অঙ্ক ভীতি ও তিন ইয়ারী কথা / গল্প

অঙ্ক ভীতি ও তিন ইয়ারী কথা / গল্প
16 Oct 2022, 10:15 AM

অঙ্ক ভীতি ও তিন ইয়ারী কথা / গল্প

 

শ্রীপর্ণা মিত্র মজুমদার

 

স্কুলের তিন বন্ধু অগ্নিমিত্রা, সুরঞ্জনা, শ্রীপর্না। ক্লাস ফাইভ থেকেই বন্ধুত্ব তিনজনের। বন্ধুত্বের শুরুয়াতটাও বড্ড অদ্ভুত। গভর্ণমেন্ট গার্লসে ক্লাস ফাইভের ক্লাস টেস্টে তিনজনই দশের মধ্যে শূন্য!

ব্যাস, "অঙ্ক আতঙ্ক'' নিয়ে তিনবন্ধু হয়ে গেলাম এক ও অভিন্ন। হল যাত্রা শুরু। মাধ্যমিক পর্যন্ত আমাদের বিষয়গুলো ছিল এক। অঙ্ক তাই মাধ্যমিক পর্যন্ত আমাদের পিছু ছাড়েনি। উফফ ক্লাস সিক্সের "সময় ও কাজ" - এর অংক-A, B একটি কাজ একসঙ্গে শুরু করল, কয়েকদিন পর A চলে গেল, বাকি কাজ B কতদিনে শেষ করবে?

আমরা বুঝতাম না এত ছাড়াছাড়ি কিসের? দুই বন্ধু মিলে একসাথে কাজ করলে সমস্যাটা কোথায়! যাই হোক আমি তাও ফাইনালে টেনেটুনে ৮০, বাকি দুজন চারের ঘরে। ক্লাস সেভেনে আবার এসে পড়ল বীজগণিত। ওরে বাপরে গোদের ওপর বিষ ফোঁড়া। সংখ্যার সাথে আবার a,b,c,d?? (a+b) (a-b) দিয়েই বই ভরা। ফর্মুলা মুখস্থ, উৎপাদকে বিশ্লেষণ, উফফ কি সব দিন ছিল যে! তাও ৭০ পেয়েছিলাম ফাইনালে। ওরা কিন্তু চল্লিশের ঘরেই স্টিক। এবার অষ্টমে উঠতেই চলে এল পাশ ফেলের অঙ্ক, %এর হিসেব। উফফ কি বাজে ব্যাপার, কোথাকার কোন ছাত্র তারা কোন বিষয়ে পাশ করল কি করল না তাতে আমাদের কি মাথাব্যথা বুঝতাম না। এদিকে হিসেব বের করতে গিয়ে তো আমাদের তিনজনের কালঘাম ছুটতো। তাও যাইহোক মোটামুটি একটা নম্বর পেয়ে পাশ করে আমরা গেলাম।এখন ক্লাস নাইন। মাধ্যমিকের সিলেবাস শুরু। সেখানে "মধুপুরগামী ট্রেন ও কলকাতাগামী ট্রেন" যে কি বিরক্তি আর ভীতির কারণ ছিল আমাদের, কি আর বলব। আমি তো চিরকাল অংকটা মুখস্থই করে গেলাম। গতিবেগ যে কি সাংঘাতিক জিনিস সেটা আমাদের চাইতে কেউ ভালো বুঝত না। ট্রেন এর গতি এতো দ্রুত যে লাইট পোস্ট গুলোও হয়ে যেত চিরুনির দাড়া। কি যে ট্রেন গুলোর মধ্যে গতি নিয়ে এতো রেষারেষি বুঝতাম না বাপু!

অতঃপর ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক। শেষ দিন অংক। আমরা তিন মূর্তি তো আনন্দে আত্মহারা। কাল থেকে আর অংক নেই। অংকহীন জীবন কাটবে আমাদের আনন্দে, নির্বিঘ্নে, নির্ঝঞ্ঝাটে। কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয়। প্রশ্নপত্র হাতে নেওয়ার তিরিশ মিনিটের মধ্যেই বুঝে গেলাম এই পরীক্ষায় পাশ করা আমাদের কম্ম নয়। যেটাই ধরছি, আটকে যাচ্ছে। মিলছে না কিছুই।

আশেপাশে বন্ধুদের কান্নার রোল উঠতে লাগলো। তবুও চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। অতঃপর তিনটার সময় পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে দেখলাম কান্নাকাটির ধুম। সবাই বলছে, এ বছর নষ্ট হল, আসছে বছর আবার দিতে হবে "অংক"। আমাদের তিনজনেরই খুব মন খারাপ হয়ে গেল। একবারে মাধ্যমিক পাশ করা আর কপালে নেই। বাড়িতে এসে দেখলাম, খবরে জানানো হল পরীক্ষা আবার হবে! ইস আবার অঙ্ক! উফফ এতো নাছোড়বান্দা-আমাদের ছাড়তে চাইছে না একেবারেই।

যাই হোক আশায় বুক বেঁধে "জয় মা" বলে নেমে পড়লাম ফিল্ডে। "আমরা করব জয় নিশ্চয়" বলে। ভালোই দিলাম। যাক, এবারে নিশ্চিন্ত, অংক বাদ গেল জীবন থেকে। এবার শুরু একাদশ। আমরা তিনজনই কলা বিভাগের ছাত্রী। শ্রীপর্ণা আর অগ্নিমিত্রার বিষয় এক-ইতিহাস, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, সংস্কৃত, দর্শন। বাংলা, ইংরেজি কম্পালসারি তো ছিলই। সুরঞ্জনার এবার একটু ভিন্ন। ও ইতিহাসহীন জীবন কাটাতে চায়। তাই সেই জায়গায় ওর মিউজিক। আসলে তখন থেকেই আমরা ছিন্ন হতে শুরু করলাম একটু একটু করে। সুরঞ্জনা গানে গানেই থাকত। আমরা প্রাচীনপন্থী, ভীতু টাইপ থাকতাম বইয়ের পাতায়- শিল্প বিপ্লব, নবজাগরণ নিয়ে। কাটতে লাগলো দিন, বইতে লাগল সময়। অবশেষে ১৯৯৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক। পরীক্ষায় অদ্ভুতভাবে সিট পড়েছিল পর পর তিনজনের। প্রথমে, শ্রীপর্ণা, তারপর অগ্নিমিত্রা তারপর সুরঞ্জনা। রোজ পরীক্ষা দিচ্ছি পাশে বসে। আলোচনা, কানাকানি, ফিসফিস সহযোগে। এবার সংস্কৃত, রাষ্ট্রবিজ্ঞান পরপর দুদিন। মাঝে শুধু একটা রাত, কি যে হবে। যায় হোক  রাষ্ট্রবিজ্ঞান দিয়ে বেরিয়ে এলাম। ফল বেরোল কয়েক মাস পরে। বিচ্ছিন্ন হলাম আমি। রয়ে গেলাম নিজ শহরে। অগ্নিমিত্রা, সুরঞ্জনা গেল সংস্কৃত নিয়ে যাদবপুরে পড়তে।

বর্তমানে আমি নিজের শহরেই একটি বালিকা বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষিকা। সুরঞ্জনা আছে হুগলি মহসিন কলেজে সংস্কৃতের অধ্যাপিকা হয়ে। আর অগ্নিমিত্রা এখন ঘোরতর সংসারী। কলকাতায় স্বামী-পুত্র নিয়ে তার সংসার। দেখা সাক্ষাৎ প্রায় হয় না বললেই চলে, ফোনেও কথা নেই, যা কিছু সামান্য আলাপচারিতা হয় হোয়াটস অ্যাপে। তাও কখনো সখনো। অংক যখন ছিল, ছিলাম যুক্ত। অংক গেল, হলাম বিচ্ছিন্ন, বিযুক্ত। কঠিন হলেও অংকই আমাদের যোগসূত্র ছিল, ছিল আশীর্বাদ, সেটা আজ বুঝতে পারি। অঙ্ক ছাড়া কোনও কিছুই মেলানো কঠিন।

.......

Mailing List