আমজাদের এঁটোও পরিষ্কার করেছিলেন বিশ্বজননী মা সারদা

আমজাদের এঁটোও পরিষ্কার করেছিলেন বিশ্বজননী মা সারদা
14 Jun 2020, 11:58 AM

আমজাদের এঁটোও পরিষ্কার করেছিলেন বিশ্বজননী মা সারদা

সুদর্শন নন্দী

জীবজগতের মঙ্গলের জন্য ভগবান বারে বারে এই ধরায় অবতীর্ণ হয়েছেন। আর যখন তিনি এই ধরায় আসেন তখন তিনি নিয়ে আসেন শক্তিরূপিণী তাঁর লীলাসঙ্গিনীকে। ভগবান শ্রীরামের সঙ্গে যেমন এসেছিলেন তাঁর শক্তি সীতাদেবী, শ্রীকৃষ্ণের সাথে যেমন রাধা বা শ্রীচৈতন্যের সাথে বিষ্ণুপ্রিয়া তেমনই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে লীলাসঙ্গিনী রূপে এসেছিলেন বিশ্বজননী মা সারদাদেবী। মা সারদা ছিলেন আদ্যাশক্তি মহামায়া। তাঁর অমৃতময় জীবন কাহিনীর মধ্যে আমরা পাই এক বরাভয়দায়িনী জননীকে যিনি ছিলেন সতের মা আবার অসতেরও মা, সবলের মা আবার দুর্বলেরও মা, ধনীর মা আবার দরিদ্রেরও মা, ব্রাহ্মণের মা আবার মুসলমানেরও মা। আসলে এককথায় তিনি ছিলেন সকলেরই মা, বিশ্ব জননী সারা বিশ্বের একান্ত আপনার মা। আপন মা যেমন সন্তানের সুখে খুশি হন, আবার সন্তানের কষ্টে মায়ের বুক ফেটে যায় ঠিক নিঃসন্তান হয়েও তিনি ছিলেন সবার আপন মা। ধনী দরিদ্র, জাতপাত নির্বিশেষে সব সন্তানের জন্যই তাঁর বুক কেঁপে উঠত। মায়ের সান্নিধ্যে যেসকল পুন্যবাণ সন্তান তথা ভক্ত এসেছেন তাঁদের বিভিন্ন কাহিনি থেকে আমরা মায়ের বিগলিত করুনার রূপটি দেখতে পাই। তাই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যদি আধ্যাত্মিক নবজাগরনের পথিকৃৎ হন, তবে সেই সময়কার সামজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে মায়ের কর্মধারা ছিল নারী জাগরণের এক পথপ্রদর্শক মহীয়সী হিসেবেও। তিনি একাধারে মানবী, দেবী,  বিশ্বজননী আবার তিনি এক মহীয়সী সমাজ সংস্কারক হিসাবেও।


আমরা আমাদের এই আরাধ্যা মায়ের বহুচর্চিত ও আলোচিত দৈনন্দিন ঘটনাবলী থেকে তাঁর অপার মাতৃস্নেহের দেখা পাই। দেখতে পাই সন্তানের দুঃখ, কষ্ট, কান্না তাঁর হৃদয়কে কীভাবে বিচলিত করত। কীভাবে সেসময়কার সামাজিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে তাঁর স্নেহ ঝরিয়ে দিতেন সন্তানকুলের মঙ্গলে। মায়ের সন্তান বাৎসল্যের কিছু ঘটনার কথা তো প্রায় প্রত্যেকেই অবগত, বিশেষ করে আমাজাদের কাহিনী। এক মুসলমান ডাকাতকে কীভাবে মা বুকে করে নিজের সন্তান স্নেহে আদর করছেন। আমজাদকে নলিনী দিদি খাবার ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছেন। কারণ, সে নিচু জাত, মুসলমানও। তখনকার সমাজ ব্যবস্থা এরকমই। মা তা দেখে বিচলিত হলেন, থাকতে পারলেন না। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ধমকের সুরে নলিনীদিদিকে বললেন, এরকম করে খেতে দিলে কেউ খেতে পারে? তুই যদি না পারবি আমাকে দে আমি খেতে দিচ্ছি আমজাদকে। আমরা জানি আমজাদের খাবার শেষে নিজে হাতে সেই এঁটো পরিস্কার করলেন। তা দেখে নলিনীদিদি বিস্ময়ে ও সাবধানী হয়ে বলেছহিলেন ও পিসি তোমার যে জাত গেল গো? মা তাঁর উত্তরে বলে ছিলেন তা যাক, আমার শরত যেমন ছেলে, আমজাদও তেমনি ছেলে। মাতৃত্বের এমন উজ্জ্বল রূপ যে এই পৃথিবী আগে দেখেনি তা বলাই বাহুল্য। মুসলমান সন্তানের আরেকটি কাহিনী অনেকেই জানেন। কয়েকটি কলা নিয়ে এক মুসলমান চাষি মাকে দিতে চাইলেন। মা কোন সংকোচ  না করেই তা গ্রহন করলেন। এরপর আদর করে আপন সন্তান স্নেহে তাকে মুড়ি মিষ্টি খেতে দিলেন মা। তা দেখে এক স্ত্রীভক্ত বিরক্ত হয়ে মাকে বললে- ওমা, ওরা যে চোর! ওদের জিনিস ঠাকুরকে দেবে? মা তখন কিছু বললেন না। সেই চাষি চলে যাবার পর ভক্তটিকে তিরস্কার করে বললেন- কে ভাল, কে মন্দ আমি জানি। দোষ তো মানুষের লেগেই আছে। তাঁকে কি করে ভাল করতে হবে তা জানে কজনা?


এভাবে আমরা তাঁর জীবনী থেকে অসংখ্য ঘটনা পাই তা সে বিষ্ণুপুর স্টেশনের কুলি হোক, বা দুর্ভিক্ষ হলে খেতে দেওয়া হোক বা পূর্ববঙ্গে পদ্মার বন্যায় ভেসে যাওয়া চন্দ্রমোহণের পরিবারের জন্য সাহায্য করাই হোক, আমরা মায়ের এই করুনাধারা প্রবাহিত দেখি তাঁর পুরো জীবনকালে। তিনি রসিক মেথরকেও সন্তান স্নেহে আপনার করেই দেখতেন। তিনি বারবার বলেছেন যার যা প্রাপ্য তাঁকে তা দিতে হয়, কাউকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে নেই। তাঁর সন্তান স্নেহই ছিল তাঁর বিশেষ সত্ত্বা। সেই অর্থে তিনি যেমন আমাদের করুণাময়ী মা, বিশ্বরূপিণী মা, তেমনি সারা বিশ্বেরই পরম আরাধ্য জননী। 

                                                            ******* 

ছবি সংগৃহীত

Mailing List