলোভী ডাক্তার মোটা টাকার বিনিময়ে বেআইনি ভাবে ঐ কাজ-ই গোপনে করে যাচ্ছিল। সুন্দর এই নোংরা জঘন্য কাজের ঘোর বিরোধী। 

একদিন এক সিরিয়াস পেশেন্টের স্পেশাল অ্যাপয়েন্টমেন্টের কারনে নার্সিংহোমে গিয়ে সুন্দর থ'। 

নীচের রিসেপশনের মেয়েটি হঠাৎ তার স্যারকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিল। বাইরে রোগীর বাড়ির লোকজনেরা বসে। কমন লবি ক্রশ করে লিফটের দিকে এগোতে গিয়ে দেখল অর্কের চেম্বারের দরজা খোলা। যে কথা কানে এলো তার, আর বুঝতে বাকি থাকে না, কি নিয়ে আলোচনা চলছে তার এই নার্সিংহোমে। 

সারা শরীরে বিদ্যুৎ শিহরণ বহে যায়। জীবনে এই দ্বিতীয়বার তাকে চটজলদি একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল। তার ঔরসজাত সন্তান আজ সেই জঘন্যতম অপরাধ করতে চলেছে!!! 

আর মাথার ঠিক রাখতে পারেনি সুন্দর। সোজা গিয়ে ঢুকল অর্কের চেম্বারের মধ্যে। অত্যন্ত ঠান্ডা স্বরে ছেলের চোখে চোখ রেখে সরাসরি প্রশ্ন করেছিল, কত টাকা নিয়েছে সে পেশেন্ট-পার্টির কাছ থেকে। 

বাবার এই চেহারা আগে কোনো দিন দেখেনি। আর গোপন করা যাবে না বুঝতে পেরে বলে দেয় আসল কথা। 

 উত্তরটা জানার পর পকেট থেকে চেক বই বার করে তার বেশি অঙ্কের টাকা ঐ পেশেন্ট-পার্টিকে ফেরত দিয়ে, হাত জোড় করে বলেছিল, 'আমার ছেলের জন্য আপনাদের কাছে আমি বিশেষভাবে লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী। এই যে কাজটি আপনারা আমার পুত্র ডক্টর অর্কজিৎ রায়চৌধুরীকে করতে বাধ্য করছিলেন, তা বেআইনি ও অবশ্যই নিঃসেন্দহে ঘৃণ্য একটি কাজ। আমার এই নার্সিংহোমে কেন, কোথাও এইরকম পরীক্ষা নিষিদ্ধ। কোনো ডাক্তার এই পরীক্ষা করতে আইন-গত ও মানবিক দিক দিয়ে করতে পারে না। আর , এটা যেহেতু আমার প্রতিষ্ঠান, তাই আমি চাই না, এ নিয়ে আর কোনো কথা হোক। আপনারা এবার সসম্মানে আসতে পারেন।'

ঘটনার গতি এত শীঘ্র সংঘটিত হয়ে গেল যে, অর্ক আর কোনো কথা বলার সুযোগ পেল না।  

সুন্দরও আর কোনো কথা না বলে ওপরে তার বিশেষ অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য লিফটে উঠলেন।  

 

চেম্বার থেকে বাড়ি ফেরার পথে অর্কজিৎকে নিয়ে এক সুনিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলেন। সেটা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গেও কোনো আলোচনা করার দরকার বোধ করেন নি। 

খাবার টেবিলে সবাই মিলে একসাথে রাতের খাওয়া শেষ করলেন। সৌম্য, রিম্পি ও নবনীতা খালি অবাক বিস্ময়ে সুন্দরের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল ওর এই অদ্ভুত আচরণের কারণ। মুখ বন্ধ করে অর্কও খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল। 

যে শাসনে - শৃঙ্খলা ও রুচিবোধে সুন্দর তার মা'র কাছে মানুষ হয়েছে, যে শিক্ষা তাকে আজ এই স্থানে পৌঁছে দিয়েছে, সেই শিক্ষা দিয়েই আজ ওর এই সংসারটাকে তিলতিল করে ঐ একই শৃঙ্খলা, ভব্যতা ও শান্তির আবরণে আবৃত করে রেখেছে।  

নবনীতাও জানে, এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে, যার কারণে আজ পরিস্থিতি এতটা জটিল। তবে ঘটনার গভীরতা আঁচ করাটাও তার স্বপ্নেরও অতীত ছিল। সে শোবার ঘরে গিয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছিল। 

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সলিসিটর বন্ধু মহিম ঘোষ-কে ডেকে নিলেন। ব্রেকফাষ্ট টেবিলে বড় ছেলেকে পাশে ডাকলেন। স্ত্রী নবনীতাকে সামনে রেখে লবিতে অর্ককে ডেকে পাঠালেন। 

অর্ক ঘুম থেকে ততক্ষণ ফ্রেশ হয়েছে। সলিসিটর বন্ধুকে অনুরোধ করলেন তৈরি করা উইলটা পড়ে শোনাতে।  

মহিম ঘোষ পড়তে লাগল:

" আমি, শ্রী সুন্দরমোহন রায়চৌধুরী, উপরিউক্ত ঠিকানায় নিবাসী,সজ্ঞানে এই মর্মে ইচ্ছা প্রকাশ করছি যে আমার কনিষ্ঠ পুত্র শ্রীমান অর্কজিৎ রায়চৌধুরীকে আমার নার্সিংহোমের সকল সত্ত্ব দান করলাম এবং আজ থেকে উক্ত ঐ স্থানের কোনো রকম কর্ম, লাভ-লোকসান, আদায়-অনাদায়ে এবং ভোগ-সত্ত্বের অধিকারী রইলাম না। এবং মালিকানার সমস্ত কাগজপত্রে নিজের নাম বদল করে সকল ক্ষেত্রে শ্রীমান অর্কজিৎ রায়চৌধুরীর নামান্তরীকরণ করার জন্য আইনানুগ সব দায়িত্ব সলিসিটর শ্রী মহিম ঘোষকে দায়িত্ব দিলাম।

এবং এই সঙ্গে এও জানাচ্ছি যে আজ থেকে সর্বতোভাবে আমার কনিষ্ঠ পুত্র অর্কজিতের সাথে আমাদের পরিবারের কারোরই কোনো সম্পর্ক আর বজায় থাকবে না। 

এবং আমার জৈষ্ঠ্য পুত্র শ্রীমান সৌম্যজিৎ আমার অবর্তমানে আমার বসতবাড়ি ও ফার্মাসির ভোগ-দখলের সত্ত্বলাভ করবে। 

আমি ও আমার স্ত্রী শ্রীমতী নবনীতা রায়চৌধুরী আমার পৈত্রিক ও পারিবারিক রোজগারের অর্থে আগামী দিনে দিনাতিপাত করব। "

 

এইটুকু একনাগাড়ে পাঠ করে মহিম ঘোষ থামলেন।  

লবির চেয়ার থেকে উঠে যাবার সময় খালি ধীর কন্ঠে বলে গেল তাকে, " গতকাল রাতে এই ড্রাফ্ট-টা তাড়াতাড়িতে তৈরি করা, যদি লেখার বয়ান ঠিক থাকে, তাহলে আজকেই এই উইলটা রেজিস্ট্রি করে আমার কাছে নিয়ে এসো। "

পরিবেশটা অদ্ভুত রকমের থমথমে হয়ে গেল। 

   ( ক্রমশঃ)

ads

Mailing List