আলো / গল্প - লিখেছেন মৌমিতা বিশ্বাস

আলো / গল্প - লিখেছেন মৌমিতা বিশ্বাস
05 Jun 2022, 02:30 PM

আলো / গল্প

মৌমিতা বিশ্বাস

 

শিমূল গাছটার নিচে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে মৌলী। শেষ বসন্তের রবিবারের দুপুরে একটু শুনশান করছে জায়গাটা। রোদটাও বেশ তেতে আছে। ইচ্ছে করেই গাড়িটা একটু দূরে দাঁড় করিয়ে হেঁটে এসেছে সে। শিমূল গাছটা ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে।

 এই পাড়া ছেড়ে এই মফস্বল ছেড়ে তারা যেদিন চলে গেছিলো সেদিনও তাদের পাড়ায় ঢোকার মোড়ে এই শিমূল গাছটা এইভাবেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিদায় জানিয়েছিলো তাদের। মা আর বোনের হাত ধরে শহরে চলে এসেছিলো তারা। মাত্র আট বছর বয়স তখন তার। একটা শিমূল গাছের আয়ু কতদিন হয়? মনে মনে ভাবছিলো সে। আজ তার প্রায় চৌত্রিশ বছর বয়স। এতগুলো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও শিমূল গাছটা একই রকম রয়ে গেছে!!! মানুষ গুলোও কি একই আছে? কে জানে।

   প্রায় চব্বিশ পঁচিশ বছর আগের কথাগুলো মনে পড়ছে তার। এই মফস্বলেয় জন্ম তার। এখানেই তার বাবার বাড়ি ছিলো। হ্যাঁ বাবার বাড়িই। ওই বাড়িটা কোনোদিনই তার নিজের বাড়ি ছিলোনা। থাকলে কি আর বাবা মারা যাওয়ার পরে ওই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয় তাদের? পর পর দুই মেয়ে হওয়ায় এমনিতেই একটু কোণঠাসা হয়ে ছিলো তার মা। কিন্তু বাবার চোখের মণি ছিলো তারা দুই বোন। আর কৃতি, বড় চাকরি করা সুরোজগেরে বাড়ির বড় ছেলের ওপর কথা বলা বা তার বিরোধিতা করার ঝুঁকি কেউ নিতো না। যদি ছেলে নিজের সংসার নিয়ে আলাদা হয়ে যায়!!! এই ভয় ছিলো সবার মনে। কিন্তু ওই একরত্তি বয়সেও মৌলী বুঝতে পারতো তার আর তার বোনের থেকে বাড়িতে মেজকাকা আর ছোটকাকার দুই ছেলের আদর বেশ কিছুটা বেশী। যা প্রকাশ্যে নয় গোপনে অন্ত:সলিলার মতো বাহিত হতো তার বাবা আর মা ছাড়া বাড়ির আর সবার মনে।

এর মধ্যে ঘটে গেলো সেই অঘটন। যদিও তখন খুবই ছোটো মৌলী তাও তার মনে পড়ে বেশ কিছুদিন ধরেই শরীর ভাঙতে শুরু করেছিলো বাবার। ডাক্তার দেখানোর কথাবার্তা চলছিলো। এরকমই একদিন সকালে অফিসে বেরোনোর আগে হঠাৎ অসহ্য পেটে ব্যথা শুরু হয়। তার সঙ্গে বমি। বমির রঙ ছিলো পুরো কালো। মা কাঁদছিলো খুব। ভয়ে কাঠ হয়ে মৌলী তার দু বছরের ছোট বোনকে জাপটে ধরে ঘরের এক কোণে বসেছিলো। কাকারা সঙ্গে সঙ্গে হসপিটালে নিয়ে গেলো বাবাকে। যকৃতে ক্যান্সার ধরা পড়েছিলো। লাস্ট স্টেজ। তারপরে আর বেশীদিন নয়। মাসখানেক ভুগেই তাদের ছেড়ে চলে গেলো বাবা। শোকে দুঃখে আর অনিশ্চয়তায় তাদের মা তখন দিশেহারা। আর সেই সময়েই এতদিনের অন্ত: সলিলা নদী যেনো সমুদ্র হয়ে ফুলে ফেঁপে উঠলো। গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়লো তাদের ওপর। আশ্চর্য হয়ে যেতো ছোট্ট মৌলী। শুধু একটা মানুষের থাকা আর না থাকার তফাতে চেনা পরিজন চেনা পৃথিবীটা এতটা বদলে যেতে পারে!!!!!!!

কথায় কথায় অপমান আর মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মা বাবার অফিসের পরিচিত দু একজনের সাথে যোগাযোগ করতে শুরু করলো। উপরোধ, অনুরোধ, ধরা - কওয়া করে একটা ছোটো খাটো চাকরি জোগাড় করলো মা ওই অফিসেই। তাতেও দাদুর প্রবল আপত্তি ছিলো। দুটো ছোটো ছোটো মেয়ে রেখে বাড়ির বউ চাকরি করতে যাবে!!!!! প্রশ্নই ওঠে না। ঝামেলা চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছানোর পরে শেষমেশ মা তাদের নিয়ে কিছুদিনের জন্য মামারবাড়ীতে গিয়ে ওঠে। কিন্তু সেখানেও বেশীদিন নয়। কারন তাদের মা তো বটেই সেই সঙ্গেই কোথায় যেনো একরত্তি তারা দুজনেও বুঝতে পেরেছিলো যে এই পৃথিবীতে নিজেদের লড়াইটা নিজেকেই লড়তে হয়। কারো কাছে কিছু আশা না করায় উচিৎ। আস্তে আস্তে অফিসের কাছাকাছি একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে তাদের নিয়ে সেখানে উঠে যায় মা। শুরু হয় তাদের তিনজনের দাঁতে দাঁত চেপে এক অসম লড়াই এই জগৎ সংসারে মাথা তুলে টিকে থাকার জন্য।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাড়ার ভিতর তাদের পুরোনো সেই কোন ছোটবেলায় ফেলে যাওয়া বাড়ির দিকে পা বাড়ায় মৌলী। ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে এই বাড়ির কেউ আর কোনোদিন সেভাবে যোগাযোগ রাখেনি তাদের সাথে। ওই কালে ভদ্রে চিঠি চাপাটি পাঠানো। বা কখনও সখনও ফোন এইটুকুই যা যোগাযোগ ছিলো। মা তাদের নিয়ে আর একদিনও আসেনি এই বাড়িতে। কেউ ডাকেওনি। দাদু ঠাকুমার মারা যাওয়ার খবর জানার পরে মা একা এসেছিলো তাদের কদিনের জন্য মামারবাড়িতে রেখে। কর্তব্য যা করার করেছিলো। কিন্তু মৌলীদের আসা হয়নি আর। মনে মনে জানতো মৌলী একদিন সফল  হয়ে মাথা উচু করে ফিরে আসবেই সে এই বাড়িতে। প্রমাণ করে দেবে মেয়েরা কোনো অংশে কম নয়। তারাও পারে বংশের মুখ উজ্জ্বল করতে। এই পাড়া, তাদের পুরোনো দিনের একতলা বাড়ি, বাড়ির উঠান, আর মোড়ের মাথার ফুলে ফুলে লাল হয়ে থাকা শিমূল গাছটাকে কথা দিয়ে গেছিলো সে। আজ সেইদিন এসেছে। সে আর তার বোন দুজনেই প্রতিষ্ঠিত আজ। আজ সে ফিরে এসেছে সবাইকে দেখাতে। সবার চোখের সামনে নিজের সাফল্যের বাহারী পেখম মেলে অহংকারী হতে। ভাবতে ভাবতে দরজার কড়া নাড়লো সে।

একইরকম আছে বাইরের দিকটা। অনেকদিন বাড়ির কোনো কাজ করানো হয়নি বোঝা যাচ্ছে। আশে পাশের নতুন গজিয়ে ওঠা বেশ কিছু বাড়ির মধ্যে এই বাড়িটা যেনো বেখাপ্পা রকমের বুড়োটে আর ক্ষয়িষ্ণু লাগছে।

কড়া নাড়ার আওয়াজ শুনে দরজা খুলে দাঁড়িয়েছে একজন মাঝবয়সী মহিলা। কাঁচা পাকা চুল মাথায়। মুখের প্রতি রেখায় জীবন তার অসহযোগিতার ছাপ রেখে গেছে যেনো। দু মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে চিনতে পারলো মৌলী। বড় কাকিমা। কাকিমা কিন্তু একবারেই চিনতে পেরেছে তাকে।

-"ওমা মৌলী!!!!!!!! এতদিনে মনে পড়লো আমাদের? আয় আয় ভিতরে আয়। আরে তোমরা সব এসো গো। কে এসেছে দেখো। আমাদের ভাঙ্গা ঘরে আজ চাঁদের আলো এসেছে"

একটু হকচকিয়ে গেলো মৌলী। সে জানতো তার সাফল্যের কারণে সে সমাদর পাবে সম্ভ্রমও পাবে এখানে। কিন্তু এতটা উচ্ছ্বাস আসা করেনি। ছুটির দিনের দুপুর। সবাই বোধ হয় বাড়িতেই ছিলো। একে একে বেরিয়ে এলো সবাই। সবার চোখ জুড়ে বিস্ময়, শ্রদ্ধা আর আরেকটা অদ্ভুত জিনিষ দেখতে পেলো মৌলী সেটা যেনো প্রচ্ছন একটা গর্ববোধ তাকে নিয়ে।

বড়কাকাকে হঠাৎ দেখে চিনতে পারেনি মৌলী। হয়তো বছর ষাট বয়স হবে তার। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে আশী। দুই কাকার কেউই তো সেরকম ভালো কোনো চাকরি বাকরি করতোনা। বড়কাকা একটা কাপড়ের মিলে কাজ করতো। আর ছোটকাকা একটা ছোটো স্টেশনারি দোকান দিয়েছিলো রাস্তার ধারে।

সেই বড়কাকা এসে বুকে জড়িয়ে ধরলো মৌলীকে। সবাইকে বললো,

- "পাড়ার সবাইকে ডেকে দেখাও গো। আমাদের বাড়ির মেয়ে এসেছে। আমাদের গর্ব।"

বড়কাকীমা বললো

-" হবেক্ষণ সব। আগে মেয়েটাকে একটু বসে জিরোতে দাও দিকিনি। একটু জল মিষ্টি খাক। সারাক্ষণ কাজের চাপে ব্যস্ত থাকে। কি খায় সারাদিন কখন খায় কে জানে।"

-"হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক বলেছো। আয় মা আয় বোস।"

সবাই খুব ব্যস্ত হয়ে গেলো তাকে আপ্যায়ন করার জন্য। তার দুই খুড়তুতো ভাই। যারা একসময় বাড়িতে অনেক বেশি দামী ছিলো তাদের দু বোনের চেয়ে তারা তার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে এলো। বাঁধা দিল মৌলী। ছোটোকাকার ছেলে দীপু বাবার স্টেশনারি দোকানটাই চালায়। আর বড়কাকার ছেলে বাপ্পা টুকটাক জমি বাড়ির দালালী করে কথায় কথায় বুঝলো মৌলী।

বেশ কিছুক্ষণ চললো এই আনন্দের উৎসব। বাড়ি শুধু নয়। পাড়াময় আলোড়ন পড়ে গেলো যেনো। কাকা কাকিমারা সবাইকে ডেকে ডেকে দেখাতে লাগলো মৌলীকে। ক্ষনিকের জন্য যেনো তার সাফল্যের আলো চলকে এসে লেগেছে এই নোনাধরা দেওয়াল আর শেওলামাখা উঠানের বুড়োটে চেহারার মফস্বলের একতলা বাড়িটার কোনায় কোনায়।

বাপ্পার বছর পাঁচেকের মেয়েটা লেপ্টে বসে ছিলো তার গায়ে। তার মা সরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো জোর করে। বাঁধা দিয়েছিলো মৌলী। থাকনা। মেয়েটা হঠাৎ ফিসফিস করে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো

-" পিপি আমি বড় হয়ে তোমার মতো হবো। মা বলেছে তোমার মতো হতে।"

যে বাড়িতে একদিন মেয়ে বলে তাদের মায়ের হাত ধরে অনিশ্চিত জীবনের পথে বেরিয়ে যেতে হয়েছিলো সেই বাড়িরই একটা ছোট্ট মেয়েকে তার মা আজ তার মতো হতে বলছে। নিজের মায়ের সেই সব কঠিন দিনের শ্রান্ত অথচ দৃঢ় মুখটা মনে পড়ে গেলো তার। বুকের ভিতরটা চিনচিন করে উঠলো।

আরও কিছুক্ষণ বসতে বলছিলো সবাই। কষ্ট করে রাতটুকু থেকে যাওয়ার কথাও বলছিলো। কিন্তু আর বেশিক্ষণ বসলোনা মৌলী। সে তো আজ তার সাফল্য তার সামাজিক অবস্থান দেখিয়ে অনেকদিন আগের দুর্ব্যবহারের জবাব দিতে এসেছিলো। কিন্তু এরা যেনো কখন  নিজে থেকেই হেরে বসে আছে। নিজেরাই কবে যে তাকে নিজেদের মনের মধ্যে সোনার সিংহাসনটাতে বসিয়ে দিয়েছে তা তারা নিজেরাও হয়তো জানেনা। সময় সব হিসেব নিকেশ মিলিয়ে দেয়। তার কাছে কোনো ফাঁকি নেই।

সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলো মৌলী। আই পি এস মৌলী দত্ত। কাকারা গাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে গেলো তাকে। হাত নেড়ে জানালার কালো কাঁচ তুলে দেওয়ার আগে শিমূল গাছটা চোখে পড়লো। আগুনের মতো লাল শিমূল ফুল ফুটে আছে গাছ ভরে। যেন একটা জ্বলন্ত মশাল। যার তেজ যার আলো এমনিতেই অপরূপ রূপ নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেয় সবার। সবাই ভালোবাসা মেশানো মুগ্ধ বিস্ময়ে বারবার এমনিতেই ঘুরে তাকায় তার দিকে। তাকে এগিয়ে যেতে হয় না কখনো নিজেকে দেখানোর জন্য।

>>>>>>

লেখিকা অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার (রেভিনিউ)

ads

Mailing List