‘অম্বুবাচী’ মানে কৃষির সূচনা, নারী ও পৃথিবী এখানে মিলেমিশে একাকার, শাস্ত্রের ব্যাখ্যা জানা আছে

‘অম্বুবাচী’ মানে কৃষির সূচনা, নারী ও পৃথিবী এখানে মিলেমিশে একাকার, শাস্ত্রের ব্যাখ্যা জানা আছে
22 Jun 2022, 10:45 AM

অম্বুবাচী’ মানে কৃষির সূচনা, নারী ও পৃথিবী এখানে মিলেমিশে একাকার, শাস্ত্রের ব্যাখ্যা জানা আছে

 

সুখেন্দু হীরা

 

         

‘অম্বু’ মানে জল। অম্বুবাচীর আক্ষরিক অর্থ হল- যাহা অম্বু (বারিবর্ষণ) সূচনা করে। শাস্ত্রের ভাষায়- “অম্বুবাচয়তি তদ্ববর্পনং সূচয়তি অম্বু-চুরা”।

এক কথায় যে সময় বর্ষার সূচনা হয়, তাই হল অম্বুবাচীর কাল। তারিখ অনুযায়ী আষাঢ় মাসের সাত তারিখ থেকে আম্বুবাচী শুরু হয়। চলে তিনদিন বিশ দন্ড। ‘দন্ড’ মানে ২৪ (চব্বিশ) মিনিট।

এইরকম সময় হিসেব কেন। এই সময়কাল সূর্য আর্দ্রা নক্ষত্রে প্রথম পাদে থাকে। জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী সূর্য বারো মাসে ২৭ টি নক্ষত্রে অবস্থান করে। বলা হয় সূর্য ২৭ টি নক্ষত্রকে ভোগ করে। এই বারো মাস ১০৮ টি পাদে বিভক্ত। এজন্য প্রতিটি নক্ষত্রে ৪ পাদ করে থাকে। সূর্য প্রতি মাসে দুই নক্ষত্র ও একপাদ ভোগ করে। যেমন বৈশাখ মাসে আশ্বিনী ও ভরণী দুই নক্ষত্র ও কৃত্তিকার একপাদ ভোগ হয়। আষাঢ় মাসে প্রথম ছয় দিন মৃগাশিরার শেষ দুইপাদ ভোগ হয়। তারপর আর্দ্রা নক্ষত্রে প্রবেশ করে। তখন শুরু হয় অম্বুবাচী। বলা হয় এই সময়ে পৃথিবীর রজস্বলা হয়। আসলে বাংলায় আষাঢ় ও শ্রাবণ বর্ষাকাল। বর্ষার জলে মাটি সরস হয়ে ওঠে।

 

 আষাঢ় মাসেই দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ু ঢুকে যায় বঙ্গে। আষাঢ় প্রথম সপ্তাহ থেকে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। তাই ভূমি হলকর্ষণের উপযোগী হয়ে ওঠে; বীজ বপনের যোগ্য হয়ে ওঠে। প্রাকৃতিক নিয়মে মেয়েরা যেমন ঋতুকালীন রজস্বলা হয়; সন্তান ধারণে সক্ষম হয়। পৃথিবীকে আমরা মায়ের সঙ্গে তুলনা করি, নারী হিসাবে কাল্পনা করি। শাস্ত্রকাররা এই প্রকৃতির লীলা থেকেই ঈশ্বরের লীলার অবতারণা করেছেন।

 

বাঙালী তথা ভারতীয়দের জীবন একান্ত ভাবে কৃষি নির্ভর। বৃষ্টির ওপর কৃষিকাজ ভীষণভাবে নির্ভরশীল। তাই বর্ষা আগমন কৃষকের কাছে ভীষণ আনন্দের। এই আনন্দ উপভোগ করতে বর্ষার প্রথম কিছুদিন জমিতে নামে না চাষ করতে। এতে মাটি আরো কিছুদিন জল পেয়ে কর্ষণ যোগ্য হবে। তারপর অনায়াসে হাল দেওয়া যায়। তাই আম্বুবাচীর সময় অর্থাৎ তিনদিন বিশদন্ড মাটি খোঁড়া নিষেধ। আবার অনেক সমাজবিদরা বলেন একঘেয়েমি দূর করতে কিছুদিন চাষীরা বিশ্রাম নেয়।

সিহর গ্রামের কামাখ্যা

পঞ্জিকা মতে এই সময় পাঠকর্ম, বীজবপন, শুভকর্ম ও সপ্তাহ ব্যাপী বিশেষ যাত্রা প্রভৃতি নিষেধ। আরো আছে “যাতি, ব্রতী, বিধবা ও দ্বিজ এই সময়ে পাক করিয়া ভক্ষণ করিবে না”। তবে বাকিরা নামানলেও বিধবারা এখনও আগুন স্পর্শ করেন না। ফল-মূল, কাঁচা দুধ, খই-চিড়ে খেয়ে থাকে। এই খই-চিড়ে আম্বুবাচীর আগে ভেজে রাখে। লোক বিশ্বাস - এই সময় দুধ খেলে সর্প ভয় দূর হয়।

 

বাঙালী বিধবারা নিষ্ঠার সঙ্গে অম্বুবাচী পালন করে। অম্বুবাচী করলে বিধবারা স্বর্গবাসী হয়। না করলে নরক গমন। এই কদিন বিছানায় শোয়া বারণ। মাটিতে খড় বা মাদুর পেতে শয়ণ করে। অম্বুবাচী ছেড়ে গেলে সমস্ত কিছু ধুয়ে স্নান করে। এগুলি একপ্রকার বিধবাদের অনুশাসনে রাখার কৌশল। কারণ বাংলায় বাল্যবিধবার সংখ্যা ছিল প্রচুর। তারা যাতে বিপথে না যায়, প্রলোভনে পা না দেয় তাই সমাজের রক্ষকরা তাদের কৃচ্ছ সাধন পূর্বক বৈধব্য পালন করতে বলতেন। মহিলাদের ঋতুকাল নিয়ে সবাই চিন্তিত থাকতো। তাই পৃথিবীর ঋতুকালীন অনুশাসনের নিদর্শন দিয়ে তাঁদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতো। এরকমই অভিমত সমাজবিদ্‌দের।

লোখেশোল গ্রামের কামাখ্যা মন্দির

বোঝা যাচ্ছে আম্বুবাচী প্রকৃতপক্ষে কৃষিকাজের সূচনায় আনন্দ উৎসব। বাংলায় অনেক স্থানে মনসা পূজা ও নানা লৌকিক দেব দেবীর পূজা হয়। পূর্ব বর্ধমান জেলায় খণ্ডকোষ থানা এলাকার বোঁয়াই গ্রামে বোঁয়াইচণ্ডী বা বসন্তচণ্ডী দেবীর পূজা হয় খুব বড় করে। এই উপলক্ষে মেলা বসে পাঁচ দিন। নদীয়া জেলার নাকাশীপাড়া থানা এলাকায় সাহেব ধনী সম্প্রদায়ের কাটাপীর সাহেবের মেলা বসে দুদিন নাঙ্গাল গ্রামে। হুগলীর শেওড়াফুলিতে নিস্তারিণী মন্দিরে মেলা বসে। সবচেয়ে বড় উৎসব হয় অসমের কামরূপে বা কামাখ্যা মন্দিরে। সাতদিন ধরে মেলা চলে। তবে তিনদিন মন্দির বন্ধ থাকে। এইসময় দেবীপীঠে রজঃ দেখা যায়। দক্ষ যজ্ঞের পর সতীর এখানে যোনিদ্বার পড়েছিল।

 

পশ্চিমবঙ্গেও কামাখ্যা মন্দির দেখা যায়। আলিপুরদুয়ার জেলায় কামাখ্যাগুড়িতে কামাখ্যা মন্দির আছে। সেখানে আম্বুবাচীর সময় পূজা হয়। বাঁকুড়া জেলায় বিষ্ণুপুর থানার অধীন লোখেশোল গ্রামে একটি কামাখ্যা মন্দির আছে। অম্বুবাচীতে এখানে পূজা হয়। বাঁকুড়া জেলার কোতুলপুর থানায় সিহর গ্রামেও এটি কামাখ্যা মন্দির আছে সেখানেও অম্বুবাচীর দিন বিশেষ পূজা হয়। বাঁকুড়া জেলাতে আচার হিসাবে বেশি পালিত হয় আম্বুবাচী। এখানের জনগণ বলেন আম্ববতী।

 

তথ্যঋণ: 

১. বিশ্বকোষ - নগেন্দ্র নাথ বসু।

২. বঙ্গীয় শব্দকোষ - হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

৩. বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি কোষ – সম্পাঃ বরুণ কুমার চক্রবর্তী।

ads

Mailing List