বারো মাসে বারো রূপে পূজিত হলেও মহাশক্তি আসলে একটাই, আদিশক্তির বিভিন্ন রূপ কী?

বারো মাসে বারো রূপে পূজিত হলেও মহাশক্তি আসলে একটাই, আদিশক্তির বিভিন্ন রূপ কী?
03 Oct 2021, 10:28 AM

বারো মাসে বারো রূপে পূজিত হলেও মহাশক্তি আসলে একটাই, আদিশক্তির বিভিন্ন রূপ কী?

সিদ্ধার্থ সিংহ

 

হিন্দুধর্ম অনুযায়ী জগতের স্রষ্টা ব্রহ্ম, আবার তিনিই পুরুষ ও প্রকৃতিতে দ্বিধাবিভক্ত। পুরুষ পুংশক্তি; আর নারীশক্তি হল প্রকৃতি। আর এই অপরূপ প্রকৃতিই পরমব্রহ্মের শক্তি।

হিন্দু শাস্ত্রমতে, এই নারী শক্তিই আদি শক্তি বা আদ্যাশক্তি মহামায়া। শক্তির মূল উৎস শক্তিমান ব্রহ্ম, আর এই মাতৃশক্তি তাঁরই একটি প্রকাশ।

সে জন্য তাঁকে বলা হয় ব্রহ্মারূপিণী। হিন্দু শাক্ত অনুসারীগণ তাঁকে পরমাশক্তি, মহাশক্তি, মহাগৌরী, মহাদেবী, মহালক্ষ্মী, চামুণ্ডা, কালী, তারা, দূর্গা, জগদম্বা, মহাসরস্বতী, সীতা, রাধা-সহ আরও অনেক নামে পুজো করেন।



আদিশক্তির বিভিন্ন রূপ

হিন্দু পুরাণে আদিশক্তির নানান রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়। তার মধ্যে বাংলা বারো মাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আদিশক্তির বারোটি রূপ বাঙালি শাক্ত অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত আছে। এগুলো হল--- গন্ধেশ্বরী, ফলহারিণী, কামাক্ষ্যা, শাকম্ভরী, পার্বতী, দুর্গা, জগদ্ধাত্রী, কাত্যায়নী, পৌষকালী, রটন্তীকালী, সঙ্কটনাশিনী ও বাসন্তী।



গন্ধেশ্বরী

বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস, বৈশাখ মাসের পূর্ণিমাতে মূলত গন্ধবণিকেরাই মাতৃ শক্তির প্রতীক এই গন্ধেশ্বরী দেবীর পুজো করেন। বাংলার গন্ধবণিকেরা আগে শৈবধর্মের উপাসক অর্থাৎ শিবের উপাসক হলেও পরবর্তিকালে শাক্ত উপাসক হয়ে ওঠেন।



ফলহারিণী

হিন্দু তন্ত্রমতে, ফলহারিণী কালী হল আদিশক্তির একটি রূপ। জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষেরা জীবনের বাধা-বিপত্তি দূর করার জন্য নানা রকম ফলমূল, মিষ্টান্ন দিয়ে ফলহারিণী কালীর পুজো করেন।



শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ১২৮০ বঙ্গাব্দে জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে দক্ষিণেশ্বরে আদ্যাশক্তির সগুণরূপে এই দিনেই স্ত্রী সারদা দেবীকে পুজো করেছিলেন। আজও রামকৃষ্ণ মঠ ও আশ্রমে এই পুজো 'ষোড়শী' পুজো নামে মহাসমারোহে পালিত হচ্ছে।



কামাক্ষ্যা

আদিশক্তির আর এক রূপ হল ঊর্বরতার দেবী--- কামাক্ষ্যা। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী, আষাঢ় মাসে দেবী কামাক্ষ্যার পুজো করা হয়। বাংলায় একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে--- '৬ আষাঢ় অম্বুবাচি, তার নেই কোন পাঁজিপুঁথি'। এই পুজো উপলক্ষে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় অম্বুবাচি উৎসব পালন করা হয়। আসামের অত্যন্ত জাগ্রত কামাক্ষ্যা মন্দিরে সবচেয়ে বড় অম্বুবাচি উৎসবের আয়োজন করা হয়।



শাকম্ভরী

শাকম্ভরী হলেন শ্রাবণ মাসের আরাধ্যা দেবী। দেবীর এই রূপের বর্ণনা মার্কণ্ডেয় পুরাণ ও দেবীভাগবত পুরাণে বর্ণিত আছে। দেবীভাগবত পুরাণে উল্লেখ আছে, হিরণ্যাক্ষ বংশধর রুরুর পুত্র দুর্গমাসুরকে বধ করার জন্যই দেবী পার্বতী শাকম্ভরী রূপ ধারণ করে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।


শ্রাবণ মাসে প্রকৃতিতে প্রাচুর্য আনেন তিনি। তাঁর কৃপাতেই বাংলার মাঠঘাট ভরে ওঠে শাকসব্জিতে, এমনটাই মনে করেন দেবীর ভক্তরা। আর সে জন্যই গাছগাছালির পাতার রঙের সঙ্গে মিল রেখে এই দেবীর গায়ের রংও সবুজ। যদিও ইদানিংকালে আদিশক্তির এই রূপের পুজো এখন খুবই কমে গেছে।

কৌশিকী

একবার শুম্ভ আর নিশুম্ভ নামে দুই ভয়ঙ্কর অসুর  ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল জয় করে ফেলেছিল। তখন স্বর্গ হারানোর ভয়ে আতঙ্কগ্রস্থ দেবতাদের অনুরোধে দেবী পার্বতী নিজের কোষিকা থেকে একজন দেবীর সৃষ্টি করেন। যিনি ভাদ্র মাসের অমাবস্যা তিথিতে ওই সহদর দুই ভাইকে বধ করেন। যেহেতু কোষিকা থেকে ওই দেবীর উৎপত্তি, তাই ওই দেবীর নাম হয়--- কৌশিকী।




দুর্গা

আশ্বিন মাসে যাঁর আরাধনায় মেতে ওঠে গোটা বাংলা, তিনিই হলেন দেবী দুর্গা। রামায়ণের কাহিনিতে যে অকালবোধনের কথা বলা হয়েছে এবং রামচন্দ্র একশো আটটি নীলপদ্ম দিয়ে যাঁর আরাধনা করতে গিয়ে, একটা পদ্ম কম পরায়, নিজের নীলচোখকে নিবেদন করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তিনি হলেন আদিশক্তির এই রূপ।



সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দেবীর সঙ্গেই মহিষাসুরমর্দিনী ও চার সন্তানের জননী, দেবী পার্বতীর রূপটি মিশিয়ে এই দুর্গাপুজোর প্রচলন হয় বাংলায়। এখন বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল উৎসব হল এই--- দুর্গোৎসব। দুর্গম নামের এক দৈত্যকে বধ করার জন্যই দেবী পার্বতীর নাম হয়--- দুর্গা।



জগদ্ধাত্রী

দেবী জগদ্ধাত্রী কার্তিক মাসের আরাধ্য দেবী। পৌরাণিক কাহিনিতে আছে, এক সময় ইন্দ্র, অগ্নি, বায়ু ও চন্দ্র--- এই চার দেবতা খুব অহংকারী হয়ে উঠেছিলেন। আদিশক্তির শক্তিতেই যে তাঁরা বলীয়ান, সেটা ভুলে গিয়েছিলেন।


তখনই তাঁদের সামনে জগতের রক্ষাকারিণী দেবী হিসেবে আবির্ভূত হন দেবী পার্বতী। জগতকে রক্ষা করার জন্যই যেহেতু তাঁর আবির্ভাব, তাই পার্বতীর এই রূপের নাম হয়--- জগদ্ধাত্রী।
পশ্চিমবঙ্গের চন্দনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো সবচেয়ে বিখ্যাত। বিখ্যাত আলোর রকমারি কারিগরিও। চার দিনের এই পুজোর শেষ দিনে ওখনকার সমস্ত পুজো কমিটি পর পর লাইন দিয়ে শোভাযাত্রা বের করে একই দিনে দেবীমূর্তির বিসর্জন দেন।

কাত্যায়নী

আদিশক্তির কাত্যায়নী রূপের আরাধনা করা হয় অগ্রহায়ণ মাসে। মূলত বিবাহ ও সন্তান কামনা পূরণ করার জন্য অনেকে দেবী কাত্যায়নীর আরাধনা করেন।


ভাগবত পুরাণ অনুসারে, ব্রজের গোপিণীরা শ্রীকৃষ্ণকে স্বামীরূপে পাওয়ার জন্য এই দেবীর মূর্তি গড়ে পুজো করেছিলেন।

বাংলাদেশের মাগুরায় বেশ ঘটা করে কাত্যায়নী উৎসবের আয়োজন করা হয়। ঋষি কত্যায়ানের মেয়ে হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন বলেই দেবীর এই রূপের নাম--- কাত্যায়নী।



পৌষকালী

বাংলার অনেক কালীমন্দিরেই পৌষকালীর পুজো হয়। আদিশক্তির এই রূপকে বলা হয়--- মোক্ষদানকারিণী। পৌষ মাসের অন্যতম প্রধান সবজি মুলোই এই দেবীর প্রধান প্রসাদ। তাই পৌষ মাসে পুজো হয় বলে বেশির ভাগ লোক পৌষকালী বললেও, অনেকে এই দেবীকে মুলোকালীও বলেন।



রটন্তী কালী

মাঘ মাসে কৃষ্ণ চতুর্দশীতে আদিশক্তির আর এক রূপের পুজো করা হয় বাংলার বিভিন্ন কালী মন্দিরে। দেবীর এই রূপকে বলা হয়--- রটন্তী কালী। আদিশক্তির এই রূপকে গৃহের সুখশান্তি রক্ষাকারিণী দেবী হিসেবে গণ্য করা হয়। দেবীর এই রূপের আরাধনায় সাংসারিক জীবন সুখের হয় বলেই ভক্তরা মনে করেন।



সংকটনাশিনী দুর্গা

ফাল্গুন মাসের আরাধ্যা দেবী হলেন--- সংকটনাশিনী। বসন্তের শুরুতে এই সময় বাংলার ঘরে ঘরে নানা ধরনের রোগের প্রকোপ দেখা দেয়। তাই জীবনসঙ্কট ও অন্যান্য বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য মায়ের ভক্তরা এই সঙ্কটনাশিনী দেবীর পুজো করে থাকেন।



বাসন্তী

চৈত্র মাসে বাসন্তী দেবী হিসেবে পূজিত হন দেবী দুর্গা। শরৎ কালে দুর্গা পুজোকে যেমন শারদীয় দুর্গাপুজো বলা হয়, ঠিক তেমনি চৈত্র মাসে বা বসন্তকালে বাসন্তী পুজোকে বলা হয় বাসন্তী দুর্গা উৎসব। পূরাণ মতে, রাজা সুরথ ও সমাধি বৈস্য বাসন্তী দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। চৈত্র মাসে বাংলার অনেক জায়গায় আদিশক্তিকে অন্নপূর্ণা দেবী রূপেও পুজো করা হয়।



 ------------------------------

ads

Mailing List