সুলতা পাত্রের গল্প / অনিমেষ

সুলতা পাত্রের গল্প  / অনিমেষ
28 Nov 2022, 02:00 PM

সুলতা পাত্রের গল্প / অনিমেষ

সুলতা পাত্র

 

পাড়াতে এক সাধুর আবির্ভাব হয়েছে।  দুপুরে বেশ কয়েকটি বাড়িতে হস্তরেখা বিচার করে উনার কাঁধের ব্যাগটি চাল, আলু,কলা তে প্রায় ভর্তি বলা যায়। শিখার বাড়িতে এলে তিনি ও সাধুবাবাকে বাড়ির ভেতর থেকে চাল আর বাগান থেকে কয়েকটি বেগুন, গাছের কাঁচা লঙ্কা এনে দেন।

সাধু বাবা জিজ্ঞেস করেন কোলে তোমার ছেলে মা?

' হ্যাঁ সাধু বাবা'

'তোমার ছেলে তো ভারি মিষ্টি দেখতে মা। তবে ওর কপাল দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারছি ভাগ্য রেখা খুবই খারাপ, তোমার বংশের নাম ডোবাবে ওই ছেলে। তুমি যদি আমাকে পাঁচশো টাকা দাও, আমি তোমাকে একটি মাদুলি দিতে পারি। ওর ভাগ্য রেখা ধীরে ধীরে বদলে যাবে। নেবে মা একটি মাদুলি'?

ছেলের মঙ্গল কোন মা না চায়। শিখা ছেলেকে কোল থেকে নামিয়ে, ট্রাংকের ভেতর থেকে তার জমানো একটা পঁচশো টাকার নোট এনে দিয়ে সাধুবাবাকে জিজ্ঞেস করেন,-'বাবা এই মাদুলি কবে ও কখন পরাবো'?

সাধু বাবা বলেন, -'মঙ্গলবার পরাবে মা। আর তুমিও তোমার ছেলে, শনি ও মঙ্গলবার নিরামিষ খাবে'।

'সাধু বাবা আপনি আবার আসবেন কেমন?  আপনি আমার খোকার ও আমাদের যে এত উপকার করলেন তার জন্য, আপনার কাছে আমি চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবো। আপনাকে একটা প্রণাম করি, আমার খোকাকে আশীর্বাদ করুন আপনি'।

সাধু বাবা আশীর্বাদ করে বলেন,-'আমি আশীর্বাদ করলাম তোমার ছেলেকে, কিন্তু মা আমি আগামীকাল এই গাঁ ছেড়ে অন্য গাঁয়ে ভিক্ষে করতে যাবো। আজ রাতে এই গ্রামে একজনের বাড়িতে সাকাহার গ্রহণ করে, আগামীকাল ভোরে অন্য কোন গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেবো। তাই আর দেখা হবে না'।

শিখার স্বামী অনন্ত, বাড়ি থেকে দুই মাইল দূরে, জনকাতে বিডিও অফিসে চাকরি করেন। ভদ্রলোক কাঁথি কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করেছেন। শিখার পড়াশোনা এইচ এস পাস। উনাদের দুই ছেলে রাকেশ ও  অনিমেষ, খেজুরির হিজলি তে বাড়ি। বেশ কয়েক বিঘে ধান জমি লোক দিয়ে চাষ করান অনন্ত।

অনন্ত সন্ধেবেলা বাড়ি এসে, হাতমুখ ধুয়ে দুই ছেলেকে আদর করে কিছুটা সময় কাটান। তারপর শিখার সাথে চা ও টিফিন খেয়ে ছেলেদের পড়াতে বসেন। গ্রামের সকলের সাথে খুব ভালো মিল আছে, কিন্তু তাস খেলে বা আড্ডা দিয়ে অহেতুক সময় নষ্ট করেন না।

শিখা চা খাবার সময় অনন্তকে বলেন, -'শুনছো আজ একজন সাধু বাবা ভিক্ষে করতে এসেছিলেন। অনিমেষের কপাল দেখে বললেন, -'ওর জন্য নাকি আমাদের সংসারের মান-সম্মান থাকবে না। তবে উনার কাছ থেকে একটা মাদুলি নিয়েছি, ছেলের হাতে পরিয়ে দেবো। ওই মাদুলি ধারণ করলে অনিমেষের ভালো হবে'।

অনন্ত এতক্ষণ অবাক হয়ে শুনছিলেন। শিখাকে জিজ্ঞেস করেন, -'তোমাকে বিনে পয়সায় মাদুলি দিলেন, নাকি তোমাকে বললেন তুমি আমাকে কিছু টাকা দাও, তোমার ছেলের হাতে পরানোর জন্য একটা মাদুলি দেবো। তাতে তোমার ছেলের মঙ্গল হবে'।

শিখা জানান, হ্যাঁ উনি পাঁচশো টাকা চেয়েছিলেন।আর উনাকে কিছুটা চাল, বেগুন ও কিছু কাঁচা লঙ্কা দিয়েছি। জানো আমার বাবাকেও একজন গনৎকার কপাল দেখে বলেছিলেন,বাবার আশি বছরে মৃত্যুযোগ আছে। দোষ খণ্ডন করার জন্য বাবাকে একটা ছোট শেকড়ের টুকরো সুতোতে বেঁধে, হাতে ধারণ করতে বলেছিলেন। বাবা তো টাকা দিতে সেদিন পারিনি, মা পরে আসতে বলেছিলো কিন্তু উনি আর আসেননি। তাই তো বাবা ঠিক আশি বছর বয়সেই মারা গেলো'।

অনন্ত বলেন আচ্ছা শিখা, তুমি এই সব বিশ্বাস করলে?  তুমি তো একবিংশ শতাব্দীর একজন শিক্ষিত মেয়ে। তুমি এমন করবে, আমি আশা করতে পারিনি'।

'বাবার মৃত্যুর পর আমি গণৎকার কে বিশ্বাস করি গো। আর আজ ছেলের মঙ্গলের জন্য পাঁচশো টাকা খরচ করেছি, তাতে কি এমন ক্ষতি হয়েছে বল? সপ্তাহে দুই দিন মা ও ছেলে নিরামিষ খাবো, তুমি বাপু না করো না'।

'আমি ছেলেকে ওই মাদুলি ধারণ করার জন্য, নিরামিষ খাওয়াতে তোমায় বারণ করছি শিখা। ওই মাদুলি আমি বিশ্বাস করি না।  সাধু বাবার ওটা ব্যবসা ছাড়া আর কিছু না। মাদুলি পরলে যদি সব কিছু হয়, তবে ওই সাধু বাবা কি ধারণ করতে পারতেন না একটা মাদুলি, রতন টাটার মতো বিত্তশালী হবার জন্য। রতন টাটা না হোক, একজন বিত্তশালী মানুষ হয়ে, নিজের জমি জায়গা চাষ করে সুখে শান্তিতে বাস করতে তো পারতেন'।

শিখা একটু ক্ষুন্ন হয়ে বলেন,-'তোমার ওই এক দোষ, তুমি কুষ্টি, মাদুলি এগুলো বিশ্বাস করো না। তাহলে আমার বাবা কেন আশি বছরেই গনৎকারের কথা মত মারা গেলো'?

শ্বশুরমশায়ের মাথায় ওই কথাটা সবসময় ঘুরতো। উনি বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন যে, আশি বছরের আগে তিনি মারা যাবেন না। আর আশি বছরের পরে উনি আর বাঁচবেন না। জানোতো এই বিশ্বাসটাই শ্বশুরমশায়ের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো'।

'মাদুলি নিলে ক্ষতি তো কিছু হবে না। সাধু বাবার বলা কথাগুলো তুমি আর আমি ছাড়া কেউ জানবে না। আমার বিশ্বাস খোকার ভালো হবে। তুমি আমার কথাটা রাখো লক্ষ্মীটি'।

'তোমার কথা কি আমি রাখিনা শিখা? আজ তোমায় বলবো, আমার অনুরোধ, তুমি খোকাকে মাদুলি পরাবে না। তোমরা দুজন নিরামিষ খাবে, আর আমি, বড় খোকা মাছ খাবো তা কি হয়? বাড়িতে তাহলে সবাইকে বৃহস্পতিবার নিয়ে, সপ্তাহে তিন দিন নিরামিষ খেতে হবে। তোমার ছেলেরা বড় হলে কি সপ্তাহে তিনদিন চাইবে নিরামিষ খেতে'?

শিখা মন খারাপের সুরে বলেন, -' আমি জানতাম তুমি মানবে না। এতটা এক রোখা হলে চলে না। যাই আমি রাতের খাবার করতে'।

রাগ কোরোনা শিখা, আমি এক সাধু বাবা কে জানতাম। পাশের পাড়াতে বাস করতেন। তিনি আমার গ্রামে আমার বন্ধুকে বলেছিলেন, হায়ার সেকেন্ডারি তে সে ফেল করবে। ভাগ্যিস তখন তার পরীক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছিলো। তা না হলে তো ওই কথা শোনার পর, পড়াশোনায় মন বসাতে পারত না এবং নির্ঘাত ফেল করতো। আমার বন্ধু কিন্তু হায়ার সেকেন্ডারি তে লেটার পেয়ে পাস করেছিলো। সাধু বাবার সঙ্গে দেখা হলে, আমার বন্ধু একদিন জিজ্ঞেস  করেছিলো, সাধু বাবার আয়ু কত। উত্তরে সাধুবাবা বলেছিলেন উনি আরও তিরিশ বছর বাঁচবেন। তার এক মাস পর খবর পেলাম, সাধু বাবা সাপের কামড়ে মারা গেছেন'।

-' ঠিক আছে মাদুলিটা তবে আগামীকাল পুকুরে ফেলে দেবো'।

- তাই দিও। বলাতো যায় না তোমার ওই সাধু বাবা দেখো হয়তো কোন দলের সাথে যুক্ত আছেন, বা এইভাবে পয়সা উপার্জন করে সকলের আড়ালে এক লাক্সারি জীবন অতিবাহিত করেন'।----

রাকেশ ও অনিমেষ ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।  স্কুল কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে চাকরি জীবনে প্রবেশ করেছে। রাকেশ জনকা থানার পুলিশ ইন্সপেক্টর, অনিমেষ তেতুলতলা কলেজের প্রফেসর। শিখা ছোট ছেলেকে নিয়ে মাঝে মাঝে চিন্তা করেন ভাবেন, -'এত ভালো ছেলে আমার, বাবা-মাকে কত ভালোবাসে সে কি করে বংশের নাম ডোবাবে? উত্তর খুঁজে পান না, ঠাকুরকে স্মরণ করেন আর মনে মনে বলেন, ঠাকুর আমার ছোট ছেলেটা কে দেখো'।

দুই ছেলে, স্বামীকে নিয়ে সুখে আছেন শিখা। বড় ছেলে যখন এক বছর, তখন শ্বশুর-শাশুড়ি গত হয়েছেন। থাকার মধ্যে আছেন এক ননদ, বাড়ি জুন পুট। জীবনটা এত সুন্দর হতে পারে ভাবেননি শিখা কোনদিন। বিকেলে উঠোনে বসেছিলেন, সাধু বাবার কথাটা আজ আচমকা মনে উঁকি দিয়ে গেলো। বেলা চলে যায়, সন্ধ্যার আগমনে নিঝুম হতে থাকে চারদিক, কিন্তু শিখার মনে কোথাও যেন মাঝে মাঝে শূন্যতা দেখা দেয়। ডুবে যান মন খারাপের দেশে।------

কেটে গেছে তিন বছর অনন্ত কয়েক মাস হলো আজকাল কেমন যেন খিটখিটে হয়ে গেছেন। শরীরে দেখা দিয়েছে কিছু লক্ষণ। যেমন ক্ষুধা মন্দা, ক্লান্তি ভাব, ঘুম কম হওয়া, পা ফোলা ইত্যাদি। সকলের কপালে দেখা দেয় চিন্তার ভাঁজ। ছেলেরা বাবাকে ডক্টরের কাছে নিয়ে যায়। ডক্টর কিছু রিপোর্ট করতে দেন, রিপোর্টে ধরা পড়ে অনন্তের কিডনি কাজ করছে না। ডায়ালিসিস শুরু হয়,অনিমেষ কলেজ ছুটি নিয়ে প্রায় বাবাকে হসপিটালে আনে।------

হিজলি গ্রামে শিখার বাড়ির কিছুটা দুরেই রত্নার বাড়ি।  অনিমেষ রত্নাকে কলেজে পড়ার সময় থেকে ভালোবাসে। রত্না, অনিমেষের চেয়ে তিন বছরের ছোট, ভারী মিষ্টি মেয়ে। একটি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষিকা। কতদিনের স্বপ্ন রাকেশের বিয়ে হলেই, রত্নার বাবা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে অনিমেষের বাবা-মায়ের কাছে আসবেন। বেশ কাটছিলো সকলের জীবন, কিন্তু অনন্ত অসুস্থ হওয়াতে, সকলের কপালে এসেছে দুশ্চিন্তার ভাঁজ।

ডক্টর বলেছেন যদি একটা কিডনি প্রতিস্থাপন করা যায়,  তাহলে অনন্ত বেঁচে যাবেন। তাই অনিমেষ একদিন রত্নাকে সব খুলে বলে, -'রত্না বাবার শারীরিক অবস্থার কথা তো তুমি শুনেছো। কিডনি খোঁজা চলছে, কিন্তু কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। পেপারেও বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে,কিডনি দাতাকে দশ লাখ টাকা দেওয়া হবে। ফোন নাম্বার দেওয়া ছিলো,কোন প্রত্যুত্তর আসেনি'।

রত্না বলে,-'এ মা কি হবে তাহলে'?

'সেটাইতো ভাবছি, -'দেখো বাবাকে তো এইভাবে বেশিদিন ফেলে রাখা যাবে না। তাই বাধ্য হয়ে আমি আমার একটি কিডনি দান করবো বাবার জন্য, এইটুকু আমায় যে করতেই হবে রত্না। আমার  ব্লাড গ্রুপ বাবার ব্লাড গ্রুপের সাথে ম্যাচ করেছে, তাছাড়া সব রকম টেস্ট ও হয়ে গেছে'।

 

রত্না কাঁদতে থাকে। বলে, -'দেখো তোমার বাবা তুমি যা ভালো বুঝবে করবে। আমার চিন্তা হচ্ছে কাকু, কাকিমা মেনে নেবেন কিনা, আর চিন্তা হচ্ছে তোমাকে নিয়ে। তোমার শরীর তো কমজোরি হয়ে যাবে'!

'এত ভেবোনা রত্না,  চিকিৎসা বিজ্ঞান কত উন্নত হয়েছে। একটি কিডনি নিয়ে দিব্যি ভালো থাকা যাবে। তাছাড়া আমি তো কোন কায়িক পরিশ্রম করি না, তাই কোন অসুবিধা হবে না। তুমি যদি ভেঙে পড়ো, আমি সাহস পাই কি করে বলতো'।

'আচ্ছা আমারও কাকুর ব্লাড গ্রুপ ম্যাচ করলে, আমি যদি কাকুকে কিডনি দেই তোমার পরিবর্তে। আমার ব্লাড গ্রুপ কিন্তু ও পজেটিভ'।

'দূর বোকা তোমাকে যে আমাদের সন্তানের মা হতে হবে। তুমি যদিও কিডনি দেবার উপযুক্ত হও, তোমার কিডনি নেওয়া যাবে না। দেখো আমার কোন ক্ষতি হবে না, তোমার ভালবাসার টানে, বাবা-মায়ের আশীর্বাদে আমি ঠিক ভালো থাকবো'।

রত্না অনিমেষের হাত দুটো ধরে বলে,-'আমার যে ভীষণ ভয় করছে গো। তোমার কিছু হয়ে গেলে আমি এই জীবন আর রাখবো না, চলে যাবো তোমার সাথে। চার পাঁচ ঘন্টার অপারেশন হবে। কাকিমাকে সামলাবো কি করে, আর নিজে কিভাবে স্বাভাবিক থাকবো, আমি কিছুই ভেবে পাচ্ছি না'।

অনিমেষ রত্নার কাঁধে মাথা রেখে বলে,-'মা- বাবা, দাদা অপারেশনের আগে কেউ জানবে না,আমি বাবাকে কিডনি দিচ্ছি। জানতে পারলে ওরা কেউ মত দেবে না। জানলে শুধু তুমি, অপারেশন হবার পর আমার জ্ঞান ফিরে এলে ওদের সবকিছু বলো। তার আগে কিছু বলতে যেও না,ডক্টর কে সেই ভাবে আমি জানিয়ে রেখেছি'।

'কোথা থেকে কি যে হয়ে গেলো। আসলে আমি অপয়া,আমার ভাগ্যে কোন কিছুই সুন্দর রূপ নিয়ে আসে না। সবই তেই থাকে একটা  বাধা'।

অনিমেষ রত্নার মুখে হাত দিয়ে বলে,-' তুমি তো আমার প্রাণ। আমি তোমার মধ্যেই খুঁজতে চাই আমার হৃদয়ের স্পন্দন। তোমার মধ্যে খুঁজতে চাই ভালোবাসার বসন্ত। আমি তোমার মধ্যে খুঁজতে চাই আমার অন্তর আত্মা কে। তোমার মধ্যেই যে খুঁজতে চাই আমাকে'।

হেমন্তের শিশির সিক্ত সন্ধ্যায়, মিহি কুয়াশা ডানায় মেখে নীড়ে ফিরছে সব পাখির দল। বাতাসে ধান শীষের এক অপূর্ব গন্ধ, ঘাসের ডগায় জমছে শিশির বিন্দু, শাপলাগুলো হাসছে। শীতল জলের উপর, যেন বসন্ত আসার আগে এই পূর্ব রাগ। অনিমেষ  এবার উঠে পড়ে, ওরা বসেছিলো অনিমেষের পুকুর পড়ে। অনিমেষ রত্নাকে কিছুটা পথ ছেড়ে আসে। আর বলে, -'অপারেশনের আগে প্রতিদিন পুকুর পাড়ে এসো রত্না। আমি ছুটি নিয়েছি'।

'বেশ আসবো। আগামীকাল কাকু, কাকিমার সাথে দেখা করবো। আজ আসি, তুমি রাত জেগো না। স্মোক করবে না কেমন'?

জীবনের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নেই কারণ যতক্ষণ উত্তর খুঁজতে সময় লাগবে, ততক্ষণে জীবন তার প্রশ্নগুলোই বদলে ফেলবে। রত্নার মনে জাগে প্রশ্ন, -'হে ঈশ্বর তুমি এ কোন খেলা খেলছো! আমার স্বপ্নগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিও না প্রভু! আমি তো কোনদিন কিছু চাইনি তোমার কাছে আজ চাইছি। আমারও অনিমেষের জীবনে তুমি স্বাভাবিক সুখ টুকু দিয়ো, আমরা যেন সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে পারি। ওর বাবাকে ভালো রেখো, বাবা-মা যে ওর জীবনে প্রথম স্থান দখল করে আছে। সেটাই তো একজন আদর্শ সন্তানের কর্তব্য ঠাকুর, অনিমেষের সুখে আমি যেন সুখী হতে পারি'।------

অনিমেষ বাড়ি এসে বাবা-মা ও দাদাকে জানিয়েছে, -'কিডনি পাওয়া গেছে। সামনে সপ্তাহে বুধবার বাবাকে হসপিটালে ভর্তি করতে হবে, কিডনি প্রতিস্থাপন করার জন্য। আমি ডক্টরের সাথে আগামীকাল সবকিছু আলোচনা করে নেবো'।

শিখা জিজ্ঞেস করেন, -' কিডনি কোথায় পেলি বাবা? সে যে অনেক টাকার ধাক্কা'।

'সবই ডক্টর ব্যবস্থা করেছেন মা। ঠাকুরকে ডাকো যিনি কিডনি দেবেন, তিনিও বাবা যেন অপারেশনের পর সুস্থ থাকেন। আমি কিন্তু বিশেষ কাজে ব্যাঙ্গালোর যাবো,অপারেশনের দিন থাকতে পারবো না। দাদা তুই অপারেশনের সবকিছু দায়িত্ব নিবি। আমি বাবাকে হসপিটালে ভর্তি করে, তারপর বেরোবো। বাড়ি ফিরে আসতে দশ দিন মতো সময় লাগবে'।

মাও দাদার অমত থাকলেও উপায় নেই, তাকে যে সেই দিন হসপিটালে ভর্তি হতে হবে। চলে গেলো আরও একটি দিন জীবনের থেকে। সামনের পথ অজানা, পেছনে ফিরে যাবার উপায় নেই। শুধু এই মুহূর্ত টাই একমাত্র সত্যি।------

অপারেশনের দিন চলে এলো,  অনন্তকে হসপিটালে ভর্তি করা হয়। সকলে হসপিটালে উপস্থত। অনিমেষ শিখাকে প্রণাম করে বলে,-' মা আমায় আশীর্বাদ করো, আমি যেন জয়ী হতে পারি। যে কাজে যাচ্ছি, সে কাজ যেন সফল হয়। এই সই করার চেকটা কাছে রাখো মা। দরকার যদি হয় দাদাকে দিও, ও আমার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে ডক্টর কে দেবে'।

শিখা আশীর্বাদ করেন, -'তুই সব কাজে জয়ী হবি বাবা'। দাদাকে প্রণাম করলে দাদাও আশীর্বাদ করে বলে,-' তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস ভাই'।

অনিমেষ বলে, -' যে কিডনি দিচ্ছে তাকে আশীর্বাদ করো মা। সে ও বাবা যেন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসে'।

'আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি বাবা, যে কিডনি দিয়ে আমার সিঁথির সিঁদুর রক্ষা করার জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিলো, তার যেন মঙ্গল হয়। সে যেন তার বাবা-মায়ের কাছে সুস্থ হয়ে ফিরে যায়। তোর বাবার অপারেশন ও যেন সাকসেসফুল হয়। অপারেশন হয়ে গেলে, ছেলেটাকে দেখতে যাবো আমরা'।

আর বেশি কথা না বাড়িয়ে অনিমেষ, মা ও দাদাকে বলে, -' তোমরা আগামীকাল নটার সময় ওয়েটিং রুমে থেকো। চার ঘন্টা মত সময় লাগবে অপারেশন হতে। দাদা তুই ডক্টরদের সাথে যোগাযোগ করবি বন্ড সই করতে হবে। আমি আসছি। ততক্ষণে রত্না এসে গেছে, অনিমেষ রত্নাকে বলে,তুমিও সাথে থেকো'।

শিখা বলেন, -' তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস বাবা'।

'আসবো মা আমি বাবার সাথে দেখা করে তারপর বেরোবো হসপিটাল থেকে-----

অনন্তের পাশের কেবিনে ভর্তি করা হয় অনিমেষকে।  অনিমেষের বন্ধু শুভম অনিমেষের দেখাশোনা পুরোপুরি করছে। ডক্টর দেবমাল্য

চৌধুরী এবং সানভ দত্ত রায় দুজনে, বাবা ও ছেলের অপারেশনের দায়িত্ব নিয়েছেন। দেবমাল্য চৌধুরী হলেন শুভমের দাদা।

পরেরদিন যথাসময়ে অপারেশন শুরু হলো। রত্না ও অনিমেষের বাড়ির সকলের সাথে শুভমের দেখা হয়। শিখা জিজ্ঞেস করেন, -'বাবা তোমাকে বুঝি অনিমেষ আসতে বলেছিলো? দেখো না ছেলেটা আজ বাড়ি নেই, কি দরকারি কাজে ব্যাঙ্গালোর যেতে হয়েছে'।

শোভার হাত দুটি ধরে শুভম জানায়, -'মাসীমা অনিমেষ কোথাও যায়নি। এই হসপিটালে ভর্তি আছে, অপারেশন চলছে। আমি বন্ড সই করে এলাম। কিডনিটা অনিমেষই তার বাবাকে দিচ্ছে। ও আমাকে বলেছিলো,মেসোমশায় কে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন দিতেও কুন্ঠিত হবে না। তাইতো এত বড় সিদ্ধান্ত নিলো। আপনারা জানলে ওকে কিডনি দিতে দেবেন না, তাই আপনাদের জানায়নি'।

শিখা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদতে থাকেন। বলেন, -'তুমি কেন জানালে না বাবা? আমার ছেলের কি হবে? কেন ও এমন কাজ করলো'!

'ঈশ্বরকে ডাকুন মাসীমা, দুটো অপারেশন যেন সাকসেসফুল হয়। আপনার ভাবি পুত্রবধূ রত্না কিন্তু সব জানে, রত্নাকে ও অনিমেষ কিছু জানাতে বারণ করেছিলো।

শিখা ভাবি পুত্রবধূ রত্নাকে বলেন, -'একি করলি মা, নিজের ভাবি স্বামীর কথাটা চিন্তা করে আমায় তো জানাতে পারতিস। আমার ছেলে ভগবানের আশীর্বাদে অপারেশনের পর সুস্থ ঠিক হয়ে যাবে। তবুও ছেলেটা যে সারা জীবন একটা কিডনি নিয়ে থাকবে, কত কমজোরি হয়ে গেলো! আমি মা হয়ে সহ্য করবো কি করে!

রত্না শিখা কে শান্ত করে।  বোঝায়, -'কাকিমা তোমাদের আশীর্বাদে তোমার ছেলে ঠিক ভালো  থাকবে। তুমি এত ভেঙ্গে পড়োনা'।

রাকেশ,  রত্না কে উদ্দেশ্য করে বলে,-'ভাই যা করলো এ সত্যিই নজির বিহীন ঘটনা। তবে সবার আগে তোমাকে স্যালুট জানাই রত্না। তুমি যে আমার ভাইকে মত দিয়েছো, অন্য কোন মেয়ে হলে দিত না'।------

অপারেশন সাকসেসফুল, আই. সি. ইউ তে দুজনকে ট্রান্সফার করা হয়েছে। প্রথমে শিখা ও রত্নাকে পাঠানো হয় অনন্ত ও অনিমেষের সাথে দেখা করার জন্য।

শিখা ছেলের কাছে আগে যান বলেন, -' একি করলি খোকা, তোর বন্ধুর কাছ থেকে সবকিছু জানতে পারলাম। তুই সাবধানে থাকিস বাবা। আমি তো চিন্তাই করতে পারি না, কোন ছেলে তার বাবাকে বাঁচানোর জন্য এত বড় ঝুঁকি নিতে পারে। তোর বাবাকে যে কি করে জানাবো তাই ভাবছি আমি'

অনিমেষ মৃদু হেসে বলে, -' তোমাদের আশীর্বাদ সাথে আছে মা, কিছুই খারাপ হবে না আমার দেখো'।

রত্নাকে অনিমেষের কাছে রেখে শিখা যান স্বামীর সাথে দেখা করতে, জানান সব কথা। অনন্ত বলেন,-'কি বলছো এসব,ছোট খোকা কিডনি দিয়েছে, হায় ভগবান কেন করলো এ কাজ! বাবা-মা কি চিরকাল কারো থাকে? এটুকুও বুঝলো না'!

শিখা উত্তেজিত হতে বারণ করেন অনন্তকে। বলেন, -'জানো রত্নার অবদান কিন্তু কম নয়। ও যদি মত না দিতো,ছোট খোকা সাহস পেতো না হয়তো এই কাজ করতে'।

সব শুনে অনন্তের চোখের কোন দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। শিখাকে বলেন,-'তোমার সাধু বাবার কথা মনে আছে শিখা? কি বলেছিলেন উনি, আমার ছেলে নাকি বংশের নাম ডোবাবে। এবার বুঝতে পারলে তো, এমন ছেলে কয়জন বাবা মায়ের ভাগ্যে জোটে। তা বলে আমি জ্যোতিষ শাস্ত্রকে অপমান করছি না, আসলে আমি বিশ্বাস করি না'।

'তুমি বেশি কথা বলো না, সত্যিই আমার দুই ছেলে দুই রত্ন।জানো হসপিটালের সমূহ খরচ বড় খোকা বহন করেছে। বলেছে, 'ভাই এত বড় ত্যাগ স্বীকার করল মা, আমাকে এইটুকু করতে দাও'।------

সুস্থ হলে জেনারেল বেডে, দুজনকে পাশাপাশি ট্রান্সফার করা হয়। ডক্টর বলেন,-'আপনি সৌভাগ্যবান এমন ছেলে পেয়েছেন'।

অনন্ত ছেলেকে উদ্দেশ্য করে পাশের বেড থেকে বলেন, -'তুই যা করলি সাতজন্ম ও এই ঋণ শোধ করতে পারবো না বাবা। আজ তোকে একটা প্রণাম করতে খুব ইচ্ছে করছে,এটা তোর প্রাপ্য। এই জন্মে তো আর হবে না, তাই আবার জন্মাতে চাই, তোর ছেলে হয়ে। তখন না হয় শোধ করবো যতটা পারি। রত্না মা তুমি হলে এখনকার দিনে নজিরবিহীন স্ত্রী ও বৌমা। আমি আশীর্বাদ করি মা, তুমি সুখী হও, তোমার মনের সব ইচ্ছে পূরণ হোক, সিথির সিঁদুর যেন অক্ষুন্ন থাকে,ভালো থেকো তোমরা'।

 

লেখিকার পরিচিতি:-  আন্তর্জাতিক কাব্যশ্রী পুরস্কার, বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক সম্মান, শরৎ সাহিত্য সম্মান, বিভূতিভূষণ স্মৃতি সম্মান, লীলা মজুমদার স্মৃতি সম্মান প্রাপ্ত বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক, কলকাতার বাসিন্দা সুলতা পাত্র, অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার (বর্তমান পূর্ব মেদিনীপুর জেলা) কাঁথি শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। স্কুল কলেজ ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখতেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে লেখা শুরু করেন। লেখালেখি ছাড়া গান আবৃত্তিতেও দক্ষতা রয়েছে। উনার লেখা অনেকগুলি উপন্যাস, গল্প ও কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে।

Mailing List